১
বই: স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ
লেখক : পিনাকী ভট্টাচার্য
প্রথমেই লিখতে যাচ্ছি ‘স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ’ বইটা নিয়ে, লিখেছেন পিনাকী ভট্টাচার্য। ৬৫০ টাকা দিয়ে অনলাইনে পাইরেটেড কপি সংগ্রহ করতে হয়েছে। মোট ৪৮৮ পৃষ্ঠা এবং বাইশটি অধ্যায়ে বিভক্ত ঝরঝরে গল্পের মতো করে লেখা বইটি পড়ে শেষ করতে খুব বেশি সময় লাগেনি। লেখকের প্রকাশভঙ্গি চমৎকার এবং বইয়ে ব্যবহৃত প্রত্যেকটি তথ্যের সূত্র উল্লেখ করে আপাতদৃষ্টিতে বিশ্বাসযোগ্যভাবে প্রত্যেকটি বিষয় উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে তারপরও কথা থেকে যায়, যেমন বইএর দ্বিতীয় অধ্যায়ে (৭৩-৭৫ পৃষ্ঠা) পরিবেশিত তথ্য অধিকতর যাচাইয়ের দাবী রাখে। এই অধ্যায়টা আমাকে যথেষ্ট হতাশ করেছে এই কারণে যে, স্বাধীনতা যুদ্ধে গণহত্যার মতো একটা স্পর্শকাতর ইস্যু এত অল্প পরিসরে এবং যথেষ্ট সংখ্যক সূত্র ব্যবহার না করেই আলোচনা করা যৌক্তিক হয়নি। শুধুমাত্র ‘বিবিসি-ওয়ার্ল্ড সার্ভিস’-এর পূর্ব পাকিস্তান বিভাগের সাংবাদিক সিরাজুর রহমানের দেয়া তথ্য ব্যবহার না করে সেসময়ে দেশে-বিদেশে প্রকাশিত পত্রিকা এবং এম আর আখতার মুকুল-এর চরমপত্রে উল্লেখিত তথ্য, আমলে নেয়া উচিত ছিল। একাত্তরের জেনোসাইড বা গণহত্যার বিষয়টা নিয়ে আমার মাঝে একটা আলাদা ফিলিংস কাজ করে। রুয়ান্ডার রাজধানী কিগালি’তে একটা বিশ্বমানের জেনোসাইড মিউজিয়াম আছে জানতে পেরে শুধুমাত্র সেটা দেখার জন্যই ২০১১ সালে আমি কিগালি’তে গিয়েছিলাম, কিন্তু সেখানে পৃথিবীর সব দেশের গণহত্যার দলিল প্রদর্শিত হলেও বাংলাদেশে একাত্তরে সংঘটিত গণহত্যার কোন নিদর্শন না থাকায় হতাশ হয়েছিলাম। এই বিষয়ে মিউজিয়াম অফিসে খোঁজ-খবর নিয়েও যথোপযুক্ত কারণ জানতে পারিনি।
বইয়ে প্রচুর রেফারেন্স দেয়া আছে, তবে পাঠক এই বই পাঠ করার পাশাপাশি সেসব রেফারেন্স এবং একই বিষয়ে প্রকাশিত অন্যান্য সূত্র ঘাঁটাঘাঁটি করলে বিভ্রান্ত হবার সুযোগ থাকবেনা। যে কোন বই পাঠ করার সময়ে যিনি বইটা লিখেছেন তার সামাজিক-রাজনৈতিক-শিক্ষাগত গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টাও আমলে নেয়া জরুরী। কেননা কোন লেখকই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন এবং সবারই দেখার বা দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতা থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে পুরো বইয়ের মধ্যে, বিশেষ করে প্রথম অধ্যায়ে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে ঢাকায় ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো লেখক যেভাবে সাজিয়েছেন তা পড়ে ভালো লেগেছে। বইএ অনেক ছোট ছোট অথচ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার উল্লেখ যেমন আছে, তেমনি যেকোন একটা বিষয়কে অন্য বা ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপনের ব্যাপারটিও চোখে পড়েছে।
২
বই: জন্ম ও যোনির ইতিহাস
লেখক: জান্নাতুন নাঈম প্রীতি
এই বইটা নিয়ে ফেসবুকে যেভাবে আলোচনা হয়েছিল তাতে মনেহয়েছিল বইটা না পড়ে কোন মন্তব্য করা ঠিক হবেনা। অবাক হলাম এটা দেখে যে, ১৭৬ পৃষ্ঠার একটা বইয়ের মাত্র ১৪টি পৃষ্ঠায় (৭৮-৯১) লেখা ঘটনার ওপরে কথা বলতে গিয়ে বইয়ে উল্লেখকরা লেখিকার মানবাধিকারের জন্য লড়াই এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। নিরাপত্তার খাতিরে দেশত্যাগ করে প্যারিসে নির্বাসনে গিয়ে লেখিকা তার জীবনে ঘটে যাওয়া তথ্যগুলো বইয়ের পাতায় তুলে ধরেছেন। শুধু তাই নয় বিদেশে থাকাকালীন দেশবিদেশের বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য স্থানে ভ্রমণ, সেখানকার পরিবেশ-শিল্প-সাহিত্য নিয়ে সামান্যতম হলেও আলোচনা করেছেন। সেসব বর্ণনা থেকে জানার আছে অনেক কিছুই। আমরা তো বিভিন্ন ভাবেই জ্ঞান আহরণ করে থাকি, ভ্রমণ কাহিনীও জ্ঞান অর্জনের একটা ভালো মাধ্যম। তার রাজনৈতিক কিংবা ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই, তবে দেশ ছেড়ে যাবার মুহুর্তে তার আবেগ-অনুভুতির বর্ণনা আমাকে স্পর্শ করেছে।
