গ্রাউন্ড জিরো: পার্ট-১

উপন্যাস গ্রাউন্ড জিরো
গ্রাউন্ড জিরো: পার্ট-১

নাজমা বোর্ডিং হাউজ, দারিয়াকান্দি রোড, কুলিয়ারচর। 

সময়টা সন্ধ্যার পরপর।


বাইরে বেশ ঝড়-বৃষ্টি চলছে। এরমাঝেই, ঝুপ। একটু পরে আবারো, ঝুপ।


ভোঁতা শব্দ দু’টো যখন ইথারে ভেসে এলো নাজমা বোর্ডিং হাউজের ক্যাশিয়ার অনিল দাস তখন রিসিপশনে বসে দিনের হিসেব মেলাতে ব্যস্ত। তিনি চেয়ার থেকে সামান্য হেলে উঁকি দিয়ে সিঁড়ির দিকে তাকালেন কিন্তু কিছু চোখে পড়লো না। বিরক্ত হয়ে ফ্লোর বয়কে ডাকলেন,


- শামসুজ্জামান, এই ব্যাটা শামসুজ্জামান। ওপরে কিসের শব্দ হল? সুধীর ......দেখত...


কি ব্যাপার! দু’টার একটাও সাড়া দিচ্ছেনা। বদমাশ দুটো গেল কোথায়? এখন বোধহয় সুধীরের ডিউটি না। তাহলে শামসুজ্জামান হতচ্ছাড়াটা যে কোথায় গেল! এই বৃষ্টির মাঝে তাকে কেউ বাইরে পাঠালো নাকি! অনেক সময় বোর্ডাররা রাতে-বিরাতে সিগারেট বা ওষুধ আনতে হলে ছেলেদেরকে বাইরে পাঠায় অবশ্য, কিন্তু তাই বলে এই ঝড়ের রাতে! এসব ভাবতে ভাবতে অনিল বাবু হাতের কাজটা ফেলে উঠে দাঁড়ান। কলম গড়িয়ে টেবিলের নীচে পড়ে যায় কিন্তু তিনি সেদিকে ভ্রূক্ষেপ করেন না। ঠিক এমন সময় কোথাও বাজ পড়ার শব্দের সাথেসাথেই কারেন্ট চলে গেলে তিনি রাগে গজগজ করতে থাকেন, বিরক্ত হয়ে অন্ধকার হাতরে টেবিলের ড্রয়ার থেকে টর্চ লাইট বের করে সিঁড়ির দিকে এগোন।


সম্ভবত অনিল বাবুর পায়ের শব্দ পেয়ে বোর্ডিং হাউজের কেউ একজন রুমের দরজা খুলে বাইরে বের হলেন, মোমবাতি চাইলেন তার কাছে। অনিল বাবু বিরক্তবোধ করলেও ক্লায়েন্টের কাছে ধরা দেননা, তিনি রিসিপশন কাউন্টারে ফিরে যেয়ে আলমারির তা’কে সাজানো মোমবাতির প্যাকেট থেকে দু’টা মোমবাতি এনে ভদ্রলোকের হাতে দিলেন। ভদ্রলোক এরইমধ্যে একটা সিগারেট ধরিয়ে ফেলেছেন। সিগারেটের লাল আলোয় তার আবছায়া মুখ রহস্যময় লাগছে। তিনি সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলেন,


- দাদা, একটু দেখুন তো, ওদিকটায় কিসের যেন শব্দ শুনলাম। যা বৃষ্টি, আর যেভাবে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, ভালোভাবে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।


কথাগুলো বলে লোকটা অবশ্য দাঁড়ালেন না। নিজের রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলেন। অনিল বাবু টর্চের আলো ফেলতে ফেলতে সামনে এগোন।


শামসুজ্জামান এই বোর্ডিং হাউজের তিনজন ফ্লোর বয়ের একজন। কিন্তু অনিল দাসের কথায় কেউ সাড়া দিলো না। কিছুক্ষণ চুপচাপ অপেক্ষা করে আবার ক্যাশে ফিরে গিয়ে ভাবলেন ওটা সম্ভবত বিড়ালের লাফিয়ে পড়ার শব্দ। ইঁদুরের যা উৎপাত বেড়েছে আজকাল! সারাদিন এখানে সেখানে ইঁদুর আর বিড়ালের ছোটাছুটি চলতেই থাকে, এক মুহুর্তও শান্তিতে থাকবার জো নেই। তিনি ফতুয়ার কোণায় চশমার পুরু লেন্স ঘষে আবারো হিসেবের খাতায় মনযোগ দিতে চেষ্টা করেন। কিন্তু কাজে মন বসেনা, সুরটা কেটে গেছে যেন।


ডেস্কের এক কোণায় পড়ে থাকা সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে তাতে আগুণ ধরাতে না ধরাতেই একজন আগন্তক ভেজা কাপড় থেকে বৃষ্টির ছাঁট ঝারতে ঝারতে দরজা ঠেলে ভিতরে ঢোকেন। কয়েকদিন ধরে কীযে বৃষ্টি শুরু হয়েছে! পৌষ মাসের ভরা শীতের মধ্যেও তুমুল ঝড়-বৃষ্টি। কে যেন বললো সমুদ্রে নিম্নচাপের কারণে অসময়ের এই ঝড়-বৃষ্টি। পশ্চিমবঙ্গের দিকে প্রচুর ক্ষয় ক্ষতি হয়েছে, আমাদের সাতক্ষীরা-বরিশালের দিকেও। তিনি জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকান, বৃষ্টির কারণে যতটা না রাত হয়েছে তার চেয়ে বেশী গভীর দেখাচ্ছে। এমনিতেই শীতের রাত, কুয়াশার কারণে ঘন অন্ধকারে কিছুই দেখা যায়না। কখন যে কারেন্ট আসবে কে জানে! জেনারেটরটা কয়েকদিন ধরে নষ্ট অবস্থায় পড়ে আছে, কতবার মালিককে বলেছেন কিন্তু তিনি যেন গায়ে মাখছেন না। আসলে বোর্ডারদের কটু কথা তো তাকে শুনতে হয়না, ঝড়-ঝাপটা যা যাবার সব তার ওপর দিয়েই যায়। প্রায় ১৪/১৫ বছর ধরে এখানে চাকুরী করে কেমন মায়ায় জড়িয়ে গেছেন। ভালো কোথাও চাকুরী জুটিয়ে যে চলে যাবেন সে ইচ্ছেও করেনা, তাছাড়া অনেক বয়সও হয়ে গেছে। এ হল বটবৃক্ষের জীবন, শেকড়-বাকল ছড়িয়ে এমন অবস্থা যে এই বয়সে আসলে নতুন করে আর কিছু শুরু করতে ইচ্ছে করেনা।


একটু পরপর মেঘের গুরগুর ডাকের সঙ্গে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। তিনি ভাবলেন কিছুক্ষণ আগে শোনা শব্দটা মেঘের ডাকও হতে পারে। এসব নয়-ছয় ভাবতে ভাবতেই তিনি আগন্তকের দিকে তাকান। নাহ্‌, নতুন কেউ না। দোতলার ২০৭ নাম্বার রুমের বোর্ডার, সন্ধ্যের আগেআগে বোর্ডিং হাউজে এসে উঠেছেন। খাতায় তো নাম লিখেছেন জসিম আখতার, আসলে যে কে সেটা কেইবা জানে! কম তো দেখলেন না, কতো কিসিমের লোকের যে আনাগোনা এই বোর্ডিং হাউজে! ২ ঘণ্টা/৩ ঘণ্টা থেকে শুরু করে ২/৩ সপ্তাহও থাকে কেউ কেউ। এলাকাটার ব্যবসা কেন্দ্র হিসেবে বেশ নামডাক আছে, তাই যার যেরকম ধান্দা আর কি! ইনি যে কত দিন থাকবেন কে জানে! গেস্ট রেজিস্টারে নাম-ঠিকানা এসব টুকতে টুকতে অবশ্য জিজ্ঞেস করেছিলেন, তিনি পরে জানাবেন বলেছিলেন। অবশ্য মালিকের পরিচিত যে ব্যক্তির মাধ্যমে রুম দু’টা বুক করা হয়েছে তিনি এক মাসের কথাই বলেছিলেন। জাতীয় পরিচয়পত্র দেখতে চেয়েছিলেন কিন্তু দেখাতে পারেনি, সাথে নেই বলে প্রসঙ্গের ইতি টেনেছিলেন। অনিল বাবু অভ্যেসবশত রেজিস্টারের পাতায় লেখা নামটা মিলিয়ে নেন। এই বোর্ডিং হাউজের এটাই নিয়ম, প্রতিবারই নামধাম নিশ্চিত করেই তবে রুমের চাবিটা হাতে দেয়া হয়। বোর্ডাররা এতে বিরক্ত হলেও তার কিছুই করার নেই, লোকাল থানার নির্দেশ। ব্যবসা চালাতে হলে তাদের বেঁধে দেয়া নিয়ম মানতেই হবে। কিন্তু তার সাথে তো আরেকজন থাকবার কথা, ওনারা দুজন এসেছিলেন। ২০৭ আর ২১৭ নাম্বার, মুখোমুখি রুম দু’টা তাদের জন্য বুক করা ছিল। তিনি গলা পরিষ্কার করে জানতে চান,


-কি ব্যাপার দাদা, আপনি একা যে! আপনার বন্ধু কই?


জসিম সাহেব অর্থাৎ নসু ওরফে পাঙ্খা নসু উত্তর দিতে আগ্রহ বোধ করে না, রিসিপশন ডেস্কে হাত বাড়িয়ে চাবিটা নিয়ে একটু কাঁধ ঝাঁকিয়ে দোতলার সিঁড়ির দিকে পা বাড়ায়। নাজমা বোর্ডিং হাউজে শুধু থাকবার ব্যবস্থা আছে। খাবার-দাবার বোর্ডারদের বাইরে থেকেই আনাতে হয় অথবা নিজেদেরই আশেপাশে কোথাও থেকে সেরে আসতে হয়। ফ্লোর বয়দের বললে তারা অবশ্য পাশের নুরানি হোটেল থেকে ভাত-মাছ যা লাগে এনে দেয়, হোটেলের সাথে একটা অলিখিত সমঝোতা করা আছে এবং সে অনুযায়ী তারা রুম সার্ভিস দিয়ে থাকে। বোর্ডাররাও কেউ আজ পর্যন্ত এই ব্যবস্থায় কখনও অভিযোগ করেনি, তাই মালিকের বাপ-দাদার আমলের ব্যবসা আজো একই নিয়মে চলছে।


দোতলার করিডর। 

নাজমা বোর্ডিং হাউজ, দারিয়াকান্দি রোড, কুলিয়ারচর।


সারাদিনের ধকল আর টেনশনের পরে পেটে দু’মুঠো খাবার ঢোকায় নসু এখন একটু স্বস্তিবোধ করে। বোর্ডিং হাউজে ঢোকার মুখে যে ছাপরা রেস্তোরাঁটা আছে সেখান থেকে কড়া লিকারের এক কাপ চা মেরে দেয়ার ফলে শরীরের ঝিমলাগা ভাবটা বেশ কেটে গেছে, মামুনটা এলে পারত। ওর নাকি অত্যধিক টেনশনের কারণে খিদে উবে গেছে, এমুহুর্তে গোসল সেড়ে একটা ঘুম বড় বেশী প্রয়োজন। নসু খামাখা জোর-জবরদস্তি না করে নিজের পেটটা ভরাতে যায়। মনের মাঝে একটা হালকা স্বস্তি ভাব থাকলেও রিসিপশনের লোকটার অযথা কৌতূহলে নসু বেশ বিরক্ত বোধ করে। এমনিতেই বোর্ডিং হাউজে খাবারের ব্যবস্থা নেই জেনে তার মেজাজটা তেতে ছিল। তার মতে এধরণের গায়ে পড়া বা তেলতেলে স্বভাবের লোকগুলো একটু ঘাঘু টাইপের হয়ে থাকে, সে এদের দু’চোখে দেখতে পারে না। সেজন্যই লোকটার প্রশ্নে সে উত্তর দেবার তাগিদও অনুভব করে না।


