বাঙালির মাছ ও ভাতের সংস্কৃতি

লেখালোক সাহিত্য এবং সংস্কৃতি
বাঙালির মাছ ও ভাতের সংস্কৃতি

ভাত-মাছ খেয়ে বাঁচে বাঙ্গালি সকল

ধানে ভরা ভূমি তাই মাছ ভরা জল।


কবিতার লাইন দুটো ঊনবিংশ শতাব্দীর একজন বিখ্যাত সাহিত্যিক ও কবি ঈশ্বর গুপ্তের। ১৭৮০-র দশকে গোলাম হোসেন সালিম তার ‘রিয়াজ-উস-সালাতিন’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘এ দেশের উচু-নিচু সবাই মাছ, ভাত, সর্ষের তেল, দই, ফল আর মিঠাই খেতে পছন্দ করে। প্রচুর লাল মরিচ এবং লবণ তাদের পছন্দ। তারা আদৌ গম এবং যবের রুটি খায় না। ঘিয়ের রান্না খাসি এবং মোরগের মাংস তাদের মোটেই সহ্য হয়না।’ ‘মাছে ভাতে বাঙালি’-এই প্রবচনটি তাই আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি। একসময় কোনো দম্পতিকে আশীর্বাদ করার সময় বলা হতো,


দীর্ঘজীবী হও বৎস দুধে, মাছে, ভাতে।


তবে মাছ শুধু বাঙালিদেরই খাবার নয়, পৃথিবীর আরো অনেক জাতিই মাছ খেয়ে বেঁচে আছে। ইংরেজরা মাথাপিছু বছরে মাছ খায় ৪৯ পাউন্ড বা প্রায় আধমণ আর ডেনমার্কের মানুষ ২৪ পাউন্ড। চীনা-জাপানিরাও কম যায় না। সে তুলনায় বাঙালিরা খায় মাত্র ৯ পাউন্ড। অথচ একমাত্র বাঙালিরই ‘মছলী খোর’ নাম ভূ-ভারতে ছড়িয়ে গেছে। বৃহস্পতি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকজনদের আচার-ব্যবহার বর্ণনা করেছেন এভাবে, ‘পূর্বদেশের দ্বিজাতিগণ মৎসাহারী এবং তাহাদের স্ত্রীগণ দূর্নীতিপরায়ণা’, শুধুমাত্র মাছ খাওয়ার কারণেই এই অসম্মান। বাঙলায় কর্মরত মোগলরাও বাঙালির মাছ-ভাতকে ঘৃণা করতো। তারা ঈশা খান এবং তার পুত্র মুসাকেও জেলে বলে আখ্যায়িত করেছে।


মধ্যযুগের সাহিত্যে মাছের উল্লেখ পাওয়া যায়। বিশেষ করে ভারতচন্দ্রের তালিকা বেশ দীর্ঘ। তিনি অন্নদামঙ্গল কাব্যে লিখেছেন,


