১
‘নানান দেশের নানান ভাসা (ভাষা)
বিনে স্বদেশীয় ভাসে পূরে কি আশা?
কত নদী সরোবর,
কি বা ফল চাতকীর|
ধরাজল বিনে কভু ঘুচে কি ত্রিষা’ (তৃষা)?
নিধুবাবু অর্থাৎ রামনিধি গুপ্তের লেখা এই স্বদেশী গানটির সঙ্গে আমরা কমবেশি সবাই পরিচিত। বাঙলা গানের বিষয়বস্তুতে আমূল পরিবর্তন ঘটে তার হাত ধরেই। তার পূর্বসূরীদের অগ্রাহ্য করে তিনি দেবতা নয়, মানুষকে নিয়ে, মানব-মানবীর প্রেমের কথা গানের বিষয়বস্তুতে নিয়ে আসায় তাকে গানের জগতে অশ্লীলতা আনার অপবাদ সইতে হয়েছিল। কারণ তার আগে কেউতো এভাবে গান লেখেনি। তখনও রামমোহন রায়ের নেতৃত্বে বাঙলায় রেনেসাঁর যাত্রা শুরু হয়নি। তার রচনায় মানবিক প্রেমের কথা প্রকাশ পায় উনিশ শতকের প্রথম দশকেই। তার একটি গান-
‘অনেক দিবস পর মিলন হইল।
বিরহ-বিষ-অনল ছিল অধিক প্রবল।
তাহা যে শীতল হবে মনেতে না ছিল।।
মিলন আশ্রয়ে প্রাণ, ছিল যেঞি তেঁই প্রাণ তোমারে পাইল।।
কত সুখ হল লাভ, কথায় কত কহিবে।
আনন্দ সাগরে মন, নয়ন সজল।।’
আসলে বাঙলা গানের ধারায় যে গানগুলোকে পুরোপুরি ধর্ম নিরপেক্ষ গান বলা যেতে পারে তা নিধু বাবুর লেখা টপ্পা। টপ্পা হিন্দী শব্দ। এর বাঙলা মানে লম্ফ। তবে বাঙলা টপ্পার আদি পুরুষ কালী মীর্জা। ১৭৮০- ৮১ সালের দিকে তিনি সঙ্গীত শিক্ষা শেষে হুগলিতে এসে বাঙলা টপ্পা গানের চর্চা শুরু করেন। কালী মীর্জা অনেক আগে থেকে বাঙলা টপ্পার প্রচলন করলেও কলকাতার নাগরিক সমাজে নিধুবাবুর প্রচুর জনপ্রিয়তা ছিল। বর্ধমানের মহারাজা তেজেশচন্দ্র রায়বাহাদুর তার গানের একজন একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন। তিনি ১৭৭৬ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে লখনউ-এর কাছে ছাপরায় কালেক্টরি অফিসের কেরানি হিসেবে চাকুরি করতে গিয়ে গোলাম নবী নামে একজন ওস্তাদের কাছে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চর্চা করেন। কিন্তু যে ধারার গান তাকে বেশী আকৃষ্ট করে তা হলো টপ্পা। এই টপ্পা রচিত হয়েছিল এক ধরণের পাঞ্জাবী লোকগীতির ওপরে ভিত্তি করে। ক্যাপ্টেন উইলার্ভকে উদ্ধৃত করে রাজ্যেশ্বর মিত্র তার ‘বাঙলার গীতিকার ও বাঙলা গানের নানা দিক’ গ্রন্থে টপ্পার উৎস সম্পর্কে লিখেছেন– ‘টপ্পা ছিল রাজপুতনার উষ্ট্র চালকদের গীত। শোনা যায়, মধ্যপ্রাচ্য থেকে যেসব বণিক উটের পিঠে চেপে বাণিজ্য করতে আসত, তারা সারারাত নিম্নস্বরে টপ্পার মতো একপ্রকার গান গাইতে গাইতে আসত। তাদের গানের দানাদার তানকেই বলা হতো জমজমা। আসলে জমজমা শব্দে ‘দলবদ্ধ উষ্ট্র’ বোঝায়। সাধারণভাবে উষ্ট্র বিহারিদের গানও এই শব্দের আওতায় এসে গেছে। লাহোরে উট বদল হতো। এই লাহোর থেকেই টপ্পার চলটি ভারতীয় সংগীতে অনুপ্রবিষ্ট হয়েছে।’ শোরী মিয়া (১৭৪২-১৭৯২) নামে একজন সঙ্গীতজ্ঞ টপ্পা গানগুলোকে সাঙ্গিতিক আদর্শে সাজিয়ে সম্পূর্ণ আলাদা একটি গায়ন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। ১৭৯৪ সালে কলকাতায় ফিরে নিধু বাবু তার টপ্পা গান চালু করেন। শুরুর দিকে লখনউ থেকে আনা মূল হিন্দি গান ভেঙ্গে বাঙলা করে গাইতেন। কিন্তু কিছুদিন পরে তিনি নিজেই বাঙলায় টপ্পা গান লেখা শুরু করেন। এই গানে তিনি দু’ধরণের মৌলিকত্ব দেখালেন, সুরের দিক থেকে তিনি পাঞ্জাবী টপ্পার ক্ষিপ্র গলার কাজ ও অলঙ্কারকে খানিকটা মন্থর করে বাঙলা গানের উপযোগী করে নিলেন। আর আগেই যেটা উল্লেখ করেছি, তিনি আমূল পরিবর্তন আনেন গানের বিষয়বস্তুতে, তিনি এককথায় বিশুদ্ধ মানবীয় প্রেমের গান রচনা করেন।
২
বাঙলা গান নিধুবাবুর হাত ধরে এই পর্যায়ে পৌঁছাতে প্রায় ৬ শত বছর সময় নিয়েছিল কেননা চর্যাপদ যেমন বাঙলা ভাষার আদি নিদর্শন, তেমনি তা বাঙলা গানেরও আদি নিদর্শন। আর্যরা যে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত এনেছিল গুরু পরম্পরার মধ্য দিয়ে তার খানিকটা যে রক্ষা পেয়েছে চর্যাপদে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রতিটি চর্যার ওপর রাগ-রাগিণীর নাম লেখা আছে, এগুলোর সংখ্যা মোট ১৯টি। গবড়া ও গউড়া এবং শীবরী ও শবরী এক হলে এই সংখ্যা হবে ১৭টি। চর্যায় সবচেয়ে বেশী ব্যবহৃত রাগ হলো পটমঞ্জরী। অন্যসব রাগিণীর মধ্যে আছে গউড়া, মালসী, মল্লারী, রামক্রী, কামোদ, বরাড়ী এবং বঙ্গাল। এগুলোর মধ্যে কয়েকটি এখন লোপ পেয়েছে। বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যরা তাদের লেখা চর্যাপদ সুর করে গাইতেন। যারা এগুলো রচনা করেছিলেন তারা নিজেরা হয়তো শাস্ত্রীয় সঙ্গীত জানতেন কিন্তু তাদের শিষ্যরা সবাই যে সঙ্গীত শাস্ত্র শিখে সেগুলো গাইতেন তা মনেকরা ঠিক হবেনা। এখন যেভাবে মানুষ সুর করে ধর্মীয় শ্লোক আবৃত্তি করে তারা হয়তো সেভাবেই আবৃত্তি করতেন। ধর্মের সঙ্গে মানুষের আবেগের সম্পর্ক থাকায় ধর্মীয় শ্লোক সুর করে আবৃত্তি করার একটা প্রবৃত্তি সব ধর্মেই কমবেশি লক্ষ্য করা যায়। আসলে ধর্ম এবং মরমী ভাবনার সঙ্গে গানের যোগাযোগ অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। বাঙলা গানও এর ব্যতিক্রম নয়।
৩
দুশো বছরেরও আগে প্রথম বাঙলা নাটক (দ্য ডিসগাইস, ২৭ নভেম্বর ১৭৯৫ সালে রাধাবাজার, কলকাতায় অভিনীত) এর লেখক কলকাতাবাসী রুশ ভদ্রলোক গেরাশিম লেবেদেফ বাঙালির চরিত্র সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে লিখেছিলেন, বাঙালিরা ভালোবাসে গান আর ভাঁড়ামি। কিন্তু গুনগুন করে কণ্ঠস্বরের ওঠানামার মাধ্যমে যে গানের উৎপত্তি তা তো বাঙালি লিপিবদ্ধ করে রাখেনি, তবে এটা বোঝা যায় যে, আর্যদের আনা ধর্মের মতো সঙ্গীতও তার স্বকীয়তা হারিয়ে একটা লোকায়িত রূপ পেয়েছিল এই বাঙলায়। প্রাচীন বাঙলার