উপলব্ধি

কবিতা বন্ধনহীন গ্রন্থি
উপলব্ধি

অনিমেষ দা’র সাথে প্রথম দেখা কলেজের ক্যান্টিনে,  

কোন এক অলস দুপুরে ক্লাস ফাঁকির নির্জনতায় 

কোনের টেবিলটাতে একা বসে, মাথায় ঝাঁকড়া চুল- 

পরনে খাদি আর চোখে কালো ফ্রেমের চশমা, 

গভীর আগ্রহে টমেটো সসে সিংগারা মেখে খাচ্ছেন। 

হঠাৎই চোখের ফ্রেমে আটকে গেলো দৃশ্যটা-  

তারপর সেভাবেই পোস্টারের মতো সেঁটে থাকলো,  

ওভাবেই আরো কয়েকবার দেখা, আর প্রতিবারই.....

অনি দা ইতিহাসে অনার্স ফাইনাল দেবেন আর আমি- 

সবেমাত্র কলেজে ভর্তি হয়েছি, বাংলা প্রথম বর্ষ ।


একদিন যেচে পড়ে ওনার সাথে আলাপ জুড়লাম-  

কখনও ওরকম হয়না, অথচ সেদিন কী যে হলো! 

ব্যক্তিত্বের নির্মোক ছেড়ে আমি যেন শঙ্খলাগা ঘোরে,

হয়তো এক সর্বগ্রাসী কৌতূহলের কাছে হার মেনেছিলাম। 

উপন্যাসের পাতা ওল্টানোর মতো করে জেনেছিলাম- 

তার আদ্যোপান্ত, ভাসমান শ্যাওলা জীবনের কথা,  

জলের অভাব আর খরতাপের অঘোর উষ্ণতায়- 

ক্রমাগত ক্ষয় আর ম্রিয়মান অস্তিত্ব সংকটের কথা।  

প্রাত্যহিক জীবনে তার দারিদ্র্য আর চিলের ডানার শূন্যতা 

মেঘের মতো ভিজিয়ে দিয়েছিলো অনুভূতির প্রতিটা স্তর।


সকালে নাস্তার জন্য পকেটের খুচরো রা যাযাবর হলে- 

কলেজ ক্যান্টিনের ভর্তুকি দেয়া সিংগারায় নাস্তা আর 

দুপুরের খাওয়ার পর্বটা ওভাবেই সেরে নিতে হতো।   

খরচ বাঁচাতে রাতে একবেলা ভাত, সাথে ডিম কিংবা- 

আলুসেদ্ধ; অনি দা মেসের চুলোয় নিজেই রেঁধে নিতেন। 

দত্ত পাড়ায় দু’টো টিউশনি পড়িয়ে যা আয় তা থেকে-   

নিজের জন্য কিছুটা রেখে বাকীটা পাঠাতে হতো বাড়িতে, 

অনি দা বলেছিলেন অসুস্থ বাবা’র কথা, মৃত মায়ের কথা 

ঘরে বসে থাকা বিয়ের যোগ্য বোন আর পড়ার খরচের-  

অভাবে গ্যারেজে চাকরি নেয়া ছোট ভাইটার কথা।


আমি তখন উত্তরাধিকার, কালবেলা পাঠ শেষ করে 

কালপুরুষের পাতায় চোখ মেলে কী এক মুগ্ধতায়- 

মাধবীলতাকে ধারণ করে, ওনার নাম রেখেছি অনিমেষ। 

অনিমেষ দা বলতেন তার অপ্রাপ্তি-কষ্ট-শূন্যতার কথা আর 

আমার দু’চোখ যেন গাভীন বরষা, নোনাজলের অযুত ধারা 

চিহ্ন রেখে যেতো পরিযায়ী পাখির পালকের মতো, 

নদীর যেমন চোখ আছে বলে দেখতে পায়, দু’কূল ভাসায়-  

একাকার করে দেয় সবকিছু! আমিও যেন বহতা নদী!  

আমার ছায়ায় তিনি জিরিয়ে নেবার সুখ পেলেও জীবন যুদ্ধে- 

বিপর্যস্ত কারো কাছে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া মানে তো বিলাসিতা।


শ্রেণীবৈষম্যের লক্ষণরেখা পেরিয়ে সম্পর্কটা তবুও যখন 

একটা নাম পাওয়ার অপেক্ষায়, আমার হঠাৎ উপলব্ধি- 

চামচের মতো অনি দা’র চোখ, সিংগারার টুকরো, সস 

অজস্র কষ্টের বুদ্বুদ ক্যান্টিনের প্রশস্ত টেবিলে পড়ে থাকে

কিন্তু আগের মতো সেগুলো আমাকে আর স্পর্শ করছেনা,

অনিমেষ দা’র প্রোলেতারিয়েত জীবনের একঘেয়ে কষ্ট- 

অপূর্ণতার গল্পে একসময় বিরক্তলাগা এসে ভর করে,  

আসলে মেঘে আর মাটিতে মাখামাখি শ্রদ্ধা না থাকলে 

ভালোবাসা যায় না, অনুভূতির দাগ হয়তো লেগে থাকে 

তবু নক্ষত্রের মতো ভালোবাসাও একদিন মরে যায়।



পোস্ট ভিউঃ 8

আপনার মন্তব্য লিখুন