
১
দক্ষিণ এশিয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক বিপর্যয়, বাংলাদেশের কোটা সংস্কার আন্দোলন, নেপালের তরুণদের বিক্ষোভ এবং সর্বশেষ ভারতে লাদাখের আন্দোলনকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে, বরং একটি বৃহত্তর ‘ডমিনো ইফেক্ট’ বা গণরোষের অভিন্ন চিত্রনাট্য হিসেবে দেখা যেতে পারে, যার মূল চালিকাশক্তি জেনারেশন জি। দক্ষিণ এশিয়ায় এখন যেন গণরোষের এক অভিন্ন চিত্রনাট্য চলছে, যা এক দেশ থেকে অন্যদেশে ছড়িয়ে পড়ছে ‘ডমিনো ইফেক্ট’-এর মতো। এটি কেবল অর্থনৈতিক সংকটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নয়, বরং দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত রাজনৈতিক দুর্নীতি ও অব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক নতুন প্রজন্মের বিদ্রোহ। যখন শ্রীলঙ্কার ‘গোটা গো হোম’ স্লোগান বিশ্বজুড়ে প্রতিধ্বনিত হয়, তখন তা বাংলাদেশের তরুণদেরও একই ধরনের প্রতিবাদের শক্তি জুগিয়েছিল। আর বাংলাদেশের আন্দোলন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নেপালের ‘জেন জি’রাও তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে পথে নামে। নেপালের আন্দোলন উদ্বুদ্ধ করে লাদাখের যুবকদের। এই ধারাবাহিক আন্দোলনগুলো প্রমাণ করে যে, দক্ষিণ এশিয়ার জনগণ আর নীরব থাকবে না; তারা এখন নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই লিখছে। এই আন্দোলনগুলির মধ্যে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ অভিন্ন বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়, যা এগুলিকে আঞ্চলিক প্রবণতা হিসেবে চিহ্নিত করে,
ক। অভিন্ন প্রেক্ষাপট।
দুর্নীতি, বৈষম্য ও অর্থনৈতিক হতাশা ঘিরে এই আন্দোলনগুলির কেন্দ্রে রয়েছে তরুণ প্রজন্মের গভীর হতাশা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। যার কারণ,
(১) দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা। প্রতিটি ক্ষেত্রেই সরকার ও শাসকগোষ্ঠীর ব্যাপক দুর্নীতি, স্বজনপোষণ এবং অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা ছিল গণরোষের প্রধান উৎস। শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক বিপর্যয়, বাংলাদেশের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় সরকারের প্রতিক্রিয়ায় ক্ষোভ এবং নেপালের তরুণদের রাজনৈতিক অকার্যকারিতার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ—সবই একই ধরনের অভিযোগের প্রতিফলন।
(২) অর্থনৈতিক বৈষম্য। উচ্চ বেকারত্ব, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সম্পদের অসম বন্টন এই অঞ্চলের তরুণদের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। তারা মনে করে যে প্রচলিত ব্যবস্থা তাদের জন্য কোনো সুযোগ সৃষ্টি করছে না।
(৩) রাজনৈতিক এলিটদের প্রতি অনাস্থা। তরুণরা প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল এবং নেতাদের প্রতি আস্থাহীন। তারা পুরনো রাজনীতির পরিবর্তে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা দাবি করছে।
খ। অভিন্ন চালিকাশক্তি।
ডিজিটাল প্লাটফর্মের অভিন্ন ব্যবহার আন্দোলনগুলির প্রকৃতি এবং বিস্তারে জেনারেশন জি-র প্রভাব সুস্পষ্ট, যেমন-
(১) ডিজিটাল অ্যাক্টিভিজম। জেনারেশন জি’র তরুণরা সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম (যেমন—ফেসবুক, টুইটার, টিকটক, ডিসকর্ড) ব্যবহার করে দ্রুত সংগঠিত হচ্ছে এবং বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে। এরফলে আন্দোলনগুলি নেতৃত্ববিহীন ও বিকেন্দ্রীভূত রূপ ধারণ করেছে।