বুকিং থাকা সত্ত্বেও লোকটা এটা সেটা প্রশ্ন, জাতীয় পরিচয় পত্র এসব চেয়ে একটু ঝামেলায় ফেলার চেষ্টা করেছিল। ডিবি’র টিকটিকি বোধহয়। মাথায় এক তাড়া বিপদ নিয়ে ঘুরছে বলে নসু তাকে কিছু বলেনি। অন্য সময় হলে এতোক্ষণে তার কপালে খারাপ কিছু ঘটত। এর আগে এরচেয়ে অল্পতেও সে অনেকের ডেডবডি ফেলে দিয়েছিল। তার রাগচটা বা খুনে স্বভাবটা দলের কমবেশী সবাই জানে। স্বভাবে ওয়েস্টার্ণ সিনেমার আউট ল'দের মত ট্রিগার হ্যাপি বলে নসুর অযথা কথা বলতে ভালো লাগেনা। অনিল বাবু’র দিকে তাকিয়ে সামান্য চোখ পাকাতেই তিনি যেন শামুকের মত গুঁটিয়ে যান। দ্বিতীয় প্রশ্নটি করার সাহস পাননি। আজ সকালেই সাভারে এত বড় একটা ঘটনার জন্ম দিলেও নসু কেন জানেনা একটু ভারমুক্ত বোধ করে। নিজের এরকম কঠিন স্বভাবের কারণে সে নিজেও মাঝে মাঝে বেশ অবাক হয়। তবে এটা সে ভালো করেই জানে যে, এর সবটাই হয়েছে তার শক্ত-পোক্ত ট্রেনিং-এর কারণে। কলকাতার আন্ডারওয়ার্ল্ডে ফেরারি জীবন কাটানর সময় দাশু মাস্তান তাকে নিজ হাতে গড়ে তুলেছিলেন। দোতলার করিডরে শিস্‌ দিতে দিতে নসু নিজের রুমের দিকে এগোয়। শিস্‌ এর এই সুরটা তার খুব প্রিয়, মন ফুরফুরে থাকলে সে প্রায়ই সুরটা তোলে, ফ্লো-রিডা হুইসেল-


Can you blow my whistle baby, whistle baby

Let me know

Girl I'm gonna show you how to do it

And we start real slow


কলকাতায় দাশু মাস্তানের হয়ে কাজ করার সময় দলের একটা ছেলের কাছ থেকে এই সুরটা শিখেছিল। একসময় সেও সুরটা রপ্ত করে ফেলে। রূপনগর বস্তির ঝুপড়িতে বেড়ে উঠলেও ছেলেটার কাছ থেকে অল্প-বিস্তর বাংলা-ইংরেজি লেখাপড়া শিখে নসু নিজেকে বদলে ফেলেছে। কিছু শেখার বা জানার প্রবল আগ্রহ থেকেই নসু আজ তাদের দলের সবার থেকে একদম আলাদা। আচ্ছা, কি যেন নাম ছেলেটার! সুদীপ্ত না সুখদেব! অনেকদিন হল, ভুলে গেছে অনেক কিছু। এদিকের পরিস্থিতি একটু ঠাণ্ডা হলে তার কলকাতায় যাবার কথা, দর্শনার উথুলি সীমান্তে সেভাবেই প্রস্তুতি নেয়া আছে। তবে এবার গেলে ছেলেটাকে খুঁজবে, রোগা লিকলিকে চেহারায় একমাথা চুল, দার্জিলিং-এর কোন এক কনভেন্টে পড়ত। কি একটা অপরাধ করে সেখান থেকে পালিয়ে এসে দাশু মাস্তানের দলে যোগ দিয়েছিল। মাঝে মাঝে গিটার বাজিয়ে কি সুন্দর দারুণ গান গাইত!


এলোমেলো কীসব ভাবতে ভাবতে রুমের সামনে পৌঁছেই তাকে থমকে দাঁড়াতে হয়। কিছু একটা অস্বাভাবিক লাগছে, সে চারদিকে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকায় কিন্তু সমস্যাটা ঠিক ধরতে পারেনা। বৃষ্টির কারণে বাতাসটাও বেশ ভারী, আর তাতে হালকা বারুদের গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে যেন! নাকি সকালের ওরকম ফায়ারিং-এর পরথেকে তার ঘ্রাণ শক্তি লোপ পেয়ে গেছে কে যানে! তবে সে খেয়াল করে তার রুমের বিপরীত দিকে অর্থাৎ ২১৭ নাম্বার রুমের দরজার পাল্লা আধেকটা খোলা। কি ব্যাপার হোয়াইট মামুন কোথায় গেল? তার তো এভাবে দরজা মেলে রেখে কোথাও যাবার কথা না! নসুর কপালে চিন্তার রেখা হালকা ভাঁজ তুলেই মিলিয়ে যায়। সে জানে মামুন আর সবার মত না, সে খুবই সতর্ক টাইপের ছেলে। নসু দরজা ঠেলে ঘরের ভেতরে ঢুকতে চায়, কিন্তু বাথরুম থেকে শাওয়ারের পানির ফোঁটার শব্দ ভেসে এলে সে ঘুরে দাঁড়ায়। এখনো গোসল করছে! সে অবাক হয়, কিন্তু মুখে কিছু বলেনা। কবে যে ছেলেটার আক্কেল জ্ঞান হবে, নসু আপন মনে ভাবতে ভাবতে নিজের রুমের দিকে ফেরে।


রুম নাম্বার- ২১০, নাজমা বোর্ডিং হাউজ। 

দারিয়াকান্দি রোড, কুলিয়ারচর।


নসু একটু কৌতূহলী হয়ে ২১৭ নাম্বার রুমের বাথরুমে ঢুকলে দেখতে পেত কমোডের পাশে একটা লাশ বেকায়দা ভঙ্গীতে পড়ে আছে। লাশটা ফ্লোর বয় শামসুজ্জামানের। জিহ্বাটা সামান্য বেড়িয়ে আছে, গলায় নায়লনের কর্ডের গভীর দাগ। তার বিস্ফোরিত দু’চোখে তখনো আতঙ্ক ভিড় করে আছে। পেশাদার হাতের কাজ, চোখ বুঁজেই বলে দেয়া যায়। নসু ফ্লোর বয়ের লাশটা ওভাবে পড়ে থাকতে দেখলে নিজেকে অন্তত সতর্ক করতে পারত। কিন্তু তার দুর্ভাগ্য যেন তাকে তাড়া  করে ফেরে তাই হয়ত সে নিজের রুমের দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। হালকা মুডে দরজায় চাবি ঘোরাতে যেয়ে সে ওভাবেই যেন হঠাৎ একদম স্থির হয়ে যায়। করোটির পিছনে সে ধাতব একটা কিছুর ঠাণ্ডা স্পর্শ অনুভব করে। লোকটা ওভাবেই তাকে ফ্রিস্কিং করে, কোমরে গুঁজে রাখা ৭.৬৫ মি.মি. ক্যালিবারের সেমি-অটোমেটিক বেরেতা পিস্তলটা নিজের দখলে নেয়। জিন্সের পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করে ঘরের এক কোণে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। তবে তাড়াহুড়োর কারণে দ্বিতীয় ফোনটা চোরাই পকেটে রয়েই যায়, নসু তবুও সে মুহুর্তে নিজেকে খুব অসহায় বোধ করে। অনেক বছরের অভিজ্ঞতা থেকে সে বুঝতে পারে তার করোটিতে ঠেকানো জিনিসটা আসলে কি। নিজেরাই তো কত বার একইভাবে অপারেশন করেছে। এতদিন সে ছিল শিকারি, আর আজ সে নিজেই যেন কারো শিকার। ধাতব বস্তুটির মালিক তাকে আলতো ভাবে রুমের ভেতরের দিকে ঠেলে দেয়। দরজাটা সম্ভবত খোলাই ছিল। সামান্য ধাক্কায় পাল্লাটা সরে গেলে ঘরের ভেতরের উজ্জ্বল আলোয় যে দৃশ্যটা দেখতে পায় তার জন্য সে আসলে প্রস্তুত ছিলনা।


হোয়াইট মামুনের নিথর দেহটা সোফার ওপরে হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে আছে। খালি শরীর, কোমরে সাদা তোয়ালে প্যাঁচানো। ওর বাম হাতের বাহুতে আঁকা মারমেইড ট্যাটুতে টিউবলাইটের আলো রিফ্লেক্ট করায় জ্বলজ্বল করছে। রক্তে ভেজা সোফার কুশনটা মেঝেয় পড়ে আছে, তার প্রান্ত ছুঁয়ে রক্তের একটা ক্ষীণ ধারা ঘরের এক কোণে সরে গেছে, সম্ভবত তার ক্ষতস্থান থেকে তখনও রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। তবে তার চোখের জমাট দৃষ্টি সিলিঙ-এ বিঁধে আছে যেন। অবস্থাদৃষ্টে মনেহচ্ছে ঘটনাটা খুব বেশী আগে ঘটেনি, হয়ত সে যখন রেস্তোরাঁর পাশে দাঁড়িয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিল তখন, কিংবা যখন সে রিসিপশন ডেস্কের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল তখন। সে চোখের কোণা দিয়ে আসেপাশে দেখার চেষ্টা করে। সে জানেনা কিলিং মিশনে তারা কত জন এসেছে। সে শুধু জানে আততায়ী একজন হয়ে থাকলে সে সম্ভবত সামলাতে পারবে। হয়ত সে কারণেই তার শরীরের পেশীগুলো শক্ত হতে চায় কিন্তু আততায়ী তা যেন বুঝতে পেরে সামান্য পিছিয়ে আসে। সে ফিসফিস করে বলে,


- কোন লাভ নেই, ডার্লিং।


একটা ফিচেল হাসি দিয়ে সে ফিসফিস করে আবৃত্তি করে,


"I was born with the devil in me."

These people search for me, sleeping within my chambers

The look of terror

Horror is defined by my legacy

Nothing is more entertaining than a good murder

"I was born with the devil in me."


নসুর হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে যেন, সে নির্ঘাত ঠাণ্ডা মাথার কোন পেশাদার খুনির কবলে পড়েছে। প্রবল ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সে তার মুখটা দেখতে পারছে না। তবে আততায়ীর চোখে মুখে এমুহুর্তে যে রক্তের নেশা লেগে আছে তা বেশ অনুভব করতে পারছে। এরকম টানটান উত্তেজনার মুহুর্তে যে ঠাণ্ডা মাথায় কবিতা আবৃত্তি করতে পারে, সে আর যাই হোক কোন সাধারণ খুনি নয়। নসু ভেবে পায়না, কে তাকে পাঠিয়েছে! এই জীবনে কত জনের হয়ে যে কত রকম কাজ করে দিয়েছে! কলকাতাতেও তো কত কিছু করেছে, কিন্তু এই টাইপের কিলারের সাথে তার কখনো পরিচয় ঘটেনি। সে জানে অন্ধকার জগতের কেউই তাকে এভাবে হত্যা করার সাহস করবে না, এমনকি কোটি টাকা দিলেও না। তার নিজের দলের বা প্রতিপক্ষ দলের কারো কলিজায় সেরকম সাহস নেই। এই লোকটা কালাবাবু’র দলের কেউ হতে পারেনা, ওদের অনেককেই সে কমবেশি চিনে। তারাও নসুর ক্ষিপ্রতা এবং নৃশংসতার ধরণ সম্পর্কে জানে, এজন্যই আড়ালে-আবডালে অনেকে তাকে চিতা, আবার কেউকেউ তাকে কসাই বলেও ডাকে। আপনমনে কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই সে মৃদু স্বরে বলে ওঠে,


- দশ পেটি।  

- হুম! কি?


আততায়ী কানের পাশে বাঁ হাতটি রেখে নসুর কথাগুলো শোনার ভঙ্গী করে। নসু আবারো উচ্চারণ করে,


- যেই হানে পৌঁছান লাগবো কইবি, পায়া যাবি।  

- উঁহু, মাত্র দশ লাখ! আমি তো আরও ভালো অফার পেয়েছি ডার্লিং!


হেঁয়ালি করে কথাগুলো বলেই সে হাসতে থাকে, এবং আবারও বিরক্তিকর আবৃত্তি,


A cellar filled with the fragrance of bodies

So much creativity when I hold a cadaver

The look of terror

I live for a true scream of agony 

Blood stains my fingers

"I was born with the devil in me."


আততায়ীর উত্তর শুনে নসু ভাবে, ঠিকভাবে আলাপচারিতা চালানো গেলে একটা রফায় হয়ত পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে। সেক্ষেত্রে টাকার অঙ্কটা যে তাকে খুন করতে পাঠিয়েছে তার চেয়ে অবশ্যই বেশী হতে হবে, কিন্তু অঙ্কটা কত হতে পারে সে ভেবে পায়না। তবু কথার সূত্র যেন ছিন্ন না হয় অথবা একটা কিছু বলার জন্যই হয়ত সে সাহস করে বলে ফেলে,


- এক খোখা। চলবো?


