
১
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি এবং স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সামরিক, অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকে বিশ্বের একমাত্র অপ্রতিরোধ্য পরাশক্তিতে পরিণত হয়। এই সময়কালকে ‘ইউনিপোলার মোমেন্ট’ বলা হয়, যেখানে আন্তর্জাতিক বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত প্রাধান্য পেত। তবে একবিংশ শতাব্দীতে এসে এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা আর আগের মতো শক্তিশালী অবস্থানে নেই। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থাকে এখন অনেকেই ‘মাল্টি পোলার’ বা বহু-মেরুকেন্দ্রিক হিসেবে বর্ণনা করছেন। অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের কারণে বিশ্ব এখন ধীরেধীরে বহুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে, যেখানে একাধিক ক্ষমতাধর রাষ্ট্র বা জোট বৈশ্বিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এর প্রধান কারণ হতে পারে চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং দ্রুত বর্ধনশীল সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক আধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। আবার ভ্লাদিমির পুতিনের নেতৃত্বে রাশিয়া তার হারানো প্রভাব ফিরে পেতে চাইছে এবং পশ্চিমা বিশ্বের এককেন্দ্রিক শাসনের বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নিচ্ছে। এছাড়াও ভারত, ব্রাজিল, জার্মানি, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এমনকি ব্রিকস (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা) এবং সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের মতো জোটগুলো একক পশ্চিমা নিয়ন্ত্রণের বাইরে বিশ্ব শাসনকে ঢেলে সাজানোর কথা বলছে। এছাড়াও চীন, বিশেষকরে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিপুল বিনিয়োগ করে এবং নিজস্ব সাপ্লাই চেইন তৈরি করে মার্কিন নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এটি বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্লক-ভিত্তিক বিভাজন তৈরি করছে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে মেনে নেয়া অসম্ভব। যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোকে সম্প্রসারিত করে ইউরোপ ও এশিয়ার সীমান্তে রাশিয়া ও চীনের প্রভাব সীমিত রাখা এবং বিভিন্ন অঞ্চলে নিজস্ব সামরিক ঘাঁটি ও নৌ উপস্থিতির মাধ্যমে সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছে। বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় ৮০টি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ৭৫০টির বেশি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে বলে জানা যায়। পেন্টাগন সঠিক সংখ্যা না প্রকাশ করলেও জাপানে প্রায় ১২০টি, জার্মানিতে প্রায় ১১৯টি, ইতালিতে প্রায় ৪৪টি, দক্ষিণ কোরিয়াতে প্রায় ১৫টি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। কাতারে অবস্থিত আল-উদেইদ বিমান ঘাঁটি মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম মার্কিন ঘাঁটি (সেন্ট্রাল কমান্ডের ফরওয়ার্ড হেডকোয়ার্টার), এছাড়া বাহরাইন (মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর), কুয়েতের ক্যাম্প আরিফজান (ইউএস আর্মি সেন্ট্রালের অগ্রবর্তী সদর দপ্তর) ও আলি আল সালেম বিমান ঘাঁটি, সংযুক্ত আরব আমিরাত (আল ধাফরা বিমান ঘাঁটি), সৌদি আরব (প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটি), জর্ডান (মুওয়াফাক আল সালতি বিমান ঘাঁটি ও টাওয়ার ২২), ইরাক (আইন আল আসাদ বিমান ঘাঁটি) এবং সিরিয়ায় (আল তানফ গ্যারিসন) সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এসব ঘাঁটি ছাড়াও তুরস্ক, জিবুতি, অস্ট্রেলিয়া, স্পেন, গ্রিস, বুলগেরিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি রয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সামরিক আধিপত্য ও বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণ, কৌশলগত অবস্থান, সন্ত্রাস দমন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর উপর নজরদারি ও চাপ, সামরিক রসদ ও অভিযান পরিচালনা, মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও অর্থনৈতিক স্বার্থ ইত্যাদি কারণে বিভিন্ন দেশে এসব সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে। বাংলাদেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সামরিক ঘাঁটি না থাকলেও কান পাতলে দেশের উপকণ্ঠে ঘাঁটি স্থাপনের গুঞ্জন শোনা যায়। তবে সে প্রসঙ্গে যাবার আগে অন্যপ্রসঙ্গে সামান্য আলোচনা করবো, যেটা নিয়েও প্রায়ই গুঞ্জন শোনা যায়। আর সেটা হলো, Status of Forces Agreement বা SOFA এবং General Security of Military Information Agreement বা GSOMIA নামে দুটো গুরুত্বপূর্ণ সামরিক চুক্তি। এসব নিয়েও বহু বছর ধরে বাংলাদেশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে আলোচনা চলছে। এবার এই দুটা চুক্তির ধরণ এবং যাদের সাথে অনুরূপ চুক্তি রয়েছে তাদের অভিজ্ঞতাটা কীরকম জানা যাক।
ক। Status of Forces Agreement বা SOFA চুক্তি।
প্রথমে SOFA চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছি, এই চুক্তি স্বাক্ষরকারী স্বাগতিক দেশে মার্কিন সামরিক ও বেসামরিক কর্মীদের আইনি অবস্থান, অধিকার ও দায়মুক্তির শর্তাদি নির্ধারণ করে। চুক্তিবলে মার্কিন সামরিক কর্মীরা বিনা ভিসায় বা ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া ছাড়াই হোস্ট দেশে প্রবেশ ও অবস্থান করতে পারে। তবে এই চুক্তির সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হলো, কর্মরত অবস্থায় কেউ কোনো অপরাধ করলে তাদের বিচার বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী না হয়ে মার্কিন সামরিক আইন অনুযায়ী হতে পারে (যা অন্যান্য SOFA চুক্তিবদ্ধ দেশে দেখা যায়)। এটি সরাসরি একটা দেশের জাতীয় বিচারিক সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ণ করে। এক্ষেত্রে জাপানের অভিজ্ঞতা উদাহরণ হিসেবে আসতে পারে, জাপানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির কর্মীদের দ্বারা জাপানি নাগরিকদের বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার নিয়ে জটিলতা একটি দীর্ঘস্থায়ী ও সংবেদনশীল সমস্যা। সেখানে বিচারিক এখতিয়ার নিয়ে বিভিন্ন সময়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। আর এই জটিলতার মূল কারণ জাপান-মার্কিন সামরিক বাহিনীর মর্যাদা চুক্তি (Japan-U.S. Status of Forces Agreement - SOFA)।