(২) দ্রুত প্রভাব বিস্তার (ডমিনো ইফেক্ট) । এক দেশের সফল বা সহিংস আন্দোলন অন্য দেশের তরুণদের উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করেছে। শ্রীলঙ্কার 'আরাগালয়া' এবং বাংলাদেশের ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন’ ছিল এই অঞ্চলের পরবর্তী বিক্ষোভগুলির জন্য একটি অনুপ্রেরণা। নেপালের ‘নেপো কিড’ ঘিরে জেন জি আন্দোলন লাদাখেও দ্রুত ছড়িয়েছে। সেখানকার জেনারেশন জি প্রজন্ম পরিবেশগত সংবেদনশীলতা রক্ষা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে যে বিক্ষোভ করেছে, তাও বৃহত্তর চিত্রনাট্যের অংশ। এটি অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং স্থানীয় স্বশাসনের দাবির মতো বিষয়গুলিকে তুলে ধরে, যা এই অঞ্চলের অন্যান্য আন্দোলনের মতোই ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও জবাবদিহিতা চাওয়ার ইঙ্গিত বহন করে।
গ। চিরায়ত ব্যবস্থা বদলের আকাঙ্ক্ষা।
জেন জি বিক্ষোভগুলির একটি সাধারণ লক্ষ্য হলো দীর্ঘদিনের পুরনো, অকার্যকর রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং ক্ষমতা কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ জানানো। আর তাই,
(১) সরকার পতন। শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালে বিক্ষোভের মুখে সরকারের পতন হয়েছে এবং যা প্রমাণ করে যে গণরোষ কতটা শক্তিশালী হতে পারে।
(২) দীর্ঘমেয়াদী সংস্কারের দাবি। আন্দোলনগুলি শুধু তাৎক্ষণিক সমস্যার সমাধান চায় না, বরং কাঠামোগত পরিবর্তন ও টেকসই সংস্কারের দাবি জানায়।
এইভাবে শ্রীলঙ্কা থেকে শুরু করে লাদাখ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভগুলি হলো একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক অস্থিরতার লক্ষণ, যা এই অঞ্চলে সুশাসন, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার ব্যর্থতা নির্দেশ করে।
২
এবার আসি ডমিনো ইফেক্ট প্রসঙ্গে। ডমিনো ইফেক্ট কি? এই ইফেক্টের মাধ্যমে আসলে এমন একটি পরিস্থিতিকে বোঝানো হয় যেখানে একটি ঘটনা বা কাজ অন্য একটি একই ধরনের বা সম্পর্কিত ঘটনার জন্ম দেয়, যা আবার পরবর্তী আরেকটি ঘটনার জন্ম দেয় এবং এভাবেই পরপর ঘটনাগুলোর একটি শৃঙ্খল তৈরি হয়। এটা অনেকটা ডমিনো খেলার মতো, যেখানে একটি ডমিনোকে ধাক্কা দিলে তা অন্যটিকে ফেলে দেয় এবং এভাবে সব ডমিনোগুলো একে একে পড়ে যায়। এটি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঘটতে পারে, যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি, দলগত কাজ, বা এমনকি ব্যক্তিগত অভ্যাসের ক্ষেত্রেও। প্রভাবটি ইতিবাচক বা নেতিবাচক উভয়ই হতে পারে। শ্রীলঙ্কায় ডমিনো ইফেক্টের প্রভাব মূলত অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট এবং রাজনৈতিক দুর্নীতির কারণে শুরু হয়। এই সংকট একসময় এত তীব্র আকার ধারণ করে যে তা সাধারণ জনগণের মধ্যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ হয়ে বিস্ফোরিত হয়, যা পরবর্তীতে প্রতিবেশী দেশগুলোতেও প্রতিবাদের ঢেউ তোলে।
ক। শ্রীলঙ্কার গণরোষের সূত্রপাত কিংবা ‘ডমিনো ইফেক্ট’ এর প্রথম টাইল।
শ্রীলঙ্কায় ‘ডমিনো ইফেক্ট’ এর শুরুটা ছিল দেশটির দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক অব্যবস্থার কারণে। সেখানে কোভিড-১৯ মহামারী, ভুল অর্থনৈতিক নীতি এবং আন্তর্জাতিক ঋণ—এইসব দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে ফেলে। পর্যটন শিল্প ধসে পড়ে, বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ কমে যায় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আকাশ ছুঁয়ে ফেলে। এর ফলে জনগণের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়। সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত দেখতে পায়। একারণে শ্রীলঙ্কার প্রেক্ষাপটে, ‘ডমিনো’র প্রথম টাইল ছিল দেশটির অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটই জনগণের মধ্যে এমন ক্ষোভ তৈরি করেছিল যা শেষ পর্যন্ত একটি সফল গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি যখন ধ্বসে পড়ে, তখন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরমভাবে বিপর্যস্ত হয়। জ্বালানি, খাদ্য, বিদ্যুতের অভাবে জনগণ রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়। অর্থনৈতিক সংকট জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে বিস্ফোরণের দিকে ঠেলে দেয়। তারা রাজাপক্ষে পরিবারের রাজনৈতিক দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে একত্রিত হয়। এরফলে বিক্ষোভকারীরা একসময় প্রেসিডেন্টের বাসভবন ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় দখল করে নেয়। এই ঘটনা বিশ্বব্যাপী প্রচারিত হয় এবং সফলভাবে সরকার পতনের কারণ হয়।
