১
আমি জন্মেছি বাংলায়
আমি বাংলায় কথা বলি।
আমি বাংলার আলপথ দিয়ে, হাজার বছর চলি।
চলি পলিমাটি কোমলে আমার চলার চিহ্ন ফেলে।
তেরশত নদী শুধায় আমাকে, কোথা থেকে তুমি এলে?
সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক-এর ‘আমার পরিচয়’ কবিতাটা কমবেশি অনেকেই জানেন। কবির মত কুতূহলে অনেকের মনে একই প্রশ্ন, আসলেই আমরা কোথা থেকে এলাম? এই পর্বে মূলত প্রোটো অস্ট্রালয়েডদের কথাই লিখবো কারণ আমাদের সূচনা তাদের হাত ধরে। তাহলে পিছনে ফেরা যাক। তবে কতোটা পিছনে? এর আগে একটা লেখায় নৃবিজ্ঞানী ক্রিস ষ্ট্রিনজার এবং পিটার অ্যান্ডুস-এর ‘আউট অফ আফ্রিকা’ থিওরি নিয়ে লিখেছিলাম। ফিরে যেতে হবে সেখানেই। ইথিওপিয়ার অ্যাফার মরুভূমিকে বলা হয় মানব সভ্যতার সূতিকাগার, কারণ সবেচেয়ে বেশি ফসিল ওখানেই আবিষ্কৃত হয়েছে। বন্যা আহমেদ এর ‘বিবর্তনের পথ ধরে’ বইটি যারা পড়েছেন তাদের ‘আউট অফ আফ্রিকা’ এবং মাইটোকণ্ড্রিয়াল ইভ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা রয়েছে। The Out of Africa Model has gained support by recent research using mitochondrial DNA (mtDNA). After analysing genealogy trees constructed using 133 types of mtDNA, they concluded that all were descended from a woman from Africa, dubbed Mitochondrial Eve. এই থিওরি আফ্রিকা থেকে মানবজাতির অভিপ্রয়াণের স্বপক্ষে যুক্তি দেয়। তবে ইতিহাসের কোনও তথ্যই চূড়ান্ত নয়। আজ যা সত্য হয়ে আছে কালই তা মিথ্যে প্রতিপন্ন হতে পারে। কাজেই, কিছুই ধ্রুব সত্য ভেবে নেয়ার কোনও কারণ নেই। যাহোক প্রসঙ্গে আসি।
২
প্রায় ৬৫ হাজার বৎসর আগে দ্বিতীয় গণ অভিপ্রয়াণের সময়ে আফ্রিকা থেকে এশিয়াতে আসা হোমো সেপিয়েন্সদের দ্বিতীয় দলটিকে বিজ্ঞানীরা প্রোটো-অস্ট্রালয়েড বা অস্ট্রিক (ল্যাটিন শব্দ অস্ট্রিকের অর্থ হলো দক্ষিণ দেশীয়) বা আদি-অস্ত্রাল নামে চিহ্নিত করেছেন। প্রায় ৫০-৬০ হাজার বৎসর আগে এরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রোটো-অস্ট্রালয়েডরা ছিল অরণ্যচারী এবং মূলত শিকারী। প্রথমদিকে তারা কৃষি কাজ জানতো না, জীবিকার জন্য নির্ভর করতো বনের ফলমূল আর বন্যপ্রাণীর ওপরে। এরা দীর্ঘমুন্ডু, চ্যাপ্টা নাক, চিবুক বেশ ছোট, খর্বকায়, কালো গাত্রবর্ণ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিল। তাদের চুল ছিল ক্ষেত্রভেদে বিভিন্ন রকম। রশির মতো পাকানো, ঢেউ জাগানো, এমনকী সোজা চুলও তাদের মধ্যে ছিল। এরা ক্রমে দক্ষিণ ভারত, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া ও ওসেনিয়ায় বসতি স্থাপন করে। অনেকে মনে করেন এরাই উপমহাদেশে প্রথম সভ্যতা স্থাপন করে। আদিবাসী হিসেবে ভারতে নেগ্রিটো বা নিগ্রয়েড বা নিগ্রোবটুদেরকে সবার আগে স্থান দিলেও মূলত প্রোটো-অস্ট্রালয়েডরাই ভারতের মূল জনসংখ্যায় পরিণত হয়েছিল। বেদ ও বিষ্ণপুরাণে এদেরকেই নিষাদ নামে অভিহিত করা হয়েছে। এরা ঠিক কোন সময় থেকে ভারতবর্ষে আসা শুরু করেছিল, তা সুষ্পষ্টভাবে জানা যায় না তবে ধারণা করা হয় এরা ছড়িয়ে পড়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব ২০-৬ হাজার অব্দে।
