
১
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন এক গভীর ও নজিরবিহীন জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী কিংবা ঢাকার যমুনা ফিউচার পার্কে অবস্থিত ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্র বন্ধ হওয়া কেবল একটি যান্ত্রিক ঘোষণা নয়। বরং এটি দুই দেশের তলানিতে ঠেকে যাওয়া সম্পর্কের এক কঠোর বহিঃপ্রকাশ এবং বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতার ইঙ্গিত। গত ১৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগ সরকারকে দিল্লির একপাক্ষিক সমর্থনের অভিযোগ জনমনে গভীর রাজনৈতিক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। ৫ই আগস্টের ছাত্র-জনতার বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে সেই পুঞ্জীভূত জনরোষ এখন ভারত-বিরোধী তীব্র প্রতিক্রিয়ায় রূপ নিয়েছে। হত্যামামলার রায়ে অভিযুক্ত শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় প্রদান এবং সেখান থেকে তার রাজনৈতিক বার্তা প্রদান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ক্ষুব্ধ করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অস্থিরতা এবং কথিত উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর উত্থানকে কেন্দ্র করে দিল্লির নিরাপত্তা উদ্বেগ ক্রমাগত বাড়ছে। সীমান্তে বিএসএফ-এর হাতে নিয়মিত নাগরিক হত্যা এবং তিস্তা পানি বণ্টন ইস্যু এই অবিশ্বাসের আগুনে দীর্ঘকাল ঘি ঢেলেছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে হুমকি এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে পাল্টাপাল্টি মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে। চীন ও পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের ক্রমবর্ধমান নৈকট্য দিল্লির জন্য এক নতুন কৌশলগত উদ্বেগের কারণ। ফলে উভয় দেশের কূটনৈতিক উচ্চপর্যায়ে এখন গঠনমূলক সংলাপের চেয়ে পারস্পরিক তলব এবং অভিযোগের পাল্লাটাই বেশি ভারী। সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হওয়ায় এই কূটনৈতিক সংকটের মানবিক মূল্যও এখন আকাশচুম্বী। এই অচলাবস্থা নিরসনে কেবল নিরাপত্তার অজুহাত নয়, বরং প্রয়োজন দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ক্ষোভের একটি টেকসই ও সম্মানজনক সমাধান। বর্তমান নিরাপত্তা বাস্তবতা এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে সমন্বয় করতে না পারলে এই ঐতিহাসিক দূরত্ব ভবিষ্যতে আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
২
বর্তমান নিরাপত্তা বাস্তবতা: অবিশ্বাসের মেঘ।
ভারতের দাবি অনুযায়ী ঢাকায় তাদের কূটনৈতিক মিশন ও ভিসা কেন্দ্রগুলোর কর্মীরা বর্তমানে চরম নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে রয়েছেন। হাইকমিশন ঘেরাওয়ের হুমকি এবং উস্কানিমূলক মন্তব্যের প্রেক্ষিতে দিল্লি এক ধরনের ‘ডিফেন্সিভ’ বা সতর্ক অবস্থানে চলে গেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ভিসা কার্যক্রমের ওপর। এই দ্বিপাক্ষিক অবিশ্বাসের মেঘ কেবল কূটনৈতিক স্তরেই সীমাবদ্ধ নেই বরং তা দুই দেশের সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের ভরসায় বড় ধরনের ফাটল ধরিয়েছে।
ক। ভিসা কার্যক্রম স্থগিত।
নিরাপত্তার কারণে এশিয়ার বৃহত্তম ভিসা কেন্দ্র যমুনা ফিউচার পার্কসহ সব কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত হওয়ায় বাংলাদেশে ভিসা প্রত্যাশীদের মাঝে এক চরম সংকট তৈরি হয়েছে। প্রতি বছর প্রায় ২২ লক্ষ ভিসা ইস্যুকারী এই কেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকায় সাধারণ ভ্রমণকারী ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন জরুরি চিকিৎসার অপেক্ষায় থাকা রোগীরা। ভারতের চেন্নাই, ভেলোর বা দিল্লির বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে পূর্বনির্ধারিত অ্যাপয়েন্টমেন্ট থাকলেও মেডিকেল ভিসা না পেয়ে অনেক জটিল রোগীর জীবন এখন সংকটাপন্ন। স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া পরিচালিত এই ভিসা প্রক্রিয়া থমকে যাওয়ায় চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার অন্য বিকল্পগুলোও সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল হয়ে উঠেছে। মানবিক এই বিপর্যয় কাটাতে সীমিত পরিসরে হলেও জরুরি সেবা চালুর দাবি জোরালো হচ্ছে, তবে বর্তমান কূটনৈতিক পরিস্থিতিতে বিষয়টি এখনও ঘোর অনিশ্চয়তায় রয়েছে।