SOFA চুক্তি মোতাবেক মার্কিন সামরিক বাহিনীর সদস্যরা যখন ‘সরকারি দায়িত্ব পালনের সময়’ কোনো অপরাধ করেন, তখন মার্কিন কর্তৃপক্ষের একচেটিয়া বিচারিক এখতিয়ার থাকে। আবার সরকারি দায়িত্বের বাইরে সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে জাপানি কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক এখতিয়ার থাকলেও অনেকক্ষেত্রেই মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের এখতিয়ার প্রতিষ্ঠা করতে চায় এবং জাপানের পক্ষ থেকে এখতিয়ার ত্যাগের অনুরোধ করা হয়। এছাড়া মার্কিন সামরিক বাহিনীর সদস্যরা ঘাঁটি থেকে বাইরে কোনো অপরাধ করে যদি ঘাঁটির ভেতরে আশ্রয় নেন, তবে তদন্ত বা আত্মসমর্পণের ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হয়। বিশেষ করে জাপানের ওকিনাওয়াতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে কর্মরত সেনাসদস্যদের দ্বারা ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধসহ অন্যান্য বহু অপরাধের ঘটনা ঘটেছে এবং সেসবের বিচারিক এখতিয়ার নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক ও জনরোষ সৃষ্টি হয়েছে। এক্ষেত্রে দুটা ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। ১৯৯৫ সালে ০৩ জন মার্কিন সেনাসদস্য দ্বারা এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনা সেখানে একটি বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল, যার ফলে SOFA চুক্তি পর্যালোচনার দাবি ওঠে। এছাড়াও ২০১৬ সালে একজন প্রাক্তন মার্কিন মেরিন সেনা ও সামরিক ঠিকাদার দ্বারা একজন জাপানী তরুণী খুন ও ধর্ষণের ঘটনা সেখানে জন-আন্দোলনের জন্ম দেয়। এসবের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে জাপানি জনমনে ক্ষোভ রয়েছে। অনুরূপভাবে দক্ষিণ কোরিয়া এবং ফিলিপাইনের সাথেও এই চুক্তি নিয়ে সমস্যা হয়েছিল। ২০০২ সালে সিউলের কাছে মার্কিন সামরিক বাহিনীর গাড়ির ধাক্কায় ০২ জন কোরীয় স্কুলছাত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় মার্কিন সামরিক ট্রাইব্যুনাল ০২ সেনাকে খালাস দিলে দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন সামরিক ঘাঁটির বিরুদ্ধে বিশাল বিক্ষোভ হয়েছিল। তারা এটিকে তাদের সার্বভৌমত্বের ওপরে আঘাত বলে দাবী করে। ফিলিপাইনের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের SOFA চুক্তি না থাকলেও প্রায় একইরকম Visiting Forces Agreement বা VFA চুক্তি রয়েছে। এটিও মার্কিন সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মর্যাদা নির্ধারণকারী চুক্তি, যা SOFA-এর মতোই কাজ করে। এই চুক্তির কারণে ফিলিপাইনে মার্কিন সেনাদের উপস্থিতি এবং অপরাধের বিচার নিয়ে বিতর্ক বহু বছর ধরে চলে আসছে। বিশেষ করে ২০১৫ সালে একজন ফিলিপিনো রূপান্তরকামী নারীকে হত্যার দায়ে এক মার্কিন মেরিন সেনার কারাদণ্ড হলে চুক্তি অনুযায়ী সেনাসদস্যটিকে ফিলিপাইনের কারাগারে রাখা হবে নাকি মার্কিন হেফাজতে রাখা হবে, তা নিয়ে কূটনৈতিক জটিলতা সৃষ্টি হয়েছিল। আফগানিস্তানেও SOFA চুক্তি নিয়ে চরম বিতর্ক ছিল, কারণ সেখানে মার্কিন কর্মীদের Immunity দেয়া নিয়ে আফগান সরকার ও জনগণের আপত্তি ছিল। আফগানিস্তান সরকার, বিশেষ করে প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই, মার্কিন বাহিনীর দ্বারা বেসামরিক নাগরিক হত্যার ঘটনায় অত্যন্ত সোচ্চার ছিলেন। এভাবে SOFA চুক্তিবদ্ধ দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে, Immunity’র কারণে বা SOFA চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন কর্মীরা ফৌজদারি মামলা থেকে দায়মুক্তি পেলে, তারা স্থানীয় আইন লঙ্ঘন করেও দেশের বিচার ব্যবস্থার মুখোমুখি নাও হতে পারে। এটি জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া বা ফিলিপাইনের মতো বাংলাদেশের বিচারিক সার্বভৌমত্বের জন্যও চরম অবমাননাকর হতে পারে।
খ। General Security of Military Information Agreement বা GSOMIA চুক্তি।
এবারে আসি General Security of Military Information Agreement, সংক্ষেপে GSOMIA চুক্তি প্রসঙ্গে। GSOMIA চুক্তি হলো স্বাক্ষরকারী দুই দেশের মধ্যে সামরিক তথ্য ও উপাত্ত আদান-প্রদান এবং তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার শর্ত। সামরিক গোয়েন্দা তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করা হলেও, এই চুক্তি বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিয়মিতভাবে সরবরাহ করার পথ উন্মুক্ত করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে মার্কিন প্রভাব বাড়াতে পারে। এই চুক্তি নিয়ে স্বাক্ষরিত দেশগুলোর মধ্যে সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নয়, বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান এশীয় মিত্র—দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপানের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার এই দুই মিত্রদেশের মধ্যে সামরিক গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের জন্য একটি ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তা কাঠামোর (US-Japan-South Korea trilateral security cooperation) অত্যন্ত প্রয়োজনীয় অংশ হিসেবে GSOMIA-কে দেখে। যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তির একটি পক্ষ না হলেও, এটি ছিল তাদের উত্তর কোরিয়া ও চীনের মতো আঞ্চলিক হুমকি মোকাবিলায় ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা জোটকে শক্তিশালী করার একটি প্রচেষ্টা। যখন জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে, তখন যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি বাতিল না করার জন্য দু’দেশের উপর চাপ প্রয়োগ করেছিল। বিশেষ করে জাপান ২০১৯ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত সামগ্রী রপ্তানির উপর বিধিনিষেধ আরোপ করলে এই দু’দেশের মধ্যে তীব্র বাণিজ্য বিরোধ সৃষ্টি হয়। এই বিরোধের প্রতিক্রিয়ায় ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে দক্ষিণ কোরিয়া সরকার ঘোষণা করে যে তারা GSOMIA চুক্তির স্বয়ংক্রিয় নবায়নের প্রক্রিয়া স্থগিত করবে। দক্ষিণ কোরিয়া সেসময় এই চুক্তিটিকে জাপানের উপর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল। কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়ার এই সিদ্ধান্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে চরম উদ্বেগে ফেলে দেয়, কারণ তারা মনে করেছিল যে GSOMIA বাতিল হলে উত্তর কোরিয়ার হুমকি মোকাবিলায় ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তা সহযোগিতা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং পুরো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। মার্কিন কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে দক্ষিণ কোরিয়াকে চুক্তিটি বহাল রাখার আহ্বান জানান।
২০২০-২০২৩ সালের মধ্যে রাজনৈতিক পরিবেশ পরিবর্তনের ফলে এবং উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার প্রতিক্রিয়ায় দক্ষিণ কোরিয়া ২০২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিটিকে 'স্বাভাবিক' অবস্থায় ফিরিয়ে আনে, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার দুই মিত্রের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা আবার জোরদার হয়। এভাবে GSOMIA নিয়ে জটিলতাটি ছিল মূলত জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের কারণে, কিন্তু এর পরিণতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক নিরাপত্তা কৌশলে গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল। এজন্য SOFA বা GSOMIA চুক্তি করার ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থকে অবশ্যই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে বিচারিক দায়মুক্তির শর্তটি কঠোরভাবে বাংলাদেশের পক্ষে রাখতে হবে, যাতে কোনো মার্কিন কর্মকর্তা বা সেনা অপরাধ করলে বাংলাদেশের আদালতে তার বিচার হতে পারে। এক্ষেত্রে ইরাকের উদাহরণ থেকে অভিজ্ঞতা নেয়া যেতে পারে। ২০০৮ সালে ইরাকের সাথে স্বাক্ষরিত SOFA চুক্তিতে ইরাককে মার্কিন সামরিক কর্মীদের উপর প্রাথমিক বিচারিক এখতিয়ার প্রয়োগের ক্ষমতা দেয়া হয় (সরকারি দায়িত্বের বাইরে সংঘটিত গুরুতর অপরাধের জন্য)। এই শর্তটি সেসময়ে আলোচনার একটি বড় বিষয় ছিল, কেননা এটি ছিল অন্যান্য দেশের সাথে স্বাক্ষরিত SOFA চুক্তির ব্যতিক্রম। তবে এটা ঠিক, সামরিক সহযোগিতার নামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে SOFA বা GSOMIA চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংক্রান্ত স্পর্শকাতর সিদ্ধান্তগুলোতে মার্কিন প্রভাব বাড়বে, যা দেশের নিজস্ব বা স্বাধীন প্রতিরক্ষা নীতিকে প্রভাবিত করতে পারে।
