
১
তিউনিশিয়া এবং মিশরে যা হয়েছে তা যদি আরব বসন্ত হয় তবে বাংলাদেশে যা হয়েছে তা অবশ্যই বাংলা বসন্ত। একটা সফল গণ-অভ্যুত্থানের নায়ক জেনারেশন-জি এখন দেশ সংস্কার করছে। শহরের রাজপথের জ্যাম দূরকরার জন্য ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ, দেয়ালের বিভিন্ন রাজনৈতিক শ্লোগানের পাশাপাশি বিশ্রী লেখাগুলো মুছে দিতে গ্রাফিতি বা ক্যালিগ্রাফি, এলাকা পরিষ্কার, বিধ্বস্ত থানাগুলো পরিচ্ছন্নতার কাজে হাত দিয়েছে। এসবের মূলে আছে দেশের জন্য তাদের অকৃত্রিম ভালোবাসা, বুকভরা দেশপ্রেম না থাকলে এভাবে নিজেদের উজাড় করে দেয়া যায়না। এই জেনারেশন নিয়ে তাই গর্ব করতেই হয়, এই স্বীকৃতি তারা আদায় করে নিয়েছে। প্রায়ই ভাবি আমাদের রাজপথগুলো যদি বিদেশের রাজপথগুলোর মত যদি পরিচ্ছন্ন হতো! রাজপথের বিভাজিকায় থাকতো ফুলের কেয়ারী, চাররাস্তার মোড়ে ভাস্কর্য কিংবা রঙিন পানির ফোয়ারা, রাজপথের দিকে তাকালে কালো বিটুমিনের বদলে দীর্ঘ আলপনা আর পথের পাশের দেয়ালে দেখা যেত গ্রাফিতি। তাহলে অন্তত জ্যামে বসে থাকতে খারাপ লাগতো না।
আমরা যখন প্রাইমারী স্কুলে পড়তাম তখন সাপ্তাহিক ছুটি ছিল রবিবার, শনিবারে সম্ভবত হাফ হলিডে আর শুক্রবারে মর্নিং শিফট। তখন প্রতি শনিবারে আমরা আমাদের স্যারদের তত্ত্বাবধানে আশেপাশের এলাকা পরিচ্ছন্ন করার কাজ করতাম। একই ঘটনা ২০১১ সালে রুয়ান্ডার রাজধানী কিগালিতে দেখেছি। সেখানে স্টুডেন্টরা ছুটির দিনের সকালে কিগালির রাজপথ পরিষ্কার করে। কিগালি হচ্ছে আফ্রিকা মহাদেশের সবচেয়ে পরিষ্কার শহর। শহরটা এতই পরিষ্কার যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিক থেকে ইউরোপ-আমেরিকার যেকোনো শহরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অবস্থায় পৌঁছে গেছে। কিগালি একটা সাজানো-গোছানো শহর আর রুয়ান্ডাকে বলা হয় ‘Heart of Africa’।
২
বর্তমানে দেশের ৬৩৯টা থানার মধ্যে ৫৩৮টা থানার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এরমধ্যে বিভিন্ন মেট্রোপলিটন এলাকার ১১০টা থানার মধ্যে ৮৪টা এবং জেলা পর্যায়ের ৫২৯টা থানার মধ্যে ৪৫৪টা থানার কাজ শুরু হয়েছে। এছাড়া ডিএমপি’র ৫০টা থানার মধ্যে ৪৫টা থানার কাজ শুরু হয়েছে। অবশিষ্ট ০৫টা থানা যথাক্রমে খিলক্ষেত, উত্তরা পূর্ব, পল্টন, যাত্রাবাড়ি এবং কদমতলী থানার স্বাভাবিক কার্যক্রম চালুর প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। তবে প্রাথমিকভাবে মামলা/এজাহার বা জিডি নেয়া ছাড়া অন্য কোন কাজ এখনো শুরু করা যায়নি জনবল সংকটের কারণে। যাত্রাবাড়ি থানায় জিডি নিচ্ছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। পুরোদমে দেশের সব থানা চালু হতে আরও সময় দরকার হবে। ঢাকাসহ এখনও দেশের বিভিন্ন জেলার পুলিশ সদস্যরা কাজে যোগ দেননি। কাজে যোগ না দেয়া পুলিশ সদস্যরা পুলিশের নবনিযুক্ত আইজিপি’র কাছে স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনসহ ১১দফা দাবী পেশ করেছেন। র্যাবে চাকুরী করার কারণে অনেক পুলিশ সদস্যদের সাথে কথা বলার বা তাদের অভাব-অভিযোগ জানার সুযোগ হয়েছিল, সেই অভিজ্ঞতার আলোকে তাদের দাবীগুলো আমার কাছে যৌক্তিক বলে মনেহয়েছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন ৩/৪ দিনের মধ্যে পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকবলের অভাবে রাজপথের অরাজকতা থেকে শুরু করে রাতে চুরি-ডাকাতি, ধর্মীয় উপাসনাস্থান/মন্দির, মাজারে, বাড়িঘরে আক্রমণ ঘটেছে। যা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমি জ্ঞানত সংখ্যালঘু শব্দটা ব্যবহার করলাম না, কারণ এদেশে বসবাসরত সবাই আমার ভাই-বোন-বন্ধু। এই দেশ আমাদের সবার, ধর্ম-বর্ণ–গোত্র-পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিশেষে আমরা সবাই বাংলাদেশী, এটাই আমাদের পরিচয়। আমাদের ছাত্ররা অনেকে স্থানে বিভিন্ন ধর্মীয় স্থান-উপাসনালয় ইত্যাদি রক্ষায় পাহারা দিচ্ছে।