খ। পাল্টাপাল্টি তলব।
দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার মহম্মদ রিয়াজ হামিদুল্লা এবং ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণব বর্মাকে অতি সম্প্রতি পাল্টাপাল্টি তলব করার ঘটনা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো নিয়ে বাংলাদেশের কিছু মহলের উস্কানিমূলক হুমকি এবং হাইকমিশনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার হুঁশিয়ারিতে দিল্লি কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে। অন্যদিকে ভারতের মাটি ব্যবহার করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উস্কানিমূলক বার্তা প্রচার এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগে ঢাকা তীব্র আপত্তি তুলে ধরেছে। এই পাল্টাপাল্টি কূটনৈতিক তলব দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের পারস্পরিক আস্থার সংকটকে আরও প্রকট করে তুলেছে, যা গত কয়েক দশকে বিরল। সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা ইস্যুতে উভয় দেশের এই কঠোর অবস্থান বর্তমানে ঢাকা-দিল্লির বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশকে এক অস্বস্তিকর অবিশ্বাসের বৃত্তে বন্দি করে ফেলেছে।
৩
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ক্ষোভ: প্রেক্ষাপট ও কারণ।
বাংলাদেশের বর্তমান ভারত-বিরোধী মনোভাব কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি গত দেড় দশকের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের এক অনিবার্য বহিঃপ্রকাশ। বিশ্লেষকদের মতে বিগত ১৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতায় টিকে থাকতে দিল্লির একপাক্ষিক ও নিঃশর্ত সমর্থন এ দেশের সাধারণ মানুষের মাঝে গভীর বঞ্চনার বোধ তৈরি করেছে। তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনে ভারতের ভূমিকাকে জনমতের অবজ্ঞা এবং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সরাসরি হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়েছে। এই দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক পক্ষপাতের ফলে ভারত এখন এদেশের একটি বড় অংশের মানুষের কাছে কেবল প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়, বরং বিশেষ একটি ব্যবস্থার সমর্থক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এই পুঞ্জীভূত রাজনৈতিক অসন্তোষই মূলত বর্তমানের নিরাপত্তা সংকট ও কূটনৈতিক অচলাবস্থাকে সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলছে।
ক। নির্বাচন ও গণতন্ত্র।
(১) ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনে ভারতের ভূমিকা নিয়ে প্রথম বড় ধরনের ক্ষোভের জন্ম হয়। তৎকালীন ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের ঢাকা সফর এবং জাতীয় পার্টিকে নির্বাচনে অংশ নিতে চাপ দেওয়ার ঘটনাটি জনমনে দিল্লির সরাসরি হস্তক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হয়। প্রধান বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মুখেও ভারতের একপাক্ষিক রাজনৈতিক সমর্থন আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় টিকে থাকতে সাহায্য করে, যা দেশের বড় একটি জনগোষ্ঠীর কাছে তাদের ভোটাধিকার হরণের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল।
(২) ২০১৮ সালের নির্বাচনেও ভারত সরকার একই কৌশল অবলম্বন করে, যেখানে ‘রাতের ভোট’ বা ব্যাপক কারচুপির পাহাড়সমান অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও দিল্লি দ্রুততম সময়ে শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানায়। আন্তর্জাতিক মহলে যখন এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠছিল, তখন ভারতের নীরবতা ও কূটনৈতিক সমর্থন আওয়ামী লীগ সরকারকে এক ধরনের রক্ষাকবচ প্রদান করেছিল। এদেশের নাগরিকরা মনে করেন ভারত তাদের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে বিসর্জন দিয়ে কেবল নিজের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও সংকীর্ণ নিরাপত্তা স্বার্থকেই বড় করে দেখেছে।
