১
১৯৪৮ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তার লক্ষ্য নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যখন যাত্রা শুরু করে, তখন থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছিল এর প্রধান স্থপতি ও আর্থিক প্রাণভোমরা। দীর্ঘ ০৭ দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশটি সংস্থাটির বৃহত্তম দাতা হিসেবে নিবিড় অংশীদারিত্ব বজায় রেখেছে, যার প্রমাণ মেলে গত এক দশকে (২০১৪-২০২৪) তাদের প্রদান করা প্রায় ৫.৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অনুদানের পরিসংখ্যানে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অধীনে ট্রাম্প প্রশাসনের আকস্মিক বিচ্ছেদের ঘোষণা বিশ্ব স্বাস্থ্য রাজনীতির চিরাচরিত সমীকরণ ও আর্থিক স্থিতিশীলতাকে আমূল বদলে দিয়েছে। এই প্রস্থান কেবল একটি সদস্যপদ ত্যাগ নয়, বরং এটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্য কূটনীতিতে এক গভীর অনিশ্চয়তা ও নতুন মেরুকরণের জন্ম দিয়েছে। মার্কিন অনুপস্থিতি একদিকে যেমন প্রতি বছর গড়ে ৪০০-৫০০ মিলিয়ন ডলারের তহবিল সংকট তৈরি করতে পারে, অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে রোগ প্রতিরোধ ও গবেষণা কার্যক্রমে তৈরি করতে যাচ্ছে বিশাল কারিগরি শূন্যতা। এই বিচ্ছেদ বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় জনস্বাস্থ্য ও জাতীয়তাবাদের মধ্যকার তীব্র দ্বন্দ্বের এক প্রকট উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রধান দাতা দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্থান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভবিষ্যৎ সক্ষমতাকে এক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
২
প্রেক্ষাপট: দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারিত্বের অবসান।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কখনই একটি সাধারণ সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং ১৯৪৮ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র ছিল এই সংস্থার আর্থিক ও কারিগরি শক্তির মূল চালিকাশক্তি। গত এক দশকে গড়ে বার্ষিক ৪০০-৫০০ মিলিয়ন ডলার অর্থায়ন এবং সিডিসি’র বিশেষজ্ঞ জ্ঞান প্রদানের মাধ্যমে ওয়াশিংটন বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নীতির মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নীতিগত বিরোধের ফলে সেই সাত দশকের নিবিড় ও অবিচ্ছেদ্য অংশীদারিত্ব এখন এক অনাকাঙ্ক্ষিত সমাপ্তির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েছে।
ক। ঐতিহাসিক ভূমিকা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সূচনালগ্ন থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র মধ্যে এক অভূতপূর্ব বৈজ্ঞানিক ও কৌশলগত মেলবন্ধন বজায় ছিল। বিংশ শতাব্দীতে বৈশ্বিক মহামারী ‘স্মলপক্স’ বা গুটিবসন্ত নির্মূলে যুক্তরাষ্ট্রের কারিগরি নেতৃত্ব এবং আর্থিক সমর্থন ছিল সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার, যা বিশ্বকে একটি মরণব্যাধি থেকে মুক্তি দেয়। পরবর্তীতে এইচআইভি/এইডস, ম্যালেরিয়া এবং আফ্রিকায় ইবোলা প্রাদুর্ভাবের মতো সংকটকালীন সময়ে মার্কিন গবেষণা ও সিডিসি’র বিশেষজ্ঞ দল বৈশ্বিক ত্রাণ হিসেবে কাজ করেছে। এছাড়া পোলিও নির্মূল এবং শিশুদের জীবনরক্ষাকারী টিকাদান কর্মসূচিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিরবচ্ছিন্ন ভূমিকা বৈশ্বিক গড় আয়ু বৃদ্ধিতে সরাসরি অবদান রেখেছে।
খ। বিচ্ছেদের সূত্রপাত।
যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের ফাটল প্রথম জনসমক্ষে আসে ২০২০ সালে, যখন কোভিড-১৯ মহামারীর চরম সংকটের মাঝে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে সংস্থাটি ত্যাগের নোটিশ দেন। এই আকস্মিক ঘোষণা বিশ্বজুড়ে তীব্র বিস্ময় ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছিল, কারণ সেই সময় বৈশ্বিক সমন্বয়ের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল। পরবর্তী সময়ে জো বাইডেন প্রশাসন ক্ষমতায় এসে এই ত্যাগ প্রক্রিয়া স্থগিত করে পুনরায় অংশীদারিত্বের অঙ্গীকার করলেও, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণ থেমে থাকেনি। ২০২৪-২৫ সালের মার্কিন নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জয় এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিকে পুনরায় সামনে নিয়ে আসে, যা পূর্বের স্থগিত হওয়া বিচ্ছেদকে পূর্ণ বাস্তবতায় রূপ দেয়।
৩
নেপথ্যের প্রধান কারণসমূহ: কেন এই চরম সিদ্ধান্ত?
যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ত্যাগের এই চরম সিদ্ধান্তটি কেবল আর্থিক লেনদেনের কোনো হিসাব নয়, বরং এর পেছনে কাজ করেছে গভীর ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ ও বৈশ্বিক আধিপত্যের নতুন কৌশল। মার্কিন নীতিনির্ধারকদের মতে, সংস্থাটির বর্তমান কাঠামো মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা এবং জনস্বাস্থ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সংস্কারের অনীহাই ওয়াশিংটনকে এই ঐতিহাসিক বিচ্ছেদের পথে হাঁটতে বাধ্য করেছে বলে প্রতীয়মান হয়।
ক। চীনের প্রভাব ও 'চীনা পুতুল' তত্ত্ব।
ওয়াশিংটনের প্রধান রাজনৈতিক অভিযোগ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তার নিরপেক্ষতা হারিয়ে বেইজিংয়ের প্রতি অযৌক্তিক পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শন করছে। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী, চীনের চাপের মুখে সংস্থাটি তাদের ভুল তথ্য বা প্রাথমিক পর্যায়ে মহামারী সংক্রান্ত তথ্য গোপন করার প্রবণতাকে যথাযথভাবে চ্যালেঞ্জ করতে ব্যর্থ হয়েছে। মার্কিন নীতিনির্ধারকরা একে ‘চীনা পুতুল’ নীতি হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং মনে করেন যে, সংস্থাটি এখন বেইজিংয়ের প্রভাব বলয়ে বন্দী হয়ে তাদের ভূ-রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। এই অভিযোগের ফলে মার্কিনিদের মধ্যে এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয় যে, বিশাল অংকের আর্থিক সহায়তা দিয়েও সংস্থাটিকে মার্কিন স্বার্থে বা নিরপেক্ষ অবস্থানে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এই আস্থার সংকটই ওয়াশিংটনকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাথে কয়েক দশকের সম্পর্ক ছিন্ন করার অন্যতম প্রধান যৌক্তিকতা হিসেবে কাজ করেছে।
খ। কোভিড-১৯ মোকাবিলায় ব্যর্থতার দায়।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ২০২০ সালের শুরুতে করোনা সংক্রমণের ভয়াবহতা ও মানবদেহে এর সংক্রমণের দ্রুততা সম্পর্কে বিশ্বকে সতর্ক করতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চরম বিলম্ব করেছে। বিশেষ করে, প্রাথমিক পর্যায়ে চীনের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার বৈজ্ঞানিক প্রয়োজনীয়তা থাকলেও সংস্থাটি তার বিরোধিতা করায় ওয়াশিংটন তীব্র ক্ষুব্ধ হয়। মার্কিন প্রশাসনের মতে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র এই নমনীয় অবস্থান ভাইরাসের বিশ্বব্যাপী বিস্তারকে ত্বরান্বিত করেছে এবং এর ফলে লাখ লাখ মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র এই ‘সতর্কতা প্রদানে ব্যর্থতা’ এবং ‘ভুল কৌশলগত পরামর্শ’ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ত্যাগের অন্যতম প্রধান কারণ।
গ। সংস্কারের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা।
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছিল যে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় দাতা দেশগুলোর প্রভাব ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল সংস্থাটির বিশাল আমলাতান্ত্রিক খরচ কমিয়ে সেই অর্থ সরাসরি মাঠপর্যায়ের জনস্বাস্থ্য ও টিকাদান কর্মসূচিতে বিনিয়োগ করা। তবে সংস্কারের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা এবং কাঠামোগত পরিবর্তনের ধীরগতি ওয়াশিংটনকে চরমভাবে হতাশ করে, যা তাদের বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।
ঘ। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতি।
রিপাবলিকান আইডিওলজি বা ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির মূল ভিত্তি হলো আন্তর্জাতিক সংস্থায় মার্কিন করদাতাদের অর্থের অপচয় রোধ করে তা সরাসরি দেশের অভ্যন্তরীণ জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে ব্যয় করা। মার্কিন নীতিনির্ধারকদের একটি বড় অংশ মনে করে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় বিশ্বের বৃহত্তম চাঁদা দাতা দেশ হয়েও যুক্তরাষ্ট্র তার আনুপাতিক গুরুত্ব বা কৌশলগত সুবিধা পাচ্ছে না। তাদের মতে বৈশ্বিক আমলাতন্ত্রের পেছনে বিপুল বিনিয়োগ করার চেয়ে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে স্বাধীনভাবে স্বাস্থ্য নীতি পরিচালনা করা অনেক বেশি লাভজনক। এই জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিই মূলত যুক্তরাষ্ট্রকে বহুপাক্ষিক সম্পর্কের বলয় থেকে বেরিয়ে আসতে উৎসাহিত করেছে।
