
১
আগামী ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের ক্যালেন্ডারে কেবল একটি তারিখ নয়, বরং এটি হতে যাচ্ছে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত প্রবাস জীবনের অবসান ঘটিয়ে এদিন লন্ডন থেকে প্রিয় মাতৃভূমিতে পা রাখছেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের প্রাণভ্রমরা যখন নিজ দেশে ফিরছেন, তখন সারা দেশের লাখো কোটি নেতাকর্মীর হৃদয়ে বইছে উচ্ছ্বাস আর আবেগের বাঁধভাঙা জোয়ার। এই প্রত্যাবর্তন যেমন দীর্ঘ প্রতীক্ষার এক পরম তৃপ্তি তেমনি বাংলাদেশের রাজনীতির বাঁক পরিবর্তনের এক শক্তিশালী সংকেত। তবে এই আনন্দের সমান্তরালে এক গভীর ও বহুমুখী উদ্বেগের মেঘও দানা বাঁধছে। তারেক রহমানের এই ফেরা এমন এক সময়ে ঘটছে যখন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির রক্তাক্ত ইতিহাস পর্যালোচনায় আমরা দেখেছি দক্ষিণ এশিয়া তথা বিশ্বজুড়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বারবারই চরম ঝুঁকি আর ষড়যন্ত্রের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। লিয়াকত আলী খান থেকে শুরু করে বেনজির ভুট্টো, রাজীব গান্ধী, বেনিগনো অ্যাকুইনো, কেনেডি’র মর্মান্তিক ইতিহাস এমনকি অতিসাম্প্রতিক কালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উপরে স্নাইপার শ্যুট আমাদের সামনে সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে পলাতক ও ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচারী সরকারের অবশিষ্টাংশের রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র, মাঠপর্যায়ে ঘাপটি মেরে থাকা নাশকতামূলক চক্র এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির জটিল সমীকরণ এই উদ্বেগকে আরও ঘনীভূত করেছে। একদিকে যখন রাজপথে লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢল নামার প্রতীক্ষা, অন্যদিকে তখন অদৃশ্য আততায়ীর ছায়া আর বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা তৎপরতার ভিড়। তাই তারেক রহমানের এই ঘরে ফেরা কেবল একজন নেতার প্রত্যাবর্তন নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সক্ষমতা এবং আগামী দিনের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার এক মহা-অগ্নিপরীক্ষা।
২
ইতিহাসের প্রেক্ষাপট ও আততায়ীর ছায়া: রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের অমসৃণ পথ।
বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় কোনো দেশের শীর্ষ জনপ্রিয় বা প্রভাবশালী নেতার দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন যেমন বিপুল জনসমর্থনের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়, তেমনি অনেক সময় তা এক মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিতে পর্যবসিত হয়েছে। ইতিহাসের এই পুনরাবৃত্তি বারবার প্রমাণ করেছে যে পরিবর্তনের কারিগরদের পথ কখনোই কন্টকহীন নয়।
ক। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও শিক্ষা।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেনেডি ভ্রাতৃদ্বয়ের হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে আততায়ীর কালো থাবা বারবার নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি করেছে। ১৯৫১ সালে পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে লিয়াকত আলী খানের হত্যাকাণ্ড বা ২০০৭ সালে দীর্ঘ নির্বাসন শেষে ফেরার পর রাওয়ালপিন্ডিতেই এক নির্বাচনি জনসভায় বেনজির ভুট্টোর মর্মান্তিক মৃত্যু বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে এক বড় ক্ষত। বেনজির ভুট্টোর সেই ঘটনার সঙ্গে বর্তমান বাংলাদেশের পরিস্থিতির অনেক মিল পাওয়া যায়, যেখানে জনসমুদ্রের উন্মাদনার সুযোগ নিয়ে অদৃশ্য শত্রুরা তাদের নীল নকশা বাস্তবায়ন করেছিল। ফিলিপাইনের বিরোধী দলীয় নেতা বেনিগনো অ্যাকুইনো’র ১৯৮৩ সালের সেই দৃশ্য আজও বিশ্ববাসী ভোলেনি, যিনি নির্বাসন থেকে বিমানে করে দেশে ফেরার কয়েক সেকেন্ডের মাথায় রানওয়েতেই আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়েছিলেন।