শ্রীলঙ্কার জনগণের এই আন্দোলনের মূল স্লোগান ছিল ‘গোটা গো হোম’। এই স্লোগানটি কেবল প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষের পদত্যাগের দাবি ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সামগ্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। বিক্ষোভকারীরা কোনো ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় ছিল না। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে সংগঠিত হয় এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ডাক দেয়। এই ডিজিটাল বিপ্লব তাদের প্রতিবাদকে দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে। এরপর তারা যখন প্রেসিডেন্টের বাসভবন ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় দখল করে নেয়, তখন আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় এই খবর ছড়িয়ে পড়ে। এটি প্রমাণ করে যে শান্তিপূর্ণ গণবিক্ষোভের মাধ্যমে সরকারকেও নতজানু করানো সম্ভব। এই সাফল্যই প্রতিবেশী দেশগুলোর সাধারণ মানুষকে অনুপ্রাণিত করে এবং বাংলাদেশ ও নেপালে, জনগণের মধ্যে এই বিশ্বাস তৈরি করে যে, ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ এবং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের মাধ্যমে পরিবর্তন আনা সম্ভব। তাই শ্রীলঙ্কার আন্দোলনকেই বলা হয় ‘ডমিনো’র প্রথম টাইল’, কারণ এটিই সেই সূচনা যা পুরো অঞ্চলের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে বদলে দিতে শুরু করে।
খ। বাংলাদেশে আন্দোলনের দ্বিতীয় টাইল।
শ্রীলঙ্কার আন্দোলন থেকে বাংলাদেশে এর ঢেউ মূলত দুটি প্রধান কারণে আছড়ে পড়ে। প্রথমত, দুই দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে কিছু মিল, যার কারণে শ্রীলঙ্কার আন্দোলন বাংলাদেশের মানুষের মনে একধরনের সংহতি ও অনুপ্রেরণা তৈরি করে। দ্বিতীয়ত, গণমাধ্যমের দ্রুত প্রসারের কারণে শ্রীলঙ্কার আন্দোলন মুহূর্তের মধ্যে বাংলাদেশের জনগণের কাছে পৌঁছে যায়, যা তাদের মধ্যে এক নতুন চেতনার জন্ম দেয়। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম, যারা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্য ও দুর্নীতির শিকার হয়েছিল, তারা শ্রীলঙ্কার আন্দোলন থেকে অনুপ্রেরণা পায়। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট শ্রীলঙ্কার মতো তীব্র না হলেও, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব এবং রাজনৈতিক দুর্নীতির মতো বিষয়গুলো জনগণের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করছিল। শ্রীলঙ্কার সাফল্য তাদের দেখিয়েছিল যে, প্রতিবাদ করলে পরিবর্তন আনা সম্ভব। এটি বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন’ এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন বিক্ষোভে ইন্ধন যুগিয়েছিল। এছাড়াও এই প্রভাবের পেছনে ‘ভারত-বিরোধিতা’ও একটা ফ্যাক্টর ছিল। শ্রীলঙ্কা থেকে বাংলাদেশে আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ার অন্যান্য কারণ,
