
১
‘স্বাধীনতা-হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, কে বাঁচিতে চায়?’, কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মিনী উপাখ্যান’ কাব্যের বিখ্যাত পঙক্তি। যার সরল অর্থ, পরাধীন জীবনে কেউ বাঁচতে চায় না বা স্বাধীনতা মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান অধিকার। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্যও একদফার আন্দোলন। কিন্তু আমরা যেন মত প্রকাশের স্বাধীনতার নামে স্বেচ্ছাচারিতার পথ বেছে নিয়েছি। অন্ততপক্ষে এনসিপি’র কিছু নেতার লাগামহীন কথাবার্তা তাই নির্দেশ করে। তাদের একজন, নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারীর সেনাবাহিনী, সেনাঅফিসার, সেনাপ্রধান, ডিজিএফআই-নিয়ে বল্গাহীন ভাষণ দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির পাঁয়তারা বলে মনেহয়। দেশব্যাপী সেনামোতায়েনের সুবিধাভোগী এই দল এবং তাদের নেতারা কী এজেন্ডা নিয়ে ব্যস্ত সেটা তারাই ভালো বলতে পারবেন। তবে আমি সঙ্গতকারণে ডার্বি নাসির ওরফে নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারীর ঘিলু ও মেধা টেস্টের দাবী জানাই। আমার মনেহয় সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে আনার সময় হয়েছে। সেনাপ্রধানকে অনুরোধ,‘স্যার, সেনাসদস্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে আনুন।’
ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়লে গত ১৯ জুলাই ২০২৪ তারিখ রাতে সারাদেশে কারফিউ জারি ও সেনা ডেপ্লয় করেছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। এরপর ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা নিয়ে একবছরের অধিক সময় ধরে সেনাবাহিনী ব্যারাকের বাইরে। এতে কাজের কাজ যতোটা হয়েছে বিভিন্ন কারণে দূর্নাম তার চেয়ে কোন অংশে কম হয়নি। এক বছর, বেশ লম্বা সময়। তাই সময় এসেছে আত্মোপলব্ধি করার। ঘটনা প্রবাহ বিশ্লেষণ করে বোঝা দরকার এই ডেপ্লয়মেন্টে কতোটা লাভ কিংবা কতোটা ক্ষতি হয়েছে! পুলিশের বিপর্যস্ত অবস্থায় দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় কিছুটা সাফল্য এলেও এবং সেনাবাহিনী ও পুলিশের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব কিছুটা কমে এলেও আমার ধারণা অভ্যন্তরীণভাবে সেনাবাহিনীর এই ডেপ্লয়মেন্টে বেশ ক্ষতি হয়েছে। সেটা কীরকম দেখি:
ক। দীর্ঘসময় ব্যারাকের বাইরে, স্কুল-কলেজ-হাসপাতাল-কমিউনিটি সেন্টারসহ বিভিন্ন স্থাপনায় অস্থায়ী ক্যাম্পে থাকার কারণে সেনাসদস্যরা প্রচুর অসামরিক লোকজনের সংস্পর্শে এসেছেন। তাদের মধ্যে ভালো লোকজনের পাশাপাশি চোর-বাটপার-ধান্দাবাজ-অসৎ ব্যবসায়ী টাইপের লোকজনও আছে। সেনাসদস্যরা তাদের আত্মীয়-স্বজন, ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধবদের মাধ্যমে অসাধু ব্যবসায়ী কিংবা পূর্ব পরিচয়ের সূত্রধরে শৃঙ্খলাজনিত কারণে চাকুরিচ্যুত এবং বিপথগামী সেনাসদস্যদের সংস্পর্শেও এসেছেন। এভাবে অসাধু প্রলোভনে পড়ে অনেকেই নানারকম অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়েছেন। অনেকে ধরা পড়ে চাকুরি হারিয়েছেন, তাদের কেউকেউ জেলে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা ভোগ করছেন। এপ্রসঙ্গে সার্জেন্ট ফরহাদ বীন মোশারফের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। তাকে গত মার্চ মাসে রাজধানীর ধানমন্ডিতে ডাকাতির অভিযোগে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। ধানমন্ডি ৮ নম্বরে অলংকার নিকেতন জুয়েলার্সের মালিকের বাড়িতে এই ডাকাতির ঘটনা ঘটে। অনুরূপ আরেকটা ডাকাতির ঘটনায় বর্তমানে মেজর মুরাদ (বরখাস্ত) জেলে আছেন বলে জানা যায়।