চীতল ভেকুট কই কাতলা মৃগাল।

বানি লাটা গড়ুই উলকা শোল শাল।।

পাঁকাল খয়রা চেলা তেক্ষো এলেঙ্গা।

গুতিয়া ভাঙ্গন রাগি ভোলা ভোলচেঙ্গা।।

মাগুর গাগর আড়ি বাটা বাচা কই।

কালবাসু বাঁশপাতা শাকের কলই।।

শিঙ্গী ময়া পাবদা বোয়ালি ডানিকেনা।

চিঙ্গড়ী টেঙ্গরা পুঁটি চান্দাগুড়া সোনা।।

গাঙ্গদাড়া ভেদা চেঙ্গ কুড়িশা খলিশা। 

খরশুল্বা তপসিয়া পাঙ্গাস ইলিশা।।


বাঙালির মৎস্যপ্রীতির পরিচয় পাওয়া যায় আলপনায়, শাড়ির পাড়ে, আঁচলে, কানের দুলে, গলায় হারের নকশায় অথবা লকেটে। বাঙালির মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে মাছের অনুপস্থিতি বিরল। বিয়েবাড়িতে, গায়ে হলুদে রুই মাছ সাজিয়ে পাঠানো শুভাশীষের প্রতীক। মাছ বাঙালির জন্য সুস্বাস্থ্যের ভাণ্ডার, প্রজননশক্তির প্রতীক। মঙ্গল কাব্যের পাতায় পাতায় মাছ রান্নার সৌরভ ম ম করে ভেসে বেড়ায়। আধুনিক বাঙলা সাহিত্যেও মাছ ও মাছ ধরা জেলে জীবনের রয়েছে অনুপম চিত্রণ। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ‘বেনের মেয়ে’ উপন্যাসের শুরুতেই সাত গাঁয়ের পুকুরের মাছ ধরার এক বিশাল বর্ণনা। রাজার গুরু লুইপাদ মাছের তেল, পেটি খেতে পছন্দ করেন। তাই ঘটা করে জাল ফেলে শয়ে শয়ে মাছ ধরিয়ে ভাজা, চচ্চড়ি, ছেচকা, বড়ি এসব রাঁধালেন। গুরু লুইপাদ খেয়ে-দেয়ে শিষ্যকে আশীর্বাদ করলেন,


তোমার ধর্মে মতি হোক।


রবীন্দ্রনাথ ইলিশ নিয়ে তেমন কিছু না লিখলেও মাছের কত প্রসঙ্গ যে উপন্যাসে, ছড়ায়, কবিতায়, ছবিতে আর চিঠিপত্রে এনেছেন, তার শেষ নেই। তিনি কবিতায় ‘দামোদর শেঠ কি’র সঙ্গে ‘ভেটকি’কে মিলিয়ে দিয়েছেন। চিতল মাছকে বলেছেন, মিঠাই গজার ছোট ভাই। ‘নৌকাডুবি’তে খেতে বসে মাছের মুড়ো দেখে রমেশ কালিদাস আউড়ে বলেন, ‘স্বপ্ন নয়, মায়া নয়, মতিভ্রম নয়, এ যে রুই মাছের মুড়ো বলে রোহিত মেস্যর উত্তমাঙ্গ।’ অনেকে মনে করেন, রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং রমেশের জবানীতে এ উচ্ছ্বাস প্রদান করেছেন। মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরও রুই মাছ পছন্দ করতেন। তিনি তার আত্মজীবনী ‘তুজুক’-এ লিখে গেছেন যে, মালব থেকে গুজরাটে যেতে পথে সর্দার রায়সান তাকে একটা বড় রুই মাছ দেন। বহুদিন পর একটি ভালো রুই পেয়ে বাদশা এত খুশি হলেন যে, তখনই তিনি সর্দারকে একটি উৎকৃষ্ট ঘোড়া উপহার দিলেন। রুই মাছের কদর শরৎচন্দ্রের লেখায়ও পাওয়া যাবে। মাছের মুড়ো একান্নবর্তী পরিবারে ক্ষমতা, স্নেহ, ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো। তার লেখা ‘মেজদিদি’তে হেমাঙ্গিনী যেই তার জার সৎভাই কেষ্টকে আস্ত একটা রুই মাছের মুড়ো খেতে দিলেন, অমনি শুরু হয়ে গেল অশান্তি। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, অদ্বৈত মল্লবর্মণ, সমরেশ বসু, হরিশঙ্কর জলদাসের লেখায় জেলেদের জীবন এসেছে।