২
ফিরছি মূল প্রসঙ্গে, বাংলাদেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের গুজব একটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিতর্ক এবং জনমনে উদ্বেগের বিষয়। এই গুজবের সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ উল্লেখ করা বেশ কঠিন, কারণ বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির পরিবর্তনের সাথে সাথে বারবার এটি আলোচনায় ফিরে এসেছে। খ্যাতিমান বাংলাদেশী অনুসন্ধানী সাংবাদিক সেলিম সামাদ-এর ‘Fears of an American base at Saint Martin's Island kicks fresh row in Bangladesh politics’ প্রবন্ধ অনুসারে এরকম গুজব প্রথম শোনা যায় ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি। পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে অসন্তোষ জাগাতে উগ্র বামপন্থী ছাত্ররা সেসময় গুজব ছড়িয়েছিল যে তিনি ভারতকে মোকাবিলা করার জন্য সেন্ট মার্টিন দ্বীপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের জন্য ইজারা দিয়েছেন। ‘সেন্ট মার্টিন’ দ্বীপের নামটা এভাবেই প্রথম আলোচনায় আসে, এরপর আরেক গুজবে যোগ হয় ‘মনপুরা দ্বীপ’-এর নাম। রাজনৈতিক ইতিহাসবিদ ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ সম্ভবত প্রথম আলো-কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারিতে গুজবটা শোনা গিয়েছিল বলে জানান। তার বক্তব্য অনুসারে, সেই সময়কার বিরোধীদলীয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে পাকিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত জোসেফ সিম্পসন ফারল্যান্ডের আলোচনার পর, চীনপন্থী বাম/মাওবাদী দলগুলো প্রচারপত্র ছাপিয়ে গুজব ছড়ায় যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের বিনিময়ে ভোলা জেলার মনপুরা দ্বীপ আমেরিকাকে দেয়া হবে।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনকালেও বাংলাদেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের গুজব বা বিতর্কটি অব্যাহত ছিল এবং সেসময়ের রাজনৈতিক আলোচনায় বিষয়টা বারবার ফিরে এসেছিল। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট জিয়া যখন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বিশেষ অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন। তিনি সেসময়, অর্থাৎ ২৭ আগস্ট ১৯৮০ তারিখে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের সাথে সাক্ষাৎ করেন। প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে দু’দেশের সম্পর্ক উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। স্নায়ুযুদ্ধ চলমান বিশ্বে সেসময় অনেক দেশই নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মার্কিন অথবা সোভিয়েত বলয়ের মধ্যে যে কোনো একটির সাথে সম্পর্ক জোরদার করার কথা ভাবছিল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, প্রেসিডেন্ট জিয়া’র শাসনামলে মুক্তিযুদ্ধকালীন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের বদলে ভারত-বাংলাদেশের মাঝে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক ইস্যুতে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং ইস্যুভিত্তিক বিরোধের কারণে বাংলাদেশ ভারতের দিক থেকে আঞ্চলিক জলসম্পদ (ফারাক্কা), সমুদ্রসীমা (তালপট্টি) এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাজনিত (সামরিক অভ্যুত্থান) চাপের মুখে ছিল। এছাড়াও ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখের মতো, ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ তারিখে ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর দেশের অভ্যন্তরে শক্তিশালী ভারতবিরোধী মনোভাব তৈরি হয়। প্রেসিডেন্ট জিয়া’র সরকার ভারতের সামরিক চাপ, জনগণের মতের প্রতিফলন এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে জোটনিরপেক্ষ অবস্থান বা ন্যাম থেকে সরে এসে পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে সামরিক সম্পর্ক বা জোট গঠনের বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে শুরু করেছিল। এছাড়াও তিনি পশ্চিমা এবং মুসলিম দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক জোরদার করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেন, যা ভারতের ‘আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী’ মনোভাবের বিরুদ্ধে গিয়েছিল। তার এসব উদ্যোগের কারণে দেশের ভেতরে বিদেশি শক্তির সামরিক উপস্থিতির বিষয়ে জল্পনা-কল্পনা তৈরি হয়। এসময় সেন্ট মার্টিন দ্বীপ নতুন করে আলোচনায় ফিরে আসে। ১৮ ডিসেম্বর ১৯৮০ তারিখে তাই ‘সেন্ট মার্টিনে কাউকে নৌ-ঘাঁটি স্থাপন করতে দেওয়া হবে না’ শিরোনামে দৈনিক বাংলায় সংবাদ প্রকাশিত হয়। এই সংবাদে তৎকালীন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছিল, যেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অভিযোগের জবাবে বলা হয়েছিল, সেন্ট মার্টিন দ্বীপে কোনো দেশকে নৌ-ঘাঁটি স্থাপন করার অনুমতি দেয়া হয়নি। তবে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করার অনুমতি দেয়া হোক বা না হোক, দুই রাষ্ট্রপ্রধানের মাঝে আলোচনার বিষয়বস্তু যে তালপট্টি দ্বীপের ঘটনায় সরকারের শক্ত সামরিক অবস্থান গ্রহণের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছিল তা সহজেই আন্দাজ করা যায়। কি ছিল সেই ঘটনা?
১৯৭০ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পর বঙ্গোপসাগরের হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর মোহনায়, সাতক্ষীরা’র শ্যামনগর উপজেলার দক্ষিণে একটা দ্বীপ জেগে ওঠে। বাংলাদেশ এই দ্বীপটিকে দক্ষিণ তালপট্টি নামে নিজেদের অংশ বলে দাবি করে কারণ রেডক্লিফ রোয়েদাদ অনুযায়ী সীমান্ত বিভাজক হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর মূল স্রোতধারার মধ্যরেখা দ্বীপটির পশ্চিম দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। কিন্তু ভারত দ্বীপটিকে নিউ মুর আইল্যান্ড বা পূর্বাশা দ্বীপ নামে তাদের অংশ বলে দাবি করে এবং ৯ মে ১৯৮১ তারিখে (কিছু সূত্র ১১ মে ১৯৮১ তারিখে নৌ-ঘাঁটি স্থাপনের কথা উল্লেখ করে) নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ, আইএনএস সন্ধ্যায়ক পাঠিয়ে পতাকা ওড়ায়। দক্ষিণ তালপট্টিতে এভাবে ভারতের জাতীয় পতাকা ওড়ানোর ফলে বাংলাদেশে তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং ভারতের সামরিক উপস্থিতির জবাবে নৌবাহিনী’র দুটি গানবোট পাঠিয়ে পাল্টা অবস্থান নেয়। এভাবে ০৩ দিন ধরে মুখোমুখি অবস্থানের পর ভারত সেনা প্রত্যাহার করে এবং দু’দেশের মাঝে কূটনৈতিক আলোচনার পর দ্বীপটিকে ‘নো-ম্যানস ল্যান্ড’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে দৃঢ় অবস্থান নেয়ায় সেসময় দ্বীপটি ভারতীয় দখলমুক্ত করা সম্ভব হয়েছিল। তবে ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতের পর দ্বীপটি সম্পূর্ণভাবে সমুদ্রের নিচে ডুবে গেছে। ২০১০-১১ সালের দিকে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেন যে দ্বীপটি আর নেই। এরফলে এর উপরকার ভূখণ্ডগত বিতর্কটি শেষ হয়ে গেছে।
