১
এর আগে কয়েকটা বাগধারার পিছনের গল্প বা পৌরাণিক উৎস নিয়ে লিখেছিলাম। আজ সেরকমই একটা বাক্য ‘সত্য সেলুকস! কী বিচিত্র এই দেশ’ নিয়ে লিখবো। এটা বাগধারা না হলেও বহুল প্রচলিত একটা বাক্য এবং এর একটা পৌরাণিক উৎস না, ইতিহাস আছে। আমরা অনেকে সেই ইতিহাস জেনে, আবার অনেকে না জেনে কথা প্রসঙ্গে বাক্যটা ব্যবহার করে থাকি। যেহেতু বেশ প্রচলিত বাক্য তাই এর পিছনের ইতিহাস বা বাক্যটা কীভাবে চালু হলো তা জেনে রাখা ভালো। এটা না জানা অন্যায় না, তবে জেনে রাখাটা স্মার্টনেস।
মূলত অদ্ভুত, বিচিত্র প্রভৃতি অর্থ প্রকাশে বাক্যটা ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ একটা নিয়ম জানা সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে কাজ করা এমন কিছু ধারণা প্রকাশে এর ব্যবহার বেশি। তবে অনেকে স্মার্টনেস দেখাতে ‘ইয়া রব’, ‘হায় আল্লাহ’, ‘হায় খোদা’, ‘হে ভগবান’, ‘ও মাই গড’ একরকম শব্দের পরিপূরক হিসেবে ‘সত্যি সেলুকাস’, ‘হায় সেলুকাস’ শব্দ ব্যবহার করে থাকেন। নিজেকে কারো সামনে সর্বত্তম উপায়ে উপস্থাপন করাতে নিষেধ নেই, তবে তার আগে আসুন ইতিহাসের দিকে চোখ রাখি, কে এই সেলুকাস? কেন তাকে নিয়েই এত কথা ?
২
কে এই সেলুকাস?
সেলুকাস নিকেটর (Seleucus I Nicator) ছিলেন একজন গ্রিক বীর যোদ্ধা, আলেকজান্ডারের সেনাপতি এবং আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর একজন সফল শাসক। খ্রিষ্টপূর্ব আনুমানিক ৩২৭ সালে আলেকজান্ডারের ভারত দখলের অভিযানে প্রধান সেনাপতি ছিলেন সেলুকাস। তবে তারও আগে অর্থাৎ ৩৩১ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে মহাবীর আলেকজান্ডার পারস্য দখল করেছিলেন। আলেকজান্ডারের পারস্য অভিযানের সময়ে সেনাবাহিনীতে এক বিশেষ অভিজাত সৈন্যদল ছিল, যাদের নাম হিপাপিস্ট। এরা থাকতো সম্মুখ যোদ্ধা ও অশ্বারোহীদের ঠিক মাঝখানে। এ দলটারই নেতৃত্বে ছিলেন রণকুশলী বীর প্রথম সেলুকাস নিকেটর। এই সেলুকাসকে নিয়েই আকামেনিদীয় সাম্রাজ্যের বাকি এলাকাগুলো দখলের জন্য পূর্বে অগ্রসর হয়েছিলেন আলেকজান্ডার। ৩২৮ খ্রিস্টপূর্বে বর্তমান আফগানিস্তান দখল করে তিনি এগোতে থাকেন হিন্দুকুশ পর্বতের দিকে। হিন্দুকুশের পূর্বে ছিল সোয়াত উপত্যকা, পেশোয়ার ইত্যাদি, যা কিনা বর্তমান পাকিস্তানের অংশ। আলেকজান্ডার এক বছরের মাথায় সেসবের দখল নিয়ে চলে আসেন আরো পুর্বে। তারা সিন্ধু উপত্যকা দিয়েই ভারতে প্রবেশের চেষ্টা করেন। ইউরোপ থেকে আসা এই দল ইরান-আফগানিস্তান এলাকা পার হয়ে ভারতে এলে এখানকার মানুষের গঠন, চালচলন, কৃষ্টি, সভ্যতা ইত্যাদির ভিন্নতা ও বিচিত্রতা দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন।