খ। ডেপ্লয়মেন্টের সুযোগে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট থেকে অবসরপ্রাপ্ত, চাকরিচ্যুত এবং র্যাবের সোর্সরাও অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। অনেকেই র্যাব, ডিবি ও সেনাসদস্য পরিচয়ে ছিনতাই, অপহরণ করে অর্থ আদায়, লুটসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। আবার অনেক প্রতারক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে মানুষকে জিম্মি করে অর্থকড়ি লুট করছে। পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অক্টোবর ২০২৪ থেকে ২১ জুলাই ২০২৫ তারিখ পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ৫৫টি ডাকাতি ও প্রায় সাড়ে ৩০০ ছিনতাইয়ের মামলা রেকর্ড হয়েছে। এরমধ্যে অন্তত ৬টি ডাকাতির ঘটনায় এমন ৩৮ জনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে যারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের অবসরপ্রাপ্ত, চাকরিচ্যুত সদস্য ও তাদের সোর্স। তাদের দ্বারা সংঘটিত অপকর্মের কারণে সেনাবাহিনীর যথেষ্ট সুনাম ক্ষুণ্ণ হয়েছে। এ প্রসঙ্গে সৈনিক (বরখাস্ত) মোঃ নাইমুল ইসলামের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখের পর শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বরখাস্ত বা অব্যাহতিপ্রাপ্ত সাবেক কিছু সেনাসদস্যকে সঙ্গে নিয়ে সে গণমাধ্যমে উসকানিমূলক বক্তব্য দেয়াসহ নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালানোর পরিকল্পনা করেছিল বলে জানা যায়।
গ। অস্ত্র-গোলাবারুদ এবং রণকৌশলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেনাসদস্যরা রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক প্রলোভনে পড়ে চাকুরিচ্যুত হয়ে বা চাকুরিরত থেকে অনেকক্ষেত্রে নিজের অজান্তেই ক্রিমিনালে পরিণত হচ্ছেন। এপ্রসঙ্গে মেজর সাদিক, তার স্ত্রী সুমাইয়া এবং লেফটেন্যান্ট গুলশান আরা (অবঃ)-এর ঘটনাটা উল্লেখ করা যেতে পারে। তারা বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদেরকে ‘সাব টেক্টিক্যাল আর্বান ওয়ারফেয়ার’ বা সহজ ভাষায় গেরিলা ট্রেনিং দিচ্ছিলেন বলে জানা যায়। তাদের প্ল্যান ছিল ঢাকা শহরের বিভিন্ন ‘কী পয়েন্ট ইন্সটলেশন’ গুলোকে টার্গেট করা, বিশেষ করে দূতাবাসগুলো। তারা টার্গেট করেছিলেন কুর্মিটোলা জেনারেল হসপিটাল, সিএমএইচ, পপুলার হসপিটাল, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি ইত্যাদির মতো হাই ভ্যালু টার্গেট, যেগুলোর আফটার ইফেক্ট অত্যন্ত মারাত্মক হতে পারে। এছাড়াও সার্জেন্ট জসিম উদ্দিন (অবঃ) এবং সার্জেন্ট নজরুল ইসলাম (অবঃ) এর নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। তাদের বিরুদ্ধে নরসিংদীর রায়পুরায়, চরাঞ্চলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দাবি, গতবছর নরসিংদী কারাগার ভেঙে আসামি পলাতক ও অস্ত্র লুটের সঙ্গে জড়িত কিছু আসামি সেই এলাকায় থাকতে পারে। তাদের মাধ্যমে কারাগার থেকে লুট হওয়া অস্ত্র এলাকায় রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এরফলে সাধারণ মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
