পাভেলের নানাবাড়ি: পার্ট-৪

উপন্যাস পাভেলের নানাবাড়ি
পাভেলের নানাবাড়ি: পার্ট-৪

পাভেল এর আগে দিনের বেলায় অনেকবার রেশাদ মামার বাসায় বেড়াতে গেলেও রাতের আঁধারে এবারই প্রথম যাচ্ছে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে চারদিকে কোন কিছুই ঠাহর করা যায়না। গাছপালা-ঝোপ-ঝাড়গুলো দেখতে ক্যামন জমাট বাঁধা অন্ধকারের মত লাগে। দোকান পাটের আলো মিলিয়ে যেতেই আরেক অদ্ভুত দৃশ্য তার চোখে পড়ে। হাজার হাজার জোনাকি পোকা কালো রাজপথ আলো করে আছে। মামার সাইকেলের সামনে একটা হেড লাইট বসানো আছে যেটা চাকার সাথে লাগানো ছোট ডায়নামো থেকে বিদ্যুত পায়। মামাকে বলতে গেলে হেড লাইটটা জ্বালাতেই হয়না। জোনাকির আলোয় পথ চিনে তারা বিশাল তেঁতুলগাছটার নীচে মামাবাড়ির বাইরের আঙিনায় এসে দাঁড়ায়। এরপর টিনের সদর দরজা ঠেলে বাড়ীর ভিতরে ঢুকতেই মামাতো ভাই লিটনের চীৎকার করে কবিতা পড়তে শোনা যায়। লিটন সম্ভবত দরজা খোলার শব্দ শুনে টের পেয়েছে তাই পাভেল মামার সঙ্গে ভিতরে ঢোকা মাত্রই তার চীৎকার করে পড়ার ভলিউমটা বেড়ে যায়। মামা ধমক দিয়ে লিটনকে সদর দরজার খিড়কি খুলে দিতে বলেন। লিটন হ্যারিকেন হাতে খিড়কি দরজা খুলে একপাশে সরে দাঁড়ায়। এরপর মামার পিছুপিছু তাকেও বাড়িতে ঢুকতে দেখে সে অবাক হয় কিন্তু মামার ভয়ে মুখে কিছু বলেনা। লিটন এবং তার ছোট বোন কণা, দুজনই তাদের বাবাকে ভীষণ ভয় পায়। মামা ভাগ্নেকে লিটনের সঙ্গে ঘরে যেতে ইশারা করে তিনি মাছ নিয়ে রান্না ঘরের দিকে যান।