(১) অনলাইনে সংগঠিত হওয়া। শ্রীলঙ্কার গণবিক্ষোভের মূল শক্তি ছিল সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম, যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে আন্দোলনকে ছড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশেও কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় একই রকম কৌশল দেখা গেছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা অনলাইনে সংগঠিত হয়ে দ্রুত সারা দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে দিয়েছিল। এই ডিজিটাল সংযোগ দুই দেশের আন্দোলনের মধ্যে একধরনের মিল তৈরি করেছে।
(২) অভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট। শ্রীলঙ্কার মতো বাংলাদেশেও সাধারণ মানুষের মধ্যে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে চাপা ক্ষোভ ছিল। শ্রীলঙ্কার আন্দোলনের সাফল্য বাংলাদেশের জনগণকে দেখিয়েছিল যে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের মাধ্যমে সরকারকেও জবাবদিহি করতে বাধ্য করা যায়।
(৩) গণমাধ্যমের ভূমিকা। শ্রীলঙ্কার আন্দোলনের খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। সেই খবরগুলো বাংলাদেশের মানুষের কাছে পৌঁছানোর পর, তারা নিজেদের দেশের পরিস্থিতির সঙ্গে এর মিল খুঁজে পায়। এটি বাংলাদেশের জনগণের মনে একটি নতুন আশার সঞ্চার করে যে, তরুণরা চাইলে পরিবর্তন আনা সম্ভব।
(৪) ‘ভারত-বিরোধিতা’র ভূমিকা। আন্দোলনের নেপথ্যে ‘ভারত-বিরোধিতা’ সরাসরি কারণ না হলেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করেছে। শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের আন্দোলনের মূল কারণ ছিল মূলত অভ্যন্তরীণ সমস্যা—অর্থনৈতিক সংকট, দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক দমন। তবে উভয় দেশেই জনগণের মধ্যে ভারত-বিদ্বেষের একটি দীর্ঘদিনের ইতিহাস রয়েছে। শ্রীলঙ্কার গণবিক্ষোভের সময় ভারত সরকার শ্রীলঙ্কাকে অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়েছিল। এর ফলে শ্রীলঙ্কার কিছু বিক্ষোভকারী ভারতের এই ভূমিকার সমালোচনা করে এবং এটিকে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখে। আবার বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন’ নামে একটি নির্দিষ্ট দাবিকে কেন্দ্র করে আন্দোলন শুরু হলেও, এক পর্যায়ে ভারত-বিরোধী স্লোগান এবং মনোভাব দেখা যায়। এর কারণ ছিল কিছু রাজনৈতিক মহলের ভারত-বিরোধী অবস্থানের উপস্থিতি। তবে আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিল জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, যা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত ছিল না।
গ। ‘ডমিনো ইফেক্ট’ এর তৃতীয় টাইল নেপালে।
বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া গণবিক্ষোভ, বিশেষ করে কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ের ছাত্রদের বিক্ষোভ, নেপালের তরুণ প্রজন্মকে বেশ কিছু দিক থেকে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশের এই ‘ডমিনো ইফেক্ট’ নেপালের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে একটি নতুন গণচেতনার জন্ম দেয়। নেপালের জেনারেশন জি দেখেছিল বাংলাদেশের আন্দোলনগুলোর অন্যতম প্রধান শক্তি ছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা ফেসবুক, টুইটার এবং অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে দ্রুত সংগঠিত হয় এবং বিক্ষোভের খবর ছড়িয়ে দেয়। নেপালের তরুণ প্রজন্ম এই কৌশল থেকে অনুপ্রাণিত হয়। তারা বুঝতে পারে যে ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলগুলোর উপর নির্ভর না করে, নিজেদের উদ্যোগে অনলাইনে সংগঠিত হয়ে আন্দোলন করা সম্ভব। আমি কিছুদিন আগে কাঠমান্ডু গিয়েছিলাম, তখন কিছু এলাকায় দেয়ালের লিখন এবং কিছু লোকজনের সাথে কথা বলে বুঝেছি বাংলাদেশের আন্দোলনের মূল কারণ যেমন ছিল দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং সরকারের অব্যবস্থাপনা। নেপালেও ঠিক এই ধরনের সমস্যা দীর্ঘদিন ধরেই বিরাজমান। রাজনৈতিক দুর্নীতি, বেকারত্ব এবং দুর্বল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নেপালের তরুণদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি করেছিল। যখন তারা দেখে যে বাংলাদেশের তরুণরা সফলভাবে প্রতিবাদ করতে পারছে, তখন তাদের মধ্যেও একই রকম প্রতিবাদের স্পৃহা জন্ম নেয়। কেননা নেপাল যদিও একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, তবুও সেখানকার রাজনৈতিক ব্যবস্থায় দুর্বলতা এবং অস্থিতিশীলতা রয়েছে। কোন্দল, ক্ষমতা ভাগাভাগি এবং জনস্বার্থকে উপেক্ষা করার মতো ঘটনাগুলো তরুণদের মধ্যে হতাশা তৈরি করে। বাংলাদেশের আন্দোলনগুলো দেখিয়েছিল যে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যেই জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং পরিবর্তন আনতে বাধ্য করতে পারে।
বাংলাদেশের মতো নেপালের এই আন্দোলনের পেছনেও ভারত-বিরোধিতা একটি বড় কারণ হিসেবে কাজ করেছে। নেপালে দীর্ঘদিন ধরে ভারতের ‘বড় ভাই’ সুলভ আচরণ নিয়ে জনগণের মধ্যে ক্ষোভ ছিল। ভারতের বিভিন্ন সময়কার অর্থনৈতিক অবরোধ, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং সীমান্ত বিরোধ নেপালের জনগণের মনে গভীর ভারত-বিদ্বেষ তৈরি করেছে। বাংলাদেশের আন্দোলন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নেপালের তরুণরা বুঝতে পারে যে, শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, বরং বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ করা জরুরি। এইভাবে বাংলাদেশের ‘ডমিনো ইফেক্ট’ নেপালের তরুণ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে, যা তাদের মধ্যে এক নতুন রাজনৈতিক চেতনার জন্ম দেয় এবং ভারত-বিরোধী মনোভাবকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
৩
কীভাবে এই ডমিনো ইফেক্ট কাজ করে?
ক। ডিজিটাল বিপ্লব এবং তথ্যের অবাধ প্রবাহ।
আগেই বলেছি স্মার্টফোন এবং ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এই অঞ্চলের তরুণ প্রজন্মকে বৈশ্বিকভাবে সংযুক্ত করেছে। আর তাই শ্রীলঙ্কার জনগণের ‘গোটা গো হোম’ স্লোগান এবং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের ভিডিওগুলো মুহূর্তেই বাংলাদেশের তরুণদের কাছে পৌঁছে যায়। একইভাবে, বাংলাদেশের ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন’ বা শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের ছবি ও খবর নেপালের তরুণদের অনুপ্রাণিত করে। নেপালের সফল আন্দোলন লাদাখের যুবকদের আন্দোলিত করে। এভাবে সোশ্যাল মিডিয়া অনুঘটকের কাজ করে এবং দ্রুত তথ্য ও প্রতিবাদের কৌশল ছড়িয়ে দেয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক গণআন্দোলনগুলোর একটি নতুন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। ডিজিটাল বিপ্লব এই অঞ্চলের প্রতিবাদের ধরণকে সম্পূর্ণভাবে বদলে দিয়েছে। স্মার্টফোন এবং ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা কেবল তথ্যের আদান-প্রদানকে সহজ করেনি, বরং তরুণ প্রজন্মকে এমনভাবে যুক্ত করেছে যা আগে কখনো সম্ভব ছিল না।
খ। ডিজিটাল মাধ্যমের অভূতপূর্ব প্রভাব।
একসময় কোনো বড় প্রতিবাদ সংগঠিত করতে মাস বা বছর লেগে যেত, কারণ দলীয় কর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে একত্রিত করতে হতো। কিন্তু এখন সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে তা মুহূর্তেই সম্ভব। শ্রীলঙ্কার ‘গোটা গো হোম’ স্লোগান মুহূর্তেই ভাইরাল হয় এবং ফেসবুক, টুইটার ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে হাজার হাজার মানুষ একত্রিত হয়। এটি তরুণদের জন্য একটি ‘রোড ম্যাপ’ হিসেবে কাজ করে। শ্রীলঙ্কার আন্দোলনের ভিডিওগুলো শুধু সে দেশেই থাকেনি, তা মুহূর্তেই বাংলাদেশের তরুণদের কাছে পৌঁছে যায়। তারা দেখেছে যে সাধারণ মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে একত্রিত হয়ে সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছে এবং সাফল্য পাচ্ছে। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরাও কোটা সংস্কার আন্দোলন, সড়ক নিরাপত্তা আন্দোলন এবং অন্যান্য বিক্ষোভে একই কৌশল ব্যবহার করেছে। একইভাবে, বাংলাদেশের বিক্ষোভের খবর এবং ছবি নেপালের তরুণদের কাছে পৌঁছানোর পর তারা বুঝতে পারে যে, তাদের নিজেদের সমস্যাগুলোও একই ধরনের এবং সেগুলো সমাধানের জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরি। এভাবেই ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক কাঠামো এবং গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করার যে ক্ষমতা ছিল, ডিজিটাল বিপ্লব সেই ক্ষমতাকে অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে। এখন যেকোনো সাধারণ মানুষ একটি ভিডিও বা একটি পোস্টের মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। এর ফলে, তথ্য এবং প্রতিবাদের কৌশল সাধারণ জনগণের হাতে চলে এসেছে, যা পুরো ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তন করেছে।
বর্তমান যুগে সামাজিক মাধ্যমগুলো শুধু তথ্যের আদান-প্রদান করে না, বরং প্রতিবাদের কৌশল, স্লোগান এবং অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবেও কাজ করে। নেপালের তরুণরা শুধু বাংলাদেশের আন্দোলন সম্পর্কে জানতে পারেনি, বরং তারা দেখেছে কীভাবে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করতে হয়, কোন ধরনের স্লোগান ব্যবহার করতে হয় এবং কীভাবে পুলিশের দমন-পীড়নের মোকাবিলা করতে হয়। এভাবেই এই ডিজিটাল বিপ্লব প্রমাণ করে যে, বর্তমানে গণআন্দোলনগুলো আর কোনো নির্দিষ্ট দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। এগুলো বৈশ্বিকভাবে সংযুক্ত, যেখানে এক দেশের আন্দোলন অন্য দেশের মানুষকে অনুপ্রাণিত করে এবং তাদের মধ্যে প্রতিবাদের নতুন কৌশল ছড়িয়ে দেয়।
গ। দেশে দেশে অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক ব্যর্থতার অভিন্ন চিত্র।
শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক বিপর্যয়, মুদ্রাস্ফীতি এবং সরকারের ঋণ নীতি নিয়ে জনগণের ক্ষোভ ছিল স্পষ্ট। এই অর্থনৈতিক সংকট শুধু শ্রীলঙ্কার একার সমস্যা নয়। বাংলাদেশ ও নেপালের মতো দেশগুলোতেও দুর্নীতি, বেকারত্ব এবং ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে। এক দেশের মানুষ যখন দেখে যে তাদের প্রতিবেশী দেশের জনগণ সরকারের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে সফলভাবে প্রতিবাদ করছে, তখন তাদের মধ্যেও একই রকম প্রতিবাদের স্পৃহা জন্ম নেয়। শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক বিপর্যয় ছিল ‘ডমিনো ইফেক্ট’-এর প্রথম ধাক্কা। বছরের পর বছর ধরে ভুল অর্থনৈতিক নীতি, অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ এবং কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে পর্যটন শিল্প ধসে পড়ায় দেশটি গভীর সংকটে পড়ে। তৎকালীন সরকার, বিশেষ করে রাজাপক্ষে পরিবার, বড় ধরনের কর ছাড় দিয়েছিল, যা সরকারি আয় কমিয়ে দেয়। এরফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় শূন্য হয়ে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর এবং এরফলে মুদ্রাস্ফীতি চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। যার ফলে খাদ্য, ওষুধ এবং জ্বালানির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আকাশ ছুঁয়ে ফেলে। পেট্রোল পাম্পগুলোতেও দীর্ঘ লাইন দেখা যায় এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়। এই পরিস্থিতি জনগণের মনে এক গভীর হতাশা এবং ক্ষোভ তৈরি করে, যা শেষ পর্যন্ত একটি সফল গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
ঘ। বাংলাদেশ ও নেপালের অভিন্ন চিত্র।
যদিও বাংলাদেশ বা নেপালের অর্থনৈতিক সংকট শ্রীলঙ্কার মতো এত ভয়াবহ ছিল না, তবুও এই দেশগুলোতেও একই ধরনের সমস্যা বিদ্যমান, যা জনগণের মধ্যে চাপা অসন্তোষ তৈরি করছিল।