বাঙালির মৎস্যগত প্রাণ। তার দাম্পত্য জীবনের এবড়ো-খেবড়ো পথকে মসৃণ করায় মাছের প্রয়োগ ক্ষেত্রবিশেষ যে যথেষ্ট হিতকর হয়েছে, তারও দৃষ্টান্ত আছে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মা ভগবতী দেবী খুব জেদি ও অভিমানী ছিলেন। মাঝে মধ্যে রাগ করে দুয়ার বন্ধ করে দু-তিন দিন কাটিয়ে দিতেন। তখন তার পিতা ঠাকুরদাসকে পত্নীর মান ভাঙাতে যথেষ্ট বেগ পেতে হতো। শেষে তিনি একটা কৌশল শিখে ফেলেছিলেন। ভগবতী দেবী রাগ করে দরজা বন্ধ করলে তিনি বেশ ভারী ওজনের একটি রুই-কাতলা জাতীয় মাছ কিনে উঠানে সশব্দে ফেলে সবাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে উঁচু গলায় বলতেন, ‘খবরদার, আমার মাছ কেউ যেন না ছোঁয়।’ এখানে উদ্দিষ্ট ‘কেউ’ আর অন্য কেউ নন, ভগবতী দেবীই। এতে ম্যাজিকের মতো কাজ হতো। ভগবতী দেবী রাগ ভুলে তখনই ঘর থেকে বেরিয়ে উঠানে বঁটি নিয়ে মাছ কুটতে বসে যেতেন। বাঙালির মান-অভিমান দূর করতে এভাবে কতো মাছ যে প্রাণ বলি দিয়েছিল, তার হিসাব কেউ রাখেনি। বাঙালি বরাবরই অতিথিপরায়ণ। মধ্যযুগেও তার ব্যাতিক্রম ছিলনা, অতিথি অভ্যর্থনা করতে  মাছের ব্যবহার ছিল। মৈমনসিংহ-গীতিকার ‘মলুয়া পালা’য় (১৬০০ সালের পূর্বে চন্দ্রাবতী’র লেখা) উল্লেখ আছে-


সন্ধ্যাকালে অতিথ আইল ভিন দেশে ঘর।

পাঁচ পুত্রে ডাক্যা কয় সাধু হীরাধর।।

লোটা ভইরা শীতল জল দিল খরম পানি।

পাঁচ ভাইয়ের বউয়ে রান্ধে পরম রান্ধুনি।।

মানকচু ভাজা আর অম্বল চালিতার।

মাছের সরুয়া রান্ধে জিরার সম্বার।। 

কাইট্টা লইছে কই মাছ চরচরি খারা। 

ভালা কইরে রান্ধে বেনুন দিয়া কাল্যাজিরা।।

একে একে রান্ধে সব বেনুন ছত্রিশ জাতি।

শুকনা মাছ পুইড়া রান্ধে আগল সেবাতি।।


৪ 

বাঙালির মাছ খাওয়া কবে থেকে শুরু করলো আর ‘মাছে-ভাতে’ খাদ্যাভ্যাস কি করে পেল সে প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে যেতে হয় সুদূর অতীতে। মর্গান তার ‘আদিম সমাজ’ বইয়ে লিখেছেন মানুষ মাছ খাওয়া শিখেছে মধ্য পর্যায়ের আদিম সমাজে। এই যুগের আরেক আবিষ্কার আগুনের ব্যবহার মানুষের মাছ খাওয়া সহজ করে দিয়েছিল। এসময়েই মানুষ হাতে তীর-ধনুক নিয়ে তাদের আদিম অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। প্রায় ৫০-৬০ হাজার বৎসর আগে প্রোটো-অস্ট্রালয়েডরা প্রাচীন বাংলায় এসে নেগ্রিটদের (প্রায় ৭৫-৬০ হাজার বৎসর আগে পারস্য হয়ে ভারতবর্ষে প্রবেশ করে এবং খ্রিষ্টপূর্ব ৪০-২০ হাজার বৎসরের মধ্যে এরা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল) সঙ্গে মিলে সৃষ্টি করে নতুন রক্তধারা, বৈদিক সাহিত্যে যাদের বলা হয়েছে নিষাদ। নেগ্রিটোদের মতো প্রোটো-অস্ট্রালয়েডরাও প্রথমদিকে কৃষি কাজ জানতো না, জীবিকার জন্য নির্ভর করতো বনের ফলমূল আর বন্যপ্রাণী শিকারের ওপরে। তবে এরা মাছ ধরতে জানতো। উপমহাদেশে ধান চাষের প্রচলন এরাই করেছিল। কৃষিকাজের জন্য যে লাঙ্গলের দরকার হয় সেটি ওই অস্ট্রিকরাই তৈরি করেছিল। সময়ের পরিক্রমায় এদের পরে বাঙলায় এসেছে দ্রাবিড় বা ভেড্ডী, আলপাইনিয় আর্য, কিরাত, নর্ডিক আর্যরা। কিন্তু প্রাচীন বাংলার মাতৃতান্ত্রিক কৌম সমাজ ব্যবস্থায় নিষাদ জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে চালু হওয়া সংস্কৃতি আজো বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি, মাছ এবং ভাত আজো বাঙালির প্রিয় খাবার। সংস্কত ভাষায় ‘ব্রীহি’ ও ‘তন্ডুল’ শব্দ দুটি দিয়ে ধান্য (ধান) বোঝায়। ভাষাতাত্ত্বিকদের মতে, এই দু’টি শব্দের মূলে রয়েছে দ্রাবিড় ভাষা। এতে বোঝা যায় যে, প্রাচীন বাংলার প্রাকৃত জনগোষ্ঠী ধান চাষ করতো। সংস্কৃত ভাষায় মুক্তা, নীর (পানি), মীন (মাছ) এসব শব্দের মূলেও রয়েছে দ্রাবিড় ভাষা।