সে রাতে পাভেল এবং লিটন অনেক রাত অবধি ফিসফিস করে গল্প করে। তারা পরদিন সকালে নাস্তা সেরে ঘুরিয়া বিলে যাওয়ার প্ল্যান আঁটে, ঝাঁপি জাল দিয়ে মাছ মারবে। মাছ ধরার উত্তেজনায় পাভেলের সহজে ঘুম আসতে না চাইলেও একসময় সে ঘুমিয়ে পড়ে। পরদিন সকালে ডিম দিয়ে ভাতভাজা আর কাউনের পায়েস খেয়ে তারা মাছধরতে বের হয়। কণাও তাদের সঙ্গে যাবার বায়না ধরে, ইচ্ছে না থাকলেও তাকে সঙ্গে নিতে হয়। লিটন আর কণা পিঠেপিঠি ভাইবোন। মামী দুপুরের আগেই ঘরে ফিরতে বলেন। লিটন ঘাড় কাত করে তাতে সায় দিলেও তারা ভাল করেই জানে ঘরে ফিরতে তাদের অনেক দেরি হবে। ঘুরিয়া বিলে যাবার ভাল রাস্তাটা একটু আঁকাবাঁকা তাই অনেকটা পথ হাঁটতে হয়। তারা শর্টকাট মেঠো রাস্তাটা দিয়ে যাবার প্ল্যান করে। তাতে অবশ্য সময় অনেক বাঁচলেও রাস্তার সিকি অংশ একটা জঙ্গলের ভিতর দিয়ে গেছে, বাকী অংশটুকু উঁচু-নীচু জমির আল কিংবা সরু পথ। শুধু জঙ্গলের অংশটুকু পেরোতেই যা ভয়! কিন্তু ডানপিটে স্বভাবের পাভেল তাতে গা করেনা। তিন ভাইবোন কখনো জমির আল আবার কখনো লাউএর মাচার ভেতর দিয়ে হাঁটতে থাকে। একটা পরিত্যক্ত ইটের ভাটার পরেই জঙ্গল শুরু হয়। কে জানে কে কবে এখানে ইটের ভাটা তৈরি করেছিল। ভাঙ্গা চুলা আর ইটের টুকরা এখানে সেখানে পড়ে আছে। জঙ্গলটা শুরুই হয়েছে কাঁঠাল গাছের সারি দিয়ে। একদিন সে আর রিপন মামা পশ্চিমের ঘরে নানীর স্টোর থেকে একটা কাঁঠাল সরিয়ে হাসপাতালের ছাদে বসে খেয়েছিল। সরু পথের দু’পাশেই লাল-সাদা লজ্জাবতীর ঝাঁর আর ভাঁটফুল গাছের সারি, ভাঁটফুল গাছে থোকায় থোকায় সাদা ফুল ফুটেছে। একটা সবুজ রঙের সুইচরা পাখি ভাঁটফুলের মধু নাকি সেখানে থাকা কালো পিঁপড়েগুলোকে ঠোঁটের ডগায় নিয়ে খাচ্ছে তা ঠিক বোঝা যায়না। হালকা বাতাসের সঙ্গে কি সুন্দর মিষ্টি একটা ঘ্রাণ নাকে এসে লাগে। সম্ভবত জঙ্গলের মধ্যে কোথাও স্বর্ণচাঁপা ফুল ফুটেছে। পথের একপাশে বিন্না ঘাসের ছোট একটা ঝোপ, সেটাকে ঘিরে কি সুন্দর গাঢ় বেগুনী রঙের কলমি লতার ফুল ফুটে আছে। কণা কলমি ফুল এনে দেয়ার জন্য আবদার করে, পাভেল বোনের বায়না মেটাতে কলমি ফুল ছিঁড়তে গেলে একটা সাপের মুখোমুখি হয়। গ্রামাঞ্চলে এটাকে ডারাইস সাপ বলে, পাভেল জানেনা শহরের লোক কি নামে সাপটাকে ডাকে। সাপটা পাভেলের দিকে একহাত ফণা তুলে বসে আছে। তারা থমকে দাড়ায় কিন্তু এরপরে কি করবে বুঝতে পারে না। কণা ভয়ে কাঁদতে শুরু করে। লিটন ওকে ধমক দিয়ে চুপ করতে বলে একটা লাঠি খুঁজতে উদ্যত হয় তবে পাভেল তাকে নড়াচড়া করতে নিষেধ করে। সাপটা ফণা তুলে ওভাবে কিছুক্ষণ ফোঁস ফোঁস করে একসময় ফণা নামিয়ে চলে যায়। কেমন সর্‌সর্‌ ধরণের একটা শব্দ হয়, এরপর চারদিকে হালকা ঝিঁঝিঁ পোকা কিংবা নাম না জানা পাখির অস্পষ্ট ডাক এবং আবারো চুপচাপ নির্জনতা। পাভেল যখন ক্লাস ফাইভে পড়ত সেসময়ের একটা ঘটনা মনেপরে। ঘটনার দিন টিফিন পিরিয়ডে ক্লাসের সব কটা মেয়ে স্কুলের মাঠে গোল হয়ে বসে তেঁতুল চালতার আচার-ঝাল মুড়ি এসব খাওয়ায় ব্যস্ত। আসলে যতটা না খাওয়া তার চেয়ে বেশী হৈ হল্লা হচ্ছিল সেখানে। পাভেল তাদের কোলাহল থামাতে কোথা থেকে একটা মরা সাপ লাঠির আগায় তুলে এনে মেয়েদের ঠিক মাঝখানে ফেলে দেয়। মেয়েরা সঙ্গে সঙ্গে ভয়ে আর্ত চীৎকারে