হিন্দি ক্রাইম বা থ্রিলার মুভির মাধ্যমে মুম্বাই আন্ডার ওয়ার্ল্ড এ ব্যবহৃত কিছু কিছু শব্দ বা ডায়ালগ, খিস্তি-খেউড় এদিকেও চলে এসেছে। পেটি, খোখা এসব মূলত মারাঠি শব্দ, এক পেটি মানে এক লাখ এবং এক খোখা মানে এক কোটি। নসু এক কোটি টাকার কথা বলে বটে, তবে সে জানে এই বিপদ থেকে উদ্ধার পেলে সুদে-আসলে টাকাটা উসুল করে নেয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। তবে টাকার অঙ্কটা শুনে আততায়ী একটু মজা পায় যেন। সম্ভবত আরেকটু মজা করার জন্য আততায়ী নসুকে ঘরের এক কোণে ঠেলে দিয়ে নিজে একটা চেয়ার টেনে বসে। সে নসুকে হাত দুটো মাথার ওপরে রেখে ঘুরে দাঁড়াতে বলে। ইঁদুর-বিড়াল খেলতে তার বেশ ভালো লাগছে। নসু ধীরে ধীরে তার দিকে তাকায় এবং ঘাতককে চিনতে চেষ্টা করে। না, এই লাইনে সে সম্ভবত নতুন। সে একে এর আগে কখনো দেখেনি।


বালাক্লাভা’র আড়ালে। 

রুম নাম্বার- ২১০, নাজমা বোর্ডিং হাউজ।


ছাই রঙের বালাক্লাভার আড়ালে আততায়ীর চোখের শীতল দৃষ্টি এবং নিকোটিনে ঝলসানো ঠোঁট জোড়া ছাড়া কিছুই চোখে পড়ছেনা। তার পরনে ধূসর রঙের জিন্স আর কালো হুডি। তার পায়ে বাদামী রঙের লোফার এবং হাতের কালো লেদার গল্ভসে একটা পিস্তল মুঠোবন্দী। সে মাথার ওপর থেকে হুডিটা সরিয়ে বালাক্লাভাটা খুলে এক পাশে রাখে। এইমুহুর্তে তাকে বেশ আত্মবিশ্বাসী বলে মনেহয়, তা না হলে তার এরকম করার কথা না। তবে আততায়ী বেশ মার্জিত এবং পেটানো চেহারার। অনেকটা সামরিক ধাঁচের, চুলও সেভাবেই ছাঁটা। নিয়মিত জিম করে, দেখলেই বোঝা যায়। নসু তার শারীরিক শক্তি সম্পর্কে আন্দাজ করতে পারে।


তার হাতের পিস্তলটা সম্ভবত পয়েন্ট ৩২ ক্যালিবারের ওয়ালথার পিপিকে, জার্মানির তৈরি সেমি অটোমেটিক পিস্তল। জেমস বন্ড ব্যবহার করে থাকে। একসময় এরকম একটা পিস্তল জোগাড় করার জন্য সে খুব চেষ্টা করেছিল, পারেনি। আলাপচারিতার সুযোগ পেয়ে নসু যেন আত্মবিশ্বাস খুঁজে পায়, সে জিজ্ঞেস করে,


- তুই ক্যাঠা?


আততায়ী হাসে, তার সাদা রঙের দাঁতগুলো ভেসে ওঠে। বলে,


- জুলিও সান্তানা, তোর মৃত্যুদূত।


নসু আততায়ীর হেঁয়ালিপনা গায়ে মাখেনা, কারণ সময়টা আসলে তার প্রতিকূলে। তার মাথার ভেতরে প্রতি সেকেন্ডে একশোটা প্ল্যান উঁকিঝুঁকি মারছে, কিন্তু কোন ধরণের সিদ্ধান্তে আসতে  পারছে না। একই সাথে ঝুঁকি নেয়ার ইচ্ছা, কিংবা অনিচ্ছা, মুক্তি, মুক্তির পরের জীবন, এমনকি   অতীতের ফেলে আসা দিনগুলো মাথার ভেতরে সেলুলয়েডের ফিতের মত ঘুরছে, ক্লোজ শট থেকে লং শট, রঙিন থেকে সাদাকালো, সে যেন দিব্যদৃষ্টিতে সব দেখতে পায়। একে একে বিগত দিনের সব স্মৃতি চোখের সামনে এসে ভিড় করে। ছোটবেলা। ভাইবোনদের সাথে একসঙ্গে রূপনগর বস্তিতে বেড়ে ওঠা। এটাসেটা চুরি করে ডাণ্ডির নেশা করা, তারপর একেএকে সব কিছু। বাবার কথা মনেপড়ে খুব। তৃপ্তি পায় নিজ হাতে পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে পেরেছে বলে। খুব নিষ্ঠুর ভাবে প্রতিশোধটা নিয়েছিল, যেমনটা চেয়েছিল। নসু তার মনের সব ঝাল মিটিয়ে ছিল আজগরের মৃতদেহের ওপরে। মনেপড়ে মায়ের কথা। তার মা জুলেখা বেওয়া কি কখনও জানতে পারবে বা খুঁজে পাবে কি তার মৃতদেহ? সে নিজেও তো জানেনা তার মৃতদেহ নিয়ে এরা কি করবে! লাশটা কি এখানেই ফেলে যাবে! নাকি নদীতে ভাসিয়ে দিবে! মা এখন কি করছেন তাও নসুর খুব জানতে ইচ্ছে করে। তাকে মাস শেষে এখন কে টাকা পাঠাবে? মা হয়তো মাস শেষে ঠিকই তার পাঠানো টাকার অপেক্ষায় বসে থাকবেন। তারপর অপেক্ষা করতে করতে একদিন হয়ত জানতে পারবেন, তার ছেলে আর বেঁচে নেই। তখন কি তিনি কাঁদবেন ছেলের জন্য? তার মনেপড়ে হেনার সাথে সব স্মৃতি। প্রথম পরিচয়, তারপর তার সাথে প্রেম আর সবশেষে তার সাথে হেনার বিশ্বাসঘাতকতা। হেনা'র শেষ কথাটা শোনা হয়নি, মেয়েটা কী যেন বলতে চেয়েছিল! মনেপড়ে যায় টুকরো টুকরো সব কথা, অগুনতি স্মৃতি।


মুক্তির তীব্র আকাঙ্ক্ষায় আততায়ীর সাথে কথা চালিয়ে যেতে যেতে একটা কিছু করার জন্য সে 

প্ল্যান আঁটে। নসু মাথা ঠাণ্ডা রেখে অনুত্তেজিত স্বরে আততায়ীকে জিজ্ঞেস করে,


- তুই কইত্থন! কেঠায় পাঠাইছে?    

- তোর বাপ্‌।


উত্তর দিয়েই সে হাসতে থাকে, এবং আবারো নিচু স্বরে আবৃত্তি,


You have never experienced beauty until holding a body cavity

The apartments remain open so you may enter

The look of terror


কবিতার একটি শব্দও তার মাথায় আর ঢোকে না। নসুর মাথায় এমুহুর্তে বরং খুন চেপে বসে। দলের সবাই জানে, বাবা’কে নিয়ে কিছু বললে সে স্থির থাকতে পারেনা। দলের সবাই জানে আজগরকে সে কিরকম নিষ্ঠুরভাবে খুন করে পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিয়েছিল।


৫ 

বৃষ্টির আঁধারে।   

নাজমা বোর্ডিং হাউজ।


বাবার নাম তুলে গালি, শুধুমাত্র একটি কথার কারণে মুহুর্তেই নসুর সমস্ত হিসেব ওলট-পালট হয়ে যায়। সে দ্রুতই সিদ্ধান্ত নিয়ে ডান দিকে তাকায়, কিন্তু বাম দিকে লাফিয়ে খাটের আড়ালে যেতে চায়। তবে আততায়ীকে সে বিভ্রান্ত করতে পারেনা। ওরকম ভাবে বসে থাকা অবস্থাতেও সে যেন ধুর্ত হায়েনার মত তৈরিই ছিল। সে হয়তো জানত এরকমই কিছু একটা ঘটবে। তাই চোখের পলকেই কালো লেদার গ্লভসের মাঝে ধরে থাকা ৩২ ক্যালিবারের ওয়ালথার পিপিকে পিস্তল থেকে আচমকাই ক্লিক করে ছোট একটা শব্দ হয়, পিস্তলের ফায়ারিং পিন কার্টিজের প্রাইমারে আঘাত করে। তামার তৈরি খালি কার্টিজ কেস তপ্ত শরীর নিয়ে নিচে খসে পড়ে, মেঝের টাইলসে হালকা টুংটাং শব্দ হয়। প্রায় সাথে সাথেই নসুও ঢলে পড়ে মসৃণ মেঝের ওপর। বুলেট বা প্রজেক্টাইল ওর করোটি ছুঁয়ে পাশের দেয়ালে বিঁধেছে। ঝুরঝুর করে খসে পড়ে পলেস্তরার প্রলেপ। পাঙ্খা নসুর আত্মা পাঙ্খা হয়ে ততক্ষণে কোথায় উড়ে যায়, কেউ জানেনা।


টাইলসের মসৃণ মেঝে বলেই হয়ত রক্তের ধারা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকে চারদিকে। একসময় মামুনের রক্তের ধারার সাথে মিশে যায় নসুর রক্তের প্রলেপ। আততায়ী হাটু মুড়ে বসে শিল্পীর দৃষ্টিতে সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তারপর গা ঝাড়া দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায় এবং বিরক্তিকর সেই কবিতাটা আবারও শুরু করে, ইংরেজি সাহিত্যে এধরণের কবিতাকে ডার্ক কবিতা বলে। এমিলি ডিকিনসন, রবার্ট ফ্রস্ট, এলিয়ট, বায়রনের মতো কবিরা প্রচুর ডার্ক কবিতা লিখেছেন। মূলত জীবনের অন্ধকার দিক, যেমন-মৃত্যু, যন্ত্রণা, কষ্ট, বেদনা এসব উপজীব্য করে এধরণের কবিতা লেখা হয়ে থাকে।


I never acted on insanity

You decide the number of people I slaughtered


ভারী স্বরে উচ্চারণ করা কবিতার শেষ লাইনটুকু নসু সম্ভবত শুনতে পারেনা, তার শুন্য দৃষ্টি তখন অসীম শুন্যতার দিকে। হঠাৎ হাত-পা টানটান করে নসু মরিয়া হয়ে শেষবারের মত দাঁড়াতে বা কিছু একটা আঁকরে ধরার চেষ্টা করে যেন। আততায়ী মেঝেয় পড়ে থাকা প্রায় নিথর শরীরের কাছে যায়, নসুর চোখের কোণে তখন জমাট অশ্রু। এক ফোঁটা হঠাৎ গড়িয়ে পড়ে। আততায়ী কিছুক্ষণ নসুর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে, এরপর সাইলেন্সার লাগানো পিস্তলের ধাতব মাজলটা ঘাড়ের কাছে নিয়ে ট্রিগারে চাপ দেয়। ভোঁতা শব্দে আরেক রাউন্ড ফায়ার। নসু স্তব্ধ হয়ে যায়,  ঢাকার অন্ধকার জগতে সে এখন ছাই চাপা ইতিহাস।


"I was born with the devil in me."    