কোন সুনির্দিষ্ট দিন তারিখ দিয়ে মাছ খাওয়ার ইতিহাস না জানা গেলেও খাল-বিল-জলাশয়ের প্রাচুর্য্যের কারণে মাছ যে অনেক আগে থেকেই বাঙালির প্রধান খাবার তা বুঝতে অসুবিধে হয়না। চন্দ্রকেতুগড়ে মাছের ছবিসহ একটি ফলক পাওয়া গেছে। নীহাররঞ্জন রায়ের ধারণা এই ফলকটি চতুর্থ শতকের। অষ্টম  শতক থেকে পাহাড়পুর এবং ময়নামতিতে যেসব পোড়া মাটির ফলক তৈরি হয় তার অনেকগুলোতেই মাছের ছবি আছে। এমনকি, মাছ কোটা এবং ঝুড়িতে করে মাছ নিয়ে যাওয়ার ছবিও আছে। এ থেকে  মাছের প্রতি এদেশের লোকদের ভালোবাসার পরিচয় পাওয়া যায়। ‘যুইগ্যা যুগিনীর কিসসা’য় যুইগ্যা মাছ ধরে পলো দিয়ে, যুগিনী তা রান্না করে (বাংলা একাডেমীর ফোকলোর সংকলন-8)। একবার এক কৃষক   চাষ করতে গিয়ে কোন একটা খাল থেকে গোটা চব্বিশেক মাছ ধরে বাড়ি এসে স্ত্রীকে রাঁধতে দিয়ে আবার চাষের ক্ষেতে চলে গেল। কৃষকপত্নী যথাসময়ে রান্না শেষ করে মাছ রান্না কেমন হলো তা পরখ করতে একটি মাছ চেখে দেখলো। এরপর আরেকটি মাছ খেয়ে স্বাদ পরীক্ষা করে সে সন্তুষ্ট হতে চাইলে ‘এই রূপে খাইতে খাইতে একটি মাত্র অবশিষ্ট রাখিলো।’ বাড়ি ফিরে একটি মাছ পাতে দেখে কৃষক বিস্মিত হয়ে বাকি মাছের কী হলো জানতে চাইলে তার স্ত্রী মাছের হিসাব বুঝিয়ে দিল এভাবে,


মাছ আনিলা ছয় গণ্ডা  

চিলে নিলে দুগণ্ডা 

বাকি রহিল ষোল।

ধুতে আটটা জলে পলাইল,

তবে থাকিল আট।

দুইটায় কিনিলাম দুই আটি কাঠ

তবে থাকিল ছয়।

প্রতিবাসিকে চারিটা দিতে হয়

তবে থাকিল দুই।

আর একটা চাখিয়া দেখিলাম মুই।

তবে থাকিল এক;

এখন হইস যদি ভালো মানুষের পো,

কাটাখানা খাইয়া মাছ খান থো।


মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গলে মাছের রান্নার বর্ণনা রয়েছে এভাবে,


কটু তৈলে রান্ধে রামা চিথলের কোল

রুহিতে কুমুড়া বড়ি আলু দিআ ঝোল।

           .........

কটু তৈলে কই মৎস্য ভাজে গন্ডাদশ

            ............