দিগ্বিদিকে দৌরে পালায়। ঘটনার পরে হেড স্যারের অফিসে তার ডাক পড়ে, পাভেলকে সেখানে কান ধরে কয়েকবার ওঠা বসা করতে হয়েছে অবশ্য। জঙ্গলের বড় একহারা গুঁটি জাম-মেহগনি–শিরীষ গাছগুলোর সঙ্গে সাপের মত প্যাঁচানো গুলঞ্চ লতায় হলদে-সাদা ফুল ফুটে আছে। রংপুরে পাভেলরা যে পাড়ায় থাকে সেখানে আলমগীর দারোগার বাড়ির পিছনে একটা বেশ ঘন জঙ্গল আর বাঁশ ঝাঁরে এরকম অসংখ্য গুলঞ্চ লতা ঝুলে আছে। পাভেলের বয়সী ছেলেরা ছুটির দিনে সকালে গুলঞ্চ লতার গোরা কেটে দিয়ে ঝোলাঝুলি করে আর টারজানের মত করে হাঁক দেয়। বেশ মজার খেলা, খেলায় তারা কেউ টারজান আবার কেউ কাঁঠাল পাতার পোশাক বানিয়ে জংলী সর্দার সাজে। দারোগা সাহেব বাড়িতে থাকলে অবশ্য মজার এই খেলাটা হয়না। তখন পাড়ার সব ছেলেমেয়েরা ক্লাবের মাঠে দারিয়াবান্দা, বৌ-ছি, গোল্লাছুট এসব খেলে। তবে সবচেয়ে বেশী উত্তেজনা বা আনন্দ হয় ঘুরি ওড়ানোর দিনে। ফাল্গুন-চৈত্র মাসের চড়া দিনগুলোয় যখন বাতাসের প্রবল বেগ তখনি পাড়ায় পাড়ায় ঘুরি ওড়ানোর ধুম পড়ে যায়। মোস্তাক ভাইয়ের দোকান থেকে ঘুরি-সুতা কেনা, বাঁশের লাটাই বানানো, সুতায় মাঞ্জা দেয়া এসব নিয়ে তখন দারুণ ব্যস্ততার দিন কাটে। এরপর কারো ঘুরি ভকেট্টা হয়ে গেলে তো কথাই নেই, লাঠির সঙ্গে বড়ই গাছের ডাল বেঁধে ঝান্ডা বানিয়ে সেই ঘুরির পিছু পিছু দৌড়, ভাবতেই পাভেলের বেশ শিহরণ লাগে, উত্তেজনায় গায়ের লোম কাঁটা দেয়। সে ঠিক করে এবার রংপুরে ফিরে ভালো মাঞ্জা বানানোর জন্য সে নানাবাড়ি থেকে কিছু গাবের ছাল নিয়ে যাবে। আছিরুদ্দি তাকে শিখিয়েছে কিভাবে গাবের ছাল চুলাতে জ্বাল দিয়ে তার সঙ্গে কাঁচের গুঁড়া মিশিয়ে মাঞ্জা বানাতে হয়। এই জ্ঞানটা দেয়ার জন্য আছিরুদ্দির পুর্বেকার সব অপরাধ ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। তবে মা তাকে আগুনের পাশে যেতে দিবে কিনা সে নিশ্চিত না। নানাবাড়িতে আসার একমাস আগের ঘটনা। পাভেল বড় বালতিতে পানি ভরে একটা প্লাস্টিকের ব্যাগে আগুন দেয়, এরপর সেটাকে পানির ওপর ধরলে প্লাস্টিক গলে পানিতে টুপটাপ করে পড়তে থাকে। পানির ওপর ওভাবে আগুন ভাসতে দেখে তার বেশ মজা হয়। এরপর একবার হঠাৎ কি কারণে তার হাতটা নড়ে গেলে প্লাস্টিকের জ্বলন্ত ফোটা পানির পরিবর্তে তার ডান পায়ের উরুতে গিয়ে পড়ে। পড়নে হাফ প্যান্ট থাকায় পাভেলের উরুতে গোলাকার একটা ক্ষতের সৃষ্টি হয়। ইশ্‌! কি যে কষ্টের দিন ছিল সে সময়টা! শরীরের ত্বকে ফোস্কা পড়ার যন্ত্রণা সে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। এছাড়াও একবার সে পাটকাঠির গোছায় আগুন নিয়ে দাদুর দাড়িতে লাগিয়েছিল। দাদু তখন অজু করছিলেন বলে সঙ্গে সঙ্গে পানি দিয়ে আগুন নিভাতে পেরেছিলেন। এরপর থেকে মা তাকে চুলা কিংবা আগুনের আশেপাশে ঘেষতে দেন না। পাভেল মা’র কাছ থেকেই গাবের ছাল জ্বাল দিয়ে নেবে বলে ঠিক করে। অনেকটা পথ হাঁটার পরে তারা জঙ্গলের মাঝেই একটা বড় ফাঁকা জায়গায় আসে। সেখানে একদল ছেলেমেয়ে গাছের ছায়ায় দৌড়াদৌড়ি করছে, তারা সম্ভবত পাশের গ্রামেই থাকে। জঙ্গলের একদম শেষে পাভেলের বয়সী কয়েকটা মেয়ে আমগাছের নিচু ডালের সঙ্গে কাঠের পিড়ি দড়ি দিয়ে বেঁধে দোলনা বানিয়ে দুলছে আর হাসতে হাসতে ছড়া কাটছে, 

