
১
১৪ জুলাই ২০২৪ তারিখে ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোটা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের নাতি-পুতি’ বলে অভিহিত করলে তারা রোষে-ক্ষোভে ফেটে পড়ে। এরপর ১৫ ও ১৬ জুলাই ২০২৪ তারিখে, বিশেষকরে ছাত্রীদের উপরে ছাত্রলীগের হামলা আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে দেয়। এই পর্যায়ে আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ করতে ১৭ জুলাই ২০২৪ তারিখে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয় এবং মোবাইল কোম্পানীগুলো ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখে। সেদিন রাতেই, আন্দোলনকারীরা ১৮ জুলাই তারিখ থেকে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি ঘোষণা করে। তবে ১৮ জুলাই তারিখে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজপথে নামলে আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। সেদিন বিইউপি’র শিক্ষার্থীরা মিছিল করলে ছাত্রলীগ মিরপুর ডিওএইচএস-এর ভিতরে ঢুকে ভাঙচুর করে। এরপর থেকে এমআইএসটি, বিইউপি’র ছাত্রদের মিছিলের পাশাপাশি পুলিশের লাঠিচার্জ, গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ার গ্যাসের ঝাঁঝালো ঘ্রাণে মিরপুর ডিওএইচএসবাসীদের অভ্যস্ত হয়ে উঠতে হয়। কর্তৃপক্ষ ডিওএইচএস-এর সবগেটে সেনা চৌকি বসালেও মিছিল বন্ধ থাকেনি। বিশেষ করে গত ০২, ০৩ এবং ০৪ আগস্ট ২০২৪ তারিখে মিরপুর ডিওএইচএস-এর অবসরপ্রাপ্ত অফিসাররা স্ত্রী-সন্তানদেরসহ মিছিলে নামেন। আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নিলে অনেক আন্দোলনকারী বিভিন্ন ডিওএইচএস এলাকায় আশ্রয় নেয়। অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নিরাপত্তারক্ষীদের নির্দেশ দেন যাতে কোনো আন্দোলনকারীকে হয়রানি করা না হয়। ডিওএইচএস এলাকায় আন্দোলনকারীদের জন্য খাবার ও প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হয়। এটি আন্দোলনকারীদের মনোবল বাড়িয়ে দেয়, তাদের প্রতি সমাজের একটি অংশের সমর্থন নিশ্চিত করে। অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তারা এভাবেই বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের শুরুতেই সরাসরি রাস্তায় না নেমেও তাদের সামরিক অভিজ্ঞতা, সামাজিক প্রভাব এবং বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগের মাধ্যমে একটি বড় ভূমিকা রাখেন। এভাবেই সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন একসময় আমাদের সবার আন্দোলনে রূপ নেয়। এই আন্দোলন হয়ে ওঠে সরকার পতনের, একদফার আন্দোলন। এই আন্দোলনে সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক।
১৯ জুলাই ২০২৪ তারিখে সারাদেশে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে সরকার মধ্যরাতে কারফিউ জারি করে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাবাহিনী মোতায়েন করে। চাকুরীরত এবং অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মকর্তা-সেনাসদস্যরা বন্ধুবান্ধব-আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ফোনে দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রথম থেকেই জানতে পারছিলেন বলে তারা ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে সজাগ এবং মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন। এখানে উল্লেখ্য যে, তরুণ সেনাসদস্য এবং সেনাবাহিনীর জুনিয়র অফিসারদের অনেকেরই বন্ধুবান্ধব তখনও দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠরত থাকায় তাদের মাধ্যমেও তারা অনেককিছুই জানতে পারছিলেন যা অনেককে ক্ষুব্ধ করে। এছাড়াও অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তারা তাদের পূর্ব পরিচিত ও ঘনিষ্ঠদের মাধ্যমে চাকুরীরত সেনা কর্মকর্তাদের কাছে জনগণের মনোভাব তুলে ধরেন। তারা বোঝাতে সক্ষম হন যে, চলমান আন্দোলন কোনো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র নয়, বরং এটি জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ। আর তাই ১ আগস্ট থেকে ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখের বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। এই সময়ে, সেনাবাহিনী সরকারের দমনমূলক নীতির বিরুদ্ধে জনগণের পক্ষে অবস্থান নেয়, যা আন্দোলনের চূড়ান্ত বিজয়ে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
২
১ আগস্ট ২০২৪ তারিখে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা সারা দেশে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেয়। এর ফলে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি কর্মকাণ্ড কার্যত অচল হয়ে পড়ে। আন্দোলনকারীরা প্রথম থেকেই সেনা সদস্যদের জনগণের পাশে থাকার এবং সরকারের দমন-পীড়নে অংশ না নেয়ার আহ্বান জানাতে থাকে। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দ্বারা সেনাপ্রধানের কাছেও বার্তা পাঠানো হয়। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সেদিন আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর সরাসরি গুলি চালানোর নির্দেশ না দিয়ে জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান দেখিয়েছিলেন। সেনাবাহিনীর এই বাঁকবদলকারী সিদ্ধান্ত সেনাবাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা বাড়িয়ে তোলে। ৯০ কিংবা ২৪, ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সবসময় জনগণের সঙ্গেই একাত্ম থাকে। এই আন্দোলনের সময়ও সেনাবাহিনী জনগণের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল।
