বইয়ের নাম- হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধ
লেখকের নাম- আফরোজা আক্তার
আগামী প্রকাশনীর কর্ণধার ওসমান গনি লেখক হুমায়ূন আহমেদ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে একবার এক সাক্ষাৎকারে বিবিসি’কে বলেছিলেন, “আগে যারা মাসুদ রানা পড়তো, রোমেনা আফাজের বই পড়তো, পরবর্তীতে যারা হুমায়ুন আহমেদের বই পড়েছে, তারা এখন সিরিয়াস ধরনের বই পড়তে শুরু করেছে। ফলে আগের চেয়ে সিরিয়াস ধারার বইয়ের কাটতি কিন্তু আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। এখানে একটা বড় সফলতা এসেছে।” তারমানে যেটা বোঝাচ্ছে হুমায়ূন আহমেদ শুধুমাত্র কলকাতাকেন্দ্রিক বাংলা বইএর বাজারকে ঢাকামুখী করেননি, তিনি পরোক্ষভাবে হলেও সিরিয়াস ধারার পাঠক তৈরিতেও ভূমিকা রেখেছেন। মৃত্যুর পর তাঁর লেখা বইয়ের শূন্যতা পূরণ না হলেও পাঠকের বই পড়ার বেশ উন্নতি হয়েছে। ‘হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধ’ বইটা আসলে এই সিরিয়াস ধারার পাঠকদের জন্যই।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত জাতীয় জীবনকে আলোড়িত করা সব ঘটনা নিয়েই আমাদের দেশে কমবেশি সাহিত্য রচিত হয়েছে। এই ধারায় জহির রায়হান থেকে শুরু করে আরও অনেক বিখ্যাত লেখকদের কলম থেকে আমরা সেসব গল্প জানতে পারি। আনোয়ার পাশার হাতে ‘রাইফেল রোটি আওরাত’ নামে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম গ্রন্থটা বের হয় ১৯৭১ সালের মাঝামাঝি সময়ে। এরপর আরও অনেকে লিখেছেন, লেখক হুমায়ূন আহমেদ তাদের মধ্যে একজন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের ফ্রন্টলাইন থেকে শুরু করে এর পেছনের গল্পগুলো, মানুষের দুঃখ-দূর্দশাসহ মানবিক বিষয়গুলো তাঁর লেখায় মূর্ত করে তুলেছেন। লেখক হুমায়ূন আহমেদ মুক্তিযুদ্ধের ওপরে নির্বাসন (১৯৭৫), শ্যামল ছায়া (১৯৭৫), সৌরভ (১৯৮২), সূর্যের দিন (১৯৮৬), ১৯৭১ (১৯৮৬), আগুনের পরশমণি (১৯৮৬), অনিল বাগচীর একদিন (১৯৯২) এবং জোছনা ও জননীর গল্প (২০০৪), এই ০৮টি উপন্যাস লিখেছেন। অবশ্য লেখকের মৃত্যুর পরে ২০১৪ সালে প্রকাশিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক আরও একটি গ্রন্থ ‘একাত্তর এবং আমার বাবা’।
লেখকের পিএইচডি’র থিসিস পেপার হিসেবে বইটির পাণ্ডুলিপি লেখা হলেও যারা হুমায়ুন আহমেদকে আরও গভীরভাবে জানতে চান, তাঁর শিল্পী মানসের সাথে পরিচিত হতে চান তাদের বইটি বেশ কাজে আসবে। লেখক আফরোজা আক্তার-এর গবেষণার বিষয় ছিল যেহেতু ‘হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধ’ তাই গবেষণা কাজের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের জন্য তাকে সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের অনেকে, যারা ব্যক্তিগতভাবে লেখককে চিনতেন এবং যারা হুমায়ূন আহমেদের বইএর প্রকাশক, তাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় রেফারেন্স বই, পত্র-পত্রিকা, জার্নাল, প্রবন্ধ ইত্যাদি প্রচুর ঘাঁটাঘাঁটি করতে হয়েছে বোঝা যায়। বইএর প্রথম অধ্যায়ে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পরিপ্রেক্ষিত’, দ্বিতীয় অধ্যায়ে ‘হুমায়ুন আহমেদের শিল্পীমানস’ এবং তৃতীয় অধ্যায়ে ‘হুমায়ুন আহমদের উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধ’, এই তিন পর্বে সামগ্রিক বিষয়টা তুলে ধরা হয়েছে। তার গবেষণার বিষয় এবং এই বইটার শিরোনামের সাথে তৃতীয় অধ্যায় সরাসরি সম্পর্কিত হলেও একজন লেখক হুমায়ূন কি পরিবেশে বড় হয়েছেন, তাঁর পারিপার্শ্বিকতা, রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনা প্রবাহ এবং মুক্তিযুদ্ধ কীভাবে লেখকের মনোজগৎকে আলোড়িত করেছিল তা জানতে হলে প্রথম ও দ্বিতীয় অধ্যায়টা থাকা আবশ্যিক। তৃতীয় অধ্যায়ে এই বইয়ের লেখক সাহিত্যে যুদ্ধের প্রতিফলন, উপন্যাসে যুদ্ধ, বাংলাদেশের সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশের উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধ- মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসের ধার এবং হুমায়ূন আহমেদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস বিশ্লেষণ করেছেন। যেকোন থিসিস পেপারের ক্ষেত্রে মূল বিষয়ের ওপরে ফোকাস রেখে যেভাবে গবেষণাপত্র ডেভেলপ করা হয় এই পাণ্ডুলিপি স্বভাবতই সেভাবেই লিখিত ও প্রকাশিত হয়েছে। আমি বলবো এটি বরং পাঠকের জন্য ভালই হয়েছে, বিষয়ের গভীরে যাওয়ার আগে আনুষঙ্গিক বিষয়াদি সম্পর্কে জ্ঞান লাভের আসলে কোন বিকল্প নেই।
অনেকদিনের শ্রমলব্ধ ফসল বইটি ব্যক্তিগতভাবে লেখককে যেমন সমৃদ্ধ করেছে, পাশাপাশি পাণ্ডুলিপিটি বই আকারে প্রকাশ করে নন্দিত কথা সাহিত্যিক এবং বাংলা সাহিত্যের বরপুত্র হুমায়ূন আহমেদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন সত্যিই প্রশংসনীয়। আমরা যারা হুমায়ূন আহমেদের লেখা পড়ি, তাঁর সৃষ্টিকর্ম এবং বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদানের কারণে সম্মান করি, ভালোবাসি, তারা লেখকের শিল্পীসত্ত্বা এবং মুক্তিযুদ্ধের সাথে সেই সত্ত্বা কিভাবে একাত্ম হলো তা জানতে চাইলে এই বইটা পড়া দরকার বলে মনেকরি। লেখক হিসেবে আফরোজা আক্তার তার কাজটি করেছেন, এখন পাঠক হিসেবে আমরা যারা হুমায়ূন আহমেদকে গভীর ভাবে জানতে বা বুঝতে চাই তাদের দায়িত্ব হলো এটি সংগ্রহ করে লেখকের কাজের স্বীকৃতি দেয়া। বেশ ঝরঝরে ভাষায় লেখার কারণে পড়তে বেগ পেতে হয়না। কিছু বানান ভুল পরিলক্ষিত হয়েছে যেটা দ্বিতীয় সংস্করণে নিশ্চিত শুধরে নেয়া হবে।
বইএর সাথে মানানসই চমৎকার প্রচ্ছদ। প্রিন্টিং এবং বাঁধাই এর মানও বেশ উন্নত।
শুভ কামনা নিরন্তর।
সুমন সুবহান।
প্রকাশক- মঈন মুরসালিন, প্রতিভা প্রকাশ
প্রথম প্রকাশ- ফেব্রুয়ারি ২০২২
মুদ্রিত মূল্য- ৪০০ টাকা
পৃষ্ঠা সংখ্যা- ১৬৮
গ্রন্থের প্রকৃতি- মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণা
প্রচ্ছদ- চারু পিন্টু
পোস্ট ভিউঃ 27