             আইলরে দামান বুঝি 

             আসমানেরও তারা, 

             বিছাইয়া বিছাইয়া গো দাও 

             শাইল ধানের নাড়া। 

             দামান বও দামান বও। 

             আওরে দামান কওরে কথা 

             খাওরে বাটার পান, 

             যাইবার যদি চাওরে দামান 

             কাইটা রাখুম কান। 

             দামান বও দামান বও।

ছড়া শেষ হতেই সবগুলো মেয়ে একসঙ্গে হেসে ওঠে। পাভেল বুঝতে পারে তাকে উদ্দেশ্য করেই   মেয়েগুলো ছড়া কাটছে, দামান মানের অর্থ সে জানে। কণা মেয়েগুলোর উপর রাগ করে কি যেন বলতে যায় কিন্তু লিটন তাকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দেয়। পাভেল অবশ্য তাদের দুষ্টামিতে মাথা না ঘামিয়ে জোর কদমে হাঁটতে থাকে। কণা তার ভাইকে এভাবে টিটকারি কাটার কারণ বুঝতে পারেনা। পাভেলের মিতুর কথা মনেপরে। মিতুরা রংপুরে তাদের পাশের বাড়িতে থাকে। তার অনেক দুষ্টামির নিত্য সঙ্গী সে। সেটা টারজান খেলার সময়ে জেন কিংবা রবিনহুড খেলার সময়ে মেরিওন সাজা যাই হোকনা কেন। এছাড়া একসঙ্গে লুকোচুরি, বৌ-ছি খেলা কিংবা বোশেখ মাসের ঝড়ে আম কুড়ানো মিলিয়ে কত স্মৃতি তার সঙ্গে! হঠাৎ এভাবে মিতুর কথা মনেপরায় পাভেল বেশ অবাক হয়। এটা অবশ্য ঠিক যে মিতুকে তার ভাললাগে, সে রায়গঞ্জে নেই বলে কখনো কখনো তার জন্য খারাপও লাগে কিন্তু এই খারাপ লাগার অন্য কোন অর্থ থাকলেও সেটা তারা জানা নাই। যাহোক কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা ঘুরিয়া বিলের পারে পৌঁছে। বিলটাকে অনেকে ঘুরিয়া খালও বলে থাকে। জলাভূমিটা আসলে একটা প্যাঁচানো সরু খালের মত। ঝাঁপি জাল দিয়ে তারা বেশ কিছু কৈ এর সঙ্গে মলা, ঢেলা, খলিসা, পুঁটি, ট্যাংরা এসব মাছ ধরে। বিলের মাঝখানে কচুরিপানার মাঝে বেশ কয়েকটা জল পিঁপিঁ আর ডাহুক দেখে কণা ঢিল ছুড়ে মারে। কিন্তু ওগুলো তার হাতের নাগালের বাইরেই রয়ে যায়। সারা শরীরে কাদা মেখে সে আর লিটন ঘরে ফেরার পথ ধরে, কণার গায়ে অবশ্য কাদামাটি লাগেনি। সে বিলের পারে বড়ইগাছের নীচে খইল ভর্তি মাছ পাহারায় ছিল। পাভেল ভাবে কণা সঙ্গে আসায় তাদের আসলে উপকারই হয়েছে।