খ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ও তারেক রহমানের ঝুঁকি।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ইতিহাস অত্যন্ত দীর্ঘ ও কলঙ্কিত। তারেক রহমানের ক্ষেত্রে এই নিরাপত্তা ঝুঁকিগুলো বর্তমানে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হওয়ার পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ রয়েছে:
(১) পলাতক সরকারের প্রতিহিংসা: দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা হাসিনা সরকারের পতনের পর তাদের অনুসারী এবং সুবিধাভোগী চক্রটি এখনও সক্রিয়। রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার শেষ চেষ্টা হিসেবে তারা চরম কোনো নাশকতার পথ বেছে নিতে পারে।
(২) অদৃশ্য শক্তির ব্ল্যাকমেল: দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে চাওয়া বিভিন্ন রাষ্ট্রবিরোধী চক্র এবং বিদেশি অপশক্তির গোপন তৎপরতা তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে ঘনীভূত হতে পারে।
(৩) গোয়েন্দা তথ্যের শঙ্কা: বিভিন্ন অসমর্থিত সূত্রে শোনা যায় পলাতক সরকারের ঘনিষ্ঠ প্রভাবশালী গোষ্ঠী এবং পেশাদার অপরাধী চক্রের মাধ্যমে একটি বড় ধরনের ‘ডিস্ট্যাবিলাইজেশন’ পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
তারেক রহমান যখন দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফিরছেন তখন এই ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তগুলো কেবল একটি সতর্কবার্তা নয়, বরং এটি একটি কঠোর বাস্তবতাকে নির্দেশ করছে। তার জন্য যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে তা সাধারণ কোনো প্রটোকল নয়, বরং হওয়া উচিত ‘ফেল-সেফ’ বা ত্রুটিহীন। কারণ সামান্যতম নিরাপত্তা বিচ্যুতি কেবল একজন ব্যক্তি বা দলের জন্য নয় বরং পুরো জাতির ভবিষ্যৎ গতিপথকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
৩
অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও আইনশৃঙ্খলার নতুন সমীকরণ।
সম্প্রতি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এক অত্যন্ত নাজুক ও বিশেষ সন্ধিক্ষণের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে যা তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের নিরাপত্তা ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে ১৮ই ডিসেম্বরে প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ নেতা শরীফ ওসমান হাদির নির্মম হত্যাকাণ্ড এবং তার প্রেক্ষিতে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া নজিরবিহীন সহিংসতা ও ক্ষোভের বিস্ফোরণ রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতাকে বড় ধরনের নাড়িয়ে দিয়েছে। এই পরিস্থিতির গুরুত্ব এতটাই প্রবল ছিল যে খোদ জাতিসংঘের পক্ষ থেকে সকল পক্ষকে কঠোরভাবে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো মাঠপর্যায়ের মানবাধিকার ও নিরাপত্তার সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এসব ঘটনা স্পষ্ট করে দেয় যে বর্তমান সরকার ও প্রশাসনের আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও দেশের আইনশৃঙ্খলার মাঠপর্যায়ের কাঠামো এখনও পুরোপুরি স্থিতিশীল বা শত্রুমুক্ত হতে পারেনি। বিশেষ করে ঢাকার প্রধান সড়কগুলোতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতির ঘাটতি একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ক্রান্তিকালে যখন রাষ্ট্রযন্ত্র তার পূর্ণ সক্ষমতা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে ঠিক তখনই এমন একটি স্পর্শকাতর রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন নিরাপত্তার জন্য এক বড় পরীক্ষা।