ফিরে আসি আগের কথায়, ২৭ আগস্ট ১৯৮০ সালে দু’দেশের রাষ্ট্র প্রধানের মাঝে আলোচনায় প্রেসিডেন্ট জিয়া যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের আহ্বান জানিয়েছিলেন বলে শোনা যায়, তবে এর কোন দালিলিক তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিংবা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন নিয়ে দু’দেশের মাঝে আলোচনা হলেও ৮মাস পর, ৩০ মে ১৯৮১ তারিখে সামরিক ক্যুতে প্রেসিডেন্ট জিয়া নিহত হলে মার্কিন সরকারের সাথে সেই আলোচনা আর এগোয়নি বলে ধারণা করা যায়। পরবর্তীতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ভারতপন্থী সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকায় এসব আলোচনা আর আলোর মুখ দেখেনি। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় পরাশক্তিগুলোর মাঝে বঙ্গোপসাগরে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা থেকে সেন্ট মার্টিন দ্বীপে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের গুজব পুনর্জীবিত হয়েছে। এই আলোচনাটি সবচেয়ে বেশি জোরালো হয় যখন ২০২৩ সালের জুন মাসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অভিযোগ করেন, একটি বিদেশি শক্তি (অনেকে যাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বলে মনে করেন) সেন্ট মার্টিন দ্বীপ সামরিক ঘাঁটির জন্য পেতে চেয়েছিল, যার বিনিময়ে তাকে নির্বাচনে জয়লাভের প্রস্তাব দেয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে। তবে গুজব কিংবা বাস্তবতা যাই হোক না কেন, সামরিক ঘাঁটি হিসেবে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের নাম আলোচনায় আসার কারণ হতে পারে:
ক। কৌশলগত অবস্থান।
প্রায় ৮ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের সেন্ট মার্টিন দ্বীপটি উত্তর-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত। টেকনাফ থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং মিয়ানমারের উপকূল থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে নাফ নদীর মোহনায় অবস্থিত এই দ্বীপটা মালাক্কা প্রণালী ঘেঁষা গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্য রুটের কাছাকাছি। একটি সামরিক বা নৌ-পোস্ট স্থাপনের মাধ্যমে এই দ্বীপ থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মালয়েশিয়া উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত সমুদ্রপথে চীনের গতিবিধির উপর ইলেক্ট্রনিক নজরদারি চালানো সহজ হতে পারে। এছাড়াও দ্বীপটা ছোট নৌযান বা বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের ফরোয়ার্ড অপারেটিং বেস হিসেবে কাজ করতে পারে, যা যেকোনো মানবিক সহায়তা, দুর্যোগ ত্রাণ বা নৌ-মহড়ার সময় জরুরি লজিস্টিক সাপোর্ট দিতে সক্ষম। এই দ্বীপ ব্যবহার করে কোনো বহিঃশক্তি বাংলাদেশের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারলে, তা একদিকে যেমন ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগকে বাড়িয়ে তুলবে, তেমনি চীনের আঞ্চলিক স্বার্থেও প্রভাব ফেলবে। তবে বাংলাদেশ সরকার ১৯৮০ সাল থেকে বরাবরই বলে আসছে যে তারা কোনো দেশের সামরিক জোটের অংশ নয় এবং সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের জন্য কাউকে ইজারা দেয়া হবে না।
খ। ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা।
বঙ্গোপসাগর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ভারত-এর প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এর কারণ বিশ্বের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি পণ্যবাহী কনটেইনার বঙ্গোপসাগরের জলপথ দিয়ে চলাচল করে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি তেল এবং এশিয়া থেকে ইউরোপ-আমেরিকার পণ্য পরিবহনে এটি গুরুত্বপূর্ণ। 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' এর অংশ হিসেবে চীন এই অঞ্চলে শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা এবং মিয়ানমারের কিয়াউকফিউ বন্দরের অবকাঠামোতে বড় আকারের বিনিয়োগ করেছে। এর কারণ চীন এই অঞ্চলে তাদের অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বাড়াতে চায়, যা 'স্ট্রিং অফ পার্লস' কৌশল নামেও পরিচিত। অন্যদিকে বঙ্গোপসাগর ভারতের পূর্বাঞ্চলের উপকূলীয় নিরাপত্তা এবং 'অ্যাক্ট ইস্ট' নীতির জন্য অত্যাবশ্যক। আর তাই আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ নৌঘাঁটি রয়েছে। ভারত এবং চীনের আগ্রহের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র যে কৌশল প্রণয়ন করেছে তা 'Free and Open Indo-Pacific' (FOIP) কৌশল নামে পরিচিত। এই কৌশলটির মূল লক্ষ্য ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলকে ‘মুক্ত ও উন্মুক্ত’ রাখা। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথের স্বাধীনতা বজায় রাখা এবং এই অঞ্চলে কোনো একক দেশের (বিশেষত চীন) সামরিক বা অর্থনৈতিক প্রভাবের একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি হওয়া রোধ করা। সেন্ট মার্টিন দ্বীপ এই কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনেকরেন।
গ। দ্বীপের সামরিক উপযোগিতা নিয়ে বিতর্ক।
অনেক সামরিক বিশেষজ্ঞ মনেকরেন সেন্ট মার্টিন একটি প্রবাল দ্বীপ এবং এর আয়তন ও গভীরতা কম হওয়ায় এখানে একটি পূর্ণাঙ্গ বিমান বা নৌ-ঘাঁটি তৈরি করা কঠিন। ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই দ্বীপের সামরিক উপযোগিতা নিয়ে যেসব বিতর্ক রয়েছে তাকে আধুনিক প্রকৌশল এবং কৌশলগত দূরদর্শিতার আলোকে বিশ্লেষণ করলে এর সম্ভাবনাময় ও ইতিবাচক দিকগুলি বিশেষভাবে উঠে আসে। কেননা সেন্ট মার্টিন দ্বীপ আকারে ছোট হলেও এর স্ট্র্যাটেজিক অবস্থান একে অমূল্য করে তোলে, দ্বীপটি বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্বাংশে এবং আন্তর্জাতিক শিপিং লেনগুলির কাছাকাছি অবস্থিত। এর সামরিক উপযোগিতা একটি পূর্ণাঙ্গ ঘাঁটির চেয়ে বরং 'ফরওয়ার্ড সেন্সর প্ল্যাটফর্ম' হিসেবে অনেকবেশি গ্রহণযোগ্য। এখান থেকে ইলেকট্রনিক নজরদারি (ISR - Intelligence, Surveillance, Reconnaissance) চালানো সম্ভব। এখানে পূর্ণাঙ্গ ঘাঁটি তৈরি করা কঠিন হলেও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ছোট নজরদারি ড্রোন (UAV/UAS) বা ফাস্ট অ্যাটাক ক্রাফট (FAC)-এর জন্য লজিস্টিক সাপোর্ট পয়েন্ট হিসেবে কাজ করতে পারে। তাছাড়া দ্বীপটির প্রাকৃতিক সীমাবদ্ধতা আধুনিক প্রযুক্তির কাছে কোন বাধা নয়, সামরিক উপযোগী করে তোলার জন্য ড্রেজিং করে দ্বীপের চারপাশের জলরাশি বা মহীসোপানকে গভীর করা সম্ভব। যা ছোট ও মাঝারি আকারের পেট্রোল ভেসেলস ভেড়ার জন্য সুবিধাজনক ডকিং ফ্যাসিলিটি তৈরি করবে। চাইলে ড্রেজ করা মাটি ব্যবহার করে এই দ্বীপের ভূমির আয়তন বাড়ানো সম্ভব। এটি সীমিত পরিসরে হলেও হেলিপ্যাড বা ভার্টিক্যাল টেক-অফ/ল্যান্ডিং এয়ারক্রাফটের জন্য রানওয়ে তৈরি করার জায়গা দিতে পারে।
প্রবাল প্রাচীরকে শক্তিশালী এবং সংরক্ষিত করে দ্বীপটিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা যেতে পারে, যা সামরিক স্থাপনার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে। এছাড়াও দ্বীপের স্থলভাগের আয়তন না বাড়িয়ে এর আশেপাশে ফ্লোটিং ডক বা মোবাইল সি বেস স্থাপন করাও সম্ভব।
সেন্ট মার্টিন দ্বীপ মধ্যপ্রাচ্যের ‘আল উদেইদ বিমানঘাঁটি’-এর মতো বিশাল আমেরিকান বা চীনা নৌ-ঘাঁটি না, বরং এর উপযোগিতা হতে পারে 'মাল্টি-পারপাস' এবং 'ডিফেন্সিভ'। এটি চোরাচালান, অবৈধ মাছ ধরা এবং মানব পাচারের মতো অপরাধমূলক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে নজরদারি জোরদার করার একটি অত্যন্ত কার্যকর কেন্দ্র হতে পারে। বঙ্গোপসাগরে যেকোনো বড় দুর্যোগ বা দুর্ঘটনার সময় দ্বীপে স্থাপিত ঘাঁটি দ্রুত অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ফরোয়ার্ড বেস হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে কোনো পরাশক্তি সামরিক বা দ্বৈত-ব্যবহারের উদ্দেশ্যে এই দ্বীপের অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়তা করলে সেটি বাংলাদেশের সাথে তাদের দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত অংশীদারিত্বের শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত হবে। সেন্ট মার্টিন দ্বীপের সামরিক উপযোগিতা বা এখানে ঘাঁটি স্থাপন দ্বীপের আকারের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, কৌশলগত অবস্থান এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য দ্বারা নির্ধারিত হবে।
