
১
‘ও আলোর পথযাত্রী, এ যে রাত্রি
এখানে থেমোনা,
এ বালুর চরে আশার তরণী তোমার যেন বেঁধোনা।’
১৫ জুলাই ২০২৪ তারিখে অনেক আশা নিয়ে সলিল চৌধুরী’র গানের লাইন ফেসবুকের টাইমলাইনে লিখেছিলাম। তারপর ছাত্রলীগের তাণ্ডব, পুলিশি নির্যাতন আর ছাত্রীদের ওপরে হামলার ছবি পোষ্ট করে ১৭ জুলাই ২০২৪ তারিখে বৈষম্যমূলক কোটা ব্যবস্থা সংস্কার নিয়ে আমার অবস্থান পরিষ্কার করলাম। সব পোষ্ট টাইমলাইনে রেখে দিয়েছি আরেক ফাগুনে দেখবো বলে অথচ তখনও জানতাম না সকল আশা পূর্ণকরে ০৮ আগস্ট ২০২৪ তারিখে একদিন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হবে। সর্বজন শ্রদ্ধেও প্রফেসর ইউনূস স্যারের নেতৃত্বে ১৭জনের এই সরকার কেমন হলো সে প্রসঙ্গে যাবো না তবে অনেকের মতো আমার মনেও একটাই প্রশ্ন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ কতদিন? আজকে সংবাদ সম্মেলনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান একটু উষ্মা প্রকাশ করে বললেন,‘এখনই মেয়াদ মেয়াদ করে অস্থির হওয়ার কিছু নাই।’ কোটা বৈষম্যবিরোধী এই ছাত্র আন্দোলন শুরুতে চাকুরীর কোটা সংস্কারের আন্দোলন হলেও পরে কিন্তু সরকার পতনের আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। কোটা সংস্কার আন্দোলন অরাজনৈতিক হলেও সরকার পতনের আন্দোলন রাজনৈতিক। আন্দোলনের এই পর্যায়ে দেশের সব শ্রেণী-পেশার লোকজন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীরাও যোগ দিয়েছেন। কওমী মাদ্রাসাগুলো সুবিধাবাদীদের মত শুরুতে আন্দোলন থেকে দূরে থাকলেও লাভের গুড়ে কামড় বসাতে শেষের দিকে এসে যোগ দিয়েছে। একটা আন্দোলন যখন গণ-মানুষের আন্দোলনে পরিণত হয় তখন এরকম প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক। বাংলাদেশে এনজিওদের ভূমিকা আমাদের জানা। এখানে মানবাধিকারকর্মী আদিলুর রহমান খান সম্পর্কে আমরা জানি, ডা: পিনাকী আজ কয়েকজনের বিষয়ে বললেন, বাকীদের বিষয়েও জানা হবে।
রাশিয়ার ফরেন মিনিস্ট্রির মুখপাত্র মারিয়া যাখারোভা এই ছাত্র আন্দোলন, যা পরে সরকার পতনের আন্দোলনের রূপ নেয় তার পিছনে পাশ্চাত্যের ডিপ্লোম্যাটিক মিশন, বিশেষকরে বাংলাদেশে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের ইন্ধন আছে বলে জানিয়েছেন। এছাড়াও হাওয়া থেকে জানা যায় যে, মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্রথমে বিএনপিকে দিয়ে কয়েকবার আন্দোলনের প্রচেষ্টা চালালেও তাদের নেতৃত্বের একটা অংশ সরকার ও ভারতের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা পায় এবং আন্দোলনের রাজপথে রক্ত দিতে ভয় পায় বলে তা সফল হয়নি। ০৭ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত টুইট করেছিলেন ‘গনতন্ত্র পেতে হলে রক্ত দিতে হয়।’ ২৮শে অক্টোবর ২০২৩ তারিখের মিটিং-এর পর থেকে বিএনপি’র উপরে নির্যাতন অনেক বেড়ে যায় কিন্তু সেদিনের মিটিং-এ জামাত-শিবিরের ভূমিকা রহস্যজনক ছিল। নির্বাচনের আগে ও পরে বিএনপি’র নেতাকর্মীদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ জেলের ভিতরে আছেন, যারা বাইরে তারাও লুকিয়ে কিংবা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তাই এবারের আন্দোলনে জামাত-শিবির ভালোভাবে সক্রিয় ছিল এবং এই আন্দোলনে সেনাবাহিনী বাধা দিলে কি হতে পারে সে সম্পর্কে তাদেরকে ক্লিয়ার ধারণা দেয়া হয়। এজন্য একটা পর্যায়ের পর সেনাবাহিনী হাত গুটিয়ে নেয়। জামাতের পক্ষে মার্কিন সরকারের ভূমিকার কথা জানা থাকায় বিগত সরকার জামাতে ইসলামকে নিষিদ্ধ করলেও সংবাদ সম্মেলনে সেনাপ্রধান তাদেরকেই প্রথমে আলোচনার জন্য ডাকেন। ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের পর মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বদলি আদেশ জারী হলেও তিনি নির্বাচন পরবর্তী কয়েকমাস ঢাকায় অবস্থান করে প্ল্যান চূড়ান্ত করেন এবং সহিংস আন্দোলন শুরু হলে বাংলাদেশ থেকে বিদায় নেন। রাশিয়ার ইন্ধন অভিযোগ যদি সত্যি হয় তাহলে বাংলাদেশে মার্কিন সরকারের এইমুহুর্তে যেসব এজেন্ডা রয়েছে তা বাস্তবায়ন করতে কতদিন লাগতে পারে তা একটা ভাবনার বিষয় বৈকি। তাদের সব চাহিদা যদি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকেই পূরণ করতে হয় তাহলে কয়েক বছর সময় দরকার হতে পারে। এত দীর্ঘমেয়াদে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে রাজনৈতিক দলগুলো দেখতে চাইবে কীনা সেবিষয়ে সন্দেহ আছে। তারা ৩ মাস থেকে ৬ মাস কিংবা সর্বোচ্চ এক বছর অপেক্ষা করতে পারে, তারপর শুরু হবে রাজপথের আন্দোলন। সেই আন্দোলনে বিএনপি’র পাশাপাশি যদি আওয়ামী লীগও যোগ দেয় তাতে অবাক হবার কিছু নেই। মাঠের রাজনীতিতে রাজনৈতিক দলগুলো যতোটা পরিপক্ক, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে নির্বাচিতরা তাতে ততোটাই অনভিজ্ঞ। উপদেষ্টারা স্বস্ব ক্ষেত্রে একেকজন আলোকিত মানুষ, উজ্জ্বল নক্ষত্র এ বিষয়ে সন্দেহ নাই। কিন্তু শিক্ষিত জনগোষ্ঠী কিংবা নাগরিক সমাজ তাদেরকে ভালো ভাবে চিনলেও শুধুমাত্র তারাই কিন্তু বাংলাদেশ নয়। প্রান্তিক পর্যায়ের কিংবা গ্রামাঞ্চলের মানুষ এক প্রফেসর ইউনূস ছাড়া অন্যদেরকে কতোটা চিনেন সে বিষয়ে সন্দেহ আছে! শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর লোকজন তাদের বিভিন্ন প্রয়োজনে প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের কাছে যাবার সুযোগ পেলেও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষেরা কিন্তু বিপদে-আপদে বা যে কোন সমস্যায় চিনেন পাশে থাকা মাতব্বর- মেম্বার- চেয়ারম্যান- ওয়ার্ড কমিশনারদেরকে। এনারা সবাই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।
২