ভারতবর্ষের বেশকিছু আদিবাসীদের প্রোটো-অস্ট্রালয়েড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এদের মূল ধারা হিসেবে ভারতবর্ষে রয়েছে কোল, সাঁওতাল, মুণ্ডা (মুণ্ডারি) ইত্যাদি। তারা বসতি স্থাপনের পর চাষাবাদ ও গুড় তৈরীর প্রণালী সর্ব প্রথম আয়ত্ব করে। দীর্ঘদিন ভারতের প্রথম বসতি স্থাপনকারী হিসাবে তারা শান্তিপূর্ণ জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিল। তবে কাউকে বিতাড়িত করে তারা নিজেদের বসতি স্থাপন করেনি, বরং দুর্গম স্থানগুলোকে সুগম, পতিত জায়গাসমূহ আবাদ করে উর্বর জমিতে পরিণত করে এবং বনের পশুকে পোষ মানিয়ে তাদের প্রয়োজনে নিয়োজিত করে। উপমহাদেশে ধান চাষের প্রচলন তারাই করেছিল। এদের আগমনের ফলে আদি নেগ্রিটোরা অপ্রধান হয়ে পড়ে, হয়তো আত্মরক্ষায় অপারগ হয়ে তারা ক্রমে ক্রমে উত্তর ভারতে বিলীন হয়ে গিয়েছিল কিংবা দক্ষিণের দিকে সরে গিয়েছিল। আবার এও হতে পারে যে, এদের সাথে প্রোটো-অস্ট্রালয়েডদের সংমিশ্রণের ফলে এরা নিজেদের জাতিগত স্বতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য হারিয়েছিল। এভাবে তাদের মিলিত রক্তধারায় গড়ে ওঠে নতুন এক জাতিসত্ত্বা।
অস্ট্রালয়েডরা ভাষার ব্যবহার জানতো। এরা যে ভাষায় কথা বলতো, ভাষাবিজ্ঞানীরা তার গোষ্ঠীবদ্ধ নাম দিয়েছেন অষ্ট্রিক। তাদের ভাষা, বিশেষত মুন্ডাদের ভাষার প্রভাব উপমহাদেশে অত্যন্ত প্রবল ছিল। অস্ট্রালয়েডদের অনেক পরে উপমহাদেশে আগত আর্যজাতির সবচেয়ে প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ ঋগ্বেদে প্রায় ৫০০ শব্দ প্রাচীন মুন্ডাভাষা থেকে নেয়া হয়েছে। ঋগ্বেদের প্রাচীন অংশে মুন্ডা এবং শেষাংশে দ্রাবিড় ভাষার প্রভাব আছে। এ থেকে এও প্রতীয়মান হয় যে, পাঞ্জাবে ঋগ্বেদ রচনাকালের পূর্বে অস্ট্রিক জাতির নিবাস ছিল এবং পরবর্তীতে সেখানে দ্রাবিড়দের অবির্ভাব ঘটে। দ্রাবিড়দের পরাক্রমের সময়ও মুন্ডা ভাষার যথেষ্ট প্রভাব ছিল। অস্ট্রিক উপজাতিসমূহের মধ্যে এখনো তাদের আদি ভাষা টিকে আছে। পুরো ভারতবর্ষ, মায়ানমার এবং তৎসংলগ্ন অঞ্চলে প্রোটো-অস্ট্রালয়েডরা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। সিন্ধু সভ্যতার পত্তন এদের দ্বারাই ঘটেছিল বলে ধারণা করা হয়। এরা খাদ্য-শস্য এবং শাকসব্জির ব্যবহার শিখেছিল। এদের কয়েকটি দল সাগর পাড়ি দিয়ে আন্দামান-নিকোবর দ্বীপ পর্যন্ত পৌঁছেছিল। ফলে ভারতে আগত অন্যান্য জনগোষ্ঠী থেকে আজো নিজেদেরকে তারা পৃথক জাতিসত্তা হিসেবে টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
৩