নৌকায় চড়ে সিন্ধু পার হয়ে ৩২৬ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে প্রথমবারের মত আলেকজান্ডার পা রাখেন ভারতের মূল ভূখণ্ডে। পঞ্চনদের দেশ বলা হয় পাঞ্জাবকে। সেই পঞ্চনদের অন্যতম ঝিলম ও চেনবের মাঝে ছিল পৌরব রাজ্য, যার রাজা ছিলেন পোরু বা পুরুষোত্তম। হস্তিবাহিনী নিয়ে মহাবিক্রমে যুদ্ধ করে তবেই তিনি হার মেনেছিলেন আলেকজান্ডারের কাছে। সে যুদ্ধেও সেনাপতির দায়িত্বে ছিলেন সেলুকাস। ৩২৩ খ্রিস্টপূর্বে ব্যাবিলনেই অকালমৃত্যু হয় আলেকজান্ডারের। আলেকজান্ডার যখন মৃত্যুশয্যায়, তখন কথা বলবার মত সামর্থ্যও ছিলনা। এরফলে তিনি তার উত্তরসুরী মনোনীত করে যেতে পারেননি। আলেকজান্ডার যখন এশিয়া অভিযানে বের হন, তখন নিজ এলাকা মেসিডোনের দায়িত্ব তিনি আন্তিপেতারের কাছে দিয়ে গিয়েছিলেন।
পারদিকোস নজর দিয়েছিলেন সেই এলাকাতেও। আলেকজান্ডারের বোন ক্লিওপেট্রাকে বিয়ে করে তার ঐ এলাকার দখল করার পরিকল্পনা ছিল। এমন অবস্থায় মেসিডোনের আন্তিপেতার, মিসরের টলেমি সোটারসহ অন্যান্য সত্রপরা একজোটে পারদিকোসের বিরুদ্ধে চলে যান। পারদিকোসের একচ্ছত্র আধিপত্য রুখতে তার অধীনস্ত তিন সেনা কর্মকর্তা, আন্তিজেনেস, পাইথন ও সেলুকাস দাঁড়িয়ে যান। পারদিকোসকে হত্যার পর পুরস্কার স্বরূপ আন্তিপেতার সেলুকাসকে ৩২০ খ্রিস্ট পূর্বে ব্যাবিলনের গভর্নর নিযুক্ত করেন। কিন্তু আলেকজান্ডারের সেনাপতিদের মধ্যে ক্ষমতার যুদ্ধ কোন ভাবেই থামছিল না।
আন্তিপেতারের মৃত্যুর পর নানা ঘটনাক্রমে ইউরোপে কাসান্দার ও এশিয়া-মাইনর অঞ্চলে আন্তিগোনাস হয়ে পড়েন সর্বেসর্বা। আন্তিগোনাস এক সময় ব্যাবিলনও দখল করে নেন। তখন মিসরের টলেমি, মেসিডোনের কাসান্দাররা এগিয়ে আসেন সেলুকাসের সাহায্যে। তাদের সহায়তায় সেলুকাস নিজের এলাকা পুনরায় ফিরে পান। ৩১০ খ্রিস্টপূর্বে সংঘটিত এই যুদ্ধকে ইতিহাসে ব্যাবিলনের যুদ্ধ বলা হয়। এই যুদ্ধই যেন তাতিয়ে দেয় সেলুকাসকে। সাধারণ সেনাপতি ও সামন্ত রাজা থেকে তিনি বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি হতে চাইলেন। মেসোপটেমিয়া, ব্যাক্ট্রিয়া, পারস্যের দখল নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন ‘সেলুসিড সাম্রাজ্য’। বর্তমান আফগানিস্তানও ছিলো সেলুকাসের অধিভূক্ত। ‘সম্রাট’ সেলুকাস এরপর মনযোগ দিলেন আরো পূর্বে, ভারতের দিকে।
৩
