
১
সম্প্রতি পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ (Strategic Mutual Defense Agreement - SMDA) মুসলিম বিশ্বে একটি নতুন সামরিক জোট গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা উস্কে দিয়েছে। যদিও এই চুক্তিকে দুই দেশের পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক হিসেবে দাবি করা হয়েছে, তবুও এর ফলে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষকরে কাতারে ইসরায়েলের হামলার পর এই ধারণা বেশ জোরালো হয়ে উঠেছে বলা যায়। কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও এই চুক্তির পথ ধরে একটি মুসলিম সামরিক জোটের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
২
প্রেক্ষাপট।
পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তি এবং সামরিক সক্ষমতা মুসলিম বিশ্বের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। সাম্প্রতিক ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে পাকিস্তান নিজের সামরিক সক্ষমতা মুসলিম বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে পেরেছে। অপরদিকে সৌদি আরব একটি অর্থনৈতিক পরাশক্তি এবং মুসলিম বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তবে এই দুটি দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কিন্তু নতুন কিছু নয়। ১৯৬৭ সাল থেকে পাকিস্তান সৌদি সেনাদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। পাকিস্তানি বিমানবাহিনী একসময় সৌদি জঙ্গি বিমান পরিচালনায় সহায়তা করত। ১৯৬০-এর দশক থেকেই পাকিস্তান সৌদি সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দিয়ে আসছে। ১৯৭৯ সালে মক্কায় একটা চরমপন্থী সশস্ত্র গ্রুপ পবিত্র কাবা শরিফ দখল করলে সৌদি সেনাবাহিনী তাদের মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছিল। সেসময়ে সৌদি আরবের অনুরোধে পাকিস্তান তাদের কমান্ডো বাহিনী পাঠিয়েছিল। পাকিস্তানের এই চৌকস দল সৌদি সেনাবাহিনীর সাথে যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে কাবা শরিফকে দখলমুক্ত করে। এই অভিযানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা সৌদি রাজতন্ত্রের প্রতি পাকিস্তানের সামরিক সহায়তার একটি বড় উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। এর পথ ধরে ১৯৮২ সালের একটি প্রোটোকল চুক্তির অধীনে সৌদি আরবে বিপুল সংখ্যক পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন করা হয়, যারা প্রশিক্ষণ ও অভিযান উভয় ক্ষেত্রেই কাজ করে। তবে সাম্প্রতিক চুক্তি সেই সম্পর্ককে ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে গেছে এবং তা মুসলিম দেশগুলোকে নিয়ে একটা সামরিক জোট গঠনের পথ দেখাচ্ছে। অবশ্য এর আগেও, ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি মুসলিম সামরিক জোট, ইসলামিক মিলিটারি কাউন্টার টেরোরিজম কোয়ালিশন (IMCTC) গঠিত হয়েছিল। এই জোটের মূল উদ্দেশ্য ছিল সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা। প্রাথমিকভাবে ৩৪টি মুসলিম দেশ এতে যোগ দেয়, যার মধ্যে বাংলাদেশও ছিল। বর্তমানে এর সদস্য সংখ্যা ৪১এর বেশি। পাকিস্তানের প্রাক্তন সেনাপ্রধান জেনারেল রাহিল শরীফ এই জোটের প্রথম কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে এই জোটের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেক দেশই এতে নামমাত্র সদস্য হিসেবে আছে এবং জোটটি কার্যকরভাবে কোনো বড় সামরিক অভিযানে অংশ নেয়নি।
৩
সম্ভাবনা।
