ভাওয়াইয়া গান ও একজন সুন্দরী কমলা

লেখালোক সাহিত্য এবং সংস্কৃতি
ভাওয়াইয়া গান ও একজন সুন্দরী কমলা

ভাওয়াইয়া গান উত্তরবঙ্গের এক ধরণের লোকগীতি। রংপুর অঞ্চলের ভাষাকাঠামো আর ভারতের কোচবিহারের ভাষাকাঠামো অভিন্ন। তাই রংপুরে যে ভাওয়াইয়া গানের প্রচলন, সেই গান বিস্তৃত ভারতের কোচবিহার হয়ে আসাম পর্যন্ত। তবে এই গানের উৎপত্তি স্থল হিমালয়ের পাদদেশীয় তরাই অঞ্চল জলপাইগুড়ি ও কোচবিহার। এই অঞ্চলের ভৌগোলিক পরিবেশের কারণেই এখানে এ জাতীয় গানের উদ্ভব হয়েছে। ভাওয়াইয়া গানে তিব্বতী-চীনাভাষা পরিবারের অনেক শব্দ বা শব্দাংশের (যেমন- কং, লং, থাকোং, শোনং ইত্যাদি) ব্যবহারের কারণে ভাওয়াইয়ার আদি  উৎপত্তি স্থল তিব্বতী-চীনা পরিবারভুক্ত কোন দেশ বলে ধারণা করা হয়ে থাকে। এরকম ভাওয়াইয়া গানের ভাষার উদাহরণ-


হাটিয়া যাইতে নদীর পানি 

খাক লাউ কি খুক লং কি 

খাল্লাউ খাল্লাউ করে রে 

হায় হায় পরানের বন্ধুরে...


অথবা


ও মুই না শোনং না শোনং  

তোর বৈদেশিয়ার কথা রে 

ও মোক ছাড়িয়া গেলু কেনে......


তবে তিব্বতী-চীনাভাষা পরিবারভূক্ত কোন দেশ বা জলপাইগুড়ি ও কোচবিহারের তরাই অঞ্চলে এই গানের উদ্ভব ঘটলেও ভৌগোলিক পরিবেশের প্রভাব এবং জাতিগত, ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত ঐক্যের কারণে রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলের সমভূমিতে এর প্রসার ঘটে। এজন্য জলপাইগুড়ি ও কোচবিহারকে ভাওয়াইয়ার সূতিকাগার বলা হলেও রংপুর অঞ্চলকে বলা হয় এই গানের সাধন পীঠ।


ভাওয়াইয়া গান ভাবসমৃদ্ধ তাই ‘ভাব’ থেকে ‘ভাওয়াইয়া’ কথাটির উৎপত্তি বলে মনে হয়। এ গানের মূল সুর নর-নারীর প্রণয়। প্রণয়ের বিচ্ছেদ জ্বালাই এতে অধিক রূপায়িত হয়। বাউদিয়া নামে উদাসী সম্প্রদায় এ গানের রূপকার। কারও কারও মতে এই বাউদিয়া থেকেই ভাওয়াইয়া কথাটির উৎপত্তি হয়েছে। যাহোক, গানের বিষয়বস্তু ও সুর-তালের দিক থেকে ভাওয়াইয়া গান দুই প্রকার, দীর্ঘ সুরবিশিষ্ট ও চটকা সুরবিশিষ্ট। প্রথম শ্রেণীর গানে নর-নারীর, বিশেষত নবযৌবনাদের অনুরাগ, প্রেমপ্রীতি ও ভালোবাসার আবেদন ব্যক্ত হয়। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়, যেমন-


ও কি ও বন্ধু কাজল ভোমরা রে  

কোন দিন আসিবেন বন্ধু 

কয়া যাও কয়া যাও রে......


অথবা


ও মোর কালা রে কালা

ওপারে ছকিলাম বাড়ি 

কলা রুইলাম কালা সারি সারি রে......


অপরপক্ষে চটকা এক প্রকার রঙ্গগীতি। এ গান চটুল ও দ্রুত তালের। গ্রাম্য ‘চট’ (অর্থ তাড়াতাড়ি) শব্দটির স্ত্রীলিঙ্গান্তর করে ‘চটকা’ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। স্থানীয়ভাবে চটকা’র আরেক নাম ‘বন্ধুনাচারী।’ এ শ্রেণীর গানে যথেষ্ট হাস্যরসের উপাদান থাকে। চটকা গানের মধ্য দিয়ে স্বামী-স্ত্রীর আশা-আকাঙ্ক্ষা, মনোমালিন্য, সন্তান-সন্ততি কামনা, সংসার জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত, সমাজ-পারিপার্শ্বিকতা এসব বিষয় ব্যক্ত হয়। চটকা শ্রেণীর গানের উদাহরণ হতে পারে,


বাওকুমটা বাতাস যেমন ঘুরিয়া ঘুরিয়া মরে    

ঐ মতন মোর গাড়ির চাকা পন্থে পন্থে ঘোরে 

ও কি গাড়িয়াল মুঁই চলো রাজপন্থে......