২ আগস্ট ২০২৪ তারিখে মিরপুর ডিওএইচএস-এর অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের অংশগ্রহণে একটি বিশাল মিছিল বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করে। তারা বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে স্লোগান দেন এবং শিক্ষার্থীদের ওপর ঘটে যাওয়া হামলার বিচার দাবি করেন। এই মিছিল ছিল একটি প্রতীকী ঘটনা যা দেখায় যে, সমাজের একটি নির্দিষ্ট এবং প্রভাবশালী অংশও এই আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল। এই ঘটনাটি আন্দোলনের নৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করে তোলে এবং এর যৌক্তিকতাকে সবার সামনে তুলে ধরে। এরপরও, গত ৩ ও ৪ আগস্ট তারিখে সেনাবাহিনীর ভূমিকা বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনকে এক নতুন দিকে চালিত করে। এই ঘটনাগুলো আন্দোলনের গতিপথ পরিবর্তন করে এবং এর পরিধি কেবল কোটা সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সরকারের নীতি ও জনগণের অধিকারের বৃহত্তর প্রশ্নে নিয়ে আসে। ৪ আগস্ট রাতে যখন সরকার সেনাবাহিনীকে জনগণের উপর গুলি চালানোর নির্দেশ দেয়, তখন সেনাবাহিনীর কয়েকজন সিনিয়র কর্মকর্তা সেই আদেশ প্রত্যাখ্যান করেন। এই সিদ্ধান্তের পেছনে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা ছিল বলে ধারণা করা হয়। এছাড়া ৪ আগস্ট সকালে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে রাওয়াতে। সেনাবাহিনীর কিছু অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। এই খবর দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেনাবাহিনীর অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
৩
গত ২ আগস্ট ২০২৪ তারিখে সেনাপ্রধান আন্দোলনকারীদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি বার্তা দেন, যেখানে তিনি উল্লেখ করেন যে সেনাবাহিনী জনগণের পাশে আছে। এই বার্তা আন্দোলনকারীদের মনোবল বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয়। এই সময়ে সরকার পতন ও সেনাবাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণের বিষয়ে বিভিন্ন গুজব ছড়াতে থাকে, যা জনগণের মধ্যে এক ধরনের মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। তবে সেনাবাহিনী স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয় যে, তারা রাজনৈতিক ক্ষমতা গ্রহণ করবে না বরং জনগণের পাশে থাকবে। ৩ আগস্ট ২০২৪ তারিখে ঢাকা সেনানিবাসে অনুষ্ঠিত অফিসার্স এড্রেসে সেনাপ্রধান উপলব্ধি করেন যে সেনা কর্মকর্তারা সরকার টিকিয়ে রাখার জন্য কোনো হত্যাকাণ্ডের অংশীজন হতে চান না। সেনাসদস্যদের এই মনোভাব সেনাপ্রধানকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। তিনি বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে বলেন যে, সেনাবাহিনী জনগণের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং জনগণের ওপর কোনো প্রকার নিপীড়ন বরদাস্ত করা হবে না। সেনাপ্রধানের এই বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে আন্দোলনের প্রতি জনসাধারণের আস্থা বাড়িয়ে দেয় এবং এটি একটি টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে কাজ করে। দরবারে সেনাপ্রধান আরও বলেন যে, সেনাবাহিনী সংবিধান এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ। সেনাবাহিনীর এই অবস্থান সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং জনগণের মধ্যে এক ধরনের স্বস্তি এনে দেয়। এই ঘটনার পর থেকেই আন্দোলন আরও জোরদার হয় এবং এর পরিধি কেবল কোটা সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে পরিণত হয়।
সেনাবাহিনী এরপর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারী এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নেয়। এই পদক্ষেপগুলো আন্দোলনকে আরও স্থিতিশীলতা দেয় এবং এতে যুক্ত হওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এটি একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের মধ্যে ভরসা তৈরি করে, অন্যদিকে সরকারের জন্য পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন করে তোলে। এই দুই ঘটনা সম্মিলিতভাবে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনকে এক নতুন পর্যায়ে পৌঁছে দেয়। অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের মিছিল এবং সেনাবাহিনীর সমর্থন আন্দোলনকে কেবল একটি ছাত্র আন্দোলন থেকে একটি জাতীয় আন্দোলনে পরিণত করে। এটি সরকারের ওপর রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ বাড়ায় এবং জনগণের মধ্যে আস্থা তৈরি করে যে, তাঁদের দাবিগুলো শুধুমাত্র সরকারের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং সমগ্র জাতির। এই ঘটনাপ্রবাহ থেকে কীভাবে সমাজের বিভিন্ন অংশের সমর্থন একটি আন্দোলনকে শক্তিশালী করে তুলতে পারে এবং এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে আরও বৃহৎ পরিসরে নিয়ে যেতে পারে তা বোঝা যায়।