এবারের আন্দোলন দানাবাঁধে বৈষম্যমূলক কোটা সংস্কারের দাবী থেকে এবং তা মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট কেন্দ্রিক। প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং তারপর চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে। এই পর্বে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন, আদালতের রায়কেন্দ্রিক কারসাজি, তেলবাজ সাংবাদিক সমাজের প্রতিনিধি রূপা ফারজানা ও প্রভাষ আমিনের উদ্দেশ্যমূলক প্রশ্নের প্রেক্ষিতে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর অতিকথন সমস্যাজাত ‘রাজাকারের নাতি’ তকমা দেয়া, ওবায়দুল কাদের, আনিসুল হক, আরাফাত, নওফেল, দীপুমনি, পলক প্রমুখের দম্ভ ও ছাত্রলীগের জোম্বিদের লেলিয়ে দেয়া, ছাত্রীনির্যাতন এইসব ঘটনা ঘটে। তবে এই আন্দোলন জোরালো হয় এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষন করে ১৬ জুলাই ২০২৪ তারিখে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদের মৃত্যু থেকে। এখানে আবু সাঈদ বঞ্চিত ছাত্র সমাজ এবং পুলিশের এসআই ইউনুস আলী একটা ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রতিনিধিত্ব করছে। এই আন্দোলনে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব কোথায়? তারা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং মধ্যবিত্ত নাগরিক সমাজের কোটা বৈষম্যকেন্দ্রিক এই আন্দোলনের বাইরেই ছিল, আন্দোলনের তাপ তাদেরকে স্পর্শ করেনি। আন্দোলনের একপর্যায়ে বিভিন্ন কলেজ, এমনকি স্কুল পর্যায়ের স্টুডেন্টরা নেমে এলেও তাতে গ্রামীণ জনপদের অংশগ্রহন কতটুকু? অথচ এদেশের মানুষের সবচেয়ে বড় বিনোদন হলো রাজনীতি। পেটে সামান্য আহার জুটলেই ঘরের দাওয়ায় বসে পান চিবাতে চিবাতে বা গঞ্জের দোকানে চায়ের আড্ডায় ঝড় তোলা তাদের নিত্যদিনের কর্ম। তারা এভাবেই রাজনীতি চর্চা করেন, তাদের মাঝে রাজনৈতিক দলগুলোর শেকড় গভীরভাবে প্রোথিত। এজন্যই আওয়ামী লীগ ১৯৭৫ সালে জনপ্রিয়তার শীর্ষস্থান থেকে সমূলে ভূপতিত হলেও আবারও ফিরে আসে এবং ১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়, জেলে বসে থেকেও এরশাদ ৫ম সংসদ নির্বাচনে রংপুরের ৫টা আসনই লাভ করে, কলঙ্কের দাগ নিয়ে বিএনপি ২০০৬ সালে ক্ষমতার দৃশ্যপট থেকে সরে যেতে বাধ্য হলেও আবারও ফিরে এসে তার শক্তির জানান দিচ্ছে। নৌকা, ধানের শীষ বা দাড়িপাল্লা মার্কা হৃদয়ে ধারণ এবং লালনকারী এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সংখ্যাটা কোটা বৈষম্য সমস্যায় পীড়িত জনগোষ্ঠীর চেয়ে কয়েকগুণ বড়।
৩
দুর্নীতি বাঙালির রক্তে, আমাদের নৈতিকতার মান কতোটা নিম্নপর্যায়ের তার প্রমাণ ইবনে বতুতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যটকদের বিবরণী এবং আমাদের মঙ্গলসাহিত্য, সবখানেই পাওয়া যায়। নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে দুর্নীতিগ্রস্থ ব্যবসায়ী জগতশেঠ, সামরিক আমলা মিরজাফর এবং অন্যান্য আমলা-অমাত্যদের হ্যান্ডেল করতে না পেরে ঘাতকের ছুড়িতে জীবন বিসর্জন দিতে হয়। আমাদের প্রান্তিক জনগোষ্ঠিও না বুঝেই অনেকসময় এমন অনেককিছুই করে বসে যা নৈতিকতার মানদণ্ডে দুর্নীতির পর্যায়ে পড়ে। এমনকি মসজিদে গেলেও নামাজ শেষে স্যান্ডেল জোড়া ফেরত পাওয়া যাবে কীনা তা নিয়ে টেনশনে থাকতে হয়। ২০১৮ সালের কোটা আন্দোলন এবারের আন্দোলনের মতো এতোটা সর্বব্যাপী না হলেও ফ্যাসিস্ট সরকারের দুয়ারে প্রথম আঘাতটা তারাই করেছিলেন। এই আন্দোলন থেকে আমরা নুরুল হক নুরের মত একজন নেতা পেয়েছি, যিনি আন্দোলনের পরে ডাকসু নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছিলেন। ছাত্রত্ব শেষ হলে তিনি একটা রাজনৈতিক দল গঠন করেন, যা মূলত মিডিয়া এবং বিভাগীয় শহরকেন্দ্রীক। অথচ এরমাঝেই তিনি ‘বিকাশ নুরু’ খেতাব অর্জন করেন।