(১) বাংলাদেশ। বাংলাদেশে শিক্ষিত তরুণ সমাজের মধ্যে ব্যাপক বেকারত্ব একটি বড় সমস্যা। একই সঙ্গে, আর্থিক খাতে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন জনগণের মনে ক্ষোভ সৃষ্টি করে। এছাড়াও কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থার সংকটের কারণে বাংলাদেশেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায়। কোটা সংস্কার আন্দোলন, যদিও একটি নির্দিষ্ট দাবি নিয়ে শুরু হয়েছিল কিন্তু এর পেছনে ছিল সরকারের অব্যবস্থা এবং দুর্নীতির প্রতি তরুণ সমাজের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ।
(২) নেপাল। নেপালে ঘন ঘন সরকার পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক কোন্দলের কারণে উন্নয়ন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। এরফলে জনগণ রাজনৈতিক ব্যবস্থার উপর আস্থা হারাতে থাকে। এছাড়াও নেপালের তরুণরা কর্মসংস্থানের অভাবে দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি দিতে বাধ্য হয়। সেখানে এটি একটি বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা। তাছাড়া নেপালের রাজনৈতিক ব্যবস্থাতেও দুর্নীতির অভিযোগ ছিল, যা ‘নেপোকিড’ ধারণার জন্ম দেয়। যেখানে নেপালের সাধারণ তরুণরা চরম বেকারত্ব এবং দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করছে, সেখানে নেপোকিডসদের সম্পদ ও ক্ষমতার নগ্ন প্রদর্শন সমাজের ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বিশাল ব্যবধান চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ ছিল, এই বিলাসী জীবনযাত্রার অর্থের উৎস হলো প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং জনগণের করের অর্থ। এরফলে TikTok এবং Reddit-এর মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে #NepoKids হ্যাশট্যাগের মাধ্যমে আন্দোলন শুরু হয়, যেখানে তরুণরা মেমস ও ভিডিওর মাধ্যমে এই বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণির সমালোচনা করত।
আসলে যখন এক দেশের জনগণ দেখে যে তাদের প্রতিবেশী দেশের মানুষ একই ধরনের সমস্যার বিরুদ্ধে সফলভাবে প্রতিবাদ করছে, তখন তাদের মধ্যে একধরনের অনুপ্রেরণা সৃষ্টি হয়। শ্রীলঙ্কার আন্দোলন প্রমাণ করে যে, সাধারণ জনগণের ঐক্যবদ্ধ শক্তি ক্ষমতাধর শাসকদের পতন ঘটাতে পারে। এই সাফল্যটি বাংলাদেশের তরুণ সমাজকে তাদের নিজস্ব দাবি আদায়ে আরও সাহসী করে তোলে। একইভাবে, বাংলাদেশের সফল আন্দোলন নেপালের তরুণদেরও প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে উৎসাহিত করে এবং কেপি শর্মা ওলি সরকারের পতন ঘটে। এভাবে অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক ব্যর্থতার অভিন্ন চিত্রটি এই দেশগুলোর জনগণকে এক সূত্রে গেঁথে ফেলে এবং একটি অঞ্চলের গণরোষকে এক অভিন্ন রূপ দেয়।
ঙ। ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা।
শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল এবং সর্বশেষ লাদাখে বিক্ষোভের নেতৃত্বে ছিল সাধারণ জনগণ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম। তারা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় ছিলনা। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং অকার্যকর শাসনব্যবস্থা এই তরুণদের মধ্যে প্রচলিত রাজনীতির প্রতি গভীর অনাস্থা তৈরি করেছে। তারা বুঝতে পারে যে পরিবর্তনের জন্য পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার উপর নির্ভর করা সম্ভব নয়, বরং নিজেদেরই রাস্তায় নামতে হবে। এছাড়াও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক গণআন্দোলনগুলোর একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ এবং নেপালের জনগণ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম দেখিয়েছে যে তারা আর পুরোনো রাজনৈতিক দল ও তাদের নেতাদের উপর আস্থা রাখতে পারছে না। তবে এই অনাস্থার পেছনে কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে,