পাকিস্তান-সৌদিআরব প্রতিরক্ষা চুক্তি সফল হলে অন্যান্য মুসলিম দেশ, যেমন- তুরস্ক, মালয়েশিয়া এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য রাষ্ট্রগুলোকে একত্রিত হয়ে একটি বৃহত্তর সামরিক জোটে যোগদানের জন্য উৎসাহিত করতে পারে। কেননা পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তি এবং সৌদি আরবের আর্থিক ও সামরিক সক্ষমতা একত্রিত হওয়ার ফলে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ন্যাটোর আদলে একটি শক্তিশালী মুসলিম সামরিক জোট গঠনের পুরোনো ধারণাকে নতুন করে সামনে এনেছে। এই চুক্তির পর পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র মন্ত্রী মোহাম্মদ ইসহাক দার বলেন যে, এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয়, বরং এটি একটি প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা। এই চুক্তিতে অন্য দেশগুলোও ভবিষ্যতে যোগ দিতে আগ্রহী। প্রায় একইরকম মন্তব্য করেছেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী খাজা আসিফ, তিনি জিও টিভিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, এটি একটি প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা, যা ন্যাটো (NATO) চুক্তির অনুরূপ। তিনি ইঙ্গিত দেন যে, এই চুক্তিতে অন্যান্য আরব দেশগুলোও ভবিষ্যতে যোগ দিতে পারে। এভাবে একটা মুসলিম সামরিক জোটের মূল লক্ষ্য হতে পারে সন্ত্রাসবাদ দমন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ইরান এবিষয়ে আগ্রহী জানা যায়। মিশর, কাতার, তুর্কিয়ে সহ অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোও কাছাকাছি ধারণা পোষণ করে তবে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক বিভেদ এই জোটের কার্যকারিতা ও ঐক্য ধরে রাখার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে। এই চ্যালেঞ্জগুলো অতিক্রম করে মুসলিম সামরিক জোট গঠিত হলে অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর সামরিক শক্তি ও সন্ত্রাসবাদ দমনে কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন আসতে পারে।
৩.১
সামরিক শক্তি বৃদ্ধি।
সামরিক শক্তি বৃদ্ধি একটি বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া যা কেবল অস্ত্রসম্ভার বাড়ানোকেই বোঝায় না, বরং সামরিক সক্ষমতার বিভিন্নদিক উন্নত করাকে বোঝায়। পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মতো শক্তিশালী দেশ যদি একটি কার্যকর সামরিক জোট গঠন করে, তবে তা মুসলিম বিশ্বের সম্মিলিত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে পারে। একটি সম্ভাব্য মুসলিম সামরিক জোটের ক্ষেত্রে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির দিকগুলো নিম্নরূপ,
ক। যৌথ সামরিক মহড়া ও প্রশিক্ষণ। একটি জোটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক তার সদস্যদের মধ্যে সমন্বয় ও সহযোগিতা। নিয়মিত যৌথ মহড়া বিভিন্ন দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে সরঞ্জাম, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং কৌশলগত পদ্ধতির পার্থক্য কমিয়ে আনে। যৌথ সামরিক মহড়ার মাধ্যমে জোটের সামরিক বাহিনীগুলো একে অপরের যুদ্ধ কৌশল, সরঞ্জাম এবং কমান্ড-কন্ট্রোল সিস্টেম সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পারে। এরফলে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ও কার্যকরভাবে একসাথে কাজ করা সম্ভব হতে পারে। পাকিস্তান সামরিক বাহিনী সন্ত্রাসবাদ দমন এবং প্রচলিত যুদ্ধে (conventional warfare) দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন, ১৯৮৪ সাল থেকে পিকেকে (PKK)-এর সাথে যুদ্ধরত তুর্কিয়ের রয়েছে অনুরূপ অভিজ্ঞতা। এই দেশগুলো তাদের অভিজ্ঞতা অন্যান্য সদস্য দেশগুলোর সাথে ভাগ করে নিতে পারে, যা অন্যদের যুদ্ধকালীন দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করবে।
খ। প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম বিনিময়। পাকিস্তান একটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ এবং তার নিজস্ব উন্নত সামরিক শিল্প রয়েছে। গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ারের (GFP) ২০২৫ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, সামরিক শক্তির দিক থেকে পাকিস্তান বিশ্বে দ্বাদশ স্থানে রয়েছে। এই জোটের মাধ্যমে পাকিস্তানের সামরিক প্রযুক্তি এবং সরঞ্জাম অন্যান্য সদস্য দেশগুলোতে স্থানান্তরিত হতে পারে। পাকিস্তান তার ফাইটার বিমান (যেমন- JF-17 Thunder), ট্যাংক (যেমন আল-খালিদ) এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম জোটের দেশগুলোতে সরবরাহ করতে পারে, যা তাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াবে। একইভাবে তুর্কিয়ের সামরিক বাহিনী বিশ্বের শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে অবস্থান করে এবং ন্যাটোর (NATO) একটি গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তারাও দেশীয়ভাবে সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে অনেকটা পথ এগিয়েছে। তাদের তৈরী বায়রাক্তার টিবি-২ ড্রোন বিশ্বব্যাপী সুনাম অর্জন করেছে এবং ইউক্রেন, সিরিয়া, লিবিয়াসহ বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে। তুর্কিয়ে তাদের নিজস্ব পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান ‘কান’ (KAAN) তৈরি করছে, যা ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি F-16 যুদ্ধবিমানের বিকল্প হিসেবে কাজ করবে।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী খাজা আসিফ জিও টিভিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, পাক-সৌদি চুক্তির অধীনে প্রয়োজনে পাকিস্তানের পারমাণবিক ক্ষমতা সৌদি আরবের জন্য উপলব্ধ করা হবে। তার কথার প্রতিধ্বনি করে পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র মন্ত্রী মোহাম্মদ ইসহাক দার বলেন, এই চুক্তি পাকিস্তানকে সৌদি আরবের পারমাণবিক সুরক্ষার আওতায় আনতে পারে। সেক্ষেত্রে একটা মুসলিম সামরিক জোট গঠিত হলে সদস্য দেশগুলো পাকিস্তানের পারমাণবিক ঢালের আওতায় আসতে পারে।
গ। মানবসম্পদ ও পেশাদারিত্বের সমন্বয়। সামরিক শক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল। যদি একটি মুসলিম সামরিক জোট গঠিত হয়, তবে তারা প্রয়োজনে সদস্য দেশগুলো থেকে সেনাসদস্য একত্রিত করে একটি বৃহত্তর ও শক্তিশালী যৌথ বাহিনী গঠন করতে পারবে। এছাড়াও পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর পেশাদারিত্ব বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। এই জোটের মাধ্যমে সৌদি আরব এবং অন্যান্য দেশগুলো পাকিস্তানের সামরিক প্রশিক্ষণ ও পেশাদারিত্বের মানদণ্ড অনুসরণ করে নিজেদের সামরিক বাহিনীকে আরও উন্নত করতে পারবে।
ঘ। প্রতিরোধমূলক শক্তি। শক্তিশালী সামরিক জোট কেবল যুদ্ধ করার জন্য নয় বরং সম্ভাব্য শত্রুর যেকোনো আগ্রাসন থেকে নিজকে রক্ষা করতে Deterrence হিসেবে কাজ করে। এই জোটের সামরিক শক্তি একটি সম্মিলিত প্রতিরোধমূলক শক্তি হিসেবে কাজ করবে। কোনো দেশ যদি জোটের কোনো সদস্যকে আক্রমণ করার কথা ভাবে তাহলে তাদের এই বিশাল ও সম্মিলিত শক্তির কথা মাথায় রাখতে হবে। এছাড়া এই চুক্তি এবং সম্ভাব্য জোট গঠন একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা দেয় যে, মুসলিম বিশ্বের দেশগুলো তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। এটি আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রে তাদের কূটনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করবে।
৩.২
সন্ত্রাসবাদ দমন। মুসলিম সামরিক জোটের অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরে থাকা বিভিন্ন সন্ত্রাসী ও জঙ্গি গোষ্ঠীকে দমনে কার্যকরী ভূমিকা রাখা। এক্ষেত্রে সম্ভাব্য কৌশল হতে পারে,
ক। গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও সমন্বিত অভিযান। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো সঠিক ও সময়োপযোগী গোয়েন্দা তথ্য। জোটের সদস্য দেশগুলো যদি নিজেদের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য নিয়মিত বিনিময় করে, তবে তা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কার্যক্রম, পরিকল্পনা এবং আর্থিক উৎস সম্পর্কে একটি স্পষ্ট চিত্র পেতে সাহায্য করবে। এই তথ্যের ভিত্তিতে সমন্বিত সামরিক অভিযান চালানো যেতে পারে, যা একক কোনো দেশের পক্ষে করা কঠিন।