The look of terror ।


কবিতার শেষ লাইন দু’টো ভাবতে ভাবতে আততায়ী ঘরে এদিকে সেদিকে তাকায়, সে আসলে নিশ্চিত হতে চায়, কোথাও কোন চিহ্ন রেখে গেল কিনা! ঘরের পশ্চিম কোণে পড়ে থাকা নসুর মোবাইল ফোনটা কুড়িয়ে হাতে নেয়, ওটার ব্যাটারিটা বডি থেকে আলাদা হয়ে গেছে। কমদামের চায়নিজ সেট। এরপর যেভাবে ঘরে ঢুকেছিল ঠিক সেভাবেই নিঃশব্দে সরে পড়ে।


সব কাজ শেষ করে আততায়ী যখন করিডোরে এসে দাঁড়ায় তখন বাইরে বৃষ্টির বেগ বেড়ে গেছে, আঁধারটাও যেন আরও বেশী জমাট বেঁধেছে পুডিং-এর মত। বৃষ্টির মাঝেই হুডিটা তুলে দিয়ে আততায়ী আঁধারে মিলিয়ে যায়। বৃষ্টির আঁধারে মিলিয়ে যায় একটা অধ্যায়, যার শুরু হয়েছিল আজ থেকে আট বছর আগের আরেক শীতের আঁধারের রাতে।


৬                                                                                                                                                  

আট বছর আগের এক রাত।  

চুয়াডাঙ্গা রেলস্টেশন। রাত সাড়ে সাতটা।


রেলষ্টেশনটা ঐ রাত জেগে থাকা কালের সাক্ষী বটগাছটার মতই পুরনো। সেখানে ইট সুরকী আর ক্ষয়ে যাওয়া লোহার ফ্রেমগুলো দিনরাত ফিসফিস করে কোনও এক সুদূর অতীতের কথা বলে। এলোমেলো বাতাসে মরচে ধরা টিনের ছাউনিগুলো দোল খায় বেতের লতার মত। হাল্কা বাতাসে তিরতির করে কেঁপে ওঠে। বিবর্ণ ষ্টেশনটা যেন বিগত যৌবনা নারী, শুধু কাঠামোটাই টিকে আছে। কালের আবর্তে স্থাপনার জৌলুশ চাপা পড়েছে। শীতের শেষ, তবু সন্ধ্যাগুলোয় ঘন কুয়াশার চাদর শাড়ীর মত জড়িয়ে রাখে ষ্টেশনের জীর্ণ কাঠামোটাকে। বিদ্যুতের লাইনগুলো থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় গড়িয়ে পড়ে রাতের ঘন শিশির। ভেজা ল্যাম্পপোস্টের আলোও যেন ঠাণ্ডায় জমে আছে। আলো তাই মাটি অব্দি পৌছায় না। ল্যাম্পপোষ্টের হলদেটে আলো বাদুড় ঝোলার মতই পোস্টেই ঝুলে থাকে। ম্যাড়মেড়ে আলোয় প্ল্যাটফর্মে হেঁটে বেড়ান মানুষগুলোকে আধিভৌতিক লাগে। তাদের কেউ হয়ত তার মতই পলাতক অপরাধী, রাতের ট্রেনের সাধারণ যাত্রী কিংবা ভবঘুরে মানুষ অথবা চোরাকারবারি। সীমান্তের কাছে বলে চোরাচালান ব্যবসাটা বেশ জমজমাট এখানে। ওপার থেকে মাদক দ্রব্য, অস্ত্র এসব আসে আর এপার থেকে সোনা অথবা ডলার হুন্ডি হয়ে যায়।


রেল পুলিশের দু’জন কনস্টেবল কাঁধে কাঠের ৩০৩ রাইফেল ঝুলিয়ে পান খায়, পিক্‌ ফেলে আর উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে ঘোরে সারা প্ল্যাটফর্ম জুড়ে। এর ওর সাথে কথা বলে, যাত্রীদের কারো সাথে 

বস্তা বা বড় ব্যাগ দেখলে কি আছে জানতে চায়। জিজ্ঞেস করে,


- ওই মিয়া ব্যাগের ভিতরে কি? খোলেন দেহি। যাইবেন কই ?


ওরা প্রশ্ন করে, কিন্তু উত্তরের অপেক্ষা না করেই বিভিন্ন জনের চটের বস্তায় লাঠি দিয়ে গুঁতো দেয়, পরখ করে দেখে। এত রাতেও এক অন্ধ ভিখারি তার কিশোরী কন্যাকে সাথে নিয়ে ভিক্ষা করছে। মেয়েটির হাড় জিরজিরে শরীর ঠেলে উঁকি দেয়া পুষ্ট স্তন জানান দিতে চাচ্ছে নতুন যৌবনের। নসু হায়েনার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সেদিকে। মেয়েটি বোধহয় নসুর চোখের ভাষা বুঝতে পারে,


- শুয়োর!


গালির সাথে একটা রহস্যময় হাসি দিয়ে মেয়েটি তার বাবা’র হাতটা টেনে ধরে, অন্যদিকে সরে যায়। নসু উত্তরে কিছু বলে না। গালিটা গায়ে না মেখে সে বরং চাপা হাসি ছুঁড়ে দেয় তার দিকে। প্ল্যাটফর্মের এক কোনের চায়ের স্টল থেকে ভেসে আসছে মানুষের ফিসফাস, মাঝেমাঝে চাপা হাসি কিংবা চায়ের  কাপের সাথে চামচের অযথা টুংটাং আর পুরনো দিনের হাল্কা চটুল হিন্দি গানের সুর, ‘সাঁইয়া দিল মে আনারে.........।


যাত্রীদের মাঝে ট্রেনের অপেক্ষায় টানটান উত্তেজনা কাজ করে। কেউবা ঘনঘন হাতঘড়িতে সময় দেখে আর টর্চের অনুজ্জ্বল আলো ফেলে রেল লাইনের অতল অন্ধকার বরাবর। দূরের গুমটি ঘরটা অন্ধকারে দেখতে কালো দৈত্যের মত লাগে। যাত্রীরা টর্চের ঘোলাটে আলোয় যেন ট্রেন খুঁজতে চায়। জিন্সের পকেট থেকে লাইটারটা বের করে প্যাকেটের শেষ সিগারেটে আগুন দেয় নসু মিয়া ওরফে পিচ্চি নসু ওরফে পাঙ্খা নসু। একটা লম্বা ঘন টান দিয়ে ধোঁয়াটা বাতাসে ছাড়তেই চোখে পরে প্ল্যাটফর্মের শেষে পা ঝুলিয়ে বসে থাকা পাগলিটার দিকে। শরীরে নোংরা চট মোড়ানো, বিড়িতে টান দিয়ে বিরবির করে কি সব বলছে। দৃষ্টিটা সেখান থেকে সরিয়ে এনে এদিকে সেদিকে, ঘন অন্ধকারে তাকায়। পুলিশ বা র‍্যাবের ইনফরমার তাকে ফলো করছে কিনা তা বোঝার চেস্টা করে। অবশ্য তাদের কারও জানার কথা না যে সে সীমান্তের এপারে, কাঁটাতার পেরিয়ে দেশে ঢুকেছে। নসু শুধু লীডার অর্থাৎ ল্যাংড়া মনিরকে ফোন করে দেশে ফিরে আসার দিন ক্ষণ জানিয়েছে।


নসু কাঁধের ব্যাগটা ফ্লোরে নামিয়ে নিঃসঙ্গ কাঁঠালগাছটার নিচে বসে। এই জায়গাটা বোধহয়  প্ল্যাটফর্মের এক্সটেনশন। সেখানে সিমেন্টে বাঁধানো ফ্লোর থাকলেও মাথার ওপরে ছাউনিটা নেই। দূরে আধো আলোয় রূপজীবী এক যুবতী দাঁড়িয়ে আছে খদ্দেরের আশায়। এতদূর থেকেও তার মুখে পাউডারের সাদা প্রলেপ আর ঠোঁট লেপ্টে থাকা লিপিস্টিকের টকটকে লাল রঙ বোঝা যায়। শরীরটা কীরকম বাঁকা করে দাঁড়িয়ে আছে! খাজুরাহোর প্রস্তর মূর্তি যেন! শরীরের ভাঁজ দেখানোর কী এক প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা! তার দিকে তাকিয়ে নসুর শরীরটা কেমন যেন করে ওঠে! কিন্তু সেটা কয়েক মুহূর্তের আদিম লিপ্সা মাত্র, বিদ্যুতের ঝলসানো আলোর মত সারা দিয়েই চলে যায়। পরক্ষণেই সে হাত দিয়ে জিন্সের কোমরে গুঁজে রাখা পিস্তলের অস্তিত্ব পরখ করে নেয়। একটু পরপর হাত ছুঁয়ে পিস্তলের অবস্থান নিশ্চিত হওয়া, এটা ওর একধরনের অভ্যাস কিংবা বদ অভ্যাস বলা যেতে পারে। ঢাকার অপরাধ জগতে ওরা অবশ্য পিস্তলকে বলে ঘোড়া। আর পিস্তলের প্রজেক্টাইল বা বুলেটকে বলে বীচি, ওর সাথে এমুহূর্তে গোটা দশেক আছে। কলকাতার  পঞ্চাননতলা বস্তিতে থাকার সময়ে ঘোড়া চালানোয় দারুণ হাত পাকিয়েছে সে। নসু সেখানে দাশু মাস্তানের দলে ভিড়েছিল, দাশু মাস্তানের হয়ে খোখা-পেটির বিনিময়ে ভাড়ায় কিলিং করত,  আমরা যাকে কন্ট্রাক্ট কিলিং বা সুপারী কিলিং বলি। এসব করে নিরাপদ আশ্রয়ের পাশাপাশি মাস শেষে ভাল মাসোহারা জুটত। তাছাড়া মাঝেমধ্যে বড়সড় কাজ শেষে বেশ মৌজ-ফুর্তিও হত।


৭ 

পঞ্চাননতলা বস্তি, সোদপুর। 

কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ।


নসুর ঘরটা ছিল আমরি হাসপাতালের ঠিক পিছনে রেল লাইনের ধারে। ৯৬ বর্গফুটের ঘরটাতে সে আর নলাদা আলাদা দুটি চৌকিতে থাকত, মাঝে সামান্য ব্যবধান। নলাদা এসেছিলেন পশ্চিম মেদিনীপুর থেকে, তার চেয়ে বছর আটেক বড় হবেন। তিনি পার্ক স্ট্রীট এলাকায় হাত ছাপাইয়ের কাজ করেন। বলতে গেলে গোটা পার্ক স্ট্রীট এলাকায় তিনি পকেটমারদের একটা বড় দলের দায়িত্বে। প্রতিদিন পকেটমারদের কাজের ভাগ-বাটোয়ারা থেকে শুরু করে দিন শেষে বিভিন্ন জায়গায় সেদিনের বখরা পৌঁছানর কাজ তাকেই করতে হয়।


কলকাতার অপরাধ জগতে নলাদা’র বিচরণ অনেক দিনের, হয়ত এজন্যই এই লাইনে তার জানাশোনাও প্রচুর। নসু যখন জোড়া খুনের দায়ে ঢাকা থেকে পালিয়ে পার্ক স্ট্রিটে এসে উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে ঘোরাফেরা করছিল তখন নলাদা তাকে দেখে ঠিকই তার সমস্যার কথা বুঝতে পেরেছিলেন। নলাদাই তাকে সোদপুরের পঞ্চাননতলা বস্তিতে এনে ঠাই দিয়েছিলেন। তারপর অতীতের সব ঘটনা শুনে নসুকে দাশু মাস্তানের দলে ভিড়িয়ে দেন। এভাবেই দাশু মাস্তানের দলের সাথে থাকতে থাকতে একদিন ভুয়া ঠিকানা-পরিচয়ে রেশন কার্ডও মিলে যায়। এরপর থেকে নসুকে সবাই ধুবরি, আসাম থেকে এসেছে বলেই জানত। সবার মুখে নসুর নাম তখন নসু চৌধুরী।


পশ্চিমবঙ্গে সত্তর-আশির দশকে নকশাল আন্দোলন যখন বেশ তুঙ্গে দাশু ব্যানার্জি তখন হাইস্কুলে পড়ে। যৌবনের ধর্ম মেনে বন্ধুদের অনেকের মত সেও বামপন্থী রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়ে। কংগ্রেসের রাজ্য সরকার ব্যাপক রক্তপাত-ধরপাকড়ের মাধ্যমে নকশাল আন্দোলন দমন করে। সে সময় রাজ্যপুলিশ দাশুকে এরেস্ট করে জেলে পুরে দিলে কয়েক বছরের জন্য সাজা খাটতে হয়। সাজা’র মেয়াদ শেষে জেল থেকে ছাড়া পেলে দাশু ব্যানার্জি নাম বদলে হয়ে যায় দাশু মাস্তান। এরপর সে সরাসরি তৃনমূলে ভিড়েছে এবং এখনও সেখানেই আছে, দলের পান্ডা। তৃণমূল এখন ক্ষমতায়, আর সে দলের নেতাদের কাছের লোক বলেই হয়ত রাজ্য পুলিশ তাকে কখনও ঘাটায়না। সে নিজেও যতোটা সম্ভব গা বাঁচিয়ে চলার চেষ্টা করে।


দলের রাজনৈতিক কর্মকান্ডের জন্য মিছিল-মিটিং-সমাবেশে লোক জোগাড় করার দায়িত্ব আরো অনেকের মত দাশু মাস্তানের ওপরেও ন্যস্ত থাকে। এজন্য দলের ছোটবড় অনেক নেতার সে কাছের লোক। নলা দা’র মত আরও বেশ কিছু চ্যালা-চামুন্ডা দাশু মাস্তানের শেল্টারে থাকে। মিছিল সমাবেশের জন্য লোকজন ম্যানেজ করার দায়িত্ব মূলত নলাদার মত কর্মীদের ওপরেই বর্তায়। তারাও খুশী এরকম কাজ পেয়ে, কারণ সমাবেশের জন্য বিভিন্ন বস্তি থেকে ভাড়ায় আনা লোকজনের ভিতরে পকেটমার দলের ছেলেপেলেদের ঢুকিয়ে দিতে সুবিধা হয়। আর এরফলে স্বাভাবিক ভাবেই সেদিনের আয়-রোজগার একটু বেড়ে যায়।