বদরি শকুল মীন রসাল মসুরি

পণ চারি ভাজে রামা সরল শফরি।

কথোগুলি তোলে রামা চিঙ্গড়ির বড়া

            ............

কিরা দিয়া রুইমুড়া দিল খুল্লনারে।


বিজয়গুপ্তের মনসামঙ্গলেও মাছের বিভিন্ন রকম রান্নার বিবরণ দেয়া হয়েছে,


বড় বড় সওল মৎস্য রাঙ্গা হইছে কোল।

কত তৈলেত ভাজে কত রান্ধে ঝোল।।

বড় বড় ঈচা মৎস্যের ফেলাইয়া তালু।

তাহা দিয়া রান্ধিলেক সঙ্কচুর আলু।।

বড় বড় কই মৎস্যে করিয়া ভাগে ভাগে।

তাহা রান্ধিল লাউ আলু কচুর লগে।।


বিজয়গুপ্তের লেখায় পূর্ব বাংলার মধ্যযুগের রান্নার একটা ছবি পাওয়া যায় এভাবে,


মৎস্য কাটিয়া থুইল ভাগ ভাগ।

রোহিত মৎস্য দিয়া রান্ধে নলতার আগ

মাগুর মৎস্য দিয়া রান্ধে গিমা গাছ গাছা।

ঝাঁজ কটু তৈলে রান্ধে খরসুন মাছ

ভিতরে মরিচ গুঁড়ো বাহিরে জুড়ায় সুতা।

তৈলে পাক করিয়া রান্ধে চিংড়ির মাথা

ভাজিল রোহিত আর চিতলের কোল।

কৈ মৎস্য দিয়া রান্ধে মরিচের ঝোল।


শুধু মাছ ধরাকে কেন্দ্র করেই বাঙলায় একটি বিশেষ পেশাজীবী সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটে, যারা আমাদের কাছে কৈবর্ত্য নামে পরিচিত। কৈবর্ত্যরা নদী-নালা থেকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতো। বিজয়গুপ্তের মঙ্গলকাব্যে আছে,


জাতে কৈবর্ত্য বেটা দিঘল মাথার চুল। 

নিরবধি বঁড়শি বায়ে এই নদীর কুল।।  

         ............... 

ঝালু-মালুরে বোল জাল বাহিবার।

তবে সকল দুঃখ ঘোচিবে তোমার।। 

         ..................   

দুই পুত্রের তরে তখন করিয়া স্বপন। 

ভাঙ্গা জাল লইয়া তখন করিল গমন।।

জাল লইয়া তখন দুই ভাই চলে।

সুবর্ণের ঘট হইয়া পদ্মা নামে জলে।।


জেলে বা কৈবর্ত সম্প্রদায় একসময় বিদ্রোহ করে বরেন্দ্র এলাকায় একটি স্বাধীন রাজ্য স্থাপন করেছিল। পালরাজ রামপালের সভাকবি সন্ধ্যাকর নন্দীর লেখা সংস্কৃত কাব্য ‘রামরচিত’ থেকে এ বিষয়ে জানা যায়। জানা যায় যে, দ্বিতীয় মহীপাল একজন অত্যাচারী রাজা ছিলেন, তিনি তার দুই ভাই রামপাল এবং সুরপাল’কে রাজ্য অধিকারের ষড়যন্ত্রের অভিযোগে কারাগারে নিক্ষেপ করেন। এদিকে সাধারণ জনগণও তার অত্যাচারে জর্জরিত ছিল। এই সময়ে সেখানে নিম্নবর্ণের লোকেরা রাজার বিরুদ্ধে সুসংগঠিত বিদ্রোহ করে এবং তাতে নেতৃত্ব দেয় কৈবর্ত জাতের একজন কর্মচারী, নাম দিব্য। দিব্য মহীপালকে যুদ্ধে হত্যা করে নতুন রাজ্য স্থাপন করে। তার পরে একে একে রুদক, ভীম রাজ্য শাসন করেন। সন্ধাকর নন্দী  তাদেরকে দস্যু, শয়তান, ভন্ড হিসেবে অভিহিত করলেও তাদের রাজত্বে স্থায়িত্ব ছিল। অনেকে কৈবর্ত বিদ্রোহকে প্রাচীন রোমে প্যাট্রিশিয়ান ও প্লেবিয়ানদের মধ্যে সংঘটিত সংঘর্ষের সাথে তুলনা করেন। ব্রহদ্ধর্মপুরাণ অনুযায়ী এই কৈবর্তরা মধ্যম শঙ্কর জাতি।