মগধে ততদিনে গুরু-শিষ্যের এক চমৎকার জুটি শেকড় গেড়ে বসেছিলো। চাণক্যর কূটকৌশল আর চন্দ্রগুপ্তের সাহসী নেতৃত্বের ওপর ভর করে মৌর্য্য সাম্রাজ্য পূর্বে বাংলা থেকে শুরু করে পশ্চিমে পাঞ্জাব ও দক্ষিণে বিন্ধ্য পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ৩২১ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে নন্দ বংশের শেষ সম্রাট ধননন্দকে হত্যা করে মৌর্য্য সাম্রাজ্যের জয়যাত্রা শুরু হয়েছিল এবং তামিল ও কলিঙ্গ ছাড়া প্রায় পুরো ভারতবর্ষই ছিলো মৌর্য্য শাসনের অধীন। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্য ভাবলেন ভারতবর্ষের কিছু জায়গা কেন গ্রিকদের অধীনে পড়ে থাকবে! তখন নিকানর, ফিলিপ, ইউদামাস ও পাইথন উত্তর-পশ্চিম ভারতে মেসিডোন সাম্রাজ্যের সামন্ত-রাজা হিসেবে আলেকজান্ডারের উত্তরাধিকার বহন করছিলেন। এই চারজনকে যুদ্ধে পরাজিত করে চন্দ্রগুপ্ত সিন্ধু উপত্যকাকে পুরোপুরি মৌর্য্য সাম্রাজ্য অধিভূক্ত করেন। সেলুকাস বুঝে গেলেন, চন্দ্রগুপ্তকে থামানো না গেলে তার সাম্রাজ্যের উত্তর-সীমান্তকে রক্ষা করা যাবে না।
চন্দ্রগুপ্তের ছিল ৬ লাখ সম্মুখ যোদ্ধা আর ৩০ হাজার অশ্বারোহী। অন্যদিকে সেলুকাসের ছিল মাত্র আড়াই লাখ যোদ্ধা। ৩০৫ থেকে ৩০৩ খ্রিস্টপূর্বে হওয়া এ যুদ্ধে সেলুকাস পেরে ওঠেননি, তবে যুদ্ধ শেষ হয় আপোষ রফার মধ্য দিয়ে। সেলুকাস নিজ শাসনাধীন হেরাত, কাবুল, কান্দাহার, কাম্বুজা, গন্ধর, বেলুচিস্তান ও হিন্দুকুশ উপত্যকা দিয়ে দেন চন্দ্রগুপ্তকে। সেই সাথে তার কন্যা হেলেনকে চন্দ্রগুপ্তের সাথে বিয়ে দেন।
সেলুকাস তার উত্তরসুরী হিসেবে পুত্র আন্তিয়োকাসকে মনোনীত করেছিলেন। ওদিকে সেলুকাসের পুরনো মিত্র মিসরের টলেমি সোটার তার জ্যেষ্ঠ পুত্র টলেমি সেরাউনাসকে বাদ দিয়ে উত্তরাধিকার বানালেন কনিষ্ঠ পুত্র টলেমি ফিলাডেলফাসকে। এরফলে টলেমি সেরাউনাস পিতার কাছে বঞ্চিত হয়ে সেলুকাসের কাছে আশ্রয় চেয়েছিলেন। সেলুকাস তাকে আশ্রয় দিলেও তার করুণ মৃত্যু হয়েছিল এই সেরাউনাসের হাতেই। আসলেই, “History repeats itself.” ক্ষমতার স্বাদ পেতে সেলুকাস যেমন পারদিকাসকে হত্যা করেছিলেন, তেমনি সেলুকাসের প্রাণও নিল কাছের মানুষ টলেমি সেরাউনাস। তবে সেরাউনাস কেন সেলুকাসকে হত্যা করেছিলেন? তার উত্তর কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি।
৪
সেলুকাসের মৃত্যুর পরও নানা উত্থান-পতনের মধ্যে দিয়ে সেলুসিড সাম্রাজ্য টিকেছিল প্রায় আড়াইশ বছর। অনেকেই মনে করেন, হত্যা করা না হলে হয়তো বিশ্বজয়ী হিসেবে আলেকজান্ডারের বদলে সেলুকাসের নামটাই সবাই উচ্চারণ করতো। এমনই ছিল সেলুকাসের সম্ভাবনা! কিন্তু তা যেহেতু হয়নি তাই আলেকজান্ডারের কপালে জোটে ‘দ্য গ্রেট’ বিশেষণ আর সেলুকাস নিজেই হয়ে যান এমন একটা বিশেষণ, যা আদতে ‘বিস্ময় প্রকাশের সমার্থক’।