তৃতীয় পক্ষ ও স্লিপার সেলের গোপন তৎপরতা দেশের এই অস্থির ও অস্থিতিশীল পরিবেশের সুযোগ নিয়ে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের উচ্ছিষ্ট বা কোনো সুবিধাবাদী ‘তৃতীয় পক্ষ’ যেকোনো সময় ভয়ংকর নাশকতা চালিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করতে পারে বলে অনেকেই গভীরভাবে আশঙ্কা করছেন। বিশেষ করে গত দেড় দশকের শাসনকালে গড়ে ওঠা বিভিন্ন ‘স্লিপার সেল’ এবং তাদের গোপন নেটওয়ার্ক এখনও দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় সক্রিয় থাকতে পারে, যারা মূলত এই ধরনের উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতির অপেক্ষা করে। এই গোষ্ঠীগুলো সরাসরি সংঘর্ষে না গিয়ে চোরাগোপ্তা হামলা, জনাকীর্ণ স্থানে ছোটখাটো বিস্ফোরণ বা ভিড়ের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বড় ধরনের রাজনৈতিক বিপর্যয় ঘটাতে পারদর্শী। তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের মতো বিশাল জনসমাগমে যদি নিরাপত্তা ব্যবস্থার কোনো সামান্যতম ছিদ্র থাকে তবে সেটিকেই মোক্ষম সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে এই ষড়যন্ত্রকারী মহল। দেশের ভেঙে পড়া গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের পুনঃগঠন প্রক্রিয়ার মাঝেই এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা প্রশাসনের জন্য একটি কঠিন পরীক্ষা। তাই কেবল বাহ্যিক পুলিশি পাহারা নয়, বরং ভূগর্ভস্থ বা অদৃশ্য শত্রুদের মোকাবিলায় বিশেষ নজরদারি ও প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই।
৪
গোয়েন্দা তৎপরতা ও সম্ভাব্য ষড়যন্ত্র।
বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে পলাতক হাসিনা সরকারের অনুসারীরা দেশের ভেতরে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতা সৃষ্টির লক্ষে নানামুখী অপকৌশল ও গোপন পরিকল্পনা চালিয়ে যাচ্ছে। এই স্পর্শকাতর সময়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার অস্বাভাবিক অতি-তৎপরতা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর পরিবর্তিত রাজনৈতিক অবস্থান তারেক রহমানের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে নেপথ্য প্রভাবক হিসেবে কাজ করতে পারে। ২৫শে ডিসেম্বর বিমানবন্দর এলাকা থেকে শুরু করে সভাস্থল পর্যন্ত কয়েক লক্ষ মানুষের যে অভূতপূর্ব জনসমুদ্র তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তা নিয়ন্ত্রণ ও যথাযথ ‘ক্রাউড ম্যানেজমেন্ট’ করা বর্তমান প্রশাসনের জন্য একটি বিশাল লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ। এত বিশাল ভিড়ের সুযোগ নিয়ে কোনো কুচক্রী মহলের অনুপ্রবেশকারী বা সম্ভাব্য আত্মঘাতী হামলাকারীকে শনাক্ত করা এবং তাদের নাশকতামূলক পরিকল্পনা নস্যাৎ করা নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বিমানবন্দরের রানওয়ে থেকে শুরু করে ভিআইপি টার্মিনাল পর্যন্ত প্রতিটি ইঞ্চি জায়গা কঠোর নজরদারিতে রাখা এবং একই সাথে ৩০০ ফিটে দীর্ঘ ১২ সাড়ে কিলোমিটার ব্যাপী জনসমাবেশের শৃঙ্খলা বজায় রাখা প্রশাসনের সক্ষমতার ওপর এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে। এমতাবস্থায় কেবল দৃশ্যমান পুলিশি নিরাপত্তা নয় বরং গভীর গোয়েন্দা জাল ও প্রযুক্তিগত নজরদারি নিশ্চিত করা এখন সময়ের অনিবার্য দাবি।
৫
সরকারের প্রস্তুতি ও গৃহীত নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গৃহীত নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও অগ্রাধিকারমূলক ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে যে ধরণের কঠোর ও সমন্বিত প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে, তা নিচে সুনির্দিষ্ট পয়েন্ট আকারে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
