একটা তীব্র শব্দে হঠাৎ শূন্যতা-
অনেকগুলো কাক পাখা ঝাপটে কোথায় উড়ে গেলো!
অথচ আমি তখনো জানতাম না
ওটাই ছিলো আমাদের শেষ দেখা।
ঘামের নোনতা বুকে পাখিমাখা স্বপ্ন
আর চশমার লেন্সে বন্দী একজোড়া চোখ-
কি গভীর তাকিয়ে থাকা! বিদীর্ণ করে দেয়,
জানালার শার্সিটা একপাশে ঠেলে দিয়ে
পরিযায়ী পাখির দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলাম তোমার দিকে,
তোমার ফেলে যাওয়া পদচিহ্নের দিকে।
আমাদের ইটের দোতলা বাড়ি-
সামনে এক চিলতে সবুজ-বাঁ দিকে গোলাপের ঝাড়,
ওটা ছাড়িয়ে গলির মুখে দাঁড়াতেই
কি এক ঘোরে হোঁচট খেলে যেন! কি হয়েছিলো?
জুতোর সোলটা খসে গিয়েছিলো কি?
কতবার বলেছিলাম নতুন একজোড়া কিনতে, শোনোনি-
বলেছিলে সামনের মাসে টিউশনির টাকাটা পেলেই,
সামনের মাসটা আর আসেনি পার্থ দা।
দিনের পর দিন জীবনের কাছে এরকম ক্ষয়ে যাওয়া-
মেনে নিতে পারিনি, বিশ্বাস করো।
তুমি ওভাবেই ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে হারিয়ে গেলে
ছাতিম গাছটার আড়ালে, কালো রাজপথে।
তারপর মজিদের দোকান থেকে হয়তো
একটা সিগারেট কিনে তাতে আগুন ধরিয়েছো
একগাল ধোঁয়া আকাশের দিকে ছুড়ে দিয়ে
পা বাড়িয়েছো মেসের আপন ঠিকানায়।
ঠোঁটের কোনে হাসিটা ঝুলিয়ে প্রায়ই বলতে
ওভাবেই নাকি সিগারেটের ধোঁয়ার সাথে
ছাইচাপা আগুনে প্রেমটা খাঁটি হয়,
আমাদের দুশো তেতাল্লিশ দিনের প্রেম।
কীরকম করুণ ধূসর তোমার চলে যাওয়া!
একটা মানুষ ভেতরে ভেতরে কতোটা যে বিধ্বস্ত হয়
তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝেছি।
কিন্তু এছাড়া যে উপায় ছিলোনা!
ডাক্তারের রিপোর্টটা সকালেই হাতে পেয়েছি-
ফুসফুসের ক্যান্সার, অ্যাডভান্সড স্টেজ।
তারপর সারাটা দিন নিজের সাথে যুদ্ধ,
বিকেলের নরম আলোয় দেখতে চাইলাম তোমাকে
আমার ইচ্ছের কাছে উবে যায় তোমার সকল ব্যস্ততা-
কি একটা মিটিং ছিলো যেন! তবুও এলে।
তুমি এলে, কিন্তু এভাবে ফিরে যাও চাইনি
কখনো চাইনি বিশ্বাস করো!
আমি চাইনি দুশো তেতাল্লিশ দিন-
চার ঘন্টা পঁচিশ মিনিটে প্রেমটা এভাবে ভেঙে যাক।
আমি আসলে চাইনি আমার অভাবে তুমি ধ্বসে পড়ো,
শূন্য বিরান প্রান্তরে তুমি নিঃসঙ্গ চাতক-
ও তো আমি মরেও সইতে পারবো না পার্থ দা!
ভাটার টানের মতো ফিরিয়ে নিতে হলো নিজেকে।
তোমার কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়া-
এযে কি কষ্টের! সে তুমি বোঝার অসম দূরত্বে।
যদি জানতাম ওটাই হবে শেষ দেখা
তাহলে ফ্রেমে ধরে রাখতাম আরো কিছুটা সময়,
অমন মলিন মুখে যেতে দিতাম না।
রাজপথে ট্রাকের চাকার প্রবল ঘর্ষন-সাথে আর্তনাদ
অজস্র কাকের হঠাৎ একসাথে জেগে ওঠা!
ওভাবে চলে যাওয়া যে কি ভয়ংকর! ঈশ্বর!
কি এক অভিমানে এমন নিষ্ঠুর প্রতিশোধ!
কতোটা শূন্যতা যে রেখে গেলে তুমি জানলেও না।
জানলার গরাদে চিবুক ঠেকিয়ে বুঝে নিয়েছিলাম শুধু
আমার জন্য রেখে গেছো তোমার পদচিহ্ন।
পোস্ট ভিউঃ 8