
১
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এরফলে জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্যের মধ্যে ১৫০টি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিল এবং এই সংখ্যাটা পরিবর্তন হচ্ছে। ২২ তারিখের অধিবেশনে ফ্রান্স স্বীকৃতি দিয়েছে এবং আমার ধারণা আরও কয়েকটি দেশ জাতিসংঘের অধিবেশন চলাকালেই স্বীকৃতি দিবে। সেক্ষেত্রে জাতিসংঘের স্থায়ী পাঁচ সদস্যের মধ্যে বর্তমানে শুধু যুক্তরাষ্ট্রই বাকি থাকলো, আর তাই ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতির পথে চূড়ান্ত পর্যায়ে বাধা হয়ে থাকলো যুক্তরাষ্ট্র। কারণ সংস্থাটির নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো দেয়ার ক্ষমতা রয়েছে। কোনো রাষ্ট্রের স্বীকৃতির ক্ষেত্রে স্থায়ী ৫ দেশের কোনো দেশ ভেটো দিলে তা আর এগোয় না। জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পেতে হলে ফিলিস্তিনকে নিরাপত্তা পরিষদের কমপক্ষে ৯টি সদস্য রাষ্ট্রের সমর্থন এবং কোনো স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রের (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন) ভেটো না থাকা আবশ্যক। যাহোক ফ্রান্সের পাশাপাশি বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ, মাল্টা, সান মারিনো এবং অ্যান্ডোরাও ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারে। এরমধ্যে মাল্টা স্বীকৃতি দেয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে।
১.১
গাজায় প্রায় দুই বছর ধরে চলমান ইসরায়েলের গণহত্যার মধ্যে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে শক্তিধর দেশগুলোর স্বীকৃতি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট করা এক ভিডিও বার্তায় যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান বীভৎসতার মুখে আমরা শান্তির সম্ভাবনা এবং দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানকে বাঁচিয়ে রাখতে কাজ করছি। এর অর্থ হলো একটি নিরাপদ ও সুরক্ষিত ইসরায়েল রাষ্ট্রের পাশাপাশি একটি কার্যকর ফিলিস্তিন রাষ্ট্র, এ মুহূর্তে যার কোনোটিই আমাদের কাছে নেই।’ প্রধানমন্ত্রী এরপর বলেন, ‘এখন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার সময় হয়েছে। শান্তি ও দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান পুনরুজ্জীবিত করার আশায় আজ আমি এই মহান দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করছি, যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিচ্ছে।’ তবে গত জুলাই মাসেই স্টারমার প্রশাসন বলেছিল, ইসরায়েল যদি ফিলিস্তিনের গাজায় যুদ্ধবিরতির শর্ত পূরণে রাজি না হয় এবং দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের জন্য দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই শান্তি স্থাপনে চুক্তি না করে, তাহলে যুক্তরাজ্য সরকার নিজেদের অবস্থান বদলাবে। ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে। তবে ইসরায়েল ফিলিস্তিনকে পশ্চিমা দেশের স্বীকৃতির ঘোষণা ভালোভাবে নেয়নি। এরই মধ্যে ইসরায়েল বলেছে, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে ‘সন্ত্রাসবাদকে পুরস্কৃত’ করা হবে। ইসরায়েলের অভিযোগের জবাবে স্টারমার বলেন, ‘আমাদের দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের আহ্বান বিদ্বেষপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির সম্পূর্ণ বিপরীত। এই সমাধানের অর্থ হামাসকে পুরস্কৃত করা নয়। এর অর্থ, এখন হামাসের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। সরকারে তাদের কোনো ভূমিকা থাকবে না এবং নিরাপত্তাব্যবস্থায়ও কোনো অংশীদারত্ব থাকবে না।’
জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সবার আগে কানাডা ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে, এনিয়ে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এক্স পোস্টে বলেন, ‘কানাডা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। এরমধ্য দিয়ে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল উভয়ের জন্য শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ গড়ার প্রতিশ্রুতির প্রতি আমরা আমাদের অংশীদারত্ব প্রস্তাব করছি।’ অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। এতে অস্ট্রেলিয়া ফিলিস্তিনি জনগণের দীর্ঘদিনের বৈধ রাষ্ট্র প্রত্যাশা স্বীকার করছে। এই স্বীকৃতিতে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি অস্ট্রেলিয়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি প্রতিফলিত হয়েছে। দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন উভয়ের জন্য স্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তার একমাত্র পথ।’