২০০৬-৭ সালে ঢাকায় র্যাবে কর্মরত থাকায় ১/১১ পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ অনেককিছুই কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। ঢাকার বিভিন্ন পাইকারী বাজারে জিনিসপত্রের দাম কিভাবে ও কেন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে তার কারণ অনুসন্ধান টিমে থাকায় ব্যবসায়ীদের দুর্নীতির শেকড় কতোটা বিস্তৃত তা জানার সুযোগ হয়। সর্বোপরি এটা বলতে পারি যে আমাদের আমদানি-রফতানি ব্যবসাকেন্দ্রিক ধনিকশ্রেনী প্রচন্ডভাবে দুর্নীতিগ্রস্থ, প্রকৃত শিল্প-কারখানাকেন্দ্রিক অর্থনীতির বিকাশ এখনো সেভাবে হয়নি। এই ধনিকশ্রেনীর ব্যবসায়ের প্রয়োজনে দরকার হয় দুর্নীতিগ্রস্থ আমলাতন্ত্র ও ঘুণেধরা রাজনৈতিক কাঠামো। তাদের জন্যই রাজপথের লড়াকু যোদ্ধা নুরুল হকের কপালে ‘বিকাশ নুরু’ তকমা জোটে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ১৫৮ জন সমন্বয়কের মধ্য থেকে মাত্র দু’জন নেতা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে ঠাঁই পেলেও ১৫৬ জন ক্ষমতার বাইরে থাকছেন। এই ১৫৬ জন ছাড়াও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভাগীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আরও অনেক নেতা-পাতি নেতা রয়েছেন। তাদের ঘোর কাটতে বেশি সময় দরকার হবেনা। এরপর তারাও জড়িয়ে পড়বেন টেন্ডারবাজীসহ বিভিন্ন অপকর্মে। সরকার পরিচালনায় অনভিজ্ঞ হলেও দু’জন নেতাকে হ্যান্ডেল করতে হবে দুর্নীতিগ্রস্থ আমলাতন্ত্র, কেননা এই আমলারা কিছুদিন চুপচাপ থেকে আবারও ফিরে যাবেন আগের নিয়মে। প্রান্তিক পর্যায় থেকে উঠে আসা নুরুল হকের শরীরে ‘বিকাশ’ তকমা জুটেছে, সরকারে ঠাঁই পাওয়া দু’জন কতদিন নিজেদের ধরে রাখতে পারবেন সেটাই দেখার বিষয়। কেননা তাদের উপরে একদিকে থাকবে ১৫৬ জন এবং তারসাথে শেকড়ে-বাকলে জড়িয়ে থাকা অসংখ্য নেতা-উপনেতার চাপ ও দীর্ঘদিনের বঞ্চনাজাত প্রত্যাশা, অন্যদিকে থাকবে দুর্নীতিগ্রস্থ আমলাতন্ত্রের প্রলোভন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ যতই দীর্ঘায়িত হবে ততোই এই চাপ বাড়তে থাকবে। এটা বুঝেছেন বলেই হয়তো প্রফেসর ইউনূস বলেছেন তার কথা না শুনলে তিনি এই দায়িত্ব থেকে সরে যাবেন। এটা বুঝেছেন বলেই হয়তো প্রফেসর সলিমুল্লাহ খান সরকারে যোগ দেননি।
৪