প্রোটো-অস্ট্রালয়েডরা অন্যান্য অঞ্চলের মতো বাংলাদেশেও কৃষিজীবি জাতি হিসেবে ৩০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। বাংলাদেশের মুন্ডা, সাঁওতাল, ওঁরাও প্রভৃতি ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী এই নিষাদ নরগোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্ত। এরাই বাংলাদেশের আদি বাসিন্দা, চাকমা-মার্মা-ত্রিপুরারা নয়। বাংলা ভাষার মধ্যেও নিষাদ ভাষার প্রভাব অনেকখানি। অস্ট্রিকরা সেই প্রস্তর যুগ থেকে উপমহাদেশের বাসিন্দা এবং ঐ সময়ে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ ভূভাগ জাগ্রত থাকায় তারা পশ্চিম থেকে আসামের পাহাড়ি অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। এজন্য বাংলাদেশের আদিবাসী হিসাবে প্রোটো-অস্ট্রালয়েডদেরকে বিবেচনায় আনা হয়। প্রস্তর যুগের উত্তরকালে এদের ব্যবহৃত অস্ত্রশস্ত্র দেশীয় গাছ গাছালী দ্বারা তৈরী হত। এদেশে প্রোটো- অস্ট্রালয়েডরা কৃষিজীবি হওয়ায় তারা কোন নগর সভ্যতা গড়ে তুলেনি। এদের প্রশাসনিক কোনো কাঠামো গড়ে না উঠায় রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে স্থায়ীভাবে রাজতন্ত্র গড়ে উঠেনি এবং এদের কোনো স্থাপত্য নিদর্শনও পাওয়া যায় না। এমনকি কোনো স্থায়ী স্থাপত্য নিদর্শন ছিল কিনা তাও জানা যায়না। এদের সমাজ ছিল দলনেতা ভিত্তিক গোষ্ঠী শাসনতন্ত্র। বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে এদের ছিল অসংখ্য ছোটো ছোটো গোষ্ঠী বা কৌমভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা। তারপরেও এদের সাধারণ সংস্কৃতি প্রায় একইরকম ছিল।
বাংলাদেশের যে গ্রামীণ সভ্যতা তা এ প্রোটো-অস্ট্রালয়েডদেরই অবদান। দ্রাবিড় ও আর্যদের আগমনের পূর্ব পর্যন্ত তারা ব্রোঞ্জ বা তামার ব্যবহার জানতো না। সেজন্য অস্ট্রিক সভ্যতার বস্তগত প্রমাণ পাওয়া যায়না, সংস্কৃতি ও ভাষার মধ্যেই অস্ট্রিক জাতিকে স্পষ্টরূপে পাওয়া যায়। ওদের দেবতার নাম ছিল বোঙ্গা, অনেকের অনুমান এই বোঙ্গা শব্দ থেকেই বঙ্গ শব্দটির উদ্ভব। মূলত নেগ্রিটো বা নিগ্রয়েড বা নিগ্রোবটু এবং প্রোটো-অস্ট্রালয়েড বা অস্ট্রিক বা আদি-অস্ত্রাল নামে জনগোষ্ঠীর আন্তঃ প্রজননের ফলে যে সংকর ধারার সৃষ্টি তারাই আমাদের জাতিগোষ্ঠীর ভিত্তি রচনা করেছেন। এরপর দ্রাবিড়, আলপাইনিয় আর্য, কিরাত এবং নর্ডিক আর্যদের মিলিত ধারা আমাদের জাতিগোষ্ঠীকে সমৃদ্ধ করেছে। আরও পরে আফগান, পাঠান, পশতু, আরব, আফ্রিকান, পর্তুগীজ বা ইউরোপীয় ইত্যাদিদের রক্তের সংমিশ্রণ ঘটে। এদের সবার মিলিত রক্ত ধারায় আমরা একটি বর্ণসংকর জাতি। এখনও আমাদের আশেপাশের মানুষদের দিকে তাকালে সুদূর অতীতের ঐসব জনগোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের দেখা মেলে।
হদিস:
১। বাঙ্গালির ইতিহাস (আদি পর্ব)- নীহাররঞ্জন রায়
২। বিবর্তনের পথ ধরে- বন্যা আহমেদ
৩। প্রাচীন বাংলার জনপদ ও জনজাতিগোষ্ঠী- কাবেদুল ইসলাম
৪। বাঙলা, বাঙালী ও বাঙালীত্ব- ড.আহমদ শরীফ
৫। ইন্টারনেট
পোস্ট ভিউঃ 27