জনগোষ্ঠী যে সুরে গান গাইতো কিংবা তাদের ব্যবহৃত তাল- লয় ও বাদ্যযন্ত্র পরবর্তী কালে কতোটা রক্ষা পেয়েছে তা ঠিক করে বলার মতো তথ্য প্রমাণ নেই। তবে আর্যদের সঙ্গীতের সঙ্গে স্থানীয় সঙ্গীতের যে সংমিশ্রণ ঘটেছিল তা বঙ্গাল ও ভাটিয়ালির মতো রাগিণীর নামকরণ থেকে আঁচ করা যায়। এছাড়া গৌড় মল্লার, গৌড় সারঙ্গ ইত্যাদি রাগিণী যে মূলসুরের বঙ্গীয় সংস্করণ তা বুঝতে অসুবিধা হয়না। সেন রাজাদের আমলে কবি জয়দেব গীতগোবিন্দ রচনা করেছিলেন। পালাগান গোছের এই কাব্যের ভাষা সংস্কৃত হলেও তা বাঙলার সম্পদ। তবে চর্যাপদের তুলনায় গীতগোবিন্দে সর্বভারতীয় রাগরাগিণীর ব্যবহার বেশী, এই সংখ্যাটি ১২। এতে যেসব রাগিণীর উল্লেখ আছে তার মধ্যে একটি হলো মালবগৌড়। নাম থেকেই বোঝা যায় এটা উত্তর ভারতীয় রাগিণীর বঙ্গীয় সংস্করণ। গীতগোবিন্দর প্রায় ৩ শত বছর পরে বড়ু চণ্ডীদাসের লেখা শ্রীকৃষ্ণকীর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এটিতে রাধা, কৃষ্ণ আর বড়ায়ির সংলাপ পালাগানের আকারে লেখা হয়েছে। রাগরাগিণীর ব্যবহারের ক্ষেত্রে এটিও চর্যাপদ এবং গীতগোবিন্দর ধারা অনুসরণ করেছে।
১৫ শতকের আগেই বাঙলায় গান যে সুসংবদ্ধ ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা পরিষ্কার বোঝা যায়। ১৬ শতকে চৈতন্যদেবের কীর্তন গানেও পশ্চিম ও মধ্যবঙ্গের এক ধরণের লোক সঙ্গীতের অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়। কীর্তনের মাঝে রাগরাগিণীর ব্যবহার এটিকেও সুসংবদ্ধ সঙ্গীতের চেহারা নিতে সাহায্য করে। কীর্তন গান প্রধানত রাঢ় এবং উত্তরবঙ্গে প্রচলিত ছিল, কিন্তু ১৬- ১৮ শতকে বৈষ্ণব ধর্ম সারা বাঙলায় ছড়িয়ে পড়লে এই গানও ছড়িয়ে পড়ে। এভাবে প্রথম সর্ববঙ্গীয় গানের রূপ লাভ করে কীর্তন, এই জনপ্রিয়তার কারণে কীর্তন গান তার শাস্ত্রীয় রূপ হারায়। ভক্তের মুখে মুখে প্রচারিত এর সরলীকৃত রূপকে বলা হয় ঢপ কীর্তন। ঢপ কীর্তনে পাঁচালি, কথকতা এবং বাউল গানের প্রভাব পড়েছিল। একই সময়ে বাঙলার কোথাও কোথাও পাঁচালি গান জনপ্রিয়তা পায়। কীর্তন গানকে রাগ ও তালের বিচারে বিদগ্ধ সঙ্গীত বললে পাঁচালি গানকে বলতে হবে লৌকিক সঙ্গীত। পালাগানের মতো পাঁচালি গানের বিষয়বস্তু পৌরাণিক কাহিনী, মঙ্গলকাব্যের গানও এই একই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ছিল।
৪
বৈষ্ণব ধর্ম জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল চৈতন্যদেবের প্রভাবে কিন্তু শাক্ত ধর্ম প্রচার করার জন্য তেমন কোন প্রভাবশালী ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটেনি। অথচ শাক্ত ধর্ম বৈষ্ণব ধর্মের চেয়েও পুরনো, এই অঞ্চলের ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে বৈদিক, বৌদ্ধ দর্শনের মিশ্রণ ঘটে এই