বিগত সরকার বিএনপিকে নিঃশেষ করতে এতটাই ব্যস্ত ছিল যে তারা প্রফেসর ইউনূসকে খুব খাটো করে দেখেছেন, নুরুল হক নুরুকে অবজ্ঞা করেছেন। তারা ভুলে গিয়েছিলেন জামাতের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং শিবিরের মত একটা সুসংগঠিত ও নিবেদিতপ্রাণ ছাত্র সংগঠনের কথা। এই সংগঠনে আবু সাঈদের মত হাজারো নিবেদিতপ্রাণ কর্মী রয়েছেন। শেখ হাসিনা অজিত দোভালের উপরে বেশি আস্থা রেখে ডোনাল্ড ল্যু’কে অবজ্ঞা করেছেন। তাদেরকে অতিরিক্ত ভারতপ্রীতির খেসারত দিতে হয়েছে খুব করুণ ভাবে, এমনকি শেখ হাসিনাকে তারা আশ্রয় দিতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন। অজিত দোভালকে সম্ভবত তার দায়িত্ব থেকে অপসারণ করা হচ্ছে। ‘র’ এর অনেক এজেন্টকে ইতিমধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে শোনা যায়। ভারতের ন্যাশনাল সিকিউরিটিতে ১৯৬২ সালের ইন্দো-চায়না যুদ্ধের পর এটাই সম্ভবত সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।
১৯৮৭/৮৮ সালের দিকে যখন ছাত্র ইউনিয়ন করতাম তখন ছাত্রলীগের ছেলেদের জানতাম ইভটিজার সংগঠন হিসেবে। কারণ রংপুর শহরের বিভিন্ন গলির মুখে তাদের নেতা-কর্মীদের তাইই করতে দেখেছি। এবারের কোটাবৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে তাদের ভূমিকা আরও ঘৃণিত পর্যায়ে পৌঁছেছে। আমি অবাক হবো না, যদি এই সংগঠনকে সন্ত্রাসীদল হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। কোটা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা একটা রাজনৈতিক দল গঠন করবেন বলে শুনেছি। এটা অবশ্য বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত ড্যান ডাব্লিউ মোজেনা টাইম টেলিভিশন চ্যানেলকে অনেক আগেই বলেছেন। ‘এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক দলের উত্থান ঘটতে পারে। আবার পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোও পুনরুজ্জীবিত হতে পারে। এটা হতেও পারে, না-ও হতে পারে’ তার এই বক্তব্য, ২৯ জুলাই ২০২৪ তারিখের দৈনিক ইত্তেফাকের অনলাইন ভার্সনে প্রকাশিত হয়েছে। কোটা আন্দোলনকারীরা নুরুল হক নুরু’র মত রাজনৈতিক দল গঠন করবেন, ভালো কথা। এটা নিঃসন্দেহে তাদের রাজনৈতিক অধিকার। কিন্তু রাজনৈতিক দল চালাতে টাকা লাগে, সেটা কোথা থেকে আসবে? ১৫৮ জন সমন্বয়ক নিশ্চয়ই তাদের পৈত্রিক সম্পদ বিক্রি করে রাজনীতি করবেন না। ২০১৩ সালের শাহবাগ আন্দোলন নিয়ে যে যতই বড় কথা বলুন না কেন তাদের পিছনে ছিল সরকারি সংস্থার ফান্ড। অতএব ফান্ড দরকার, প্রয়োজন পথ দেখায়। এভাবেই একজন বিকাশ নুরুর জন্ম হয়। দেশের বড় বড় রাজনৈতিক দলের সাথে নির্বাচনের রাজনীতি করতে হলে প্রচুর অর্থ সম্পদ দরকার হয়। নুরুল হক নুরুকে তাই দোষ দিয়ে লাভ নাই। আবার ড্যান মোজেনার বক্তব্য অনুযায়ী পুরাতন দল যে পুনরুজ্জীবিত হতে পারে তার সম্ভাবনাও দেখছি। কেননা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দুজন উপদেষ্টা মো নাহিদ ইসলাম এবং আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ছাত্র অধিকার পরিষদের নেতা ছিলেন, সংগঠনটা নুরুল হক নুরু’র।