৪
বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এর প্রভাব।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্থান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জন্য কেবল একটি আর্থিক ধাক্কা নয়, বরং এটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্য কাঠামোর মূল স্তম্ভ ভেঙে পড়ার সমতুল্য। প্রতি বছর ৪০০০-৫০০০ কোটি টাকার (৪০০-৫০০ মিলিয়ন ডলার) বিশাল অনুদান বন্ধ হওয়ায় আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ায় পোলিও নির্মূল, এইচআইভি নিয়ন্ত্রণ এবং শিশুদের জীবনরক্ষাকারী টিকাদান কর্মসূচির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো এখন চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। আর্থিক সংকটের পাশাপাশি এটি সংস্থাটির জরুরি সহায়তা প্রদানের সক্ষমতাকেও পঙ্গু করে দেবে, ফলে ভবিষ্যতে কোনো নতুন মহামারি দেখা দিলে তাৎক্ষণিক তহবিল গঠন করা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। কারিগরি দিক থেকে মার্কিন বিজ্ঞানীদের অনুপস্থিতি বৈশ্বিক গবেষণার মেরুদণ্ড ভেঙে দেবে, যা উন্নত ল্যাবরেটরি প্রযুক্তি ও সর্বাধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের পথকে রুদ্ধ করবে। এই বিচ্ছেদের ফলে গ্লোবাল হেলথ লিডারশিপে যে বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছে, বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন চীন আর্থিক ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সেখানে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করবে। এরফলে বিশ্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থা দীর্ঘদিনের পশ্চিমা ব্লক থেকে দূরে সরে যাবে এবং একটি নতুন ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ শুরু হবে। যুক্তরাষ্ট্রের এই বিদায় বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তাকে এক গভীর অনিশ্চয়তা ও স্থায়ী ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
৫
অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ত্যাগের সিদ্ধান্তটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এবং তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক গভীর মেরুকরণ সৃষ্টি করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা এবং জার্মানির মতো দীর্ঘদিনের মিত্র দেশগুলো এই পদক্ষেপকে ‘বিপজ্জনক’ ও ‘বিবেচনাহীন’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। আন্তর্জাতিক নেতাদের মতে, মহামারীর এই সংকটকালে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংস্থাকে অর্থায়ন বন্ধ করা আর জ্বলন্ত আগুনের মুখে ফায়ার সার্ভিসের তহবিল কেটে নেয়া সমান আত্মঘাতী ও অমানবিক। খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই এই সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক বিভাজন চরম আকার ধারণ করেছে। ডেমোক্র্যাটরা মনেকরে, আধুনিক বিশ্বায়নের যুগে এককভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে চলা অসম্ভব এবং আন্তর্জাতিক সংস্থায় থেকেই প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা বুদ্ধিমানের কাজ। কিন্তু রিপাবলিকানরা এই প্রস্থানকে স্বাগত জানিয়ে একে মার্কিন সার্বভৌমত্ব ও করদাতাদের অর্থ রক্ষার সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। মূলত জাতীয়তাবাদী অবস্থান বনাম বহুপাক্ষিক সহযোগিতার এই লড়াই ওয়াশিংটনের নীতি নির্ধারণে এক বিশাল ফাটল তৈরি করেছে। এই রাজনৈতিক টানাপোড়েন কেবল আমেরিকার ভেতর নয়, বরং পুরো বিশ্বের ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য নিরাপত্তার ভারসাম্যকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
৬
ভবিষ্যৎ কোন দিকে? একটি টেকসই সমাধান কি সম্ভব?
যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে এই প্রস্থান কি চূড়ান্ত, নাকি এটি সাময়িক কোনো কৌশল, তা নিয়ে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক বিতর্ক চলছে। বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় জলবায়ু পরিবর্তন কিংবা সংক্রামক ব্যাধির মতো সংকটে কোনো দেশই সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে বা আইসোলেশনে থেকে টিকে থাকতে পারে না। একটি টেকসই সমাধানের পথ খুঁজতে গিয়ে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো তার সমমনা মিত্রদের নিয়ে একটি বিকল্প বা সমান্তরাল স্বাস্থ্য জোট গড়ে তোলার চেষ্টা করতে পারে, যা মূলত মার্কিন স্বার্থ ও স্বচ্ছতাকে অগ্রাধিকার দেবে। তবে এই বিচ্ছেদের ভবিষ্যৎ অনেকাংশেই নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তনের ওপর। ভবিষ্যতে যদি ওয়াশিংটনের নেতৃত্ব আবারও আন্তর্জাতিকতাবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে হয়তো তারা শর্তসাপেক্ষে পুনরায় এই সংস্থায় ফিরে আসতে পারে। তবে সেই ফিরে আসা হবে অনেক বেশি কঠোর এবং সংস্কারমুখী শর্তযুক্ত, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বর্তমান কাঠামোকে আমূল বদলে দিতে পারে।
৭
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় সাত দশকের দীর্ঘ মার্কিন অধ্যায়ের এই অবসান বৈশ্বিক স্বাস্থ্য কূটনীতির ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ও সংকটময় মোড়। ১৯৪৮ সাল থেকে যে দেশটি এই সংস্থার আর্থিক ও কারিগরি মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করেছে, তাদের প্রস্থান সংস্থাটির সক্ষমতাকে বড় ধরনের অস্তিত্ব সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাব, কোভিড-১৯ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার অভাব এবং আমলাতান্ত্রিক সংস্কারের ধীরগতিই মূলত ওয়াশিংটনকে এই চরম পথে হাঁটতে বাধ্য করেছে। তবে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির এই প্রভাব কেবল একটি দাপ্তরিক বিচ্ছেদ নয়, বরং এর ফলে আফ্রিকা ও এশিয়ার জনস্বাস্থ্য প্রকল্পগুলো অর্থায়ন ও বিশেষজ্ঞ সহায়তার অভাবে পঙ্গু হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। এই শূন্যস্থানে চীনের প্রভাব বিস্তার বৈশ্বিক স্বাস্থ্য রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ ও পশ্চিমা ব্লকের নিয়ন্ত্রণ হ্রাসের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও ভবিষ্যতে বিকল্প জোট গঠন কিংবা কঠোর শর্তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না, তবে বর্তমানের এই ফাটল বৈশ্বিক মহামারী মোকাবিলার ঐক্যবদ্ধ শক্তিকে দুর্বল করেছে। আন্তর্জাতিক মিত্রদের চোখে এই সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী হলেও মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এটি সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও সংক্রামক ব্যাধির এই যুগে স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিয়ে এমন রাজনৈতিক টানাপোড়েন পুরো বিশ্বকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই বিদায় প্রমাণ করে যে, জনস্বাস্থ্য এখন আর কেবল বিজ্ঞানের বিষয় নয়, বরং তা প্রবলভাবে ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের শিকলে বন্দী।
পোস্ট ভিউঃ 19