(১) রাজনৈতিক দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি। এই তিনটি দেশেই রাজনৈতিক পরিবারের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত ছিল। শ্রীলঙ্কায় রাজাপক্ষে পরিবার, বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন দল এবং নেপালে কেপি শর্মা ওলি সরকারের রাজনৈতিক কোন্দল—এই সব ক্ষেত্রেই জনগণের মধ্যে ব্যাপক দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং আর্থিক অপচয়ের অভিযোগ ছিল। তরুণ প্রজন্ম দেখছিল যে, সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা নিজেদের এবং তাদের পরিবারের স্বার্থ রক্ষা করছে, অথচ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান ক্রমাগত খারাপ হচ্ছে। এই অভিজ্ঞতা তাদের মধ্যে প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি এক ধরনের বিতৃষ্ণা তৈরি করেছে।
(২) অকার্যকর শাসনব্যবস্থা। জনগণের মৌলিক চাহিদা যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থান পূরণে সরকারগুলোর ব্যর্থতাও এই অনাস্থার মূল কারণ। শ্রীলঙ্কায় অর্থনৈতিক সংকট, বাংলাদেশে বেকারত্ব এবং নেপালে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে তরুণরা অনুভব করেছে যে, প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা তাদের সমস্যার সমাধান করতে অক্ষম। তারা বুঝতে পারে যে, শুধুমাত্র নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন করলেই অবস্থার পরিবর্তন হবে না, বরং পুরো শাসনব্যবস্থাকেই নতুন করে সাজানো প্রয়োজন।
(৩) ডিজিটাল মাধ্যম ও সচেতনতা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এই তরুণদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়াতে সাহায্য করেছে। তারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন আন্দোলন ও তাদের সাফল্য সম্পর্কে জানতে পেরেছে। শ্রীলঙ্কার বিক্ষোভের ভিডিও, বাংলাদেশের কোটা সংস্কার আন্দোলনের খবর এবং নেপালের ‘জেন জি’দের বার্তা—এই সবকিছুই তাদের মধ্যে এক ধরনের ঐক্যবদ্ধ চেতনা তৈরি করেছে। তারা বুঝতে পেরেছে যে, নিজেদের সমস্যার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর উপর নির্ভর না করে, নিজেদেরই সরাসরি মাঠে নামা উচিত। এই কারণগুলো একত্রিত হয়ে দক্ষিণ এশিয়ার তরুণ প্রজন্মকে প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা তৈরি করেছে এবং তাদের নিজেদের ভাগ্য নিজেদের হাতে তুলে নিতে উৎসাহিত করেছে। তারা বিশ্বাস করে যে, পরিবর্তন শুধু সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমে আসবে না, বরং একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই তা সম্ভব হবে।
৪
ডমিনো ইফেক্ট প্রমাণ করে যে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জনগণের মধ্যে একটি অভিন্ন হতাশা ও প্রতিবাদের মনোভাব কাজ করছে। এটি কেবল কোনো একটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা নয়, বরং একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রবণতা যা এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে শুধু দক্ষিণ এশিয়া নয়, জেন-জি’দের এই আন্দোলনের ঢেউ ইতিমধ্যে দক্ষিণ এশিয়া ছাড়িয়ে পূর্ব তিমুর, ফিলিপাইন, মাদাগাস্কার হয়ে পেরু পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, অপরাধ এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার প্রতি গভীর হতাশা থেকে পেরুর তরুণ প্রজন্ম, যারা জেন-জি নামে পরিচিত, তারা অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হোসে হেরিও-র বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছে। এভাবে ডমিনো ইফেক্ট শেষ পর্যন্ত আরও কোন কোন দেশে সঞ্চারিত হয় তা দেখার বিষয় বৈকি!
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১৯ অক্টোবর ২০২৫