ফ্যাসিস্ট সরকার বিরোধী সফল আন্দোলন শুধুমাত্র কয়েকজন ছাত্রনেতার নেতৃত্বের ফসল বলে যারা ভাবছেন তারা ভুল করছেন। এই আন্দোলনের বীজ রোপন হয়েছিল অনেক আগেই। বীজ থেকে চারাগাছ হয়ে মহীরুহে পরিণত হতে অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হয়। গত ৭ আগস্ট ২০২৪ তারিখে বিএনপি’র সমাবেশ সেই বার্তা দিতে চেয়েছে। তারেক জিয়া’কে যারা এখনও ‘হাওয়া ভবন’এর তারেক জিয়া বলে ভাবছেন তারা ভুলের জগতে বাস করছেন। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা থেকে আওয়ামী লীগের নেতারা কোন শিক্ষা না নিলেও তারেক জিয়া ঠিকই শিক্ষা নিয়েছেন। তিনি দেশের ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত তার দলের নেতা কর্মীদের জানেন এবং খোঁজ খবর রাখেন। দলের প্রতিটা সভা-সমাবেশে আমরা যে বিপুল জনস্রোত দেখি সেটা তার প্রচেষ্টার ফসল। এমনকি গত রমজান মাসটাতে আওয়ামী লীগের নেতারা খেজুর-সরবত খেয়ে পার করলেও তারেক জিয়া পুরো মাস অনলাইনে জনসংযোগ করেছেন। বিএনপি’র মত একটা রাজনৈতিক দল ২০০৯ সাল থেকে আওয়ামী লীগের জুলুম-নির্যাতনের স্টিম রোলারে পিষ্ট হয়েও এখনও কেন এতটা সক্ষম সেটা ভাবতে হবে। শেখ হাসিনা এটা জানতেন বলেই বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেননি, তারেক জিয়াকে দেশে ফিরতে দেননি এবং দিনরাত মরহুম মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের বিষোদাগার করে গেছেন।
বিগত সরকারের জুলুম নির্যাতনের মাঝেও বিএনপি’র বিভাগীয় পর্যায়ের মিটিং আন্দোলন-হাজারও কর্মীদের জীবন বিসর্জন-লাখলাখ কর্মীদের কারাবরণ আর আত্মত্যাগ, ডাঃ পিনাকী-ডাঃ জাহেদ-কনক সারওয়ার প্রমুখদের দিনের পর দিনের প্রচারণা, ভারতীয় পণ্য বর্জন আন্দোলন, মাঠের নিঃসঙ্গ শেরপা তারেক রহমান, টক শোয়ের প্রতিবাদী কণ্ঠ রুমিন ফারহানা, নুরুল কবির, আসিফ নজরুল প্রমুখদের পরিশ্রমে আন্দোলনের যে উর্বর ভূমি প্রস্তুত হয়েছে তাতে সর্বশেষ ফিনিশিং-টা দিয়ে ফসল ঘরে তুলেছেন কোটা আন্দোলনের নেতারা। তাদের এই আন্দোলনের পুরোটা জুড়ে ছাত্র দল, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র শিবির ছাড়াও অন্যান্য বাম ছাত্র সংগঠনের স্টুডেন্টরা জড়িয়ে আছে। সবশেষে এসেছে সাধারণ জনতা। তারা সবাই তাদের নিজনিজ রাজনৈতিক সংগঠনের মতাদর্শ ধারণ করে, কোন না কোন দলকে ভোট দেয়। তাই ‘জাগো বাহে কোন্ঠে সবায়’ বললেই এই ছাত্র-জনতা তাদের নিজ দল বা মতাদর্শ ছেড়ে ভাসমান শ্যাওলার মত একটা নতুন রাজনৈতিক দলে যোগ দিবে না। নুরুল হক নুরু এখনও প্রিন্ট-ইলেকট্রনিক-সোশ্যাল মিডিয়ার মাঝেই ব্রাকেটবন্দি হয়ে আছেন। দল করতে টাকা লাগে। এবারের ছাত্র আন্দোলনের জন্যেও ভালো বাজেট ছিল শোনা যায়।
৫
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উচিত হবে ১/১১ তে জেনারেল মঈন উদ্দিন আহমেদ-এর মতো সব সেক্টরে হাত দিয়ে লেজে গোবরে পরিস্থিতির সৃষ্টি না করে মোটাদাগে কিছু কাজ করতে। দীর্ঘমেয়াদী ফল ভোগ করা যায় এরকম কিছু প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করে নির্বাচনের পথ খুলে দিতে হবে। সেনাবাহিনীর মত একটা সুসংগঠিত দল পিছনে থাকা সত্ত্বেও জেনারেল মঈনকে কেন ব্যর্থ হতে হয়েছিল সেটা স্টাডি করতে হবে। সেনাবাহিনীর