১.২
অতীতে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো একটা গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানোর জন্য সরাসরি আলোচনার ওপর জোর দিত এবং একতরফাভাবে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অনিচ্ছুক ছিল। তাদের এরকম মনোভাবের মূল কারণ ছিল,
ক। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক।
পশ্চিমা দেশগুলোর, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। এই সম্পর্ক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের এবং স্নায়ুযুদ্ধের সময় তা আরও শক্তিশালী হয়। ইসরায়েলকে মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা স্বার্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখা হতো। তাই ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিলে ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়তে পারে, এই আশঙ্কা পশ্চিমা দেশগুলোর নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলেছিল।
খ। ‘আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান’ নীতি।
পশ্চিমা দেশগুলো মনে করত যে, ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমেই একটি টেকসই শান্তি চুক্তি সম্ভব। একতরফা স্বীকৃতি এই আলোচনার প্রক্রিয়াকে দুর্বল করতে পারে এবং ইসরায়েলকে একটি চুক্তিতে আসতে নিরুৎসাহিত করতে পারে বলে তাদের ধারণা ছিল। তারা বিশ্বাস করতো যে, স্বীকৃতি কেবল একটি চূড়ান্ত শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবেই আসা উচিত, যা জেরুজালেম এবং শরণার্থীদের সমস্যাগুলির সমাধান করবে।
গ। ফিলিস্তিনিদের মধ্যে বিভাজন।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (PA) সঙ্গে হামাসের (Hamas) রাজনৈতিক বিভাজনও পশ্চিমা দেশগুলোর দ্বিধাদ্বন্দ্বের একটি কারণ ছিল। তারা একটি বিভক্ত ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের সঙ্গে একটি কার্যকর রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে সন্দিহান ছিল।
২
ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলোর অবস্থান পরিবর্তন নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক ঘটনা। পশ্চিমা দেশগুলো দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানকে সবসময়ই সমর্থন করলেও, তারা ফিলিস্তিনকে সরাসরি রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অনিচ্ছুক ছিল। এর পেছনের মূল কারণগুলো আগেই উল্লেখ করেছি। তারা আসলে ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্ক ও নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার নীতির প্রতি গভীরভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ ছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল, স্বীকৃতি শুধুমাত্র ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমেই আসা উচিত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষ করে গাজা যুদ্ধের তীব্রতার কারণে তাদের এই নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। গাজায় মানবিক বিপর্যয়, ব্যাপক বেসামরিক মানুষের হতাহত হওয়া এবং আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বিশ্বজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
২.১
গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার হামলায় নিহতের সংখ্যা এরই মধ্যে ৬৫ হাজার ছাড়িয়েছে। ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ উপত্যকাটির প্রায় ২১ লাখ বাসিন্দার প্রায় সবাই একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। সম্প্রতি গাজার বৃহত্তম শহর গাজা নগরীতে সর্বাত্মক হামলা শুরু করেছে ইসরায়েল। জাতিসংঘ স্বীকৃত রোমভিত্তিক খাদ্যনিরাপত্তা পর্যবেক্ষণবিষয়ক প্যানেল (আইপিসির) গাজায় দুর্ভিক্ষের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে। সম্প্রতি জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে গাজায় গণহত্যার (জেনোসাইড) কথা স্বীকার করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে গণহত্যা বন্ধে ইসরায়েলকে বাধ্য করতে যুক্তরাজ্যসহ অন্যান্য পশ্চিমা দেশের ওপর চাপ বাড়ছে। তাছাড়া ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর থেকে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্সসহ পশ্চিমা দেশগুলোতে ফিলিস্তিনের পক্ষে নিয়মিত বিক্ষোভ হচ্ছিল।