স্বভাবে নলাদাটা আসলে চরম বেহায়া। মদ, রান্ডি নিয়ে ফুর্তি বা রাতভর জুয়া খেলাসহ তার সমস্ত কুকর্মের ঘাঁটি হল ঝুপড়ির এই ঘরটা। আর নসু হল এসব অপকর্মের নীরব স্বাক্ষি। নলাদা মাঝে মাঝে জুয়ার টাকার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে বন্ধুদের সাথে সারারাত এমন হৈ-হল্লা করে যে সেদিন রাতে আর ঘুমানো হয়না। এসব তো তাও মেনে নেয়া যায়, কিন্তু তার বেলেল্লাপনা চরমে ওঠে যখন সে রান্ডিবাজির জন্য রেল লাইনের ওপারের ঝুপড়ি থেকে মেয়েমানুষ নিয়ে আসত। নসু যে রক্ত-মাংসের একজন মানুষ সেটা যেন দাদা আমলেই নিত না। অবলীলায় নসুর সামনে  মশারীর সাথে চাদর মুড়ে দিয়ে আদিম প্রবৃত্তি সেরে নিত। সারারাত চৌকির ক্যাচর-ক্যাচর শব্দ, শীৎকার, চেঁচামেচিতে রাতের ঘুম নষ্ট হলে মনেমনে গালি দেয়া ছাড়া কোন উপায় থাকত না। কখনো রান্ডিগুলোর আবদারে তাকে ঘর থেকে বের করে দেয়া হলে উঠানের খুঁটিতে হেলান দিয়ে সারারাত পার করে দিতে হতো। অন্য কোন উপায় না থাকায় সে নসুর এসব বেলেল্লাপনাতে  কিছু মনে করত না। তবে তার মেজাজটা চরম খারাপ হত যখন রান্ডিগুলো ভোরে উঠে শাড়ি গোছাতে গোছাতে তাকে নাল্লা বলে গালি দিত। শুধুমাত্র কৃতজ্ঞতাবোধের কারণে নসু নলাদা'র এসব কর্মকান্ডের কখনও প্রতিবাদ করেনি।


৮ 

চুয়াডাঙ্গা রেলস্টেশন। 

রাত সাড়ে আটটা।


কুয়াশায় মাথা ভিজে যাচ্ছে, নসু মাফলারটা মাথায় ভালো করে পেঁচিয়ে নেয়। ঘড়ির কাঁটায় এখন  রাত সারে আটটা। সুন্দরবন এক্সপ্রেস আসতে এখনও আধ ঘণ্টা বাকী। সে সিগারেটে বেশ জোরে শেষ টানটা দিয়ে বাটটা দূরে ছুড়ে ফেলে। প্ল্যাটফর্মের কোনা গড়িয়ে সেটা পড়ে রেল লাইনের ওপর। নিভুনিভু আগুনটা একসময় পুরোপুরি নিভে যায়। ওদিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সে আকাশের দিকে তাকায়। নিঃসীম অন্ধকার আর শূন্যতার মাঝে কুয়াশা ঢাকা চাঁদটাকে কেমন পানসে লাগে! স্বল্প ভোল্টেজে সড়কের বাতিগুলো যেমন জ্বলে আরকি! নসুর মনে পড়ে, এরকম আরেক পানসে আলোর রাতে জীবনটাকে হাতে নিয়ে সে ওপারে পালিয়ে গিয়েছিল। তাও প্রায় বছর তিনেক হতে চললো। তবে নসুর অপরাধ জগতে পদচারনা আরও আগে, ১৪/১৫ বছর বয়সে। ওপারে পালিয়ে যাওয়ার সময়ে বাচ্চু ভাই, অর্থাৎ কালীগঞ্জের বাচ্চু চেয়ারম্যান নসুকে সাহায্য করেছিলেন। এজন্য তার কাছে সে খুবই কৃতজ্ঞ। এপারে এসেই নসু তার খোঁজ করেছিল। কিন্তু তিনি আজ বেঁচে নেই। বাচ্চু ভাইকে কি একটা কাজে ঝিনাইদহ যেতে হয়েছিল, রাতে ফেরার পথে সর্বহারা দলের লালন গ্রুপের হাতে খুন হয়েছেন। এখন অবশ্য তার ছেলে নজরুল এলাকার চেয়ারম্যান।


লালন গ্রুপের কোন পক্ষের হাতে বাচ্চু ভাই খুন হয়েছেন সে ব্যাপারে নসু চেয়ারম্যানকে ভালো ভাবে খোঁজ খবর নিতে বলে,


- ভাতিজা, ক্যামতে কি হইলো একটু পাত্তা লাগাও।  

- ক্যান! কলাম না! লালন গ্রুপের হাতে।

- হাছা নি! কারা কারা ওদের লগে আছিলো পাত্তা লাগাও। 

- জী। সময় দেন। খবর দেবানে।    

- এই কামটা তো আগেই করন দরকার আছিলো। তুমি বইসা ছিলা ক্যালা!  

- সময়টা খুব খারাপ ছিল চাচা। আপনি শুধু কয়েকটা দিন সময় দেন। 

- ঠিক আছে। তাড়াতাড়ি করো, দরকার হইলে আমিই পুরা টিম লইয়া আমুনে।


নসু যদিও চেয়ারম্যানের কাছে প্রতিজ্ঞা করে তবুও সে আসলে জানেনা তার গ্রুপটার এখন কি অবস্থা! পুরনো কে কে গ্রুপে আছে? নতুন কারা এসেছে? তারা কে কি রকম? সে তেমন কিছুই জানেনা। ঢাকায় ফিরলে অবশ্য সবই জানা যাবে। লীডারের কাছে সে শুধু জেনেছে যে তার অবর্তমানে হোয়াইট বাবুই গ্রুপটাকে চালাচ্ছে। সে ফিরে গেলে হয়ত ওই গ্রুপটাকেই তাকে দেয়া হবে কিংবা নতুন কোন গ্রুপ তৈরি করে তাকে নতুন কোন এলাকার দায়িত্ব দেয়া হবে।


সরীসৃপের মত হিসহিস শব্দ করতে করতে ট্রেনটা এক সময় প্ল্যাটফর্মের পাশ ঘেঁষে দাঁড়ায়। মাতৃ মাকড়সার মত ট্রেনটা অসংখ্য যাত্রী প্রসব করে। মুহূর্তে মানুষের প্রাণ চাঞ্চল্যে কর্মমুখর হয়ে ওঠে পুরো স্টেশন। যাত্রীরা কেউ নামছে আবার কেউবা উঠে নিজের সীটের সন্ধানে ব্যস্ত। তবে যত জন যাত্রী নেমেছে উঠেছে বোধহয় তার দ্বিগুণ। মাথায় গামছা বাঁধা লাল ফতুয়া পরা কুলীদের জোরালো হাকডাক শুনতে পাওয়া যায় চারদিকে। তারা মাথায় বাক্স-পেটরা নিয়ে দৌড়ে চলে ট্রেনের বিভিন্ন কামরার দিকে। সবাই ব্যস্ত অথচ নসুর যেন ট্রেনে উঠবার কোন তাড়া নেই। সে বরং দোকান থেকে একটা সিগারেট কিনে তাতে আগুন ধরায় আর চেয়ে দেখতে থাকে মানুষের আনাগোনা। গ্রীক পুরাণের দানব মেডুসার মাথার হাজারো সাপের মত কিলবিল করছে মানুষের কোলাহল! এক সময় ট্রেনটা তীব্র হুইসেলে সুর তোলে আর ঢংঢং করে বেজে ওঠে প্ল্যাটফর্মের লোহার ঘন্টাটা। ট্রেনটা যেন ঝাঁকুনি দিয়ে আড়মোড়া ভাঙ্গে। রেলের কর্মচারী সবুজ পতাকা উড়িয়ে সংকেত দেয়, যাত্রার প্রস্তুতি। নসু পায়ের তলায় সিগারেটের আগুন মাড়িয়ে কাঁধের ব্যাগটা হাতে নেয় আর লাফ দিয়ে উঠে পড়ে সামনের বগিটাতে। ঝিকঝিক শব্দে ট্রেন চলতে শুরু করে। নসু মিয়া ওরফে পিচ্চি নসু ওরফে পাঙ্খা নসু যাত্রীর বেশে জনারন্যে মিশে যায়।


৯ 

গল্পটা অনেক আগের। 

রূপনগর বস্তি, মিরপুর। নসুর বয়স তখন ১৪/১৫ বছর।


নসু মিয়া তখনও পাঙ্খা নসু হয়ে ওঠেনি, সবাই তাকে ডাকতো পিচ্চি। উচ্চতায় স্বাভাবিকের  চেয়ে কম ছিল, সেজন্য। মিরপুরে রূপনগর বস্তির এক মাথায় লেকের কাছাকাছি একটা ঝুপড়ি ঘরে তারা থাকত। বাবা-মা আর পাঁচ ভাই-বোন মিলে বেশ বড় সংসার। নসু সবার বড়। নসুর বাবা ফুল মিয়া রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে তার চটপটির ভ্যান নিয়ে চলে যেত চিড়িয়াখানার  গেটে। মাঝেমাঝে অবশ্য খেলা থাকলে ক্রিকেট স্টেডিয়ামে যেত। বিক্রি বাট্টা খারাপ হতোনা।   নসু রোজ দুপুরে টিফিন বাটিতে করে বাবার জন্য খাবার নিয়ে যেত। নসুর মা, জুলেখা বেওয়া'র  ছিল বিভিন্ন বাসায় ছুটা বুয়ার কাজ। দিনে তেমন সময় পেত না। কিন্তু তারপরও ঠিকই সময় বের করে ছুটে এসে গরম ভাত, ভর্তা–ভাজি রান্না করে টিফিনবাটি হাতে নসু মিয়াকে তার বাবার কাছে পাঠিয়ে দিত। মাসে একদিন পরিবারের সবাই মিলে পর্বত সিনেমা হলে সিনেমা দেখতে যেত। মান্না ভাইয়ের অভিনয় ভালো লাগত। কি সুন্দর ফাইট করে! এরপর রঙিন বেলুন কিনে আইসক্রিম খেতে খেতে সবাই একসঙ্গে বস্তিতে ফিরত। মার যেদিন কাজ থাকত না সেদিন ওর বাবা ভ্যানে তালা মেরে দুপুর নাগাদ বস্তিতে ফিরত। এরপর সবাই মেঝেয় মাদুর পেতে খেতে বসতো। খাওয়া শেষে ফুল মিয়া খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে মুখ ভর্তি পান চিবাতে চিবাতে কাজে ফিরে যেত। কি সুন্দর সুখের সংসার ছিল তাদের!


রোজ দুপুর বেলা বাবার জন্য টিফিন বাটিতে খাবার নিয়ে যাওয়া ছাড়া নসুর তেমন কোন কাজ ছিল না। একদিন ঠিক এরকম সময়েই নসুর পরিবারে একটা ঘটনা ঘটে, যার ফলশ্রুতিতে বস্তিতে একটা হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত ঘটে যায়। হত্যাকাণ্ডের কোন স্বাক্ষী না থাকলেও জুলেখা বেওয়া ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন, তবে ছেলে যেন বিপদে না পড়ে সেজন্য তিনি মুখে কুলুপ এঁটে রাখেন। কারো কাছে বলেননি সেদিনের কথা। সেদিনও নসু টিফিন বাটিতে করে বাবা'র জন্য খাবার নিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তিনি ওগুলো বাসায় ফেরত নিয়ে যেতে বলেন,


- আইজ আর খাওন লাগবো না বাজান, তুমি টিফিন বাটিগুলা বাইত নিয়া যাও।

- ক্যা ? খাইবা না ক্যা?