অথবা


পান পিয়া সকি

ডালিম গাচে মোর ডালিম অইলো পাকি

ডালিম হইলো ডগমগ অস পড়ে ফাটিয়া

কতই দিন আকিমো ডালিম গামছায় বান্দিয়ারে......


এই দুই শ্রেণীর গানের সুরের মিশ্রণে অপর এক শ্রেণীর গানও প্রচলিত, যা ক্ষীরোল গান নামে পরিচিত।  দোতারা ভাওয়াইয়া গানের প্রধান  বাদ্যযন্ত্র। ভাওয়াইয়ার কথা, সুর, তাল, লয়ে মুগ্ধ উত্তর জনপদের মানুষ ভাওয়াইয়াকে অতি আপন করে নিয়েছে। তবে ধ্রুবসত্য এই যে, ভাওয়াইয়া সঙ্গীত তার উত্তরযুগ এবং এই সেদিন পর্যন্তও গুনীজনদের দরবারে অপাঙতেয় ছিলো।


রাজার আনুকূল্য এ সঙ্গীত কখনো পায়নি। সহজাত সঙ্গীতের যে মর্যাদা পাওয়ার কথা তাও পায়নি। অনেকে এর কারণ হিসেবে আর্থ-সামাজিক অবস্থাকে দেখিয়েছেন। কেননা ভাওয়াইয়া গান চতুর্দশ দশকে বা তার পূর্বে যখন প্রতিষ্ঠিত হয় সে সময়ে হিন্দুসমাজে বর্ণবাদ প্রকট ছিলো। আর ভাওয়াইয়া গান ছিলো গোচারণ ক্লান্ত রাখাল বালক, মোষের পালের মঈষাল বন্ধু, হাল কর্ষনরত চাষী, যুবকের কন্ঠে স্বচরিত গান। বর্ণাশ্রম শাসিত হিন্দু সমাজের একেবারে নীচু তলার অর্থাৎ ব্রাত্যজনের গাওয়া ভাওয়াইয়া গান যতো ভালোই হোক না কেন, এ গান সহজে জাতে ওঠেনি। তবে রাজানুগ্রহ বা সমাজপতিদের উন্নাসিকতা থাকলেও ভাওয়াইয়া গান জনসম্মুক্ষে আসে শিল্পী আব্বাসউদ্দিন আহমদের হাত ধরে, তিনিই ভাওয়াইয়া গান জনপ্রিয় করে তোলেন। তিনি নিজের উদ্যোগে অনেক গান সংগ্রহ করে সেগুলোর রেকর্ড করান এবং নিজেও অনেক ভাওয়াইয়া গান লিখেছেন।


যে ভাওয়াইয়া গানটির প্রেক্ষাপট নিয়ে দুকলম লিখতে যাচ্ছি সেটির রচয়িতা শিল্পী আব্বাসউদ্দিন আহমদের ছোট ভাই আব্দুল করিম। এটাও উত্তর বঙ্গের একটা জনপ্রিয় গান, গানটি হলো-


আজি বাহহাল করিয়া বাজানরে দোতরা সুন্দরী কমলা নাচে

ওরে কমলার নাচনে বাগিচার পিছনে চাঁদ ঝলমল হারে রে......


চটকা সুর বিশিষ্ট এই ভাওয়াইয়া গানে যে সুন্দরী কমলার কথা বলা হয়েছে তিনি আসলে কে? গীতিকার যাকে ভেবে এই গান লিখুন না কেন ইতিহাসের পাতা ঘাটলে এরকম একজন সুন্দরী কমলার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়, তবে সেজন্য আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে প্রায় দেড় হাজার  বছর আগে।