ফেরার সময়ে তারা ভাল রাস্তা দিয়ে ঘরে ফেরে। পাভেল আসলে দ্বিতীয়বার ঐ জংলী মেয়েগুলোর খপ্পরে পরতে চায়নি। ......... কাইটা রাখুম কান......কি সাংঘাতিক কথা রে বাবা! সুর্যটা ভালভাবে ঢলে পরার আগেই তারা বাসায় ফিরে রিপন মামাকে দেখতে পায়, রোমেলও এসেছে মামার সঙ্গে। এরপর গতদিন সকালে সফুরা বেগমের নাক কাটা আর বন্দী অবস্থা থেকে পালানোর ঘটনা নিয়ে তারা হাসাহাসি করতে থাকে। মামীও তাদের সঙ্গে হাসি ঠাট্টায় যোগ দেন। গোসল সেরে ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতের সঙ্গে ছোট মাছের চচ্চড়ি খেতে কিযে দারুণ লাগে! মামী রাঁধেনও দারুণ। তিনি গতকাল রাতে দামালগ্রাম থেকে কিনে আনা রুইমাছের মুড়িঘণ্ট পাভেলের প্লেটে তুলে দেন। রেশাদ মামার বাসায় ফিরতে রাত হবে বলে তারা মামার জন্য অপেক্ষা না করে খাওয়ার জন্য শোবার ঘরের বারান্দায় পাদুর পেতে গোল হয়ে বসে। সবার খাওয়া শেষ হলে তারা রিপন মামার সঙ্গে সাইকেলে নানাবাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। রোমেলকে সামনের রডে বসিয়ে দিয়ে পাভেল সাইকেলের পিছনে বসে। কিছুদূর এগোনোর পরে রিপনমামা একটা বাছুরকে পাশ কাটাতে যেয়ে সাইকেলের ব্যালান্স হারিয়ে সবাইকে মাটিতে ফেলে হাসতে থাকেন। রোমেল সামান্য ব্যথা পেয়ে কাঁদতে থাকে, পাভেল অবশ্য শরীরের কোথাও ব্যথা পায়নি। গতবার রোজার ছুটিতে প্রায় এরকম একটা ঘটনায় পাভেলের হাত ভেঙ্গে যাওয়ায় টানা একমাস মোটা ব্যান্ডেজ ঝুলিয়ে থাকতে হয়েছিল। সেবারের ঘটনা অনেকটা এরকম ছিল, রোজার ছুটিতে একদিন সকালে পাভেল তার বন্ধু রোমিওর সঙ্গে আরেক ক্লাসমেট লেনিনের বাসায় অংক কষতে গিয়েছিল। অংক কষা শেষ হলে লেনিন ওর সাইকেলটা সঙ্গে নিলে পাভেল রোমিওর সাইকেলের রডে বসে, এরপর তারা একসঙ্গে ঘুরতে বের হয়। কিছুদূর যাবার পরে তারা একটা বাসার সামনে আসতেই লেনিন ফিসফিস করে বলে, 

- দোস্ত বারান্দায় তাকা, শারমিন বারান্দার রেলিং এ বসে আছে। 

শারমিন তাদের ক্লাসেই পড়ে। রোমিও ঘাড় ফিরিয়ে শারমিনের দিকে তাকাতে যেয়ে সাইকেলের ব্যালান্স হারালে সে এবং পাভেল রাস্তায় পড়ে যায়। কিন্তু লেনিন তখনও শারমিনের দিকে তাকিয়ে আছে, ফলে কখন যে সে পাভেলের ডান হাতের ওপর সাইকেলের চাকা চালিয়ে দেয় বুঝতেও পারেনা। এরফলে যা হবার তাই হল, রাতে বাসায় ফিরলে পাভেল হাতে প্রচন্ড ব্যথা অনুভব করে। পরদিন সকালে বাবার সঙ্গে ডাক্তারের কাছে গেলে এক্স-রে করে দেখা যায় যে ডান হাতের হাড় পুরোপুরি না ভাঙলেও ধনুকের মত বাঁকা হয়ে গেছে। ফলে টানা এক মাস তাকে ব্যান্ডেজ হাতে ঘুরতে হয়েছে। দুষ্টামিহীন একঘেয়ে ও বিরক্তিকর একটা মাস! পাভেল ভাবতেই অবাক হয়, কি করে যে সে সময়টা পার করেছিল। পাভেল শার্টের কোণা দিয়ে রোমেলের চোখের পানি মুছে দেয়, এরপর দু’ভাই হাত ধরে হাঁটতে শুরু করে। রিপন মামাও মাটি থেকে উঠে জামাকাপড়ের ধূলা ঝেড়ে সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরে তাদের পাশে পাশে হাঁটতে থাকে। কিছুদূর এগোনোর পরে নানাজানের দোকান চোখে পড়ে। পাভেলের বাসায় ফিরতে ভয় করে কিন্তু ফিরতে তো হবেই। সে জানেনা মা তার জন্য বাসায় কি ধরণের শাস্তি নিয়ে অপেক্ষা করছেন।



পোস্ট ভিউঃ 23

আপনার মন্তব্য লিখুন

আমার শব্দযাত্রায় সঙ্গী হতে