- অনেকদিন পর এক পুরান বন্ধুর লগে দেখা হইছিল, হেয় বিরানি খাওয়াইলো।  

- ও


নসু আর কথা বাড়ায় না, বস্তিতে ফেরার পথ ধরে। এরফলে প্রতিদিন সাধারণত যতটা সময় লাগে সেদিন তার বেশ আগেই সে চলে আসে, আর এতেই বেঁধে যায় যত বিপত্তি। বরাবরের মত বাটি হাতে ঘরে ঢুকতে গেলে দেখে যে দরজাটা ভিতর থেকে আটকানো। তবে ঘরের ভিতর থেকে ধ্বস্তাধস্তি এবং ফুঁপিয়ে কান্নাকাটির শব্দ ভেসে আসছে। কণ্ঠটা তার মায়ের। প্রবল উৎকণ্ঠা নিয়ে জোরে ধাক্কা দিতেই দরজার কপাট খুলে যায়। বড় চৌকিটা, যেটাতে বাবা-মা আর ছোট দু’ভাই-বোন ঘুমায়, সেটাতে কাশেম চাচা তার মায়ের সাথে ধ্বস্তাধস্তিতে লিপ্ত। তাদের দু’জনেরই  পরনের কাপড় অবিন্যস্ত। কাশেম চাচা নসুকে হঠাৎ ওভাবে ঘরে ভিতরে দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। নসুর মা শাড়িটা কুড়িয়ে নিজের শরীর ঢাকতে ঢাকতে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকেন। পরিবারের সদস্যদের অনুপস্থিতির সুযোগে তার মায়ের কি সর্বনাশ ঘটতে যাচ্ছিল নসু তার কিছুটা আন্দাজ করতে পারে। সে প্রবল আক্রোশে টিফিন ক্যারিয়ারটা ঘরের মেঝেতে আছড়ে ফেলে দেয়। বাটি থেকে ভাত, ডাল, তরকারী এসব চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। এরপর দৌড়ে বাইরে থেকে একটা লাঠি কুড়িয়ে এনে রুখে দাঁড়ায়, হিংস্র বাঘের মত রাগে ফুঁসতে থাকে। কাশেম চাচা হেসে তার দিকে এগিয়ে যান, নসুর হাত থেকে এক ঝটকায় লাঠিটা কেড়ে নিয়ে ঘরের এক কোনে ছুঁড়ে দেন। তারপর একগাল হেসে তার হাতে পঞ্চাশ টাকার একটা নোট গুঁজে দিতে চেষ্টা করে,


- এইটা রাখ। কিছু কিইন্যা খাইস।


নসু সরে যেয়ে মুখের ভেতর থেকে এক দলা থুতু এনে তার মুখে ছুঁড়ে মারে। কাশেম চাচা রাগে গর্জে উঠে নসুর গালে চড় মারেন,


- খানকির পুত, তোর সাহস দেহি কম না! যা দেখছোস তা যদি কোন হালার কানে যায় তো গলা টিইপ্যা মাইরা ফালামু। কুনো হালায় ট্যারও পাইবো না কইলাম।


নসু একহাত দিয়ে গাল চেপে ধরে ঘৃণাভরা দৃষ্টিতে তার চলার পথের দিকে তাকিয়ে থাকে।


কাশেম চাচা বস্তির মাস্তান, ওয়ার্ড কমিশনারের পোষা গুন্ডা। লম্বা তাগড়া টাইপের লোকটা বস্তির ভেতরেই এক কোনে একাই থাকে, তিন বেলা হোটেলে যেয়ে খাবার খায়। তার বউ সংসার বা ছেলেপুলে নেই। তার একমাত্র কাজ হল বস্তির একে ওকে মারপিট করা বা শাসানো আর মাস শেষে বস্তিবাসীদের কাছ থেকে ঘরের ভাড়া উঠিয়ে কমিশনারের কাছে জমা করা। এ জন্য বস্তির সবার সাথেই তার পরিচয় এবং উঠাবসা আছে। তার দুশ্চরিত্র স্বভাব সম্পর্কে কমবেশি সবাই জানে। তার নানাবিধ অপকর্ম নিয়ে বস্তির ভেতরে অনেকবার ঝগড়া-ঝাঁটি বা সালিশ-মিটিং  হয়েছে কিন্তু তাতে কোন লাভ হয়নি। আসলে বস্তির সব লোকজনই ভাসমান শ্রেণীর, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তারা ভাগ্যন্বেষনে ঢাকায় এসেছে। আর তাই জীবন যুদ্ধে টিকে থাকার জন্য তাদেরকে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হয়। নিজের কাজ ফেলে এসব উটকো ঝামেলা নিয়ে মেতে থাকার বদলে দুটো ভাতের সংস্থান করার জন্য ছুটাছুটি করা তাদের কাছে বেশী গুরুত্বপুর্ণ। তাছাড়া বস্তির অনেকের মেয়ে-বউ যে আড়ালে-আবডালে দেহ বিলিয়ে আয়-রোজগার করে থাকে সেরকম কানাঘুষা তো কান পাতলেই শোনা যায়। সম্ভবত এই কারণে কিংবা কমিশনারের লোক বলে কাশেম চাচার মত লোকজন বস্তিতে যত অপকর্মই করুক না কেন তারা সবসময় পার পেয়ে যায়। এমনকি এসব নিয়ে থানা-পুলিশ পর্যন্ত হয়না।


কাশেম চাচার শকুন দৃষ্টি যে তাদের পরিবারের ওপরেও পড়েছে তা নসু কোন ভাবেই টের পায়নি। আর সে টের পাবেই বা কীভাবে! তার তো সময় কাটে ছোট ভাইয়ের সাথে ডাঙ্গুলি খেলে,  নয়তো বস্তিতে তার সমবয়সীদের সাথে এটা সেটা বা ভাংরি জিনিস কুড়িয়ে বিক্রি করে চিপা-চাপায় বসে ডাণ্ডি খেয়ে। কোন কোনও দিন তারা দু’ভাই হাঁটতে হাঁটতে কালশি রোড অব্দি চলে যায়, তারপর পুরো শরীরে ধুলো মেখে তবে ঘরে ফেরা। হাঁটার যে আনন্দ তা শিশুর মত আর কেউ ভোগ করতে পারে কি!


খুট করে একটা শব্দ হলে ঘাড় ফিরিয়ে তাকায়, এরপর মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। তার মা দরজার মুখে দাঁড়িয়ে, তার চোখ-মুখ ফোলা। আঁচলটা মুখে জড়িয়ে এখনো ফুঁপিয়ে কাঁদছেন।


- নসু!


নসু’র দু’চোখ জলে আর্দ্র হয়ে আছে। সে মায়ের দিকে তাকাতে পারে না। এক ধরণের চাপা  প্রতিশোধ স্পৃহা তার চোখ-মুখ ঠেলে বের হয়ে আসতে চায়। সে জোড়ে হাঁটতে হাঁটতে গলির মুখে চায়ের দোকানের দিকে যায়। নসু মনেমনে ঠিক করে, মায়ের অপমানের প্রতিশোধ না নিয়ে সে ঘরে ফিরবে না।


- নসু! শোন বাপধন।


নসু উত্তর দেয়ার প্রয়োজন বোধ করে না। রাস্তার বাঁকে নসুর লিকলিকে শরীরটা হারিয়ে যায়।


নসু চায়ের দোকানের বাইরের টুলটায় বসে ভাবতে থাকে, সে তার মায়ের সম্ভ্রমহানির অবশ্যই  প্রতিশোধ নিবে। কিন্তু প্রতিশোধটা কিভাবে নেয়া যায় সেটা নিয়েই সে ছক কষতে থাকে। নসু  ভালো করেই জানে কাশেম চাচা’র সাথে সে সামনা সামনি কিছুই করতে পারবে না। উল্টো মার খেয়ে কেলো ভুত হয়ে যেতে হবে। সে একেকবার একেকটা প্ল্যান আঁটা’র পর সেটা নিয়ে  ভালোমন্দ ভাবে, তারপর মনপুত না হলে সে নিজেই তা বাতিল করে দেয়। এভাবে সে নিজের সাথে নিজেই বাঘবন্দী খেলতে থাকে। হঠাৎ একটা বুদ্ধি তার মাথায় এসে চেপে বসে। সে অনেকবার দেখেছে কাশেম চাচা প্রায় প্রতিদিনই রাত দেড়টা-দুটার দিকে মদ খেয়ে মাতাল  অবস্থায় রিকশায় চেপে ঘরে ফেরে। সে সময় রিকশাওয়ালা ছাড়া কেউই তার সাথে থাকেনা। দিন-রাত চব্বিশ ঘন্টা মিলে একমাত্র ঐ সময়টাতেই সে একদম অরক্ষিত অবস্থায় থাকে।  তার ঘরের একটু সামনে একটা সরু নর্দমার মত থাকায় রিকশাওয়ালারা সাধারণত সেখানে রিকশা থেকে নেমে ঘর পর্যন্ত বাকী পথটা ঠেলে নিয়ে যায়। সে সময় কাশেম চাচার হুঁশ থাকে না  বললেই চলে, রিকশাওয়ালাই ঘরের বারান্দায় তাকে নামিয়ে দিয়ে চলে যায়।


নসু ঠিক করে কাশেম চাচা যখন মাতাল অবস্থায় রিকশায় চেপে ঘরে ফিরবে তখন সে রিকশার পিছন থেকে গলায় দড়ি বেঁধে হ্যাঁচকা টান মেরে ছুটে পালিয়ে যাবে। এরপর থেকে সে প্রায় প্রতি রাতেই তাকে ফলো করতে থাকে এবং একদিন একটা ভালো সুযোগ পেয়েও যায়। তার অস্ত্র  বলতে সরু নায়লনের দড়ি বা সুতো। টায়ারে যেগুলো থাকে আরকি, সরু তবে প্রচন্ড শক্ত। কোন একরাতে কাশেম চাচা মাতাল অবস্থায় যখন গলিতে ঢুকলেন তখন সে রিকশার পিছু নেয়। এরপর নর্দমাটা পার হওয়ার পরপরই সুযোগ বুঝে রিকশার হুডের পিছনের ফাঁকা অংশ দিয়ে তার ছোট শরীরটা গলিয়ে দিয়ে কাশেম চাচার গলায় ফাঁস পড়িয়ে শরীরের সমস্ত শক্তি জড়ো  করে একটা হ্যাঁচকা টান দেয়। নসুর ওরকম হালকা লিকলিকে শরীরে কতোটুকুইবা শক্তি! তারপরও বুদ্ধিটা বেশ কাজে দেয়। তার হাতে গামছা প্যাঁচানো থাকায় হাত কেটে যায়নি। হ্যাঁচকা টানের কারনে রিকশার সামনের চাকা শূন্যে উঠে যায়। ঘটনার আকস্মিকতায় কাশেম চাচার নেশার ঘোর কেটে গেলে চীৎকার করতে চান কিন্তু তার মুখ থেকে শুধু ঘৎ করে একটা শব্দ বের হয়, তারপর সুনসান নীরবতা। তার অমন দশাসই শরীরটা রিকশার সীট থেকে মাটিতে থুবড়ে পড়ে, প্রাণ বায়ু বের হয়ে গেছে তারও আগে। রিকশাওয়ালাও পা পিছলে একদিকে পড়ে যায়। তবে সে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বা চীৎকার করে কাউকে ডাকার আগেই নসু একটা সরু গলির ভিতরে মিলিয়ে যায়। তারপর এপথ সেপথ হয়ে ঘরে ঢুকে বিছানায় ছোট ভাইটার পাশে শুয়ে পড়ে।


অনেকদিন পরে নসুর মনে প্রশান্তির ভাব ফিরে আসে, তবে সে আসলে নিশ্চিত না কাজটা ঠিকঠাক করতে পেরেছে কিনা! পরদিন সকালে ছোটভাইটা অনেক সাধলেও সে শরীর খারাপের অজুহাতে ঘরেই শুয়ে বসে দিনটা কাটায়। দুপুরে বাবা’র কাছে ছোট ভাইটাই খাবার নিয়ে যায়। সন্ধ্যার পর সে ঘরে ফিরলে তার কাছেই শুনতে পারে কাশেম চাচা’কে কে যেন আগের দিন রাতে গলায় ফাঁস দিয়ে মেরে ফেলেছে। মিরপুর থানা থেকে ঘটনার তদন্ত করতে পুলিশের লোক বস্তিতে এসেছিল, তারা কয়েকজন সন্দেহভাজন আসামীকে কোমরে দড়ি বেঁধে ধরে নিয়ে গেছে। সেদিন রাতে জুয়ার আড্ডায় সঙ্গীদের সাথে কাশেম চাচা'র নাকি বেশ মারামারি বেঁধে ছিল। ওখানেই কেউ একজন তাকে হত্যার হুমকিও দিয়েছিল বলেও জানা যায়। পুলিশের ধারণা হত্যাকাণ্ডের মোটিভ সেখানেই লুকিয়ে আছে। ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে গল্পের সবটা শুনে নসু আপন মনে হাসতে থাকে। সে ভয়ে-বিস্ময়ে ভাবতে থাকে, সে আসলে কখনই ভাবেনি ওরকম একজন  মোটাতাজা মানুষকে এত সহজে খুন করে ফেলা সম্ভব হতে পারে। মানুষ হত্যা করা কি তাহলে এতই সহজ! তার মা দিনের কাজ শেষে ঘরে ফিরে ছেলের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন, কিন্তু নসু তাতে পাত্তা না দিয়ে শিস দিতে দিতে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। এই একটা হত্যাকাণ্ড নসুর বয়সটাকে যেন দ্বিগুন করে দেয়। জুলেখা বেওয়া নিজের ছেলেকে ঠিক চিনতে পারেন না।