(৩) ২০২৪ সালের ‘আমি-ডামি’ নির্বাচনের আগে পশ্চিমা দেশগুলোর অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের চাপের মুখে ভারত পুনরায় স্পষ্টভাবে আওয়ামী লীগের পক্ষ নেয়। বিশেষ করে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র ‘টু প্লাস টু’ সংলাপে দিল্লির অনড় অবস্থান বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের মাঝে এই বার্তা দেয় যে, দিল্লির সমর্থন থাকলে জনগণের ভোটের আর কোনো প্রয়োজন নেই। এই দীর্ঘস্থায়ী একপাক্ষিক সমর্থনই শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে নজিরবিহীন ভারত-বিদ্বেষ এবং ‘ইন্ডিয়া আউট’ ক্যাম্পেইনের মূল জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছে।
খ। বিপ্লব-পরবর্তী বাস্তবতা।
৫ই আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় গ্রহণ দুই দেশের সম্পর্কে এক নজিরবিহীন সংকটের জন্ম দিয়েছে। ১৪০০ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত এই বিপ্লবের পর গণহত্যাকারী হিসেবে অভিযুক্ত একজন নেত্রীকে দিল্লির রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা দেয়া সাধারণ মানুষ মানতে পারছে না। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে চাইলেও ভারতের অবস্থান এ ক্ষেত্রে স্পষ্ট অনাগ্রহের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কেবল শেখ হাসিনাই নন, আওয়ামী লীগের অনেক প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক মন্ত্রী ভারতের মাটিতে নিরাপদ আশ্রয়ে রয়েছেন বলে বাংলাদেশে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। এই নেতাদের উপস্থিতি এবং সেখান থেকে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বিবৃতি প্রচারকে ঢাকা তার সার্বভৌমত্বের জন্য এক ধরনের উস্কানি হিসেবে দেখছে। সাধারণ নাগরিকদের মতে হত্যার মতো ঘৃণ্য অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আশ্রয় দিয়ে ভারত আসলে বাংলাদেশের বর্তমান গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছে। এরফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজপথে ভারত-বিরোধী মনোভাব আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে যা দীর্ঘমেয়াদী দ্বিপাক্ষিক আস্থার সংকট তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতা ও দ্বিপাক্ষিক অপরাধী প্রত্যর্পণ চুক্তির বাস্তবায়ন না হওয়ার আশঙ্কাটি বর্তমানে দুই দেশের প্রশাসনিক স্নায়ুযুদ্ধকে উসকে দিচ্ছে। দিল্লি বিষয়টিকে মানবিক বা কৌশলগত আশ্রয় বললেও ঢাকা এটিকে দেখছে গত দেড় দশকের স্বৈরাচারী শাসনকে রক্ষার শেষ চেষ্টা হিসেবে। এই রাজনৈতিক আশ্রয়ের ইস্যুটি যদি আইনি ও কূটনৈতিকভাবে দ্রুত মীমাংসা না হয়, তবে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বরফ গলার সম্ভাবনা বর্তমানে সুদূরপরাহত।
গ। সীমান্ত ও পানি ইস্যু।
(১) ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে কাঁটাতারে ঝুলে থাকা ফেলানির লাশ থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিএসএফ-এর হাতে নিয়মিত নিরস্ত্র বাংলাদেশি নাগরিক হত্যার ঘটনাগুলো সবচেয়ে বড় ক্ষত হিসেবে চিহ্নিত। গত কয়েক দশকে ভারতের শীর্ষ পর্যায় থেকে সীমান্তে ‘নন-লেথাল ওয়েপন’ বা মারণাস্ত্র ব্যবহার না করার বারবার প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও বাস্তবে তার কোনো কার্যকর প্রতিফলন দেখা যায়নি। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছর সীমান্তে ডজনেরও বেশি বাংলাদেশি প্রাণ হারাচ্ছেন, যা সাধারণ মানুষের কাছে একটি স্বাধীন দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর চরম অবমাননা হিসেবে বিবেচিত হয়। এই হত্যাকাণ্ডগুলোর কোনো সুষ্ঠু বিচার বা ক্ষতিপূরণ না হওয়ায় জনমনে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে যে, ভারত বাংলাদেশের মানুষের জীবনের মূল্যকে অত্যন্ত তুচ্ছ জ্ঞান করে। বন্ধুত্বের বুলি আউড়ালেও সীমান্তে বিরামহীন গুলিবর্ষণ দিল্লির এক ধরণের ‘প্রভু’ সুলভ বা আধিপত্যবাদী আচরণের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই এ দেশের নাগরিকরা মনে করেন, যা ভারত-বিদ্বেষের আগুনে নিয়মিত ঘি ঢালছে। বিশেষ করে নিরীহ কৃষক বা কিশোরদের ওপর গুলি চালনার ঘটনাগুলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতকে একটি ‘নির্দয় প্রতিবেশী’ হিসেবে চিত্রায়িত করার প্রধান জ্বালানি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