খ। সামরিক প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি। জোটের মধ্যে সামরিক প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান বিনিময় করা যেতে পারে। তুর্কিয়ে, পাকিস্তানের মতো অভিজ্ঞ সামরিক শক্তি অন্য দেশগুলোকে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ দিতে পারে। এর ফলে সদস্য দেশগুলোর সামরিক বাহিনী আরও দক্ষ ও কার্যকর হয়ে উঠবে। বিশেষ করে আরবান গেরিলা ওয়ারফেয়ার, কাউন্টার-ইনসারজেন্সি অপারেশন এবং সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কিত প্রশিক্ষণগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গ। আর্থিক উৎস বন্ধ করা। সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো সাধারণত বিভিন্ন অবৈধ উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করে, যেমন- মাদক ব্যবসা, মানব পাচার এবং বৈদেশিক অনুদান। সামরিক জোটভুক্ত দেশগুলো আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে একত্রিত করে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর আর্থিক চ্যানেল শনাক্ত ও বন্ধ করার জন্য কাজ করতে পারে।
ঘ। সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা। মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশেই অরক্ষিত সীমান্ত রয়েছে, যা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো তাদের লোকবল ও অস্ত্রশস্ত্র এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত করার জন্য ব্যবহার করে। একটি সামরিক জোট এই অরক্ষিত সীমান্তগুলোকে চিহ্নিত করে সেখানে নজরদারি (Surveillance) এবং টহল বৃদ্ধি করতে পারে। এক্ষেত্রে ড্রোন, সেন্সর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ইত্যাদি প্রযুক্তি কার্যকর হতে পারে।
ঙ। মতাদর্শিক লড়াই এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি। সন্ত্রাসবাদ কেবল সামরিক সমস্যা নয় বরং মতাদর্শিক সমস্যাও। এই সামরিক জোটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে সন্ত্রাসবাদের ভুল ব্যাখ্যা ও সহিংস মতাদর্শের বিরুদ্ধে শক্তিশালী Counter-narrative তৈরি করা। ইসলামিক পণ্ডিত এবং ধর্মীয় নেতাদের সহায়তায় সন্ত্রাসবাদের প্রকৃত চেহারা এবং ইসলামের শান্তিবাদী দিক সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। এরফলে নতুন সদস্যরা জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোতে যোগদানে নিরুৎসাহিত হবে।
৩.৩
ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব। সামরিক জোটটি কার্যকর হলে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া এবং অন্যান্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে এটি একটি শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। এছাড়াও পাকিস্তান ও সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠ সামরিক জোট মধ্যপ্রাচ্যের বিদ্যমান ক্ষমতার ভারসাম্যকে প্রভাবিত করতে পারে। এরফলে,
ক। শিয়া-সুন্নি নির্বিশেষে সংঘবদ্ধ মুসলিম সামরিক জোট। ঐতিহাসিকভাবে শিয়া-প্রধান ইরান এবং সুন্নি-প্রধান সৌদি আরবের মধ্যে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মতপার্থক্য রয়েছে। এই মতপার্থক্য প্রায়শই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন আঞ্চলিক সংঘাতে (যেমন সিরিয়া ও ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ) প্রক্সি যুদ্ধের জন্ম দিয়েছে। সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত ইসলামিক মিলিটারি কাউন্টার টেরোরিজম কোয়ালিশন (IMCTC) মূলত একটি সুন্নি-প্রধান জোট, যেখানে ইরান, ইরাক বা সিরিয়ার মতো শিয়া-প্রধান দেশগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অনেকেই এই জোটকে ইরানের বিরুদ্ধে একটি প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবেও বিবেচনা করেন। তাছাড়া পাকিস্তান ঐতিহাসিকভাবে সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠ মিত্র। পাক-সৌদি সামরিক চুক্তি স্বাভাবিকভাবেই সৌদি আরবের সামরিক ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করবে, যার ফলে ইরান ও তার মিত্র (যেমন- ইয়েমেনের হুথি) চুক্তিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে পারে। তবে আশার কথা হলো, চীন ও ইরাকের মধ্যস্থতায় ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়েছে।