১০ 

ঘটনাস্থল মিরপুর। ক্রিকেট স্টেডিয়াম এলাকা। 

দুপুর আড়াইটা।


মিরপুর স্টেডিয়ামে ক্রিকেট বিশ্বকাপ খেলা উপলক্ষে প্রচুর নির্মাণ কাজ চলছে। নসু বস্তির লোকদের চায়ের আড্ডা থেকে শুনেছে কোটি টাকার কাজ। এই টেন্ডারবাজির ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডে বল্টু রাসেল আর আজগর বাহিনীর মধ্যে লেগে গেল ভীষণ গণ্ডগোল। আজগর তার বিশাল দল নিয়ে রাজত্ব করত মূলত কাফরুল-কচুক্ষেত এলাকায়। কিন্তু কাঁচা  টাকার লোভ তাকে টেনে আনে মিরপুর-২ এর স্টেডিয়াম এলাকা অবধি।


ঘটনার দিন সকালেও ফুল মিয়া যথারীতি স্টেডিয়াম এলাকায় চটপটি বিক্রি করতে গিয়েছিলেন। ঘটনার সূত্রপাত বেলা দু’টার পরপর। টেন্ডার পেপার ড্রপ করার সময়সীমা পার হওয়ার আগেই আজগর বাহিনীর ছেলেরা টেন্ডার বক্স ছিনতাই করে পালাতে চাইলে বল্টু রাসেলের ছেলেরা বাধা দেয়। একপর্যায়ে দু’দলের মধ্যে শুরু হল প্রচন্ড ফায়ারিং। নসুর সামনেই বিদেশী থ্রিলার মুভির  এ্যাকশন দৃশ্যের মত সবকিছু ঘটতে থাকে। টিফিন বাটি হাতে সে তখন দাঁড়িয়ে ছিল রাস্তার ওপাশে। সেদিনের সেই গান ফাইটের পরিণামে বুকে আধা ডজন বুলেটের আঘাত নিয়ে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে বল্টু রাসেল।


মিরপুর থানা থেকে পুলিশের টহল পিকআপ এসে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই তীব্র শব্দে হুটার বাজিয়ে র‍্যাবের বেশ কয়েকটা গাড়িও এসে উপস্থিত হয়। কিন্তু ততক্ষণে আজগর আর বল্টু রাসেলের বাহিনীর সন্ত্রাসী ছেলেরা যে যেভাবে পারে পালিয়ে গেছে। পরিবেশ মোটামুটি শান্ত হলে  নসু এগিয়ে যেয়ে দেখে তার বাবা’র মৃতদেহটা ড্রেনের পাশে উপুড় হয়ে পড়ে আছে। পুলিশের একজন কনস্টেবল এসে মৃতদেহটা সোজা করে দিলে দেখা যায় বুলেট কপাল ফুটো করে ঢুকে মগজ ভেদ করে বের হয়ে গেছে। পিছনে রেখে গেছে স্মৃতি। ভ্যান গাড়ীর প্যাডেলে বিচ্ছিন্ন মগজের সঙ্গে ঠিকরে পড়ে নসুদের ভাগ্যের চাকা। নসু'র ধারণা আজগর গ্রুপের ছেলেদের হাতেই তার বাবা মারা গেছেন। সে তখনই প্রতিজ্ঞা করে বড় হয়ে একদিন বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিবে। আজগরকে হত্যা করেই শুরু হবে তার সেই প্রতিশোধ অভিযান, তারপর দলের অন্যদেরকেও।


আজগর গ্রুপের বুলেটের আঘাতে বাবা’র মৃত্যুর প্রতিশোধ স্পৃহা তাকে টেনে নেয় ল্যাংড়া মনিরের দলে। বল্টু রাসেলের পর ল্যাংড়া মনিরের গ্রুপটাই আজগরের প্রতিদ্বন্দ্বী। নসু প্রথমদিকে এই গ্রুপটার ইনফরমার হিসেবে কাজ করত। এরপর এটাসেটা ফুট-ফরমায়েশ খাটতে খাটতে সে একসময় ঘোড়া চালানোর কায়দাও ভালোভাবে রপ্ত করে ফেলে। এভাবে সেই যে ১৩/১৪ বছর বয়সে কাশেম চাচাকে ক্লুলেস খুন করে তার হত্যাকাণ্ডের হাতেখড়ি হল, তারপর একজন দক্ষ  সার্জনের মত সে শিখে নিয়েছিল মানব শরীরের এনাটমি। দশ নাম্বার গোল চক্করের কাছে জিল্লুর কসাই এর মাংসের দোকানে সহকারী হিসাবে কাজ করতে করতে সে দক্ষ হাতে ছুড়ি-চাকু চালাতে শিখেছিল। তবে নসু কাজের ক্ষেত্রে সবসময়ই অস্ত্রের চেয়ে বরং বুদ্ধিমত্তার উপরেই বেশি নির্ভর করে। নসুর মতে মাথায় মাল থাকলে হাতের কাছে পাওয়া যে কোন সাধারণ বস্তুকেই মানুষ হত্যার হাতিয়ারে পরিণত করা সম্ভব। সেটা হতে পারে সাধারণ আলপিন/পেরেক থেকে শুরু করে যে কোন কিছু, বিশেষ করে তার দ্বিতীয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটা এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে। ওটা ছিল প্রথম হত্যাকাণ্ডের ঘটনার চেয়েও চমকপ্রদ এবং এটাও ক্লুলেস।


নসু’র বয়স তখন সম্ভবত পনেরো বছর হবে। তার দ্বিতীয় শিকার ছিল ওয়ার্ড কমিশনার নিজেই। কাশেম চাচা খুন হবার পর ওয়ার্ড কমিশনার বস্তির লোকজনদের ওপরে নির্যাতনের মাত্রাটা বাড়িয়ে দিল। কথায় কথায় বস্তির লোকজনদের দলের গুণ্ডাপাণ্ডা দিয়ে পেটানো, কাউকে বস্তি থেকে উৎখাত করা বা কারো মেয়ে-বউকে পছন্দ হলে রাতের আঁধারে তুলে নিয়ে যাওয়া এসব ইস্যু নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়াল। এতকিছু ঘটনা পুলিশের চোখের সামনেই ঘটছে অথচ তার রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে লোকাল থানা ওয়ার্ড কমিশনারের বিরুদ্ধে কোন জিডি-ডায়েরি নিতে নারাজ। ওয়ার্ড কমিশনারের এসব পুঞ্জিভূত অপরাধ নসু'র মধ্যে হত্যা প্রবৃত্তি জাগিয়ে তোলে। তবে ঘটনাটা ঘটে তার বন্ধু জগদীশের দিদিকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর।


নসু আর জগদীশ বস্তিতে ছোটবেলা থেকে একসাথেই বেড়ে উঠেছে। তারা একসাথেই ভাঙরি-লোহার টুকরা এসব টুকিটাকি কুড়িয়ে বা ছোটখাট ছিনতাই-চুরি এসব করে ডাণ্ডির নেশা করে থাকে। একদিন সকালে মিরপুর বাজারে টুকরি মাথায় ফুটফরমায়েশ খেটে হাতে কিছু টাকা জমলে দুপুরের পর জগদীশকে ডাকতে যায়, একসাথে নেশা করবে। কিন্তু জগদীশের ঘরের সামনে উঁকি দিয়ে দেখে ওর মা আর ছোট ভাইটা মেঝেতে বসে কান্নাকাটি করছে। ওর বাবা  অমলেশ কাকু বিছানায় বসে উদভ্রান্তের মত বাইরে তাকিয়ে আছেন। জগদীশ মুখ গম্ভীর করে তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। সেও নিজেও যে কান্নাকাটি করেছে সেটা তার মুখের দিকে তাকিয়েই বোঝা যায়। পাশের ঘরের দু’একজন মহিলা তাদের সান্তনা দেয়ার চেষ্টা করছে। কেমন একটা  থমথমে গুমোট পরিবেশ।


নসু ইশারায় জগদীশকে ঘরের বাইরে ডেকে জানতে চায় কি হয়েছে, তবে জগদীশ যেটা বলে সেটা শুনতে সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না। ওয়ার্ড কমিশনারের কিছু মাস্তান ছেলেপেলে আগের দিন রাতে রমাদি’কে উঠিয়ে নিয়ে গেছে। অমলেশ কাকু জগদীশকে সাথে নিয়ে মেয়েকে উদ্ধার করতে  রাতেই ওয়ার্ড কমিশনারের কাছে ছুটে গিয়েছিলেন কিন্তু তার বাড়ির গেটে পাহারাদার গুন্ডাগুলো তাদেরকে লাথি-গুতা মেরে তাড়িয়ে দিয়েছে। ওয়ার্ড কমিশনারের সাথে দেখা করার জন্য অনেক অনুনয় বিনয় করেও লাভ হয়নি। সেখানে কিছু করতে না পেরে শেষে থানায় গেছেন কিন্তু তারাও অভিযোগটি আমলে নেয়নি। বরং থানার ডিউটি অফিসার তার মেয়ে কারো সাথে স্বেচ্ছায় ভেগেছে কিনা সে বিষয়ে খোঁজ-খবর নিতে পরামর্শ দেন। উনি যতই বলেন যে মেয়েকে বস্তি থেকে জোরপূর্বক উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তবুও তিনি বিশ্বাস করেন না। যারা এই অপকর্মটা করেছে তাদেরকে তিনি সনাক্ত করতে পারবেন, তারা সবাই ওয়ার্ড কমিশনারের লোক এসব বলেও কোন লাভ হয়না। ডিউটি অফিসার এত রাতে বিরক্ত না করে পরদিন সকালে এসে অভিযোগ দায়ের করতে বলেন। সকালে উঠে অমলেশ কাকু একাই আবারও থানায় গিয়েছিলেন, কিন্তু কোন লাভ হয়নি।


জগদীশের মুখে ঘটনার বর্ণনা শুনে নসুর মধ্যে প্রচণ্ড রকমের রাগ এবং ক্ষোভ এসে ভর করে।  ওয়ার্ড কমিশনারের পোষা গুন্ডা কাশেমের মৃত্যুতে নসুর জড়িত থাকার ঘটনাটা জগদীশ জানত। নসু নিজেই একবার নেশার ঘোরে গল্পের ছলে বলেছিল। জগদীশ নসুকে বলে, কেউ যদি  ওয়ার্ড কমিশনারকে খুন করে দিদি’র অপমানের প্রতিশোধ নিতে তাকে সাহায্য করে তাহলে সে তার টিনের কৌটায় জমানো সব টাকা দিয়ে দিবে। নসুর কানে কথাগুলো ঢোকে কিন্তু মুখে কিছু বলেনা। সে বরং ভাবতে থাকে কিভাবে এই অপমানের প্রতিশোধ নেয়া যায়! তার কাছে এই মুহুর্তে টাকা-পয়সার চেয়ে রমাদি’কে উদ্ধার করা বা ওয়ার্ড কমিশনারকে শাস্তি দেয়াটা বেশী গুরুত্বপূর্ণ বলে মনেহয়। রমাদি’কে অবশ্য ওরা অপহরণ ঘটনার পরেরদিন রাতেই ফিরিয়ে দিয়ে যায়। কিন্তু তার সম্ভ্রমহানির ঘটনাটা নসুর রাগকে প্রশমিত করতে পারেনা। বস্তির যে ছেলেগুলো হাল্কা-পাতলা খুন-খারাবির সাথে জড়িত তাদের সাথে নসু কয়েকদিন চলাফেরা করে। গল্পে গল্পে ওদের কাছ থেকে অপরাধ জগতের অনেক কিছু জেনে নিজেকে তৈরি করে। তারপর একদিন জগদীশকে বলে,


- ডিব্বা আছেনি! কোই রাখছোস?  

- আছে, চিন্তা করিস না।


জগদীশ আর নসুর মধ্যে সেদিন কথাবার্তা আর বেশি এগোয় না। ডাণ্ডির প্যাকেটে কয়েকবার নাক ডুবিয়ে যে যার ঘরে ফিরে যায়।


১১       

ঘটনাস্থল পল্লবী এক্সটেনশন।  

ওয়ার্ড কমিশনারের দোতলা বাংলো, কোন একদিন দুপুর বেলা।


বেশ কিছুদিন ধরে ফলো করার পর নসু বুঝতে পারে দুপুরে খাওয়ার পর দোতলার বেডরুমে ঘন্টাখানেক ঘুমানো ওয়ার্ড কমিশনারের নিয়মিত অভ্যাস। এসি চলে, সেজন্য বেডরুমের দরজাটা তখন ভেজান থাকে এবং এসময় তাকে বিরক্ত করা নিষেধ। তাকে অনেক রাত অবধি জেগে দলের ও এলাকার জন্য কাজ করতে হয়। বাড়িতে লোকজন বলতে তার স্ত্রী, দু’টো বাচ্চা আর কয়েকজন কাজের লোক। এদের সামলাতে কোন সমস্যা হবেনা। তবে ঝামেলা বাঁধাতে পারে নিচতলায় লোহার গেট পাহাড়ারত দলের ক্যাডার দু'জন। তবে তাদেরকে ফাঁকি দেয়ার ফন্দীও সে এঁটে ফেলে।


ওয়ার্ড কমিশনারকে ফলো করতে গিয়ে দুপুরে ঘুমানোর সময়টায় ওনার স্ত্রীর কাজের লোক বা বাচ্চাদের নিয়ে পাশের ঘরে কেবল টিভিতে স্টার জলসার সিরিয়াল দেখা অভ্যাসের কথা সে জেনে গেছে। ঘটনার দিন সকালে সে প্রথমে বিশেষ কৌশলে ওয়ার্ড কমিশনারের বাসার কেবল টিভির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে, তারপর নিজের বেশভূষা পরিবর্তন করে কেবল অপারেটর পরিচয়ে ওয়ার্ড কমিশনারের বাসায় যায়। যথারীতি গেটে দাঁড়ান একজন ক্যাডার তাকে থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে, অন্যজন সম্ভবত বাথরুম বা অন্যকোন প্রয়োজনে আশেপাশে কোথাও গিয়েছে।


- খাঁড়াও। কই যাইতাছো ?   