(২) অন্যদিকে অভিন্ন ৫৪টি নদীর পানি বণ্টন ইস্যুতে ভারতের দীর্ঘসূত্রতা, বিশেষ করে তিস্তা চুক্তি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য জীবন-মরণ সমস্যায় পরিণত হয়েছে। ২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা সফরের সময় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও শেষ মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের আপত্তির অজুহাতে চুক্তিটি বাতিল হওয়া ছিল বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল কূটনৈতিক চপেটাঘাত। শুষ্ক মৌসুমে উজানে পানি আটকে রেখে মরুকরণ এবং বর্ষায় অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দিয়ে আকস্মিক বন্যা সৃষ্টির ফলে বাংলাদেশের কৃষিনির্ভর অর্থনীতি যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তার জন্য সাধারণ মানুষ সরাসরি দিল্লির একতরফা জলনীতিকে দায়ী করে। অথচ বিনিময়ে বাংলাদেশ ভারতকে ট্রানজিট, ট্রান্সশিপমেন্ট এবং নিরাপত্তার সব ধরণের কৌশলগত সুবিধা প্রদান করলেও ন্যায্য হিস্যা না পাওয়াকে এ দেশের মানুষ ‘অসম ও একপাক্ষিক বন্ধুত্বের’ দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখে। এই দীর্ঘস্থায়ী বঞ্চনা ও পানির অধিকার নিয়ে দিল্লির অনড় অবস্থান বাংলাদেশের মানুষের মনে এই বিশ্বাস তৈরি করেছে যে, ভারত কেবল তার নিজ স্বার্থ আদায়েই তৎপর, কিন্তু প্রতিবেশীর অস্তিত্ব রক্ষায় তারা চরমভাবে উদাসীন ও আধিপত্যকামী।
৪
নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ ও চ্যালেঞ্জ।
৫ই আগস্টের পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে এক আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘদিনের প্রথাগত ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। দিল্লির একচ্ছত্র প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে ঢাকা এখন চীন, পাকিস্তান ও পশ্চিমা বিশ্বের সাথে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ তৈরির চেষ্টা করছে যা এই অঞ্চলে নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করেছে। এই পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপট ভারতের ‘নেবারহুড ফার্স্ট’ নীতিকে নজিরবিহীন সংকটে ফেলেছে, যেখানে আঞ্চলিক প্রভাব ও নিরাপত্তা টিকিয়ে রাখা দিল্লির জন্য এখন বড় কৌশলগত মাথাব্যথার কারণ।
ক। চীন ও পাকিস্তান ফ্যাক্টর।
(১) বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কের দীর্ঘস্থায়ী শীতলতা কাটিয়ে উঠতে যে সক্রিয়তা দেখাচ্ছে তা দিল্লির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি কয়েক দশকের ব্যবধানে করাচি থেকে সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্যবাহী জাহাজের আগমন এবং দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের কূটনৈতিক আলাপ-আলোচনা ভারত অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ভারত ঐতিহাসিকভাবেই বাংলাদেশে পাকিস্তানের প্রভাব বৃদ্ধিতে অতিমাত্রায় সংবেদনশীল, বিশেষ করে যখন এটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার সাথে জড়িত। অন্যদিকে চীন এই সুযোগে তাদের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর আওতায় বাংলাদেশে নতুন করে বিনিয়োগ ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব বৃদ্ধির চেষ্টা চালাচ্ছে। বাংলাদেশের পরিকাঠামো উন্নয়নে চীনের এই ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি বেইজিংয়ের জোরালো সমর্থন ভারতকে এক ধরণের ‘কৌশলগত বেষ্টনী’ বা ঘেরাও হওয়ার আশঙ্কায় ফেলেছে। এই নতুন সমীকরণকে দিল্লি তাদের দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র প্রভাব বলয়ে একটি বড় ধরণের ফাটল হিসেবে দেখছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার প্রথাগত ভূ-রাজনীতিকে আমূল বদলে দিতে পারে। পাকিস্তানের সাথে সম্ভাব্য সামরিক সহযোগিতা এবং চীনের অর্থায়নে কৌশলগত সক্ষমতা বৃদ্ধির যেকোনো সম্ভাবনা ভারতের জন্য একটি ‘রেড লাইন’ বা চরম অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