৩
ফ্যাসিস্ট হাসিনা প্রায় এক সপ্তাহ হতে চললো ভারতে পালিয়ে গেছেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের দায়িত্বভার গ্রহন করেছে। এখন স্টুডেন্টদের ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে আনা দরকার, তারা তাদের মূলকাজ অর্থাৎ পড়াশোনা থেকে ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছে। দ্বিতীয় স্বাধীনতার শেষে তাদের এখন নিজেদের তৈরি করতে হবে, দেশের হাল ধরতে হবে। নতুন প্রজন্ম দেশের নেতৃত্বে আসুক নতুন ধরণের রাজনীতি নিয়ে, হানাহানির রাজনীতি আমরা আর চাই না। ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের কয়েক জায়গায় বৈষম্যবিরোধী কোটা আন্দোলনের কমিটি গঠন নিয়ে ঝামেলা হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলেও নতুন পোষ্টার দেখা যাচ্ছে, এসব ঘটনা দুঃখজনক। আমরা তাদেরকে ভালোবেসে যে স্থানে রেখেছি তাদেরকে আজীবন সেখানেই রাখতে চাই। আমরা চাইনা এই ছাত্ররা কোন ধরণের নোংরামি, অপকর্ম, দুর্নীতির ভেতরে জড়িয়ে পড়ুক। নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের পরবর্তী অবস্থা থেকে বলতে চাই রোড ট্রাফিকিং একটা জটিল কাজ, এটার জন্য পেশাগত দক্ষতা সম্পন্ন জনবল দরকার। এখন অবশ্য বিএনসিসি, স্কাউটসরা ট্রাফিক ডিউটিতে নেমেছে। তাদেরকে এই সংক্রান্ত কিছুকিছু প্রশিক্ষণ দেয়া হয় জানি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা আগামী বৃহস্পতিবার ১৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখের মধ্যে পুলিশ সদস্যদের কর্মস্থলে যোগ দিতে বলেছেন, তা না হলে তাদেরকে পলাতক হিসেবে ঘোষণা করা হবে। আশাকরি এরফলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে। তবে পুলিশের ব্যাপক সংস্কার দরকার। তাদেরকে উন্নত বিশ্বের পুলিশের মানদণ্ডে না নিতে পারলে নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা অসম্ভব।
স্টুডেন্টদের সংস্কার কার্যক্রম থেকে মনেহলো ট্রাফিক রুলস সম্পর্কিত প্রাথমিক বিষয়াদি, পিআরবি’র কিছু ধারা, ডিএমপি রুলস এসবের কিছুকিছু ক্লাসের সিলেবাসে থাকা উচিত। একজন স্টুডেন্টকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হলে এসব বিষয় জানা দরকার। এপ্রসঙ্গে নিজের একটা অভিজ্ঞতা শেয়ার করি, সম্ভবত ২০০৯ সালের দিকে, আমি তখন র্যাবে, আমার একজন আত্মীয় তার একটা সমস্যা জানিয়ে সহযোগিতা চাইলেন। পুরো বিষয়টা জেনে তাকে নিকটস্থ থানায় একটা জিডি করে জিডি’র কপি ও দরখাস্তসহ আমার সাথে দেখা করতে বললাম। এরপর কাজের চাপে বিষয়টা ভুলে গিয়েছিলাম। পরে একদিন যেটা জানলাম, উনি আমার কথামতো থানায় গিয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু সেখানে জিডি না করে এজাহার লিখে ফেলেছিলেন। তার বিষয়টা এমন ছিল যে সেটা জিডি বা এজাহার দুটো হিসেবেই লিপিবদ্ধ করা যায়। এরপর যথারীতি পুলিশি কার্যক্রম শেষে বিষয়টা নিস্পত্তির জন্য তাকে আদালত অবধি যেতে হলো। এই পর্যায়ে তিনি আমার সাথে যোগাযোগ করলে আমি তাকে তার ভুলটা ধরিয়ে দিয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে আমার আর কিছু করার নেই জানাতে বাধ্য হলাম। সেজন্যই এইসব বিষয়ে প্রতিটি নাগরিকের সুস্পষ্ট ধারণা থাকা উচিত। এগুলোই আসলে ব্যবহারিক জ্ঞান।