৩
সেন্ট মার্টিন দ্বীপে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য নিরাপত্তা নাকি সার্বভৌমত্বের ঝুঁকি, এই দুইয়ের মাঝে জটিল এবং স্পর্শকাতর সমীকরণ তৈরি করেছে। নিরাপত্তা সহযোগিতা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি ও আধুনিকীকরণে সহায়ক। কিন্তু সামরিক ঘাঁটির মতো স্থায়ী উপস্থিতি দেশের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি (সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও প্রতি শত্রুতা নয়) এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মার্কিন সেনাবাহিনীর সাথে যৌথ প্রশিক্ষণ বা শুভেচ্ছা সফরসহ যেকোনো ধরনের সামরিক উপস্থিতি বা স্থায়ী ঘাঁটির সম্ভাবনা সবসময়ই দ্বিমুখী বিতর্কের জন্ম দেয় তাতে কোন সন্দেহ নেই। কেননা এতে একদিকে যেমন বৃহত্তর নিরাপত্তার হাতছানি থাকে, আবার অনেকের মতে এরফলে দেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। তাই যেকোনো সামরিক চুক্তি বা উপস্থিতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। এই জটিল এবং স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
ক। নিরাপত্তা বৃদ্ধির পক্ষে যুক্তি।
মার্কিন সামরিক উপস্থিতির পক্ষে যে 'নিরাপত্তা'র যুক্তিগুলো দেয়া হয়, তা মূলত বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান এবং আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে উদ্ভূত। মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বা স্থায়ী সামরিক অবকাঠামো স্থাপনের পক্ষের সমর্থকরা এটিকে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং কৌশলগত অবস্থান সুসংহত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখেন। এরকম মনেহবার কারণ:
(১) কৌশলগত সক্ষমতা বৃদ্ধি ও বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা: মার্কিন সামরিক ঘাঁটির সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো বাংলাদেশের সামরিক শক্তির দ্রুত আধুনিকীকরণ। ঘাঁটির বিনিময়ে বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর জন্য অত্যাধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি, নেভাল প্ল্যাটফর্ম (যেমন- ফ্রিগেট বা করভেট) এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় বা অনুদান হিসেবে পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পেতে পারে। যৌথ সামরিক মহড়া, প্রশিক্ষক এবং ঘাঁটির মাধ্যমে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত দক্ষতা নিঃসন্দেহে বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। এটি শুধুমাত্র যুদ্ধকালীন সক্ষমতা নয় বরং মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় দ্রুত ও কার্যকর সাড়া দেয়ার ক্ষমতা বাড়াবে। বঙ্গোপসাগরে আঞ্চলিক জলদস্যুতা, অবৈধ মাছ ধরা এবং মাদক চোরাচালান দমনে মার্কিন নৌ-বাহিনীর সরাসরি উপস্থিতি বাংলাদেশের এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন বা মহীসোপানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।
(২) আঞ্চলিক ভারসাম্য ও কৌশলগত সুবিধা: ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মার্কিন উপস্থিতি বাংলাদেশকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘কৌশলগত প্লেয়ার’-এ পরিণত করতে পারে। বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে চীন ও ভারতের মতো বৃহৎ শক্তির প্রভাব যখন ক্রমশ বাড়ছে, তখন মার্কিন উপস্থিতি এই দুই পরাশক্তির প্রভাবের মাঝে বাংলাদেশকে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করবে। এটি বাংলাদেশকে কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এড়িয়ে নিজের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করার সুযোগ তৈরি করে দেবে। বাংলাদেশ যেহেতু বঙ্গোপসাগর এবং ভারত মহাসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত, তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 'ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক' কৌশলে অংশীদার হওয়ার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের স্বাধীনতা রক্ষায় বাংলাদেশের ভূমিকা বাড়বে এবং বৈশ্বিক অঙ্গনে গুরুত্ব বৃদ্ধি পাবে।
(৩) অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সুবিধা: সামরিক উপস্থিতি কোন দেশের জন্য শুধুমাত্র সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সুবিধাও নিয়ে আসে। ঘাঁটি বা সহায়ক সামরিক অবকাঠামো স্থাপনের জন্য সেখানে রাস্তা, বন্দর, বিদ্যুৎ সরবরাহসহ অন্যান্য বেসামরিক অবকাঠামো উন্নত করা হয়। যা স্থানীয় অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হওয়ার সুযোগ তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রভাবশালী সামরিক মিত্রের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে (যেমন- জাতিসংঘ, বিশ্ব ব্যাংক) বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান ও দর কষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে পারে। এটি বিভিন্ন বৈশ্বিক ইস্যুতে বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন লাভে সহায়ক হতে পারে। বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ ও আঞ্চলিক চরমপন্থার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক এবং গোয়েন্দা সহযোগিতা পাওয়া গেলে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলা আরও সহজ হবে।
খ। সার্বভৌমত্বের ঝুঁকির পক্ষে যুক্তি।
অন্যদিকে সমালোচক ও বিশ্লেষকদের একটি অংশ বাংলাদেশে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে দেখেন। তাদের মতে,
(১) জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন: যেকোনো বিদেশি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের ফলে স্বাগতিক দেশের ওপর বিদেশি শক্তির প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। এরফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্তরাষ্ট্রের পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের ঝুঁকি তৈরি হয়। এছাড়াও ঘাঁটিতে মোতায়েনকৃত মার্কিন সেনাদের জন্য বিশেষ আইনি সুবিধা (SOFA-এর মতো চুক্তি) দিতে হতে পারে, যা দেশের প্রচলিত আইন ও বিচার ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এবং সার্বভৌমত্বের ধারণাকে দুর্বল করতে পারে। SOFA বা GSOMIA চুক্তি নিয়ে বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা ইতঃপূর্বে আলোচনা করেছি।
(২) আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা ও সংঘাতের ঝুঁকি: চীন ও ভারত উভয়ের সাথেই বাংলাদেশ ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার নীতি গ্রহণ করেছে ('সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব')। মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপিত হলে চীন এটিকে সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখতে পারে এবং ভারতও তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিরাপত্তার জন্য উদ্বিগ্ন হতে পারে। এরফলে বাংলাদেশের নিরপেক্ষ অবস্থান ভেঙে যাবে এবং আঞ্চলিক পরাশক্তির দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এতে বাংলাদেশের সঙ্গে এই দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হতে পারে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে পারে। এমনকি এরফলে পরাশক্তির দ্বন্দ্বে বাংলাদেশ একসময় 'প্রক্সি ওয়ার'-এর কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে, যা সুদানের মতো বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাকে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করতে পারে।