ধর্মীয় দর্শনে। কৌমভিত্তিক প্রাক- আর্য সমাজ ব্যবস্থা ছিল মাতৃতান্ত্রিক, ধর্মে দেবীর প্রাধান্য সেরকমই ইঙ্গিত দেয়; লোকজ ঐতিহ্যের প্রতিফলন থাকায় সাধারণ মানুষ তাই শাক্ত ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল। এমনকি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যিনি মূর্তিপূজার ঘোর বিরোধী ছিলেন, তিনিও যখন বঙ্গমাতাকে নিয়ে লেখেন, ‘আজি বঙ্গদেশের হৃদয় হতে কখন জননী’ তখন তার অবচেতন মনে হয়তো দেশকে কালী’র অনুষঙ্গে কল্পনা করেছেন। শাক্ত ধর্মের লোকদের সঙ্গে বৈষ্ণবদের বিরোধিতা দীর্ঘদিনের। বৈষ্ণব ধর্ম এবং কীর্তন গান যখন বাঙলার আনাচে- কানাচে ছড়িয়ে পড়ে তখন শাক্তরাও পদাবলী রচনার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে। আর এভাবেই বাঙলায় শ্যামা সঙ্গীতের আবির্ভাব ঘটে। সেসময়ের দুজন বিখ্যাত শ্যামা সঙ্গীত রচয়িতা হলেন রামপ্রসাদ সেন এবং কমলাকান্ত চক্রবর্তী। এনারা দু’জনই উত্তর ভারতীয় সঙ্গীতের রাগরাগিণীর ওপর ভিত্তি করে গান রচনা করলেও তাতে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পাশাপাশি লোকসঙ্গীতের একটি ধারা প্রবহমান ছিল। বিশেষকরে রামপ্রসাদের গানে লোক সঙ্গীতের সুর নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করায় এগুলো বেশ জনপ্রিয় হয়।
সমাজের যারা সরাসরি শাক্ত মতের অনুসারী হলেন না কিন্তু ‘তন্ত্রে’ আস্থা রাখলেন তাদেরই একটি দল হলো বাউল। ‘তন্ত্র’ পুরো প্রকৃতিকে অবলোকন করেছে দেহের মধ্যে। প্রাকৃত দেহের বাইরে তন্ত্র কোন অপ্রাকৃত চেতনার খোঁজ করেনি। বরং বলেছে, ‘ব্রহ্মাণ্ডে যে গুণাঃ সন্তি তে তিষ্ঠন্তি কলেবরে’ অর্থাৎ ‘যা নাই ভাণ্ডে (অর্থাৎ দেহে) তা নাই ব্রহ্মাণ্ডে’। তন্ত্র সাধনা আসলে দেহ সাধনার মধ্য দিয়েই প্রকৃতির পরিচর্যা। প্রাচীন লোকায়ত দর্শন নানা ঘাত- প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে বাউল মতবাদে পরিণতি লাভ করে। লালন শিষ্য দুদ্দু শাহ বলেন,
‘বস্তু ছাড়া নাহি আর আল্লা কিংবা হরি।
এহি মত দেখ সবে নর-বস্তু ধরি।।
রজঃবীর্য এই দুই বস্তু যেবা চিনে।
লালন শাঁইজিকে সেই জন চিনে।।’
অর্থাৎ নারীর রজঃ ও পুরুষের বীর্য- এই দুই বস্তু থেকেই যেহেতু মানুষ রূপ বস্তুর উদ্ভব, সেহেতু বস্তুর বাইরে অন্যকিছুকে স্বীকার করা অর্থহীন। দেহতত্ত্ববাদী বাউলরা মনের মানুষকে পেতে চায় দেহ এবং প্রেমের মধ্য দিয়ে। তবে বাউলরা দেহতত্ত্বে বিশ্বাস করলেও তাদের সঙ্গে যোগী এবং তান্ত্রিকদের সূক্ষ্ম ভেদ আছে। বৈষ্ণবদের মতো বাউলদের সাধনার মাধ্যমও হলো গান, তবে ১৭ শতকের আগে বাউল সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটেনি। এই দর্শন জনপ্রিয়তা লাভ করে ১৮ শতকে এবং এর চূড়ান্ত বিকাশ লাভ করে লালন ফকিরের আবির্ভাবের পর। মধ্যবঙ্গের