(২) ভারতের প্রধান কৌশলগত মাথাব্যথা হলো ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ বা ‘চিকেন’স নেক’ এলাকাটি, যা বাংলাদেশকে ঘিরে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে যুক্ত করে। ঢাকা যদি ইসলামাবাদ ও বেইজিংয়ের সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ কৌশলগত মৈত্রীতে আবদ্ধ হয়, তবে ভারতের এই সংকীর্ণ করিডোরটির নিরাপত্তা ভবিষ্যতে চরম ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে দিল্লি মনে করে। বিশেষ করে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করে পুনরায় কোনো ধরণের তৎপরতা চালানোর সুযোগ পায় কিনা, তা নিয়ে ভারত অত্যন্ত সতর্ক। চীনের আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও নজরদারি প্রযুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তার ভারতকে তার আঞ্চলিক গোয়েন্দা ও সামরিক অবস্থানের পুনর্বিন্যাস করতে বাধ্য করছে। দিল্লির কূটনৈতিক মহলে এই ধারণা প্রবল হচ্ছে যে, দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের দীর্ঘদিনের প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ জানাতে এখন এক ধরণের ‘ভারত-বিরোধী’ অক্ষ বা জোট তৈরি হওয়ার পথ প্রশস্ত হচ্ছে। এই নতুন মেরুকরণ কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবনতি নয়, বরং পুরো দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্যকে ভারতের প্রতিকূলে নিয়ে যাওয়ার একটি গভীর সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ফলে বাংলাদেশ যদি তার বৈদেশিক নীতিতে পাকিস্তান ও চীনকে অতিরিক্ত গুরুত্ব প্রদান করে, তবে ভারতও তার সীমান্ত নিরাপত্তা ও ট্রানজিট নীতিতে আরও কঠোর ও রক্ষণাত্মক অবস্থানে যেতে পারে।
খ। চরমপন্থার হুমকি।
ভারতের বিদেশমন্ত্রকের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি অনুযায়ী বাংলাদেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগে ভারত-বিরোধী চরমপন্থী ও উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো পুনরায় সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। দিল্লির আশঙ্কা বাংলাদেশের অস্থিতিশীলতাকে পুঁজি করে এই গোষ্ঠীগুলো ভারতের সার্বভৌমত্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করতে পারে। বিশেষ করে ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ বা সমমনা সংগঠনগুলো থেকে ভারতের ভূখণ্ড নিয়ে উস্কানিমূলক হুমকি আসায় ভারত অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই দাবিগুলোকে অস্বীকার করলেও, দিল্লি মনে করে যে এসব চরমপন্থী তৎপরতা দমন না করলে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা দীর্ঘস্থায়ী ঝুঁকির মুখে পড়বে।
৫
অর্থনৈতিক ও মানবিক মূল্য।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বর্তমানে যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন চলছে তার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকা সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর। ভৌগোলিক অবস্থান এবং অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরশীলতার কারণে দুই দেশ এতটাই নিবিড়ভাবে জড়িত যে সম্পর্কের সামান্য অবনতিও দুই প্রান্তের বাজারে এবং জনজীবনে বড় ধরনের ঝাঁকুনি দেয়। বিশেষ করে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং সাপ্লাই চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এই সংকটের মানবিক ও আর্থিক মূল্য দিন দিন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