(৩) অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও প্রতিক্রিয়া: বাংলাদেশের উচিত ভারসাম্যমূলক সামরিক সহযোগিতা’র মডেল অনুসরণ করা, যা ঘাঁটি স্থাপনকে এড়িয়ে চলে। কেননা সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতি দেশের জনগণের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে পারে। বিদেশি সামরিক উপস্থিতির বিরোধিতা করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে বামপন্থী গোষ্ঠীগুলো প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে, যা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। বাংলাদেশকে চীন, ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সতর্ক ‘স্ট্র্যাটেজিক হেজিং’ নীতি বজায় রাখতে হবে। এই অবস্থানের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও সামরিক সুবিধা নেয়া হবে কিন্তু কোনো পক্ষকেই দেশের ভূখণ্ড বা সমুদ্রসীমা স্থায়ী সামরিক স্বার্থে ব্যবহার করতে দেয়া হবে না। বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা নির্দেশ করে যে, মার্কিন সামরিক উপস্থিতি সাময়িক নিরাপত্তা সহযোগিতা দিলেও স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি’র মাধ্যমে বিচারিক দায়মুক্তি নিশ্চিতভাবে জাতীয় সার্বভৌমত্বের জন্য এক বড় ঝুঁকি হতে পারে।
গ। মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বা ঘাঁটি স্থাপনের কারণে সৃষ্ট সার্বভৌমত্বের ঝুঁকিগুলি প্রশমিত করতে বাংলাদেশ তার নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি (‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’) এবং জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্রে রেখে একটি ‘স্ট্র্যাটেজিক হেজিং’ মডেল অনুসরণ করতে পারে:
(১) আইনি ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা: যে কোনো সামরিক চুক্তি বা উপস্থিতির ক্ষেত্রে আইনি কাঠামো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন সেনাদের জন্য SOFA-এর মাধ্যমে দেয়া বিচারিক দায়মুক্তি সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করতে হবে অথবা এটিকে অত্যন্ত সীমিত করতে হবে। ইরাকের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনুরূপ চুক্তিটি আরও যুগোপযোগী করে গুরুতর অপরাধের বিচার অবশ্যই বাংলাদেশের প্রচলিত আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। স্থাপিত সকল অবকাঠামো ও ঘাঁটির স্থায়ী মালিকানা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই শর্তহীনভাবে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের আইনি বাধ্যবাধকতা রাখতে হবে। যেকোনো চুক্তি চুড়ান্ত করার আগে তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা এবং জাতীয় সংসদে আলোচনা ও অনুমোদনের মাধ্যমে জনগণের সম্মতি নিশ্চিত করা উচিত যাতে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্ক প্রশমিত হয়।
(২) কৌশলগত সুবিধার ওপর জোর দেয়া: সামরিক উপস্থিতিকে দেশের অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা। সামরিক উপস্থিতির বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুধুমাত্র সরঞ্জাম নয়, বরং বৃহৎ অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের নিশ্চয়তা আদায় করতে হবে। যে কোনো অবকাঠামো (যেমন- বন্দর, রানওয়ে) এমনভাবে নির্মাণ করতে হবে, যেন তা সামরিক ব্যবহারের পাশাপাশি বেসামরিক বিমান ও বাণিজ্যিক জাহাজের জন্যও উন্মুক্ত থাকে। এতে সামরিক স্থাপনার একচেটিয়া বৈশিষ্ট্য কমে আসে এবং জাতীয় উপযোগিতা বাড়ে।
(৩) আঞ্চলিক ভারসাম্য বজায় রাখা: আঞ্চলিক পরাশক্তিদের (চীন ও ভারত) উদ্বেগকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে নিরপেক্ষ অবস্থান ধরে রাখতে হবে। স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের পরিবর্তে, সীমিত মেয়াদের জন্য যৌথ প্রশিক্ষণ সুবিধা বা লজিস্টিক হাব হিসেবে ব্যবহারের অনুমতি দেয়া যেতে পারে, যা সরাসরি সামরিক ঘাঁটির মতো ক্ষমতা বিস্তার করবে না। এর পাশাপাশি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নয়, চীন (অর্থনৈতিক ও অবকাঠামো) এবং ভারত (সীমান্ত ও প্রতিরক্ষা)-এর সাথেও সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বজায় রাখতে হবে। এটি ভারসাম্যের নীতিকে শক্তিশালী করবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, চীন থেকে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় এবং ভারতের সাথে নিয়মিত মহড়া কিংবা প্রশিক্ষণ বিনিময় কার্যক্রমের মাধ্যমে ভারসাম্য রক্ষা করা যেতে পারে। চীন এবং ভারতের উদ্বেগ দূর করতে নিচে উল্লেখিত ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে।
(ক) ভারতে নিরাপত্তা ভীতি কমানোর কৌশল: বাংলাদেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের ফলে এ অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি পেলে ভারতের নিরাপত্তা ভীতি কমানোর জন্য প্রয়োজন হবে কৌশলগত স্বচ্ছতা, যৌথ সহযোগিতা এবং আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক নিশ্চয়তা। ভারতের ভীতির মূল কারণ হতে পারে তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নৈকট্য এবং বঙ্গোপসাগরে শক্তির ভারসাম্যের সম্ভাব্য পরিবর্তন। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই প্রাথমিক ও চূড়ান্ত চুক্তির সকল শর্তাবলী (বিশেষত ঘাঁটির প্রকৃতি ও উদ্দেশ্য) নিয়ে ভারতের সাথে উচ্চ-স্তরের কূটনৈতিক আলোচনা শুরু করতে হবে। ভারতকে এই মর্মে সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা দিতে হবে যে এই ঘাঁটি বা সুবিধা কেবল মানবিক সহায়তা, দুর্যোগ সাড়া, সন্ত্রাস দমন এবং বঙ্গোপসাগরে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য ব্যবহৃত হবে এবং এটি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য কোনো প্রকার হুমকি তৈরি করবে না। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যাতে পারে, গত ১৯ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভের সপ্তম সম্মেলনে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগকে আমলে নিয়ে সব ধরনের সন্ত্রাসবাদের প্রতি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আমরা কোনো বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ শক্তিকে আমাদের সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা এবং মঙ্গলকে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ দিতে পারি না।’ তিনি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বলেন যে, বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সীমান্তের অন্য দিকে যে কেউ থাকুক না কেন, তাদের সাথে যোগাযোগ বজায় রাখবে। তিনি স্পষ্ট করে আরও বলেন, ‘কে কী বললো, তাতে কিছু যায় আসে না’, কারণ দেশের স্বার্থে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও লালমনিরহাটকে কেন্দ্র করে অবৈধ পুশ-ইন বা কৌশলগত অবস্থানের মতো ঘটনায় তিনি দেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ ও যথাযথ আন্তর্জাতিক চ্যানেলে সমস্যার সমাধানের পক্ষে তার অবস্থান তুলে ধরেছেন। তিনি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করে বলেন যে, বাংলাদেশের নীতি হলো দেশের ভূখণ্ডকে কোনোভাবেই এমন কাজে ব্যবহার করতে দেয়া হবে না যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা বা স্থিতিশীলতাকে বিঘ্নিত করে। বাংলাদেশকে এরকম দৃঢ় অবস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়মিত ত্রিপক্ষীয় সামরিক মহড়া (বাংলাদেশ-ভারত-যুক্তরাষ্ট্র) আয়োজন করে এবং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এই সহযোগিতামূলক পদক্ষেপগুলি নিশ্চিত করবে যে মার্কিন উপস্থিতি আঞ্চলিক আধিপত্যের পরিবর্তে সহযোগিতা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে, যা শেষ পর্যন্ত ভারতের কৌশলগত উদ্বেগ প্রশমিত করবে বলে মনেকরা যেতে পারে।