২.২
পশ্চিমা দেশগুলোর অবস্থান পরিবর্তনের পেছনে অন্যান্য কারণ,
ক। আন্তর্জাতিক জনমতের চাপ।
গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বিশ্বজুড়ে ব্যাপক প্রতিবাদ এবং জনমতের জন্ম দিয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোর সরকারগুলো তাদের নিজেদের নাগরিকদের কাছ থেকে ফিলিস্তিনের প্রতি আরও সমর্থন এবং ইসরায়েলের আগ্রাসন বন্ধ করার জন্য ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর ঘটনা পশ্চিমা দেশগুলোর সরকারগুলোর ওপর জনগণের চাপ বৃদ্ধি করেছে। সরকারের ওপর জনগণের এই চাপ বৃদ্ধি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার নীতি পরিবর্তনে প্রভাব ফেলেছে।
খ। গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমের ভূমিকা।
সাম্প্রতিক গাজা সংঘাতের খবর বিশ্বের গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমগুলোতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ঐতিহ্যবাহী সংবাদ মাধ্যম, যেমন- সিএনএন, বিবিসি, আল জাজিরায় যুদ্ধের ভয়াবহতা, বেসামরিক মানুষের দুর্দশা এবং অবকাঠামো ধ্বংসের চিত্র নিয়মিতভাবে প্রচারিত হয়েছে। একই সাথে, সামাজিক মাধ্যমগুলো (যেমন- টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, এক্স) ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করেছে, যেখানে তারা সরাসরি তাদের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরতে পেরেছে। এসব মাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও ও ছবিগুলো বিশ্বজুড়ে মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলেছে, যা সাধারণ মানুষকে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে জনমত গঠনে উৎসাহিত করেছে।
গ। ছাত্র আন্দোলন এবং প্রতিবাদ।
পশ্চিমা দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গাজা যুদ্ধের বিরুদ্ধে ব্যাপক ছাত্র আন্দোলন ও প্রতিবাদ সংগঠিত হয়েছে। ছাত্ররা ইসরায়েলবিরোধী স্লোগান দিয়েছে, ক্যাম্পাসে তাঁবু গেড়ে বিক্ষোভ করেছে, এবং তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ইসরায়েলের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান জানিয়েছে। এই আন্দোলনগুলো শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা সরকারের ওপরও চাপ সৃষ্টি করেছে।
ঘ। নৈতিক চাপ।
ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্দশা এবং মানবিক সংকট পশ্চিমা দেশগুলোকে নৈতিকভাবে প্রভাবিত করেছে এবং তাদের মানবিক ও নৈতিক অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করেছে। দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানকে বাস্তব রূপ দিতে এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিশ্চিত করতে এটি একটি নৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই ঘটনাগুলো তাদের জন্য একটি প্রশ্ন তৈরি করেছে যে, তারা কীভাবে মানবাধিকারের পক্ষে থাকার নীতি বজায় রাখবে, যদি তারা এমন একটি পরিস্থিতিকে সমর্থন করে। তারা উপলব্ধি করছে যে, শুধু আলোচনার ওপর নির্ভর করে ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
ঙ। রাজনৈতিক চাপ।
সরকারের মধ্যে থাকা রাজনৈতিক দল এবং বিরোধী দলগুলো এই ইস্যুতে সরকারের নীতি পরিবর্তনের জন্য চাপ সৃষ্টি করেছে। এছাড়া, আসন্ন নির্বাচনগুলোতে ভোটারদের অসন্তোষ সরকারগুলোর জন্য একটি রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করেছে।
চ। কূটনৈতিক অবস্থান।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো থেকে আসা সমালোচনার কারণে পশ্চিমা দেশগুলোর কূটনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়েছে। তাদের পররাষ্ট্র নীতিকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়াকে একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা আলোচনা প্রক্রিয়া এবং শান্তি চুক্তিগুলো ব্যর্থ হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি প্রদানকে অনেকে একটি নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানকে পুনরুজ্জীবিত করার উপায় হিসেবে দেখছেন। অনেকেই মনে করছেন যে, ইসরায়েলি বসতি স্থাপন এবং গাজায় চলমান সংঘাত, দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের সম্ভাবনাকে আরও কঠিন করে তুলছে। এইসব কারণ সম্মিলিতভাবে পশ্চিমা দেশগুলোকে ফিলিস্তিন বিষয়ে তাদের দীর্ঘদিনের নীতি থেকে সরে এসে নতুন অবস্থান নিতে বাধ্য করেছে, যা দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের জন্য একটি নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