ক। চিকিৎসা ও পর্যটন।
প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি নাগরিক ভারতে ভ্রমণ করেন, যারা সংখ্যার দিক থেকে ভারতের বিদেশি পর্যটকদের তালিকায় শীর্ষে থাকেন। এই বিশাল জনস্রোতের একটি বড় অংশই যান উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজনে যা ভারতের বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোর আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। বিশেষ করে কলকাতা, চেন্নাই, ভেলোর ও দিল্লির হাসপাতালগুলোতে বাংলাদেশি রোগীদের উপস্থিতি এতই বেশি যে, বর্তমান ভিসা জটিলতায় সেখানকার চিকিৎসা সেবায় বড় ধরনের মন্দা দেখা দিয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ভারতের চিকিৎসা পর্যটন থেকে অর্জিত রাজস্বের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসে বাংলাদেশ থেকে, যা এখন স্থবির হয়ে পড়ায় ভারতীয় ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অন্যদিকে ক্যান্সারের কেমোথেরাপি, হার্ট সার্জারি বা কিডনি প্রতিস্থাপনের মতো জটিল চিকিৎসার ফলো-আপ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার বাংলাদেশি রোগীর জীবন এখন সংকটাপন্ন। অনেক রোগী ইতিমধ্যে বিপুল অর্থ ব্যয় করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিলেও ভিসা না পেয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। পর্যটন খাতের সাথে জড়িত হোটেল, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও দুই দেশেই ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছেন। এই অচলাবস্থা কেবল কূটনৈতিক টানাপোড়েন নয় বরং একটি মানবিক সংকটে রূপ নিয়েছে যা সীমান্ত ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে। দুই দেশের অর্থনীতির পারস্পরিক নির্ভরতা এতটাই গভীর যে এই স্থবিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে পর্যটন ও সেবা খাতের অপূরণীয় ক্ষতি হবে। তাই কেবল রাজনৈতিক স্বার্থ নয়, মানবিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার খাতিরেই ভিসা সেবা দ্রুত স্বাভাবিক করা এখন সময়ের দাবি।
খ। বাণিজ্যিক ক্ষতি।
ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের বার্ষিক পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ১২ থেকে ১৪ বিলিয়ন ডলার, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম বাণিজ্যিক সম্পর্ক। এই বিশাল বাণিজ্যের একটি বড় অংশ সড়কপথে পেট্রাপোল-বেনাপোল বা হিলির মতো স্থলবন্দর দিয়ে পরিচালিত হয়, যেখানে বর্তমান সীমান্ত উত্তেজনা ও প্রশাসনিক কড়াকড়ি বড় ধরণের বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। ভারত থেকে আসা নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য যেমন পেঁয়াজ, চাল, চিনি এবং তুলা ও যন্ত্রপাতির মতো অত্যাবশ্যকীয় কাঁচামালের ওপর বাংলাদেশের বাজার ও শিল্প অনেকাংশে নির্ভরশীল। অন্যদিকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য ভারত থেকে আমদানিকৃত সুতা ও ডাইস-ক্যামিকেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হলে তা বৈশ্বিক বাজারে দেশের রপ্তানি সক্ষমতাকেও হুমকির মুখে ফেলে দেবে। ভিসা জটিলতার কারণে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ ও পণ্য পরিদর্শন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নতুন এলসি খোলা এবং বাণিজ্যিক চুক্তি নবায়নে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী এই অস্থিরতা দুই দেশের মধ্যকার সুপ্রতিষ্ঠিত সাপ্লাই চেইন ভেঙে দিতে পারে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ ভোক্তা পর্যায়ে ক্রমবর্ধমান দ্রব্যমূল্যের ওপর। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পও বাংলাদেশি চাহিদার ওপর নির্ভরশীল যা এখন গভীর লোকসানের মুখে পড়েছে। পরিবহন ও লজিস্টিক ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানিকৃত পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়ছে যা বাংলাদেশের চলমান মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে আরও কঠিন করে তুলেছে। দুই দেশের এই বাণিজ্যিক আন্তঃনির্ভরশীলতা এতটাই নিবিড় যে, সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় কোনো ধস নামলে তা উভয় দেশের অর্থনীতির জন্যই দীর্ঘমেয়াদী রক্তক্ষরণ বয়ে আনবে। তাই বৃহত্তর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে রাজনৈতিক বৈরিতার ঊর্ধ্বে উঠে বাণিজ্যিক ও লজিস্টিক পথগুলো সচল রাখা এখন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৬