(খ) চীন-মার্কিন দ্বন্দ্বে বাংলাদেশের কৌশলগত ব্যবস্থাপনা: চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম সামরিক, অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক অংশীদার হওয়ায়, বাংলাদেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বা স্থায়ী ঘাঁটি স্থাপন একটি অত্যন্ত জটিল ও স্পর্শকাতর ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। এই বহুমাত্রিক জটিলতা সামাল দিতে বাংলাদেশকে সুচিন্তিত ‘স্ট্র্যাটেজিক হেজিং’ নীতি অনুসরণ করতে হবে। এর মূল উদ্দেশ্য হবে মার্কিন সামরিক সুবিধা গ্রহণের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি করার পাশাপাশি চীনের সাথে দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে কোনো প্রকার ক্ষতি ছাড়া সুরক্ষিত রাখা। বাংলাদেশের উচিত হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সামরিক সহযোগিতা চুক্তিগুলোকে পূর্ণ সামরিক ঘাঁটির পরিবর্তে ‘দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য’ লজিস্টিক সুবিধা হিসেবে সীমিত রাখা। এর মাধ্যমে সামরিক উপস্থিতি হবে অস্থায়ী ও নমনীয়, যা আঞ্চলিক আধিপত্যের প্রতীক হবে না। এছাড়াও চীনের সাথে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক চ্যানেলগুলো সবসময় উন্মুক্ত রেখে তাদের এই মর্মে নিশ্চয়তা দিতে হবে যে, এই সুবিধাগুলো ভারত বা চীনের বিরুদ্ধে কোনো আক্রমণাত্মক সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হবে না। একইসাথে চীন থেকে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের ধারা বজায় রেখে এবং তাদের বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে (যেমন- বিআরআই) যুক্ত থেকে সামরিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যের একটি ‘নিরপেক্ষতা’র চিত্র তুলে ধরতে হবে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চুক্তির ক্ষেত্রে সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হয় এমন শর্তাবলী (যেমন- SOFA চুক্তির মাধ্যমে বিচারিক দায়মুক্তি) কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া। এই ভারসাম্যমূলক নীতি গ্রহণের মাধ্যমেই বাংলাদেশ বৃহৎ শক্তিদ্বয়ের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঝুঁকি এড়িয়ে নিজের স্বাধীনতা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে।
৪
এবার দেখা যাক বর্তমানে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সামরিক বাহিনীর মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতাগুলো কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে একটা সুদূরপ্রসারী কৌশলগত কাঠামোর অধীনে দু’দেশের নিরাপত্তা স্বার্থকে কেন্দ্র করে সহযোগিতা ক্রমাগত শক্তিশালী হচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক ও কৌশলগত কাঠামো সংক্রান্ত সহযোগিতাগুলো সাধারণত দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও চুক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। যেমন-
ক। দ্বিপাক্ষিক সংলাপ।
দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মাঝে নিয়মিত উচ্চ-পর্যায়ের সামরিক ও নিরাপত্তা আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। উভয় দেশের মধ্যে এপর্যন্ত ১১টিরও বেশি দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে জানা যায়, যা প্রতিরক্ষা সম্পর্ক জোরদার করতে এবং সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। এছাড়াও ৯টির বেশি দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে কৌশলগত নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মতো বিষয় আলোচিত হয়েছে। নিয়মিতভাবে উচ্চ-পর্যায়ের এসব প্রতিরক্ষা এবং দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা সংলাপ দু’দেশের কৌশলগত সম্পর্ককে এগিয়ে নিচ্ছে।
খ। ইন্দো-প্যাসিফিক প্রেক্ষাপট।
দু’দেশের প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল এবং বাংলাদেশের ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে শত্রুতা নয়’ নীতিকে সমর্থন করে। এর প্রধান লক্ষ্য সামুদ্রিক নিরাপত্তা, নৌচলাচলের স্বাধীনতা এবং একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল নিশ্চিত করা। এই সহযোগিতা যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলগত কাঠামোয় শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তার প্রতি অভিন্ন অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
গ। বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়ন।
মার্কিন সহযোগিতা বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়ন পরিকল্পনা ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ বাস্তবায়নে সহায়তা করে, যার লক্ষ্য হলো সশস্ত্র বাহিনীকে ২১ শতকের উপযোগী করে তোলা। এজন্য বাংলাদেশ ও মার্কিন সামরিক বাহিনী নিয়মিতভাবে বিভিন্ন ধরনের বিশেষায়িত মহড়া পরিচালনা করে। যেমন-
(১) টাইগার শার্ক: উভয় দেশের স্পেশাল ফোর্সেস (বাংলাদেশ নেভি সোয়াডস, প্যারা কমান্ডো ব্রিগেড ও ইউএস স্পেশাল ফোর্সেস) এই বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। এই মহড়ার উদ্দেশ্য কাউন্টার-টেররিজম, সংকট মোকাবিলা, ডাইভিং ও উদ্ধার অভিযান সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা। এই মহড়াটি ২০০৯ সাল থেকে ‘ফ্ল্যাশ বেঙ্গল’ সিরিজের অংশ হিসেবে চলমান রয়েছে। এতে পেট্রোল বোট পরিচালনা এবং ছোট অস্ত্রের মার্কসম্যানশিপ অনুশীলনে জোর দেয়া হয়।
(২) টাইগার লাইটনিং: এই মহড়ার মাধ্যমে উভয় দেশের সেনাবাহিনী (বাংলাদেশ আর্মি ও ইউএস আর্মি প্যাসিফিক) কাউন্টার-টেররিজম অপারেশন, শান্তিরক্ষা কার্যক্রম, জঙ্গল ওয়ারফেয়ার, আইইডি বা ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস মোকাবিলা অনুশীলন করে। এতে বাস্তবসম্মত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অপারেশনাল প্রস্তুতি এবং আন্তঃকার্যকারিতা বৃদ্ধি করা হয়।
(৩) অপারেশন প্যাসিফিক এঞ্জেল: এই মহড়ার মাধ্যমে উভয় দেশের বিমানবাহিনী (বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ও ইউএস প্যাসিফিক এয়ার ফোর্সেস) মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ মোকাবিলা, অনুসন্ধান ও উদ্ধার, চিকিৎসা সহায়তা ইত্যাদি অনুশীলন করে। মহড়ায় সি-১৩০ হারকিউলিস পরিবহন বিমান-এর ব্যবহার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, এটি সাধারণত এরোমেডিক্যাল অপারেশন এবং দুর্যোগকালীন বিমান সরবরাহ সক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
(৪) ক্যারট (CARAT) (Cooperation Afloat Readiness and Training): নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ড সামুদ্রিক নিরাপত্তা, ডোমেইন সচেতনতা, নৌচলাচল দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য এই মহড়া আয়োজন করে। এটি একটি বার্ষিক বহুজাতিক সামরিক মহড়া, যার উদ্দেশ্য নৌ-সম্পর্ক ও সহযোগিতা জোরদার করা।
ঘ। উভয় দেশের বাহিনীর মাঝে নিয়মিত মহড়ার আয়োজন ছাড়াও বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট অবদান রয়েছে। যেমন-