ক। VVIP প্রটোকল ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা।
জনাব তারেক রহমানের রাজনৈতিক অবস্থান এবং বর্তমান নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনা করে তাকে বিশেষ VVIP (Very Very Important Person) প্রটোকল প্রদানের বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে সক্রিয়ভাবে বিবেচনাধীন রয়েছে বলে জানা যায়। এর আওতায় তাকে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ন্যায় বিশেষ নিরাপত্তা বেষ্টনী এবং এসকর্ট সুবিধা প্রদান করা হতে পারে।
খ। কঠোর নিরাপত্তা বলয় ও জনবল মোতায়েন।
বিমানবন্দর থেকে শুরু করে গুলশানের বাসভবন এবং সভাস্থল পর্যন্ত সমগ্র রুটকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী প্রায় ২০০০ জন পুলিশ সদস্যসহ র্যাব, এপিবিএন এবং বিশেষায়িত বাহিনীর সদস্যদের স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে মোতায়েন করা হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে সিসিটিভি এবং ড্রোন নজরদারি সার্বক্ষণিক সচল রাখা হবে।
গ। CSF ও দলীয় স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয়।
সরকারি নিরাপত্তার পাশাপাশি বিএনপি চেয়ারপারসনের নিজস্ব সিকিউরিটি ফোর্স (CSF) সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। জনসভার শৃঙ্খলা এবং নেতার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিতে কয়েক হাজার প্রশিক্ষিত দলীয় স্বেচ্ছাসেবীকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা এবং সিএসএফ-এর মধ্যে রিয়েল-টাইম তথ্য বিনিময়ের জন্য একটি বিশেষ সমন্বয় সেল গঠন করা হয়েছে বলে জানা যায়।
ঘ। বিমানের নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ যাচাই।
নিরাপত্তার ঝুঁকিটি কেবল রাজপথেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি বরং তারেক রহমান যে ফ্লাইটে দেশে ফিরবেন, সেটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্স এবং বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও টেকনিক্যাল টিম থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্রু ও স্টাফের ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে খবর পাওয়া গেছে। এরই অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সংশ্লিষ্ট ফ্লাইটের দায়িত্বে থাকা জুনিয়র পার্সার মোঃ সওগাতুল আলম সওগাত ও ফ্লাইট স্টুয়ার্ডস জিনিয়া ইসলাম নামে দুই কেবিন ক্রুকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে।
ঙ। প্রযুক্তিগত ও কারিগরি নজরদারি।
যেকোনো ধরনের রিমোট-কন্ট্রোল নাশকতার ঝুঁকি এড়াতে ভিআইপি মুভমেন্টের সময় এবং সভাস্থলের নির্দিষ্ট এলাকায় হাই-ফ্রিকোয়েন্সি জ্যামার ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে জানা যায়। এছাড়া বিমানবন্দরের রানওয়ে থেকে বের হওয়ার পথ পর্যন্ত বিশেষ লাইটিং এবং আর্চওয়ে গেট বসানো হচ্ছে।
চ। জরুরি উদ্ধার ও চিকিৎসা ব্যবস্থা (Evacuation Plan)।
যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে তাকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার জন্য একটি ‘কন্টিনজেন্সি ইভাকুয়েশন প্ল্যান’ তৈরি রাখা হয়েছে। যাতায়াতের পথে এবং সভাস্থলের পাশে একটি বিশেষ গ্রিন করিডোরসহ অ্যাম্বুলেন্স ও বিশেষায়িত মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিক স্ট্যান্ডবাই থাকবে বলে জানা যায়।
৬
গণসমাবেশ থেকে নির্বাচনি সফর: তারেক রহমানের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা রোডম্যাপ।
বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান-এর দেশে প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে যেমন রাজনৈতিক উদ্দীপনা তুঙ্গে, তেমনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তার বিষয়টি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ৩০০ ফিট রোডের বিশাল জনসভা এবং পরবর্তী জেলা-বিভাগীয় নির্বাচনি সফরগুলোকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত নিরাপত্তা রোডম্যাপ নিচে বিশ্লেষণ করা হলো।
ক। সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি বিশ্লেষণ (Security Risk Analysis)।
তারেক রহমানের আগমন এবং নির্বাচনি জনসভাগুলোতে বহুমুখী ঝুঁকি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে:
(১) বিশাল জনসমাগম ও ভিড় ব্যবস্থাপনা: ৩০০ ফিটের মতো উন্মুক্ত স্থানে লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতি পদপিষ্ট হওয়া বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ঝুঁকি তৈরি করে।
(২) চোরাগোপ্তা হামলা ও সাবোটাজ: সাম্প্রতিক ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট-২’ এবং বিভিন্ন সহিংস ঘটনার প্রেক্ষাপটে আইইডি (IED) বা নাশকতার মাধ্যমে আতঙ্ক সৃষ্টির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
(৩) ভূ-রাজনৈতিক ও প্রতিপক্ষের তৎপরতা: পলাতক সরকারের অনুসারী বা রাষ্ট্রবিরোধী গোষ্ঠীর ড্রোন হামলা বা দূরপাল্লার অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডের ঝুঁকি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে আসতে পারে।
(৪) লজিস্টিক ও ট্রাফিক জ্যাম: বিমানবন্দর থেকে সভাস্থল পর্যন্ত যাতায়াতের পথে কৃত্রিম যানজট সৃষ্টি করে নিরাপত্তা বলয়কে দুর্বল করার চেষ্টা হতে পারে।
(৫) গুজব ও সাইবার যুদ্ধ: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে জনমনে ভীতি সঞ্চার বা সমর্থকদের উত্তেজিত করে সংঘাত বাঁধানোর ঝুঁকি প্রবল।
খ। ত্রিমাত্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা (Three-Layer Security Strategy)।
নিরাপত্তা ঝুঁকি শূন্যে নামিয়ে আনতে একটি সমন্বিত ‘থ্রি-লেয়ার’ সুরক্ষা বলয় নিশ্চিত করা জরুরি। এপ্রসঙ্গে নিচে আলোচনা করা হলো:
(১) সরকারি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা:
(ক) মাল্টি-এজেন্সি সমন্বয়: পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর সমন্বিত টহল এবং উঁচু ভবনগুলোতে স্নাইপার মোতায়েন।
(খ) প্রযুক্তিগত নজরদারি: পুরো সভাস্থল ড্রোন এবং রিয়েল-টাইম সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা।
(গ) স্যানিটাইজেশন: সভার আগে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধারে বিশেষ অভিযান।
(২) দলীয় নিরাপত্তা (CSF ও স্বেচ্ছাসেবক):
(ক) পেরিমিটার সিকিউরিটি: সিএসএফ ও প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে মঞ্চের চারপাশে ‘ইনভায়োলেবল জোন’ তৈরি।
(খ) তল্লাশি চৌকি: প্রতিটি প্রবেশপথে আর্চওয়ে গেট এবং হ্যান্ড মেটাল ডিটেক্টর ব্যবহার নিশ্চিত করা।
(গ) জরুরি রুট: ভিআইপিদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার জন্য ‘ইভাকুয়েশন রুট’ আগে থেকে নির্ধারণ করা।
(৩) প্রযুক্তিগত ও সাধারণ সর্তকতা:
(ক) সিগন্যাল জ্যামার: রিমোট-কন্ট্রোল বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয় করতে সভাস্থলের চারপাশে জ্যামার মোতায়েন।
(খ) চিকিৎসা সহায়তা: পর্যাপ্ত মেডিকেল টিম ও অ্যাম্বুলেন্সের জন্য ‘গ্রিন করিডোর’ রাখা।
গ। জরুরি নিরাপত্তা চেকলিস্ট (Emergency Security Checklist)।