উত্তরণের পথ: সংকট সমাধানে করণীয়।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার বর্তমান অচলাবস্থা নিরসনে উভয় পক্ষকে আবেগ বর্জন করে বাস্তববাদী কূটনীতির পথে হাঁটতে হবে। সম্পর্কের এই গভীর ক্ষত সারাতে পাল্টাপাল্টি বিবৃতি যথেষ্ট নয়, বরং প্রয়োজন উভয় রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের সর্বোচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক সদিচ্ছা। ভৌগোলিক বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে এবং পারস্পরিক সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে আলোচনার টেবিলে বসাই হতে পারে এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র টেকসই পথ।
ক। উচ্চপর্যায়ের সংলাপ।
বর্তমান অবিশ্বাসের দেয়াল ভাঙতে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের স্থবিরতা কাটাতে সরাসরি উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক সংলাপের কোনো বিকল্প নেই। মিডিয়া বা জনসমক্ষে 'বিবৃতি যুদ্ধ' ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ বন্ধ করে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা সচিব পর্যায়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক এখন সময়ের দাবি। এই সংলাপের মাধ্যমে নিরাপত্তা উদ্বেগ, রাজনৈতিক আশ্রয় এবং বর্ডার ম্যানেজমেন্টের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো খোলামেলা আলোচনা করে একটি সাধারণ ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ সচল থাকলে ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ কমে এবং সংকটের সমাধান সহজতর হয়। পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে নিয়মিত এই যোগাযোগই পারে দীর্ঘদিনের জমাটবদ্ধ বরফ গলিয়ে সম্পর্কের স্বাভাবিক ছন্দ ফিরিয়ে আনতে।
খ। ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিক করা।
দুই দেশের রাজনৈতিক টানাপোড়েন থাকলেও সাধারণ মানুষের মানবিক প্রয়োজন এবং যাতায়াতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। বিশেষ করে জরুরি চিকিৎসার অপেক্ষায় থাকা রোগী এবং বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ বিবেচনায় দ্রুততম সময়ে সীমিত পরিসরে হলেও ভিসা কার্যক্রম পুনরায় সচল করা অত্যন্ত জরুরি। এই প্রক্রিয়াটি সফল করতে বাংলাদেশ সরকারকে ঢাকায় অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশন ও ভিসা সেন্টারগুলোর নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আনুষ্ঠানিক ও দৃশ্যমান গ্যারান্টি দিতে হবে। কূটনৈতিক স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে ভারত আশ্বস্ত হলে ভিসা সেবা চালু করা হবে সম্পর্কের বরফ গলার প্রথম বাস্তবমুখী পদক্ষেপ। মানবিক এই উদ্যোগ কেবল মানুষের দুর্ভোগই কমাবে না, বরং দুই দেশের সাধারণ জনগণের পারস্পরিক আস্থার জায়গাটি পুনর্নির্মাণে সহায়ক হবে।
গ। শেখ হাসিনা ফ্যাক্টর ও আইনি প্রক্রিয়া।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার জন্য শেখ হাসিনার প্রত্যাবাসন ইস্যুটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব ও সংবেদনশীলতার সাথে বিবেচনা করা জরুরি। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও সাধারণ জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান জানিয়ে ভারতের উচিত এই স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে আইনি সমাধানের পথ খোঁজা। দুই দেশের মধ্যে ২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত এবং ২০১৬ সালে সংশোধিত 'প্রত্যর্পণ চুক্তি' অনুযায়ী নির্ধারিত প্রোটোকল অনুসরণ করা হলে এই সংকটের একটি গঠনমূলক সমাধান সম্ভব। অপরাধী প্রত্যর্পণের আইনি প্রক্রিয়ায় ভারতের স্বচ্ছতা বজায় রাখা বর্তমান ঢাকার সাথে দিল্লির অবিশ্বাসের দেওয়াল ভাঙতে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। রাজনৈতিক আশ্রয় বনাম বিচারিক দায়ের এই জটিল সমীকরণটি আইনি পথে সমাধান হওয়াই দুই দেশের সম্পর্কের বৃহত্তর স্বার্থে কাম্য।