(১) আনম্যানড এরিয়াল সিস্টেম (UAS) প্রবর্তন: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং নৌবাহিনীর সাথে UAS সক্ষমতা গড়ে তুলতে কাজ করছে। এজন্য তারা বাংলাদেশকে আরকিউ-২১ ব্ল্যাকজ্যাক (Small Tactical Unmanned Air System - STUAS) সিস্টেম প্রদান করেছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত একটি ডেডিকেটেড রেজিমেন্ট এই সিস্টেমটি পরিচালনা করবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই ড্রোন সিস্টেমটি উন্নত সামুদ্রিক নজরদারি, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং শান্তিরক্ষা মিশন পরিচালনায় বাংলাদেশকে সক্ষম করবে। এরফলে বঙ্গোপসাগরে জলদস্যুতা, অবৈধ মাছ ধরা ইত্যাদি অবৈধ কার্যকলাপ শনাক্তকরণ ও মোকাবিলা করার জন্য বাংলাদেশের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, যা আঞ্চলিক সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। আরকিউ-২১ ব্ল্যাকজ্যাক-এর মতো নতুন প্রযুক্তির সফল প্রবর্তন অন্যান্য অত্যাধুনিক সামরিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও সহযোগিতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি করে।
(২) প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ: ইউএস সেনাবাহিনী বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের জন্য পেট্রোল ভেসেল এবং ফাস্ট পেট্রোল বোটের ইলেকট্রনিক ও যান্ত্রিক উন্নয়নে সহায়তা প্রদান করেছে। এছাড়াও শান্তিরক্ষা মিশনে ব্যবহারের জন্য মাইন-রেজিস্ট্যান্ট অ্যামবুশ প্রোটেক্টেড ভেহিকেল সরবরাহ করেছে। এই কৌশলগত অংশীদারিত্বের উদ্দেশ্য সন্ত্রাস দমন কার্যক্রমে সমন্বয় এবং জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের ভূমিকার জন্য আরও উন্নত প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম সরবরাহ অব্যাহত রাখা।
(৩) প্রশিক্ষণ ও বিনিময় কর্মসূচি: উভয় দেশের সৈন্যরা নিয়মিত যৌথ সামরিক মহড়ার অংশ হিসেবে মার্কসম্যানশিপ, চিকিৎসা প্রশিক্ষণ এবং কমব্যাট ট্র্যাকিং ও সার্ভাইভাল এক্সারসাইজের মতো বিভিন্ন কৌশলগত দক্ষতা বিনিময় করে। এসব নিয়মিত মহড়ার মাধ্যমে দুই দেশের বাহিনীর মধ্যে অপারেশনাল ক্ষেত্রে নির্বিঘ্নে একসাথে কাজ করার সক্ষমতা আরও বাড়ানো সম্ভব, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের আঞ্চলিক বা বৈশ্বিক সংকটে দ্রুত সাড়া দিতে সহায়ক হবে। সামরিক প্রধানদের নিয়মিত শুভেচ্ছা সফর, প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা বিনিময়ের মাধ্যমে উভয় দেশের সামরিক সম্পর্ককে এভাবেই টেকসই উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
৫
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতিতে এক উল্লেখযোগ্য কৌশলগত পরিবর্তন আসে। তিনি পূর্ববর্তী সরকারের জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন-এর উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা থেকে সরে এসে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে উদ্যোগী হন। তার এই কৌশলের মূল ভিত্তি ছিল আঞ্চলিক চাপ মোকাবিলা এবং জাতীয় স্বার্থের সুরক্ষা। সে সময় বাংলাদেশের সাথে ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক একাধিক ইস্যুতে (যেমন ফারাক্কা, সমুদ্রসীমা এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা) উত্তেজনাময় ছিল। এই পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান পশ্চিমা শক্তি, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার নীতি গ্রহণ করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল ভারতকে মোকাবিলা করার জন্য একটি কৌশলগত ভারসাম্য তৈরি করা এবং ভারতের আঞ্চলিক আধিপত্যের ধারণা থেকে বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করা।
এই কৌশলের প্রতিফলন দেখা যায় ১৯৮০ সালের ২৭ আগস্ট তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের সাথে তার উচ্চ-পর্যায়ের বৈঠকে, যেখানে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয়। সেন্ট মার্টিন দ্বীপে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের গুঞ্জন এই কৌশলগত পরিবর্তনেরই একটি জোরালো দিক, যদিও এই বিষয়ে কোনো দালিলিক প্রমাণ নেই। তবে তা ইঙ্গিত দেয় যে, প্রেসিডেন্ট জিয়া ভারতের দিক থেকে আসা ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক সামরিক চাপ নিরসনে এবং বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দ্রুত বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহযোগিতা লাভে ইচ্ছুক ছিলেন। বিশেষত ১৯৮১ সালে দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপে ভারতের সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের দৃঢ় পাল্টা নৌ-অবস্থান গ্রহণের সিদ্ধান্তটি প্রমাণ করে যে, তিনি আঞ্চলিক পরাশক্তির হুমকির মুখে সামরিক শক্তি ও আন্তর্জাতিক মিত্রের মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত করার বিষয়ে বদ্ধপরিকর ছিলেন।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কৌশলগত পররাষ্ট্রনীতি প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের মতো একটি রাষ্ট্রের জন্য বহিঃশক্তির সামরিক সহযোগিতা গ্রহণ কেবল অর্থনৈতিক সুবিধা বা নিছক রাজনৈতিক সম্পর্ক নয়, বরং এটি আঞ্চলিক চাপ মোকাবিলা এবং জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করার একটি অপরিহার্য হাতিয়ার। বিশেষত দক্ষিণ তালপট্টিতে আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান এবং মার্কিন সামরিক সহযোগিতার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব, এই ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করে যে সামরিক জোট বা বিদেশী ঘাঁটি স্থাপনের আগ্রহ ছিল মূলত আঞ্চলিক পরাশক্তির ভারসাম্যহীনতা থেকে দেশকে রক্ষা করা এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দ্রুত আধুনিকীকরণ করা। সামরিক সহযোগিতার মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরে সেনাবাহিনীর আধুনিকীকরণের ভিত্তি স্থাপন করা এবং বহিঃশক্তির আগ্রাসন বা চাপ থেকে দেশকে রক্ষা করার একটি কার্যকর ঢাল তৈরি করাই ছিল তার মূল লক্ষ্য। তার এই কৌশলগত মনোভাব বর্তমান বহু-মেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে এবং বঙ্গোপসাগরে চীন-মার্কিন প্রভাব বিস্তারের তীব্র প্রতিযোগিতার যুগে যেন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। তবে নিরাপত্তা সহযোগিতা দেশের সামরিক সক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধিতে সহায়ক হলেও, তা অবশ্যই ‘স্ট্র্যাটেজিক হেজিং’ নীতির অংশ হতে হবে। এর অর্থ হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো পরাশক্তির সাথে সামরিক সুবিধা বিনিময়ে চুক্তিবদ্ধ হলেও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বিন্দুমাত্র আপস করা যাবে না। বিশেষ করে SOFA চুক্তির মাধ্যমে বিচারিক দায়মুক্তি কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে জাতীয় আইনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। একইসাথে ভারত ও চীনের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগ নিরসনে কূটনৈতিক স্বচ্ছতা ও ভারসাম্য বজায় রেখে সামরিক সুবিধাকে স্থায়ী ঘাঁটির পরিবর্তে দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য লজিস্টিক হাব হিসেবে সীমিত রাখতে হবে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষা কৌশলের মূলমন্ত্র হতে হবে জাতীয় স্বার্থকে সর্বাগ্রে রেখে বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে দেশের অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
২৩ নভেম্বর ২০২৫