সামগ্রিকভাবে বলতে পারি ‘জন্ম ও যোনির ইতিহাস’ বইটা আমার না পড়লেও চলতো। পড়ে কোন ক্ষতি যেমন হয়নি, আবার লাভও হয়নি। লেখিকার জীবনে যা ঘটেছে তাই তিনি সরলভাবে এবং অবলীলায় বলে গেছেন। সেখানে কথা প্রসঙ্গে তার প্রেমিক এবং শয্যাসঙ্গীদের বিষয় এসেছে। কিছু নাম এসেছে যারা সমাজে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে বেশ পরিচিত। তবে আমাদের অবদমিত যৌনতার সমাজে যৌন সংক্রান্ত কিছু পেলেই লোকজন লাফিয়ে উঠে, তাই ফেসবুকে তাকে নিয়ে এত মাতামাতি আর এই বইটা নিষিদ্ধ হওয়া। তবে নিষিদ্ধ করেই বরং এর কাটতি বেড়ে গেছে। আর এসবের মাঝে পড়ে আমার পকেট থেকে আধা কেজি গরুর মাংসের দাম, ৫০০ টাকা বেড়িয়ে গেল।
৩
বই: প্রেসিডেন্টের লুঙ্গি নাই
লেখক: ববি হাজ্জাজ
এরপর যে বইটা নিয়ে লিখবো তার নাম ‘প্রেসিডেন্টের লুঙ্গি নাই’, লিখেছেন ববি হাজ্জাজ। লেখক জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। তিনি একসময় জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদের উপদেষ্টা ছিলেন। একুশে বইমেলায় বইটা নিষিদ্ধ হলেও মেলার বাইরে এবং অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে। বইতে সরকারের বিরুদ্ধে কোন কথা বলা হয় নি। এমন কি এটা আসলে কোন বাস্তবধর্মী কাহিনীও নয়। তাই বইটা নিষিদ্ধ করার কোন কারণ খুঁজে পাই নি, তবে নিষিদ্ধ করায় লেখকের নিশ্চিত উপকার হয়েছে। মুসা বিন শমসের-এর ছেলের লেখা বই যারা ছুঁয়েও দেখতেন না, নিষিদ্ধ করায় তারা হয়তো বইটা সম্পর্কে খানিকটা আগ্রহী হয়েছে্ন। এই যেমন আমার নিজেরও জানার আগ্রহ ছিল, বইতে এমন কি লেখা আছে যা বইটাকে নিষিদ্ধ করলো। বইতে মূলত একটা কাল্পনিক রাজ্যের গল্প বলা হয়েছে, যেখানে খালেদ নাম একজন ব্যক্তি নিজের জবানীতে কোন একজন স্বৈরশাসক এবং তাকে ঘিরে থাকা কিছু মানুষের কথা, তার পরিণতির কথা বর্ণনা করেছে। লেখক যেহেতু রাজনীতির উঁচু পর্যায়ে চলাফেরা করেন তাই উপরমহলের অনেককিছুই তার জানা। আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে ঘটে যাওয়া সেরকম কিছু ঘটনা তিনি রূপকথার আদলে বর্ণনা করেছেন। তবে বইটা পড়ে আমি মোটেও আরাম পাই নি। লেখকের লেখার হাত মজবুত নয়, বারবার মনে হয়েছে তাকে যেন গান পয়েন্টে রেখে বইখানা লিখিয়ে নেয়া হয়েছে। লেখার মাঝে অপ্রাসঙ্গিক ঘটনার অবতারণা যে বিরক্তির কারণ হতে পারে সেটা লেখকের বোঝা দরকার ছিল।
বইটার নাম ‘প্রেসিডেন্টের লুঙ্গি নাই’ রাখার কারণ বুঝি নি। বইয়ে ঘটনার শুরুতে যখন মাকড়শা ভাই বলে, ‘স্যারের লুঙ্গি নিয়ে আয়’, তখন খালিদ বলে ''স্যারের তো লুঙ্গি নাই। প্রেসিডেন্টের তো লুঙ্গি নাই।'' পুরো বইয়ে এই একবারই বাক্যটা ব্যবহার করা হয়েছে, আর সেটা দিয়েই নামকরণের উদ্দেশ্য কি? তবে লুঙ্গি নাই বলতে যদি কারও ইজ্জত হরণ করা টাইপ কিছু বোঝানো হয়ে থাকে তাহলে ঘটনার প্রেক্ষাপটে কিছুটা যৌক্তিক হলেও হতে পারে। তবুও যেন একটু গোলমেলে ঠ্যাকে। আর লেখকের উদ্দেশ্য যদি হয়ে থাকে পাঠকের মনোযোগ আকর্ষন, তাহলে বলবো তিনি এক্ষেত্রে সফল। তবে আমার মত পাঠকরা নিশ্চয়ই নিজে নিজেই কানমলা দিয়েছেন। দুর্মূল্যের বাজারে এভাবে ২৬০ টাকা গচ্চা না দিয়ে সিএসডি থেকে ইফতারের জন্য এক কেজি শাহী জিলাপি কেনা যেত। আফসোস!
৪
সবাই ভালো থাকবেন। হ্যাপি রিডিং। সবার জন্য শুভ কামনা রইলো।
পোস্ট ভিউঃ 52