৪ আগস্ট ২০২৪ তারিখে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের এক উত্তাল মুহূর্তে চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে সেনাপ্রধানের সরাসরি জনগণের পাশে থাকার বার্তা’র প্রতিফলন দেখা যায়। সেনাবাহিনীর সদস্যরা সেখানে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। চট্টগ্রামে মেজর জেনারেল মাইনুর, জিওসি, ২৪ পদাতিক ডিভিশন-এর ভূমিকা খুবই দৃঢ় এবং ইতিবাচক ছিল। দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীরা যখন পুলিশ বা অন্যান্য বাহিনীর দ্বারা বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল, তখন চট্টগ্রামে জিওসি’র নির্দেশে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সংঘর্ষ এড়াতে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। সেনাবাহিনীর এই ভূমিকা সাধারণ মানুষ এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে ব্যাপক আস্থা তৈরি করে। অনেক জায়গায় শিক্ষার্থীরা সেনাবাহিনীর সদস্যদের কাছে গিয়ে কৃতজ্ঞতা জানায় এবং তাদের সহযোগিতা চায়। প্রায় একইরকম ঘটনা কুমিল্লাতেও ঘটে, কুমিল্লাতেও সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সেনাবাহিনী সহযোগিতা করে এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখে। সেনাবাহিনীর পদক্ষেপ কুমিল্লায় সাধারণ মানুষ এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে ব্যাপক আস্থা তৈরি করে। এসব ঘটনার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে এই বিশ্বাস দৃঢ় হয় যে, সেনাবাহিনী জনগণের বাহিনী, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নয়।
৪
৪ আগস্ট ২০২৪ দিনটি ছিল আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলির মধ্যে অন্যতম। সেদিন আন্দোলনকারীরা ঢাকা অভিমুখে পদযাত্রা শুরু করে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের ঠেকাতে বিভিন্ন স্থানে গুলি ও টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে। এরফলে অসংখ্য মানুষ হতাহত হয়। এই পর্যায়ে সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাবাহিনীকে রাস্তায় নামানোর চেষ্টা করে। কিন্তু সেনাপ্রধান ও অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সরকারের এই আদেশ প্রত্যাখ্যান করেন। তারা জনগণের উপর গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানান। ৪ আগস্ট রাতে সেনাপ্রধান একটি টেলিভিশন বার্তা দেন, যেখানে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে সেনাবাহিনী জনগণের উপর কোনো ধরনের শক্তি প্রয়োগ করবে না। তিনি দেশের সংবিধান ও আইন মেনে চলার কথা বলেন এবং জনগণের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। এই বার্তার মাধ্যমে সেনাবাহিনীর অবস্থান স্পষ্ট হওয়ায় সরকারের মনোবল ভেঙে পড়ে। ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখ সকালে শেখ হাসিনা পদত্যাগ এবং দেশ ত্যাগ করেন। সরকারের পতনের পর সেনাবাহিনী বঙ্গভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। তারা কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল না করে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দেয়। সেনাপ্রধান একটি বিবৃতিতে জানান যে, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া চলছে এবং সেনাবাহিনী এই প্রক্রিয়াকে সমর্থন দেবে।
আন্দোলন পরবর্তী প্রায়-নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ পুলিশ যখন নিষ্ক্রিয় ছিল, তখন দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা বিভিন্ন সংকট ও সমস্যা সমাধানে অন্তর্বর্তী সরকারকে ব্যাপকভাবে সাহায্য করেছে। বিপ্লবের পর সেনাবাহিনী জনগণের আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিজেও তার এক বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন, ‘ছাত্র-জনতার জুলাই বিপ্লবের পর সেনাবাহিনী জনগণের আস্থার প্রতীক হয়েছে।’
৫
জুলাই আন্দোলনে সেনাবাহিনী আন্দোলনরত জনতার ওপর গুলি না চালিয়ে, শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরে সহযোগিতা করে এবং পরবর্তীতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে একটি ঐতিহাসিক ও প্রশংসনীয় অবস্থান গ্রহণ করেছিল। এই লেখার সাথে ব্যবহৃত ছবি ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ তারিখের সিপাহী-জনতার ঐক্যবদ্ধ অভ্যুত্থানের কথা মনেকরিয়ে দেয়। কেননা ৭ নভেম্বরের সেই বিপ্লবের সাথে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের এক অদ্ভুত মিল রয়েছে। আর তা হলো, আওয়ামী লীগের প্রভাব এবং পার্শ্ববর্তী দেশের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে জেগে ওঠা। সেদিনের মতো ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে সরকারের পতনের পর ঢাকার রাজপথে ছাত্র-জনতা যেভাবে সেনাবাহিনীর সদস্যদের প্রতি ভালোবাসা, সম্মান দেখিয়েছে এবং একাত্ম করে নিয়েছে, তা অভূতপূর্ব। সেনাবাহিনীকে ভবিষ্যতেও জনগণের এই আবেগ, ভালোবাসা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান বজায় রাখতে হবে।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
৫ আগস্ট ২০২৫