ভাটিয়ালি সুরের যে টান এবং গাইবার যে রীতি সেটাই বাউল সুরের ভিত্তি, আবার বীরভূম অঞ্চলে এর ওপরে খানিকটা কীর্তনের প্রভাবও পড়েছে। তবে এটা মূলত কুষ্টিয়া এবং বীরভূম অঞ্চলেরই গান। উত্তর- পূর্ববঙ্গে প্রচলিত বাউল গানের সঙ্গে এই অঞ্চলের বাউল গানের বিষয়বস্তু এবং ভাব- সুরের মিলের চেয়ে অমিল বেশী। বাউলদের কোন ধর্মশাস্ত্র নেই বা আনুষ্ঠানিক ধর্ম নেই। তারা হলেন ভক্তিবাদী এবং একজন গুরুতে বিশ্বাসী। এভাবেই একটি ধর্মীয় দর্শনকে কেন্দ্র করেই বাউল গানের আবির্ভাব। ঠিক এরকমই আরেকটি গানের ধারা হলো বিষয়বস্তু ভিত্তিক মুর্শিদী গান। সুফীবাদে বিশ্বাসীদের যে পীর, তাকে আবার বলা হয় মুরশিদ। এই মুরশিদের নামে যে গান গাওয়া হয় তাকে বলা হয় মুর্শিদী গান। ভক্তিবাদী বৈষ্ণব বা বাউলদের মতো আরেকটি সম্প্রদায় হলো কর্তাভজা। বাউলদের মতো এরাও নিজেদের হিন্দু বা মুসলমান বলে মনেকরে না। এদের ধর্ম হলো, মানুষের সহজ ভক্তির ধর্ম। সুফীবাদীদের যেমন পীর তেমনি এদের আছে কর্তা। মুর্শিদী গানের মতো এরাও কর্তা’কে ভজে যে গান গায় তা হলো কর্তাভজা গান।
৫
উপরে এ পর্যন্ত বাঙলা গানের যতগুলো ধারা নিয়ে কথা হলো, তার সবগুলিই আসলে ধর্মীয় আন্দোলন বা দর্শনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর বাইরে আছে লোকসঙ্গীতের কিছু আঞ্চলিক ধারা, যেমন- পূর্ববঙ্গের দক্ষিণ অঞ্চলের ভাটিয়ালি গান, উত্তরবঙ্গের ভাওয়াইয়া গান, ময়মনসিংহ গীতিকা। এসব গানের বিষয়বস্তুও কিন্তু মানবিক প্রেম। লোকজ ধারার এই মানবিক প্রেমভিত্তিক গানকে নিধুবাবু নাগরিক সভ্যতায় এনে সমালোচনার মুখোমুখি হলেন, তার গান নিষিদ্ধ হয়েছিল সাধারণ সমাজে। অশ্লীলতার দায়ভার চেপেছিল তার গায়ে, বিশেষ করে সেই সময়ের ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষদের একটি অংশ তাকে অশ্লীল গায়ক বলে আখ্যাও দিয়েছিলেন। সম্ভবত টপ্পা বাইজিদের মজলিশ বা ঐ জাতীয় অনুষ্ঠানে বেশী গাওয়া হতো বলে এই অপবাদ। বিশেষ করে ১৯ শতকের দ্বিতীয়ভাগে ব্রাহ্মরুচি গড়ে ওঠার পর এই ধারণা বেশ জোরদার হয়েছিলো। করুণ রস, প্রেম, বিরহকে বিষয়বস্ত্ত করে রচিত টপ্পার উপযোগী কিছু বিশেষ রাগও আছে, যেমন- ভৈরবী, খাম্বাজ, দেশ, সিন্ধু, কালাংড়া, ঝিঁঝিট, পিলু, বারোয়া ইত্যাদি। অশ্লীলতার অপবাদ থাকলেও ভাওয়াইয়া গানের মতো নিধুবাবু রচিত গানে বিরহের প্রকাশ কত যে মার্জিত ও পরিশীলিত একটি উদাহরণ দিলে তার প্রমাণ পাওয়া যাবে-
‘বিধি দিলে যদি বিরহ যতনা।
প্রেম গেল কেন প্রান গেল না॥
হইয়ে বহিয়ে গেছে, প্রেম ফুরাইছে,
রহিল কেবল প্রেমেরি নিশানা।’
হদিসঃ
১। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি-গোলাম মুরশিদ
২। প্রাকৃতজনের জীবন দর্শন-যতীন সরকার
৩। বাংলাপিডিয়া
৪। ইন্টারনেট
পোস্ট ভিউঃ 31