সমাবেশ সফল করতে এবং যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা নির্দেশিকা অনুসরণ করা অত্যাবশ্যক। সভার অন্তত ১২ ঘণ্টা আগে ডগ স্কোয়াড এবং বিশেষজ্ঞ দল দিয়ে পুরো মঞ্চ ও ভিআইপি এলাকা পরীক্ষা করতে হবে এবং সেখানে কঠোর ‘অ্যাক্সেস কন্ট্রোল’ বা প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি প্রবেশপথে আর্চওয়ে গেট স্থাপন করার পাশাপাশি বড় ব্যাগ, ধাতব বস্তু বা সন্দেহজনক কোনো সরঞ্জাম বহন নিষিদ্ধ করতে হবে। কারিগরি নিরাপত্তার অংশ হিসেবে সভাস্থলের চারপাশের অন্তত ১ কিলোমিটার এলাকা সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনতে হবে এবং মূল মাইক সিস্টেম বিকল হলে ব্যবহারের জন্য শক্তিশালী বিকল্প সাউন্ড সিস্টেম প্রস্তুত রাখতে হবে।
স্বাস্থ্য ও অগ্নি-নিরাপত্তার ঝুঁকি মোকাবিলায় সভাস্থলের বিভিন্ন পয়েন্টে অগ্নিনির্বাপক সিলিন্ডার, বালির বালতি এবং অন্তত দুটি অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্পসহ পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স স্ট্যান্ডবাই রাখতে হবে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সুশৃঙ্খল রাখতে সভাস্থল থেকে অন্তত ৫০০ মিটার দূরে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করা এবং ভিআইপিদের যাতায়াতের রুটগুলো নিয়মিত স্যানিটাইজ করা প্রয়োজন। যেকোনো ধরনের অপপ্রচার বা বিশৃঙ্খলা রুখতে একটি সক্রিয় সাইবার মনিটরিং ও মিডিয়া সেল গঠন করতে হবে, যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নজরদারি করবে এবং তাৎক্ষণিকভাবে সত্য তথ্য প্রচার করে গুজব প্রতিরোধে ভূমিকা রাখবে।
৭
তারেক রহমানের এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তন কেবল একজন নির্বাসিত নেতার দেশে ফিরে আসা নয়; বরং এটি বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতির ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী সন্ধিক্ষণ এবং আগামী দিনের ক্ষমতার সমীকরণ নির্ধারণকারী এক চূড়ান্ত মুহূর্ত। দীর্ঘ ১৭ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষা, রাজনৈতিক চড়াই-উতরাই এবং নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে তার এই ফেরা জাতীয় রাজনীতিতে যে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে তার স্থায়িত্ব নির্ভর করছে একটি নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় নিশ্চিত করার ওপর। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ‘নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা’ শব্দবন্ধটি যেন কেবল সরকারি নথিপত্র বা আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। ইতিহাসের পাতায় রাজনৈতিক নেতাদের প্রত্যাবর্তনের সময় যেসব মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আমরা দেখেছি তার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রশাসনকে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের পরিচয় দিতে হবে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং একটি টেকসই গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার স্বার্থেই এই নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব নয়, বরং বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি, উভয় পক্ষের জন্যই এটি একটি জাতীয় ও নৈতিক বাধ্যতামূলক কর্তব্য।
যদি এই নিরাপত্তা রোডম্যাপ সফলভাবে বাস্তবায়িত হয় তবে তা দেশে আইনের শাসন ও রাজনৈতিক সহনশীলতার এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। অন্যথায় সামান্যতম নিরাপত্তা বিচ্যুতি কেবল একটি রাজনৈতিক দলকে নয় বরং পুরো রাষ্ট্রকে এক গভীর অনিশ্চয়তা ও বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাই ১৭ বছরের এই অপেক্ষার পূর্ণতা আসুক একটি নিরাপদ, সুশৃঙ্খল এবং উৎসবমুখর প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে-এটাই এখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
২৩ ডিসেম্বর ২০২৫