- কমিশনার সায়েবের বাসা, কেবল লাইন চেক করন লাগবো।   

- কেডায় কইছে! লাগবো না, ভাগ।  

- আগে দ্যাখেন গিয়া, কেউরে জিগান। তারপর যামু কিনা ভাবুমনে। কাইল রাইত থাইক্যা এই মহল্লার অনেক বাসায় লাইন আছিলো না।


ক্যাডার ছেলেটা ভ্রু কুচকে তার দিকে তাকায়। এরকম কোন সমস্যা থাকলে তাদেরই আগে জানার কথা এবং এসব সমস্যার সমাধান তাদেরই করার কথা।


- তুই কই থাইক্যা খবর পাইছস! 

- ঘণ্টা খানেক আগে, এক ব্যাটায় কইলো। বুড়া মতন। ঠিক আছে, সমস্যা নাই তো জাইগা।


কথাটা বলে নসু চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতে উদ্যত হলে তাকে থামায়। আসলে সে নিজেও এবার খানিকটা বিভ্রান্ত বোধ করে।


- খাড়া। দেইখ্যা আসি।


ছেলেটা ধুপধাপ সিঁড়ি ভেঙ্গে উপরে যায় এবং মিনিট তিনেক পরে ফিরে আসে।


- যা। নেতা ঘুমাইতাছে। ওনার ঘুম য্যান না ভাঙ্গে।  

- ঠিক আছে, বেশি সময় লাগবো না।      

- এই হালার পুত, খাড়া। ব্যাগটা খোল, ভিতরে কি? 

- ধুর। যাইগা, আমি পারুম না। আপনারা অন্য কাউরে আইন্যা কাজ করাইয়েন।  

- যা। মাগার সময় বেশি নিবি না কইলাম।


নসু আর দেরি করেনা। সে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে চুপিসারে ওয়ার্ড কমিশনারের ঘরে ঢুকে পড়ে এবং দরজার লক এঁটে দেয়। উনি এসির আরামদায়ক পরিবেশে একদিকে কাত হয়ে   বেঘোরে ঘুমাচ্ছেন। তার পরনে সাদা লুঙ্গী, গায়ে সাদা হাফহাতা গেঞ্জি। একটা পা কোল বালিশের  ওপর উঠিয়ে দেয়া। নসু ঘরের ভিতরে ঢুকে প্রথমে দু’হাতে সার্জিক্যাল গ্লভস পড়ে নেয়। কোথাও যেন আঙ্গুলের ছাপ না পড়ে সেজন্য শুরু থেকেই সে সাবধানতা অবলম্বন করে। এই টেকনিকের কথা আবুইল্যার কাছ থেকে শোনা। এরপর ব্যাগ থেকে কাঁচের শিশিটা বের করে বেশ খানিকটা তরল জাতীয় পদার্থ ঢেলে হাতের রুমালটা ভিজিয়ে নেয়। এরপর পা টিপে টিপে ওয়ার্ড কমিশনারের দিকে এগিয়ে তার মুখে রুমালটা একদম শক্ত করে চেপে ধরে। মুখের ওপরে কারো হাতের শক্ত চাপ অনুভব করে ঘুম ভেঙ্গে গেলে তিনি হাতে ঝটকা মেরে উঠে বসতে চেষ্টা করেন কিন্তু ক্লোরোফর্মের প্রভাবে আবারো ঘুমের ঘোরে তলিয়ে যান। নসু বস্তির ওদের কাছ থেকেই জেনেছে এই জিনিসটা খুব কাজের, কিন্তু সহজে পাওয়া যায়না। নসু বহুত কষ্ট করে মিটফোর্ড এলাকার এক মেডিক্যাল স্টোরের সেলসম্যানকে পয়সা দিয়ে চোরাই পথে এই জিনিসটা সংগ্রহ করেছে।


একটু পর ওয়ার্ড কমিশনারের নাক ডাকার হালকা থেকে গভীর শব্দ শোনা যায়। নসু ব্যাগ থেকে কারেন্টের তারটা বের করে একপ্রান্ত ওনার হাতে ভালোভাবে পেঁচিয়ে দেয় এবং প্লাগটা বেড  সাইড টেবিলের পাশে মোবাইল ফোন চার্জ করার সকেটে ঢুকিয়ে দেয়। এরপরের কাজটা খুবই   সামান্য। সুইচ অন করে দিতেই ওনার শরীরটা দু’তিনবার ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে যায়। হার্ট অ্যাটাকের কারণে ঘুমের মাঝেই ওয়ার্ড কমিশনার চিরঘুমের দেশে চলে যান। নসু কারেন্টের তারসহ সবকিছু তাড়াতাড়ি গুছিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে কাজের লোকদের ডেকে টিভির কেবল লাইন সংযোগ পরীক্ষা করে। সব ঠিকঠাক আছে। সে নিচে নামতেই গেটের কাছে বসে থাকা ক্যাডার তাকে দাঁড় করায়, ইতিমধ্যে অন্যজনও ফিরে এসেছে।


- কীরে কাম শ্যাষ?   

- হুম। 

- মানে!  

- উপরে সমস্যা নাই। নিচের লাইন চেক করন লাগবো। আপনেরা একজন আইবেননি! 

- খাড়া।


ওদের একজন দোতলায় ওয়ার্ড কমিশনারের রুমে গিয়ে উঁকি দেয়, কমিশনার সাহেব এখনো ডান দিকে কাৎ হয়ে ঘুমাচ্ছেন। সে নিচে নেমে আসে।


- বস অহনো ঘুমাইতাছে। তুই আয় আমার লগে।


নসু তাকে সাথে নিয়ে কেবল লাইনটার বাইরের সংযোগ ঠিক করে সার্ভিস চার্জ বুঝে নিয়ে চলে যায়। পরদিন সকালে পত্রিকার পাতায় খবর আসে, ওয়ার্ড কমিশনার নিজ বাসভবনে হার্ট অ্যাটাক করে মারা গেছেন। খবরের কাগজের দোকান থেকে একটা পত্রিকা কিনে জগদীশের হাতে দিয়ে নসু টিনের কৌটাটা বুঝে নেয়। দ্বিতীয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটিই যে কন্ট্রাক্ট কিলার হিসেবে নসুর হাতেখড়ি, তা চোখ বন্ধ করে বলে দেয়া যায়।


এরপর এরকম আরও কয়েকটা ক্লু-লেস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নসুর কর্ম কুশলতা তাকে অপরাধ জগতে একসময় বেশ পরিচিত করে তোলে। নসু মিয়া এখন হাসতে হাসতেই করোটিতে ফায়ার করতে কিংবা নির্দয় ভাবে কারো পেটে ছুড়ি চালাতে জানে। সে এখন এও জেনে গেছে কোথায় ফায়ার করলে মানুষ রক্তক্ষরণের কারণে ধীরে ধীরে মরে যায় কিংবা কোথায় ফায়ার করলে কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।


১২ 

ঘটনাস্থল কালসি।  

ফুল মিয়া হত্যাকাণ্ডের কয়েক বছর পরের কথা।


আজগরের সঙ্গে নসু তার পুরনো হিসাবটা চুকিয়ে ছিলো বেশ নিষ্ঠুর ভাবে।


মিরপুর ১২-ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট সংযোগ সড়কটা এখন যেরকম ঝকঝকে-তকতকে তখন কিন্তু এরকম ছিল না। দোকান-বাড়িঘর বলতে কিছুই নেই। চারদিকে উঁচুনিচু ঝোপঝাড় আর  জলাভূমি। ঠিকাদারদের দানবাকৃতির ট্রাকগুলো সারা রাত ধরে জলাশয়ে বালি ফেলে মাটি ভরাটের কাজ করত। ঘুটঘুটে আঁধারের মাঝে ট্রাকের হেডলাইট কুয়াশা ভেদ করে ভৌতিক পরিবেশের সৃষ্টি করত। এমনি এক কৃষ্ণপক্ষের রাতে আজগরকে তার বাসা থেকে তুলে আনে নসু। এরপর দলের একজন সদ্য বালি ভরাট করা পথের পাশে একটা মাছের ঘেরের কাছে আজগরকে মাটিতে চেপে ধরে, আর অন্য আরেকজন তার মুখে বালি ভরে দেয়। একসময় আধাভেজা বালিতে আজগরের মুখ ভরে যায়। নিঃশ্বাস নেয়ার জন্য সে হাত-পা ছুঁড়তে চায়, কিন্তু পারেনা। নসুর ধারালো ছুড়ির ফলা আজগরের বুকের মাঝ বরাবর চলে যায় দক্ষ সার্জনের মত। আট ইঞ্চি দৈর্ঘের ছুড়ির আঘাতে রক্ত গড়িয়ে পড়ে অজস্র ধারায়। মানুষের ইতিহাসে নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডটি ঘটে তারপরই। নসুর আদেশে দলের একজন একটা অব্যবহৃত এক্সক্যাভেটর থেকে ব্যাটারি খুলে এনে এসিড ঢেলে দেয় হা মেলে থাকা বুকের পাঁজরে। পরদিন দুপুরে খোঁজ পাওয়ার আগে পর্যন্ত ডেডবডিটা সেভাবেই ঝোপের পাশে পড়ে থাকে। পিঁপড়ের দল অবশ্য তার আগেই খোঁজ পেয়ে যায়। সারা শরীর, চোখের কোটর-নাকের ফুটো ধরে দাপিয়ে বেড়ায় তারা। পুডিং এর মত জমে থাকা রক্ত মাড়িয়ে চলে। কিসের অপেক্ষায় একটা কুকুর আর কিছু কাক এসে সকাল না হতেই ভেড়ে সেখানে।


বিকাল নাগাদ কিভাবে যেন আজগর বাহিনীর লোকেরা জেনে যায় এটা পিচ্চি নসুর কাজ। চোখে মুখে প্রচন্ড জিঘাংসা নিয়ে তাকে ধরতে বাহিনীর প্রায় সবাই বেরিয়ে পড়ে কিন্তু ততক্ষণে নসু পগার পার। সে হাওয়ার মত কোথায় যেন মিলিয়ে যায়! কেউ তার খোঁজ দিতে পারেনা।  মিরপুরের আন্ডারওয়ার্ল্ডে সেই থেকে তার নাম বদলে হয়ে গেল পাংখা নসু। পল্লবী থানায় ক্রিমিনাল ফাইলে রেকর্ড করা হয়, নসু মিয়া ওরফে পিচ্চি নসু ওরফে পাংখা নসু, পিতা # মৃত ফুল মিয়া, মা # জুলেখা বেওয়া, গ্রাম # রূপনগর বস্তি, স্থায়ী ঠিকানা অজ্ঞাত। দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত র‍্যাপিড  একশন ব্যাটালিয়নে তার সম্পর্কে সব তথ্য আপডেট করে নতুন করে প্রোফাইল বানানো হয়। অপরাধীদের বিশেষ একটা লিস্টে তার নাম তালিকাভুক্ত হয়।


আজগরের মৃত্যুতে তার দলের নেতৃত্ব চলে আসে শুটার বাবুর হাতে। নসু অজ্ঞাতবাস থেকে ফিরে আসে কয়েক বছরখানেক পর। বলতে গেলে ল্যাংড়া মনিরের চেষ্টায় শুটার বাবুর সাথে তার বিরোধ মিটে যাওয়ার পরপরই। অবশ্য বিরোধ না মিটিয়েও তাদের উপায় ছিল না। এলাকার ডন, কালাবাবুর বেশ প্রেশার ছিল। মিরপুরের অপরাধ জগতে সবাই জানে ল্যাংড়া মনির কালা বাবুর কাছের লোক।



পোস্ট ভিউঃ 25

আপনার মন্তব্য লিখুন

আমার শব্দযাত্রায় সঙ্গী হতে