ফিল্ড/জুনিয়র অফিসার থেকে শুরু করে নিচের সারির সবাই জানেন দীর্ঘদিন ব্যারাকের বাইরে থাকতে গিয়ে তাদেরকেই আসলে মূল্যটা দিতে হয়। ২০০৮ সালের পুরোটা জুড়ে ‘অপারেশন আলোর সন্ধানে’র কারণে পরিবার যশোর সেনানিবাসে রেখে আমাকেও মাগুরাতে ক্যাম্পে পড়ে থাকতে হয়েছে, ২৯ ডিসেম্বরে নবম নির্বাচনের পর সেনানিবাসে ফিরেছি। এই ত্যাগ থেকে কি লাভ হয়েছিল? শেখ হাসিনার মত একটা দানবকে ক্ষমতায় পেয়েছি।
কয়েকটা জেনারেশন দীর্ঘদিন ধরে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত এটাও এই সরকারকে মাথায় রাখতে হবে। খুব বেশি হলে একবছর, এর বেশি মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে গেলে যেটা বলেছি, বিএনপি-জামাতের সাথে আওয়ামী লীগের আন্দোলনকেও তাদেরকে ফেস করতে হবে। সজীব ওয়াজেদ জয় ইতিমধ্যে তার আগের বক্তব্য প্রত্যাহার করে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফিরে আসার কথা বলেছেন। দেশের একদম প্রত্যন্ত পর্যায় পর্যন্ত এই ০৩দলের বিস্তৃতি আছে। তাদের সাহায্য ছাড়া বাংলাদেশে কোন ধরণের আন্দোলন সফল করা সম্ভব না। যুবদল-ছাত্রদলের একটা অংশ জেলে থাকলেও তাদের বাইরে থাকা অংশটা এবং শিবিরের পুরোটা এবারের আন্দোলনে জড়িত ছিল। তাদের সহযোগিতা ছাড়া আরেকটা ছাত্র আন্দোলনের দানা বাঁধানো সহজসাধ্য হবেনা।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের যাবতীয় কার্যক্রমকে বৈধতা দিতে একটা রাজনৈতিক সরকারের সহযোগিতার দরকার হবে। ৫ম জাতীয় সাধারণ নির্বাচনের পর এরকমটা করতে হয়েছিল। রাজনৈতিক সরকারের সহযোগিতা না পেলে আজ যাদের সামনে দেখছি তাদের অনেককেই সংবিধান লংঘনের দায়ে ভবিষ্যতে জেলে ঢুকতে হতে পারে। মূলত মধ্যবিত্ত সমাজের এসব আন্দোলন থেকে কিছু নেতা-উপনেতা ক্ষমতার স্বাদ পেলেও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি, আবু সাঈদদের কপালে শুধুই জোটে বীরশ্রেষ্ঠ হবার ভাগ্য। এর আগে নুর হোসেনের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। এদেশের মানুষ নুর হোসেনের ঐতিহাসিক ছবিটা মনেরাখলেও তার পরিবারের খোঁজ কেউ রাখেনি। আবু সাইদের ক্ষেত্রেও তাইই হবে। আজ শনিবার প্রধান উপদেষ্টা তার পরিবারের সাথে দেখা করতে রংপুরে যাবেন। আমরা আবু সাঈদের ছোট বোন সুমি’র সেই আর্তনাদ, ‘মোর ভাইয়োক মারি ফেলাইছে। হ্যামার শোক আশা ভরসা শেষ হয়া গেলো’ শুনেছি। শুনেছি তার মায়ের বিলাপ, ‘তুই মোর ছাওয়াক চাকরি না দিবু না দে, কিন্তু মারলু ক্যানে।’ আজ প্রধান উপদেষ্টাও শুনবেন।
এই লেখা শেষ করবো সলিল চৌধুরী’র গানের সেই লাইনগুলো দিয়ে,
‘আহ্বান, শোন আহ্বান,
আসে মাঠ-ঘাট বন পেরিয়ে
দুস্তর বাধা প্রস্তর ঠেলে
বন্যার মত বেরিয়ে
যুগ সঞ্চিত সুপ্তি দিয়েছে সাড়া
হিমগিরি শুনল কি সূর্যের ইশারা
যাত্রা শুরু উচ্ছল চলে দূর্বার বেগে তটিনী,
উত্তাল তালে উদ্যাম নাচে মুক্ত স্রোত নটিনী
এ শুধু সত্য যে নব প্রাণে জেগেছে,
রণ সাজে সেজেছে, অধিকার অর্জনে।’
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১০ আগস্ট ২০২৪