ছ। কূটনৈতিক ব্যর্থতা।
‘কূটনৈতিক ব্যর্থতা’ বলতে ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য অতীতে যে সব আলোচনা ও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর চূড়ান্ত ব্যর্থতাকে বোঝানো হয়। দীর্ঘ চার দশক ধরে অসংখ্য শান্তি প্রক্রিয়া, চুক্তি ও রোডম্যাপ তৈরি করা হলেও, কোনোটিই সফল হয়নি। এই ধারাবাহিক ব্যর্থতার প্রধান কারণ,
(১) অসফল শান্তি আলোচনা। ১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তি (Oslo Accords) থেকে শুরু করে ২০০০ সালের ক্যাম্প ডেভিড সম্মেলন এবং পরবর্তীতে আরও অনেক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু এই আলোচনাগুলোতে মূল ইস্যুগুলো, যেমন- জেরুজালেমের মর্যাদা, ইসরায়েলি বসতি স্থাপন, ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের অধিকার এবং ভবিষ্যৎ সীমানা নির্ধারণের মতো বিষয়গুলোতে কোনো সমাধান আসেনি। উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড় ছিল। ইসরায়েল ফিলিস্তিনি বসতি স্থাপন অব্যাহত রাখে, যা দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া অসম্ভব করে তোলে। অন্যদিকে, ফিলিস্তিনি পক্ষ রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
(২) শান্তি প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা। শান্তি প্রক্রিয়াগুলো সফল না হওয়ার পেছনে মৌলিক কিছু সীমাবদ্ধতা,
(ক) ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা। আলোচনাগুলো প্রায়শই ইসরায়েলের সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার কারণে ভারসাম্যহীন ছিল। ফিলিস্তিনিদের পক্ষে নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে পড়েছিল।
(খ) যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষপাতিত্ব। যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় মিত্র হিসেবে ভূমিকা রেখেছে, যা আলোচনাগুলোকে নিরপেক্ষ হতে দেয়নি। ফিলিস্তিনিদের কাছে মনে হয়েছে, আলোচনাগুলো তাদের স্বার্থের চেয়ে ইসরায়েলের স্বার্থকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে।
(গ) আস্থার অভাব। উভয় পক্ষের মধ্যে দশকের পর দশক ধরে চলে আসা সংঘাত ও সহিংসতার কারণে আস্থার চরম অভাব দেখা যায়, যা কোনো আলোচনাকে সফল হতে দেয়নি।
৩
দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের ভবিষ্যৎ।
পশ্চিমা দেশগুলোর ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ফলে দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই স্বীকৃতির ফলে তাৎক্ষণিক কোনো বড় পরিবর্তন না এলেও দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তনের ভিত্তি স্থাপন করবে। ফিলিস্তিন একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারলে ইসরায়েলের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াবে। এই চাপ ইসরায়েলকে দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের জন্য আরও নমনীয় হতে বাধ্য করতে পারে। যদিও ইসরায়েল এই পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করছে, তবুও এটি ফিলিস্তিনিদের আন্তর্জাতিক সমর্থন বৃদ্ধি করবে। এটি ফিলিস্তিনকে জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্যপদ পেতে সাহায্য করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী তাদের সার্বভৌমত্বের দাবীকে আরও শক্তিশালী করবে।
৩.১
ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়াকে অনেকেই দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের পথে একটি উল্লেখযোগ্য এবং ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। এর প্রধান কারণ,
ক। আন্তর্জাতিক সমর্থন বৃদ্ধি।
ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের বৈধতা আরও বাড়বে। এটি তাদের জন্য জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে পূর্ণ সদস্যপদ পাওয়ার পথ খুলে দেবে, যা তাদের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করবে।
খ। সার্বভৌমত্বের দাবি।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ফিলিস্তিনিদের সার্বভৌমত্বের দাবি আরও শক্তিশালী হবে। এই স্বীকৃতি ফিলিস্তিনকে একটি সমান রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসতে সাহায্য করবে, যেখানে তারা তাদের অধিকার ও দাবিগুলো আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারবে।