৪
ট্রাফিক ডিউটি করতে গিয়ে ইতিমধ্যে একজন স্টুডেন্ট ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। কয়েকটা ছাত্রী অপহরণের মত ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে। কিছুকিছু স্টুডেন্টের বাড়াবাড়ি, এমনকি মারপিটের মত দুঃখজনক ঘটনা জনমনে রোষের সৃষ্টি করেছে। ফেসবুকে সেসব নিয়ে ইতিমধ্যেই লেখালেখি শুরু হয়েছে। বিষয়টা আরও অবনতির দিকে যাওয়ার আগেই, সম্ভব হলে আগামী সপ্তাহে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুলে দিয়ে স্টুডেন্টদেরকে ক্লাসে ফিরিয়ে আনা দরকার। ইতিমধ্যে স্কুল-কলেজ খুলে দিলেও ক্লাসে উপস্থিতির হার কম। এই বিষয়ে স্কুল-কলেজ প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। আমরা চাইনা আমাদের যে স্টুডেন্টরা কয়েকদিন আগে একটা ইতিহাস সৃষ্টি করলো তারা সমালোচনার পাত্র হোক। পরের জেনারেশনের কাছে আমরা তাদের গৌরবগাঁথা পৌঁছে দিতে চাই। এইচএসসি পরীক্ষা অর্ধেক হয়ে বন্ধ আছে, সেটাও শেষ করা দরকার। পরীক্ষা শেষ না হবার কারণে স্টুডেন্টরা অস্বস্তিকর অবস্থায় আছে, অভিভাবকদেরকেও বাচ্চাদের পড়াশুনা বাবদ বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে। তবে এই সপ্তাহটা পর্যন্ত স্টুডেন্টদেরকে অবশ্যই মাঠে থাকতে হবে। প্রতিবিপ্লবের আশঙ্কা এখনও দূর হয়নি।
ছাত্র আন্দোলন ঘিরে গত ১৬ জুলাই ২০২৪ তারিখ থেকে ০৪ আগষ্ট পর্যন্ত সংঘাতে ৩৩১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, ০৫ আগষ্ট ২০২৪ তারিখে সরকার পতনের পর থেকে এপর্যন্ত ২৪৮ জন মিলে আন্দোলনের মোট ২৬ দিনে এপর্যন্ত ৫৭৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আমরা কিন্তু ধারণা করি মৃত্যুর এই সংখ্যাটা ইতিমধ্যেই হাজার পেরিয়েছে। অনেক বাবা-মা সন্তানের মৃত্যুর খবর চেপে গেছেন রাষ্টের নির্যাতনের ভয়ে, ডেথ সার্টিফিকেট না নিয়েই গোপনে কবর দিয়েছেন। অনেক স্টুডেন্টের লাশ গুম করা হয়েছে শোনা যায়, অনেককে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে। মৃত্যুর এই সংখ্যাটা মোটামুটি কনফার্ম করা সম্ভব হবে যখন তারা ক্লাসে ফিরবে। ক্রমিক নম্বর ধরেধরে হিসেব মেলাতে হবে। এরকম একটা আন্দোলনের জন্য স্টুডেন্টের আত্মাহুতির পুর্ণাঙ্গ রেকর্ড থাকতেই হবে, এখানে মুক্তিযুদ্ধে শহীদের প্রকৃত সংখ্যার মত ধোঁয়াশা থাকলে চলবে না। আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে যারা সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছে, যাদের আদেশে হত্যাকাণ্ড হয়েছে তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে। কমান্ড চ্যানেল ধরে সবার বিচার করে সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত করতে হবে। যুদ্ধাপরাধী বিচারের মত এই বিচার যেন বিতর্কিত না হয় সেজন্য আমাদেরকে এখন থেকেই কাজ করতে হবে। স্টুডেন্টদেরকেই এই কাজে এগিয়ে আসতে হবে। পড়াশুনার পাশাপাশি তারা এই কাজ করতে পারে। আমরা যদি এই গনহত্যার সঠিক বিচার করতে পারি তাহলেই কেবল একটা নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে পারবো। সেই বাংলাদেশের আর কোন মায়ের বুক খালি হবে না। আর কোন বোনের আহাজারি শোনা যাবে না।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১২ আগস্ট ২০২৪