সম্প্রতি ইরান এবং ইরাক উভয়েই ইসরায়েলের আগ্রাসন মোকাবিলায় একটি মুসলিম সামরিক জোট গঠনের আহ্বান জানিয়েছে। কাতারে অনুষ্ঠিত আরব-ইসলামিক জরুরি সম্মেলনে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেসকিয়ান মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপের ওপর জোর দেন এবং বলেন যে, কেবল বিবৃতি দিয়ে ইসরায়েলের আগ্রাসন বন্ধ করা সম্ভব নয়। ইরান একটি ‘ন্যাটো-স্টাইলের’ সামরিক জোট গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে সদস্য দেশগুলো একে অপরের প্রতিরক্ষা ও সুরক্ষার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। সেক্ষেত্রে এই চুক্তি ইরান, ইরাক, সিরিয়ার মতো মুসলিম দেশগুলোর অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি সংঘবদ্ধ মুসলিম সামরিক জোট গঠনে আলোচনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।
খ। মার্কিন নির্ভরতা হ্রাস। উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো তাদের নিরাপত্তার জন্য বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সুরক্ষার উপর নির্ভরশীল। সম্প্রতি এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে কিছু প্রশ্ন উঠেছে বিশেষ করে, কাতারে অবস্থিত আল উদেইদ বিমান ঘাঁটি ইসরায়েলের হামলা প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটিটা কাতারের নিরাপত্তার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকলেও ইসরায়েলের হামলার ঘটনায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেনি। একারণে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের এই চুক্তি এবং তার দেখানো পথে মুসলিম সামরিক জোট মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর নিরাপত্তার জন্য বিকল্প শক্তি হয়ে দাঁড়াবে, যা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রভাব হ্রাস করতে পারে।
গ। দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে প্রভাব। একটি কার্যকর মুসলিম সামরিক জোট দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে, যেহেতু ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিনের সংঘাতময় সম্পর্ক বিদ্যমান। দিল্লির আশঙ্কা করার যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে যে, সৌদি আরবের আর্থিক এবং সামরিক সমর্থন সম্ভাব্য সামরিক জোটের সদস্য রাষ্ট্র, পাকিস্তানকে আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে পারে। এমনকি পাকিস্তান এই জোটকে ব্যবহার করে কাশ্মীর ইস্যুকে আন্তর্জাতিক ফোরামে, বিশেষ করে ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা (OIC) এবং অন্যান্য মুসলিম দেশের প্ল্যাটফর্মে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারবে।
বাংলাদেশের জন্য এই জোট সামরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং ভূ-রাজনৈতিক কৌশল উন্নত করার একটি সুযোগ হতে পারে। বিশেষ করে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী কার্যক্রমে এই জোটের মাধ্যমে নতুন প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তবে এই জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশের নিরপেক্ষ পররাষ্ট্র নীতি কিছুটা হলেও প্রভাবিত হতে পারে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়লে তা দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে মালদ্বীপের জন্য এই জোটের প্রভাব ভিন্ন হতে পারে। ছোট দ্বীপরাষ্ট্র হওয়ায় মালদ্বীপের প্রধান উদ্বেগ হলো সমুদ্র নিরাপত্তা। এই জোটের সদস্য হলে মালদ্বীপ তার সামুদ্রিক সীমানা রক্ষায় এবং জলদস্যুতা বিরোধী অভিযানে আরও বেশি আন্তর্জাতিক সহায়তা পেতে পারে। তবে ভারত মহাসাগরে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বিপরীতে এই জোটের অবস্থান মালদ্বীপকে একটি জটিল ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানে ফেলে দিতে পারে, যা তার অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে।
৪
চ্যালেঞ্জ।