গ। সরাসরি আলোচনার বিকল্প।
দীর্ঘদিনের শান্তি আলোচনা বারবার ব্যর্থ হওয়ায় এই স্বীকৃতিকে একটি নতুন কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ফিলিস্তিনকে সরাসরি আলোচনার জন্য অপেক্ষায় না রেখে তাদের রাষ্ট্রীয় অধিকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
৩.২
ইসরায়েলের বিরোধিতা এবং এর প্রভাব।
ইসরায়েল এই ধরনের একতরফা স্বীকৃতির তীব্র বিরোধিতা করে আসছে। তাদের যুক্তি শান্তি আলোচনা এবং চুক্তির মাধ্যমেই ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হওয়া উচিত, একতরফা স্বীকৃতির মাধ্যমে নয়। ইসরায়েলের এই বিরোধিতার কারণে আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়তে পারে। কেননা পশ্চিমা দেশগুলোর এই পদক্ষেপের ফলে ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের টানাপোড়েন সৃষ্টি হতে পারে। ইসরায়েল এর প্রতিবাদে কূটনৈতিক সম্পর্ক অবনতি করতে পারে এবং এর ফলে শান্তি প্রক্রিয়ার অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হতে পারে। এমনকি ইসরায়েল এই স্বীকৃতিকে শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য ক্ষতিকর মনে করতে পারে এবং যেকোনো আলোচনায় আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারে।
৪
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্য।
এই স্বীকৃতি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যকে প্রভাবিত করবে এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে। এর ফলে ইসরায়েলের ওপর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ বাড়বে এবং তা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ককেও প্রভাবিত করবে। এছাড়াও ইসরায়েল আন্তর্জাতিকভাবে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে, বিশেষ করে তার পশ্চিমা মিত্রদের কাছ থেকে। তবে ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে আরও স্বীকৃতি দেয়া হলে দীর্ঘমেয়াদী শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। অন্যান্য যা হতে পারে,
ক। কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা।
ঐতিহ্যগতভাবে ইসরায়েল তার পশ্চিমা মিত্রদের, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, এবং জার্মানির কাছ থেকে নিঃশর্ত কূটনৈতিক সমর্থন পেয়ে আসছে। এই সমর্থন ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফিলিস্তিনিদের অধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে সমালোচনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে সাহায্য করেছে। কিন্তু এখন যখন পশ্চিমা দেশগুলো তাদের অবস্থান পরিবর্তন করছে, ইসরায়েল তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্রদের কাছ থেকে সমর্থন হারাচ্ছে। এটি ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে তুলছে। যদিও ইসরায়েল তার ঘনিষ্ঠ মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন হারাচ্ছে না, তবুও অন্যান্য পশ্চিমা দেশের সমর্থন হারানো তাদের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক ধাক্কা।
খ। ফিলিস্তিনের আন্তর্জাতিক মর্যাদা বৃদ্ধি।
জাতিসংঘের বিভিন্ন ফোরামে, বিশেষ করে সাধারণ পরিষদে, ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন বৃদ্ধি পাচ্ছে। পশ্চিমা দেশগুলোর স্বীকৃতি এই প্রক্রিয়াকে আরও বেগবান করবে। ইসরায়েলকে এখন কেবল আরব বা মুসলিম দেশগুলোর সমালোচনার মুখোমুখি হতে হচ্ছে না, বরং তার দীর্ঘদিনের পশ্চিমা মিত্রদেরও সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে। এই স্বীকৃতি ফিলিস্তিনকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও শক্তিশালী করবে। এটি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে আরও বেশি রাজনৈতিক বৈধতা দেবে এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আরও শক্তিশালী ভিত্তি দেবে। এটি ইসরায়েলকে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসতে এবং একটি কার্যকর দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানে পৌঁছাতে বাধ্য করতে পারে।
গ। রাজনৈতিক চাপ।