ঘ। সীমান্তে শূন্য মৃত্যু নিশ্চিত করা।
বিএসএফ-এর হাতে সীমান্তে নিরস্ত্র বাংলাদেশি হত্যা বন্ধ করা বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের জন্য জনমত অনুকূলে আনার সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হতে পারে। দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ে বারবার 'শূন্য মৃত্যু'র প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। সীমান্তে মারণাস্ত্রের বদলে কার্যকরভাবে 'নন-লেথাল ওয়েপন' বা প্রাণঘাতী নয় এমন অস্ত্রের ব্যবহার নিশ্চিত করে বিএসএফ-কে সংযত অবস্থানে নিয়ে আসতে হবে। সীমান্ত হত্যা বন্ধ হলে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনে ভারতের প্রতি যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ রয়েছে, তা প্রশমিত হওয়ার একটি বড় সুযোগ তৈরি হবে। শেষ পর্যন্ত আইনি বিচার ও মানবিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনাই পারে কাঁটাতারের এই রক্তাক্ত ইতিহাস মুছে দিয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায় সূচনা করতে।
ঙ। সার্বভৌমত্বের সম্মান।
ভারত ও বাংলাদেশের টেকসই সম্পর্কের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত একে অপরের সার্বভৌমত্বের প্রতি প্রশ্নহীন শ্রদ্ধা এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি। দিল্লিকে উপলব্ধি করতে হবে যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে কেবল নির্দিষ্ট একটি দলের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে জনবিচ্ছিন্নতা ও কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করে। অন্যদিকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও ভারতকে এই শক্তিশালী গ্যারান্টি দিতে হবে যে, এই দেশের মাটি ব্যবহার করে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার কোনো সুযোগ উগ্রপন্থী গোষ্ঠী পাবে না। পারস্পরিক নিরাপত্তা উদ্বেগ নিরসনে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং একে অপরের রাষ্ট্রীয় সংবেদনশীলতাকে গুরুত্ব দেওয়াই হতে পারে আধুনিক ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির মূলমন্ত্র। শেষ পর্যন্ত প্রভু-ভৃত্য সম্পর্কের মানসিকতা পরিহার করে সমমর্যাদার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা অংশীদারিত্বই দুই দেশের সীমানা ছাড়িয়ে এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে পারবে।
৭
ভারত ও বাংলাদেশের জন্য ভৌগোলিক অবস্থান একটি অমোঘ সত্য—প্রতিবেশী বদলানো যায় না, তাই বৈরিতা নয় বরং সহযোগিতাই টিকে থাকার একমাত্র পথ। গত দেড় দশকের রাজনৈতিক সমীকরণ ভেঙে এখন সময় এসেছে পারস্পরিক সার্বভৌমত্বের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা এবং সাধারণ জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে সম্পর্কের কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনার। দিল্লিকে যেমন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিবর্তনের বাস্তবতা মেনে নিতে হবে, ঢাকাকেও তেমনি ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগের বিষয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। অবিশ্বাসের কালো মেঘ সরিয়ে যদি সমমর্যাদা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন রোডম্যাপ তৈরি করা হয়, তবেই এই অঞ্চলে প্রকৃত স্থিতিশীলতা আসবে। শেষ পর্যন্ত একটি শক্তিশালী, স্থিতিশীল এবং বন্ধুপ্রতিম সম্পর্কই হতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার দুই নিকটতম প্রতিবেশীর সামগ্রিক সমৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নের প্রধান চাবিকাঠি।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
২২ ডিসেম্বর ২০২৫