ব্রহদ্ধর্মপুরাণ-এ রোহিত, শকুল, শফর এবং অন্যান্য শ্বেত ও শল্কযুক্ত মাছ খাবার কথা উল্লেখ আছে।  সেখানে ইলিশ মাছ এবং শুঁটকির উল্লেখও আছে। তবে ব্রাহ্মণরা বাঙলায় আমিষ খেলেও বাঙলার বাইরে মাছ-মাংস খেতেন না। তারা বরং মাছ খাওয়াকে নিন্দে করেছে। ১০/১১ শতকে বাঙলার অন্যতম স্মৃতিকার ভবদেব ভট্ট নানাবিধ যুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বলেছিলেন, বাঙলার মাটি, বাঙলার জল বাঙালিকে যে খাদ্য সরবরাহ করে, সেটাই স্বাভাবিক আহার্য। এমন আহার্য গ্রহণই তার স্বাভাবিক ধর্ম। উল্লেখ্য, ভবদেব শুধু সাধারণ বাঙালিরই নয়, ব্রাহ্মণেরও মৎস্যাহার সমর্থন করেছিলেন। নীহাররঞ্জন রায় অবশ্য ভবদেব ভট্টকে  ত্রাণকর্তা হিসেবে পুরো কৃতিত্ব দিতে ইচ্ছুক নন। ভবদেবের ভূমিকা নিয়ে তার মন্তব্য, ‘মাংস ও মৎস্য আহার বাঙলাদেশে এত সুপ্রচলিত যে এসবের সমর্থন ছাড়া ভবদেব ভট্টের আর কোন উপায় ছিলনা।’  জীমূতবাহনও মাছের শত্রু ছিলেন না। তিনি ইলিশ মাছ এবং ইলিশ মাছের তেলের প্রশংসা করেছেন। ১২ শতকে সর্ব্বানন্দ যখন তার টিকাসর্ব্বস্বতে মাছের নিন্দে করেছেন, তখনও কিন্তু ইল্লিসের কথা তিনি ভুলে যাননি। তিনি লিখেছেন, শুঁটকি মাছ হলো নিম্নবঙ্গের লোকেদের খুবই প্রিয় খাদ্য। তিনি এ জন্য বাঙালদের শুঁটকি-খেকো বচ্চার বলেছেন। এই শতকে বেশ কিছু উদ্ভট ধরণের শ্লোক রচিত হয়েছিল। এতে মাছের, বিশেষ করে কৈ মাছের গুণ কীর্তন করা হয়েছে, আর মাছ খাওয়ার রীতিমত প্রশংসা করা হয়েছে প্রাকৃতপৈঙ্গলে। এর একটি পদে বলা হয়েছে, ‘যে নারী রোজ কলাপাতায় গরম ভাত, গাওয়া ঘি, মৌরলা মাছের ঝোল আর নালিতা শাক পরিবেশন করেন, তাঁর স্বামী পুণ্যবান।’ মাছের প্রতি বাঙালির এই আসক্তির কারণে ১৯ শতকে প্রকাশিত ‘পাক রাজ্যেশ্বর’ এবং ১৯২৩ সালে প্রকাশিত বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায়ের ‘পাক-প্রণালী’ বইয়ে মাছ রান্নার বিভিন্ন কৌশল বিস্তারিতভাবে লেখা হয়েছে। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির প্রজ্ঞাসুন্দরী তার রান্নার বইয়ে ৫৮ রকমের মাছ রান্নার পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। ঐতিহাসিক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়কে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় এক বছরের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ হিসেবে তিনি জানান, “পোষাবে না মশাই, দুপুরে এক থাল মাছের ঝোল-ভাত, লেবু, লঙ্কা ডলে খেয়ে কোলবালিশ আঁকড়ে দু’ঘণ্টা না ঘুমালে আমার চলে না।