আলেকজান্ডারের কপালে যে বিশেষণ জুটেছিল তা তিনি অর্জন করেছিলেন নিজের বীরত্ব দেখিয়ে আর সেলুকাসের বিশেষণটা চালু হয়েছে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের নাটক ‘চন্দ্রগুপ্ত’ এর একটা সংলাপ থেকে। রবীন্দ্র-সমসাময়িক কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় বাংলাসাহিত্যের ক্ষেত্রে তার স্বতন্ত্র শৈলী ও ব্যক্তিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি একাধারে কবি, গীতিকার, নাট্যকার ও সমালোচক। উনিশ শতকের শেষপর্যায়ে ডি এল রায় প্রহসন থেকে শুরু করে গীতিনাট্য, সামাজিক নাটক, পৌরাণিক নাটক, ঐতিহাসিক নাটক অর্থাৎ তখনকার নাট্যাঙ্গনে বিদ্যমান প্রায় সব কটি ধারা অবলম্বনে নাটক লেখা শুরু করেন। তবে সমালোচকদের মতে ঐতিহাসিক নাটকগুলোর মধ্যেই তার প্রতিভার পূর্ণ স্ফুরণ ঘটেছে। তার প্রথম ইতিহাসাশ্রিত নাটক ‘তারাবাঈ’ লিখেন ১৯০৩ সালে, এরপর প্রতাপসিংহ ১৯০৫ সালে, দুর্গাদাস ১৯০৬ সালে, নুরজাহান ১৯০৮ সালে, মেবারপতন ১৯০৮ সালে, সাজাহান ১৯০৯ সালে এবং বহুল আলোচিত নাটক চন্দ্রগুপ্ত ১৯১১ সালে ও ১৯১৫ সালে সিংহল বিজয় লিখেন। ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাটকের সেই বিখ্যাত দৃশ্যটা ছিল এরকম,
প্রথম অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
স্থান- সিন্ধুনদতট; দূরে গ্রিক জাহাজশ্রেণী।
কাল- সন্ধ্যা
সেকেন্দার। সত্য সেলুকস! কী বিচিত্র এই দেশ! দিনে প্রচণ্ড সূর্য এর গাঢ় নীল আকাশ পুড়িয়ে দিয়ে যায়;
আর রাত্রিকালে শুভ্র চন্দ্রমা এসে তাকে স্নিগ্ধ জোছনায় স্নান করিয়ে দেয়। তামসী রাত্রে অগণ্য
উজ্জ্বল জ্যোতিপুঞ্জে যখন এর আকাশ ঝলমল করে, আমি বিস্মিত আতঙ্কে চেয়ে থাকি। প্রাবৃটে
ঘনকৃষ্ণমেঘরাশি গুরুগম্ভীর গর্জনে প্রকাণ্ড দৈত্যসৈন্যর মতো এর আকাশ ছেয়ে আসে; আমি
নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে দেখি। এর অভ্রভেদীতুষারমৌলি নীলহিমাদ্রি স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে আছে। এর
বিশাল নদনদী ফেনিল উচ্ছ্বাসে উদ্দাম বেগে ছুটেছে। এর মরুভূমি স্বেচ্ছাচারের মতো তপ্ত
বালুরাশি নিয়ে খেলা করছে।
সেলুকস। সত্য সম্রাট।
বাস্তবে ভারতবর্ষের বৈচিত্র্য দেখে গ্রিক ভাষায় আলেকজান্ডার সেলুকাসকে কি বলেছিলেন বা আদৌ কিছু বলেছিলেন কীনা তা জানা না গেলেও দ্বিজেন্দ্রলাল রায় তার নাটকে আলেকজান্ডারের সেই মুহূর্তটির অনুভুতি সম্পর্কে লিখেছেন “সত্য সেলুকস! কী বিচিত্র এই দেশ!”
পোস্ট ভিউঃ 30