মুসলিম বিশ্বের মধ্যে বিভাজন একটি কার্যকর জোট গঠনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। বিভিন্ন দেশের ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং ধর্মীয় স্বার্থ এই জোটকে দুর্বল করতে পারে। যেমন- তুরস্কের নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য রয়েছে, যা সৌদি আরবের লক্ষ্যের সাথে সবসময় এক নাও হতে পারে। এছাড়াও, জোটের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এবং আর্থিক ব্যয় বণ্টন নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দিতে পারে। পাক-সৌদি প্রতিরক্ষা চুক্তি হলেও একটা কার্যকর মুসলিম সামরিক জোট গঠনে নিচের পয়েন্টগুলো চ্যালেঞ্জ আকারে আসতে পারে,
ক। ঐক্যের অভাব। মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক বিভেদ রয়েছে। সুন্নি-শিয়া বিভাজন, বিভিন্ন দেশের মধ্যে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা (যেমন ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে), এবং ভিন্ন ভিন্ন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ একটি শক্তিশালী সামরিক জোট গঠনের পথে বড় বাধা।
খ। ইরানের অবস্থান। ইরান এধরনের যেকোনো জোটকে নিজেদের বিরুদ্ধে পরিচালিত মনে করতে পারে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরব-পাকিস্তান-ইরান এই ত্রিভুজের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে। তবে কাতারে সাম্প্রতিক ইসরায়েলি হামলার প্রেক্ষিতে ইরানের বর্তমান অবস্থান একটি কার্যকরী মুসলিম সামরিক জোট গঠনের পক্ষে।
গ। ভারত ও ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া। একটা মুসলিম সামরিক জোটকে ভারত ও ইসরায়েল তাদের জন্য হুমকি হিসেবে দেখবে। ভারত ইতোমধ্যে পাকিস্তান-সৌদি আরব সামরিক চুক্তির উপর নজর রাখছে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার উপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
ঘ। অর্থনৈতিক চাপ। সামরিক জোট গঠনের জন্য বিপুল পরিমাণ আর্থিক সংস্থান প্রয়োজন। যদিও সৌদি আরবের আর্থিক ক্ষমতা আছে, তবে সম্ভাব্য সদস্য দেশগুলোর মধ্যে এই ব্যয় ভাগাভাগি নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিতে পারে।
ঙ। বহিরাগত শক্তি এবং অভ্যন্তরীণ সংকটের প্রভাব। বিশ্বের পরাশক্তিগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন, মুসলিম বিশ্বের সামরিক জোট গঠনে আগ্রহী হতে পারে বা বাধা দিতে পারে। এই জোট যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের প্রভাবাধীন হয়, তবে তার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে। ইতিমধ্যে চীন মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে প্রবেশ করেছে। এছাড়াও অনেক মুসলিম দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল। ফলে একটি সামরিক জোটে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ কঠিন হতে পারে।
৫
পাকিস্তান-সৌদি আরব প্রতিরক্ষা চুক্তি কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা চুক্তি নয়, এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্যকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে পারে এবং মুসলিম বিশ্বে একটি নতুন সামরিক ও রাজনৈতিক জোট গঠনের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে এর বাস্তবায়ন ও কার্যকারিতা বহু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে। মুসলিম বিশ্বের মধ্যে বিভাজন, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং পরাশক্তিগুলোর প্রভাব এই ধরনের জোটকে দুর্বল করে দিতে পারে। তাই একটি কার্যকর এবং শক্তিশালী মুসলিম সামরিক জোট গঠনের পথটি খুবই জটিল এবং অনিশ্চিত।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫
তথ্যসূত্র:
https://www.arabnews.com/node/2615833
https://timesofindia.indiatimes.com/india/saudi-pakistan-defense-pact-saudi-pakistan-defense-pact-and-india-islamic-nato-pakistan-nuclear-weapons/articleshow/123978246.cms
https://www.reuters.com/world/asia-pacific/saudi-arabia-nuclear-armed-pakistan-sign-mutual-defence-pact-2025-09-17/
উইকিপিডিয়া