পশ্চিমা দেশগুলোর পদক্ষেপ ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও চাপ সৃষ্টি করছে। ইসরায়েলের বর্তমান সরকার, যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, ফিলিস্তিনি বসতি স্থাপন এবং গাজায় সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে। কিন্তু এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে তাদের নীতি পুনর্বিবেচনা করতে। ইসরায়েলের জনগণও ভাবতে পারে যে, তাদের সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ঝুঁকিতে ফেলছে।
ঘ। ভবিষ্যৎ শান্তি প্রক্রিয়া।
ইসরায়েল শান্তি প্রক্রিয়ায় ফিরতে এবং ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে একটি কার্যকর চুক্তি করতে উৎসাহিত হতে পারে। যদি তারা আন্তর্জাতিক সমর্থন পুনরুদ্ধার করতে চায়, তবে তাদের আলোচনার টেবিলে আরও নমনীয় হতে হবে। ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে পশ্চিমা দেশগুলো ইসরায়েলকে এই বার্তা দিচ্ছে যে, শান্তি আলোচনা ছাড়া এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার উপেক্ষা করে তারা মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী স্থিতিশীলতা আশা করতে পারে না। এটি ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করে দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানকে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরিয়ে আনার একটি কৌশল।
ঙ। আঞ্চলিক জোটের পরিবর্তন।
ঐতিহ্যগতভাবে অনেক আরব দেশ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে ছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে আব্রাহাম অ্যাকর্ডস চুক্তির পর, ইসরায়েল এবং কিছু আরব দেশের (যেমন- সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, সুদান এবং মরক্কো) মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ শুরু হয়। এই প্রক্রিয়াটির লক্ষ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে মোকাবেলা করা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। তবে গাজা যুদ্ধের তীব্রতা এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি পশ্চিমা দেশগুলোর পরিবর্তিত অবস্থান এই স্বাভাবিকীকরণ প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে। পশ্চিমা দেশগুলোর স্বীকৃতি আরব রাষ্ট্রগুলোকে ফিলিস্তিনিদের প্রতি তাদের সমর্থন আরও জোরদার করতে উৎসাহিত করবে। এর ফলে ইসরায়েল ও আরব দেশগুলোর মধ্যেকার সম্পর্ক উন্নয়নের গতি কমে যেতে পারে এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে নতুন জোট গঠিত হতে পারে। ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলোর অবস্থান পরিবর্তনের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক জোট এবং ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্কে একটি নতুন ডায়নামিক তৈরি হয়েছে। এটি শুধুমাত্র ইসরায়েল- ফিলিস্তিন সংঘাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর রাজনৈতিক ভারসাম্যের ওপরও পড়বে।
৫
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যের পরিবর্তন।
ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার এই ঘটনাটি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এটি কেবল ফিলিস্তিনিদের জন্য নয়, বরং এই অঞ্চলের সামগ্রিক রাজনৈতিক ভারসাম্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমাদের স্বীকৃতি প্রমাণ করে যে, দীর্ঘদিনের যে শান্তি প্রক্রিয়ার ব্যর্থতা মধ্যপ্রাচ্যে একটি স্থিতাবস্থা তৈরি করেছিল, তা এখন ভেঙে পড়ছে। পশ্চিমা দেশগুলো এখন কেবল ‘আলোচনার মাধ্যমে সমাধান’ এই নীতির ওপর নির্ভর করতে প্রস্তুত নয়। তাদের এই পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে নতুন জোটের জন্ম দিতে পারে। ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়ার কারণে আরব দেশগুলো ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে দ্বিধায় পড়তে পারে। এটি ফিলিস্তিনের প্রতি আরব বিশ্বের সমর্থনকে আরও শক্তিশালী করবে। ইসরায়েলের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। তাকে বুঝতে হবে যে, আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কমাতে চাইলে তাকে ফিলিস্তিনের সঙ্গে একটি সত্যিকারের দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানে পৌঁছানোর জন্য আরও নমনীয় হতে হবে।
৬
সব মিলিয়ে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার এই প্রক্রিয়াটি কেবল একটি প্রতীকী পদক্ষেপ নয়, বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এরফলে ফিলিস্তিন তার স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথে অনেকখানি এগিয়ে যাবে।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