প্রাচীন ভারতে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু অর্থাৎ পাটলিপুত্র তখন গুপ্ত সম্রাটদের দখলে। গুপ্ত বংশীয় সম্রাটদের (৩২০ থেকে ৫৫০ খ্রিষ্টাব্দ) সময়ে ভারতের শিল্প-সংস্কৃতি-সাহিত্যচর্চা উন্নতির শিখরে পৌঁছে, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক মান উন্নত ছিলো বলে এই যুগটি ‘ভারতের স্বর্ণযুগ’ হিসেবেও চিহ্নিত। কবি কালিদাস (চতুর্থ শতক), গণিতবিদ আর্যভট্ট (৪৭৬ থেকে ৫৫০ খ্রিষ্টাব্দ), পঞ্চতন্ত্রের লেখক বিষ্ণুশর্মা (তৃতীয় শতক), কামসূত্রের রচয়িতা বাৎসায়ন (চতুর্থ শতক) প্রমূখ ছিলেন গুপ্ত যুগের অনন্য প্রতিভা। এছাড়া জ্যোতিষ বরাহমিহির (৫০৫ থেকে ৫৮৭ খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন গুপ্ত সম্রাট ২য় চন্দ্রগুপ্তের নবরত্নের অন্যতম। শিল্প-সংস্কৃতির এই চর্চা থেকে প্রাচীন বাংলাও পিছিয়ে ছিলোনা। কেননা করতোয়া নদীর পশ্চিম পাড় পর্যন্ত বিস্তৃত সমগ্র উত্তরবঙ্গ ও বরেন্দ্র অঞ্চল নিয়ে পুণ্ড্রবর্ধন গুপ্ত সাম্রাজ্যের একটি ভুক্তি বা প্রদেশ ছিলো, এবং এর রাজধানী ছিলো পুণ্ড্রনগরী (বর্তমানে মহাস্তান গড়)। পুণ্ড্রনগরীতে বসবাসরত কমলা সে সময়েরই একজন শিল্পমনা নারী। শ্রী হরগোপাল দাসকুন্ডু ১৯১৯ সালে তার লেখা ‘পৌণ্ড্রবর্দ্ধন ও করতোয়া’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন, ‘কমলা পৌণ্ড্রবর্দ্ধন নগরীর দেবনর্তকী। তত্রত্য স্কন্দদেবের মন্দিরে নর্তনকালে কাশ্মীররাজ জয়াপীড় কমলার যথাশাস্ত্রোক্ত নৃত্যগীতে প্রীত ও মোহিত হন। কমলা সামান্য পণ্যাঙ্গনা ছিলেন না, তিনি যেমন ঐশ্বর্যশালিনী তেমনি পণ্ডিতা ছিলেন। কমলা বিশুদ্ধ সংস্কৃতে কথোপকথন করিতেন। তাঁহার গৃহ রাজগৃহের ন্যায় প্রকোষ্ঠে, কক্ষে, বাতায়নে,অলিন্দে সুবিন্যস্ত ছিল। তাঁহার গৃহে সুবর্ণখট্টা শোভা পাইত। কমলা কাশ্মীররাজ জয়াপীড়ের সঙ্গিনী হইয়া কাশ্মীর গমন করেন। তথায় নিজ নামে নগর স্থাপন করিয়া গিয়াছেন।


৫  

যেখানে যন্ত্রেরই প্রাধান্য, সেখানে সূক্ষ্ম মানব অনুভূতি ও শিল্পের কদর প্রায় কমে আসছে। লোকশিল্পের ক্ষেত্রে আধুনিকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে একপ্রকার অভিশাপ। কারণ, লোকশিল্পের মূল সুরই হচ্ছে তার প্রাচীনত্বে। সেক্ষেত্রে পাশ্চাত্য প্রভাব আঞ্চলিকতার ধারাটিকে নষ্ট করে দিচ্ছে। ভাওয়াইয়া গানের সাথে যে বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গ আবশ্যিক, তা হলো দোতারা। কিন্তু বর্তমানে পাশ্চাত্য বাদ্যযন্ত্রের অনুপ্রবেশ ঘটছে সঙ্গীতকলায়। এরফলে, ভাওয়াইয়া হারাচ্ছে তার নিজস্বতা। শিল্পীদের আর্থিক অবস্থার অবনতিও ভাওয়াইয়া গান চর্চার ক্ষেত্রে অন্তরায়, কারণ শ্রোতামহলে দারুণ কদর থাকলেও বেঁচে থাকার জন্য দারিদ্র্যের সাথে সংগ্রাম করা ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই।



হদিস:  

১। ভাওয়াইয়া- সিধুভাই কল্যাণ ট্রাস্ট 

২। পৌণ্ড্রবর্দ্ধন ও করতোয়া- শ্রী হরগোপাল দাসকুন্ডু

৩। ইন্টারনেট 



পোস্ট ভিউঃ 33

আপনার মন্তব্য লিখুন