ঘ। বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে যেসব সেনাসদস্যরা জেলে যাচ্ছেন তারা একসময় সাজার মেয়াদ শেষে জেল থেকে বের হবেন। পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে বিপর্যস্ত এসব সদস্যদের মানসিক জগতে যে পরিবর্তন হবে সেটা সমাজের জন্য হুমকিস্বরূপ হতে পারে। এমনকি তারা তখন আরও বেশি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডসহ দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ জঙ্গি তৎপরতার সাথে জড়িয়ে পড়তে পারেন, বিগতদিনে এরকম ঘটনা ঘটেছে।
ঙ। দীর্ঘ সময় ধরে সেনাসদস্যরা ব্যারাকের বাইরে থাকার কারণে নিয়মিত বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, ফায়ারিং, প্যারেড, পিটি, স্টাডি পিরিয়ড, সামাজিক অনুষ্ঠান, গ্রীষ্মকালীন-শীতকালীন মহড়া এসব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সৈনিক জীবনের রুটিন কর্মকাণ্ডের অনুপস্থিতির কারণে পেশাগত দক্ষতা হারিয়ে দূর্বল থেকে দূর্বলতর হয়ে পড়ছে সেনাবাহিনী।
চ। সেনাবাহিনীতে লোকবলের হিসাব, জবাবদিহিতা, শৃঙ্খলা ইত্যাদি নিশ্চিত হয় দৈনিক বা সেন্ট্রাল রোলকল, ব্রিগেড বা ডিভিশন পর্যায়ে দরবার ইত্যাদির মাধ্যমে। দীর্ঘদিন বাইরে থাকার কারণে এসব এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বর্তমানে সেনাবাহিনীর চেইন অভ কমান্ড ঠিকঠাক কাজ করছে কীনা সন্দেহ হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে আবারও মেজর সাদিকের প্রসঙ্গ আসতে পারে। একজন অফিসার কীকরে ১৯৮ দিন মিসিং থাকতে পারে তা বোধগম্য না। তার অনুপস্থিতির বিষয়ে ব্যাটালিয়ন কমান্ডার, ব্রিগেড কমান্ডার, ডিভিশন কমান্ডারসহ ফিল্ড পর্যায়ের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ব্যর্থতা চোখে পড়ে।
২
আমার জানামতে অফিসারদের অনেকেই চান সেনাসদস্যরা ব্যারাকে ফিরে আসুন। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আমিও তাদের সাথে একমত। তবে নির্বাচন কমিশন চাইলে নির্বাচনের সময় পুনরায় সেনা মোতায়েন করা যেতে পারে। সেনাবাহিনীর আরো ক্ষতি হওয়ার পূর্বে এই কাজটা করা উচিত। পুলিশকে স্বাবলম্বী হতে হবে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা পুলিশের কাজ, এটা তাদেরকেই করতে দিন। মাঠ পর্যায়ে সেনা মোতায়েনের সুযোগ নিয়ে এনসিপি’র হাসনাত আব্দুল্লাহ, নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী, হান্নান মাসুদ, সার্জিস আলম ইত্যাদিরা চারদিকে যেসব উস্কানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছেন তার ফলাফল তাদের ভোগ করতে দিন। আমরা দেখেছি গোপালগঞ্জ থেকে তাদেরকে কীভাবে সেনাবাহিনীর এপিসিযোগে পালিয়ে আসতে হয়েছে।
৩
সবশেষে একটাই কথা, সেনাসদস্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে আনুন। তাদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পুনরায় চালু করুন। বাহিনীর বিভিন্ন স্তরে প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজে হাত দিন। ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখের পূর্বে এবং পরে দেশের প্রয়োজনে যেটা করার কথা ছিল সেনাবাহিনী সেটা করেছে। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রাথমিকভাবে যেটা করা দরকার ছিল সেটাও করা হয়েছে। এবার পুলিশ তাদের কাজটা করুক।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১৯ আগস্ট ২০২৫