বাঙালির খাবার হিসেবে ভাত-এর উল্লেখ পাওয়া যায় চর্যাপদের ৩৩ নাম্বার চর্যায়। ঢেণঢন পা তার কবিতায় ভাতের প্রসঙ্গ টেনে সংসারে অভাবের ছবি মর্মস্পর্শী করে এঁকেছেন,


টালত মোর ঘর নাহি পড়বেষী।  

হাড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেশী।। 

বেঙ্গ সংসার বডহিল জাঅ। 

দুহিল দুধ কি বেন্টে ষামায়।।


(অর্থ: টিলার ওপরে আমার ঘর, আমার কোনো প্রতিবেশী নেই। হাঁড়িতে আমার ভাত নেই, আমি প্রতিদিন উপোস থাকি। বেঙের মতো প্রতিদিন আমার সংসার বেড়ে চলেছে, যে-দুধ দোহানো হয়েছে তা কি আবার ফিরে গাভীর বাঁটে।)


বাঙালির প্রিয় খাবার হিসেবে ভাতের উল্লেখ রয়েছে ‘গবরার কিসসা’য়  (বাংলা একাডেমীর ফোকলোর  সংকলন-৭১)। গবরা বলে, ‘এই হোবরী কেলা আর ঘন কইরা দুধ জ্বাল দিয়া আউষের চাইলের ভাত গরম গরম ফু পারে আর খায়, তাতে কি মজা হে কথা আর কি কমু।’ বাংলাদেশের লোক কাহিনীর দ্বিতীয় খণ্ডের ‘মতিলাল বাশ্শা’ কিসসা’র জৈঙ্গিয়া মাঝির প্রিয় খাবার সকালে পান্তা, দুপুরে গরম ভাত। ভাটিদেশের কিংবদন্তীর ‘একটি সঙ্গীতের জন্য’ কাহিনীতে আমরা দেখি কালোসুফীর জন্য ভাত তরকারী সাজিয়ে পিঁড়ি পেতে বসে থাকে অম্বরী বিবি। বাংলাদেশের লোক সংস্কৃতিঃকথকতা’য় দুইখ্যার বাপ ভাত খেতে এসে ‘ডাই উজলাইয়া দেহে কুদে কুঁড়ার জাউ।’ অর্থাৎ প্রিয় খাবার ভাত খেতে না পেরে তার মেজাজ  খারাপ হয়ে যায়। বাঙালির জীবন-যাপনের সাথে ভাত কীভাবে জড়িয়ে আছে তা বোঝাতে এই লেখা শেষ করবো খনার বচন দিয়ে, ‘কলা রুয়ে না কেটো পাত, তাতেই কাপড়, তাতেই ভাত।


(অর্থঃ কলাগাছ লাগানোর পর তার পাতা কাটা যাবেনা তাহলে কলার ফলন ভালো হবে, ফলে ভাত কাপড়ের সংস্থান হবে।)



হদিসঃ  

১। কবি মুকুন্দরাম– ক্ষেত্র গুপ্ত  

২। আদিম সমাজ- হেনরি লুইস মর্গান  

৩। বাঙালির ইতিহাস (আদি পর্ব)- নীহাররঞ্জন রায় 

৪। বাংলা দেশের ইতিহাস (প্রাচীন যুগ)- রমেশচন্দ্র মজুমদার

৫। প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি- ফয়েজ আলম

৬। বঙ্গভূমি ও বাঙালির ইতিহাস- ডঃ নীতিশ সেনগুপ্ত

৭। বাঙালীর নৃতাত্ত্বিক পরিচয়- অতুল সুর

৮। মঙ্গলকাব্যে বাঙালির আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের রূপায়ণ- মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর

৯। চন্ডীমঙ্গল- ডঃ অভিজিৎ মজুমদার 

১০। প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাঙলা সাহিত্যে লোকজীবনের স্বরূপ- আবদুল খালেক

১১। লাল-নীল-দীপাবলি- ডঃ হুমায়ুন আজাদ 

১২। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি- গোলাম মুরশিদ 

১৩। ইন্টারনেট



পোস্ট ভিউঃ 31

আপনার মন্তব্য লিখুন