
১
কবি জয়দেব এর পদ্মাবতীকে নিয়ে এর আগে কয়েক পর্বে লিখেছি। এবার লিখছি আরেক ‘পদ্মাবতী’কে নিয়ে, ইনি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মধ্যযুগের প্রসিদ্ধ কবি আলাওলের ‘পদ্মাবতী’। হিন্দি কবি মালিক মুহম্মদ জায়সী’র ‘পদুমাবৎ’ কাব্যগ্রন্থ অবলম্বনে কবি আলাওল পয়ার ও ত্রিপদী ছন্দে ‘পদ্মাবতী’ কাব্যগ্রন্থটা রচনা করেন। ইতিহাসের একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে এটি রচিত হলেও এটি আসলে ইতিহাস গ্রন্থ নয়, বরং কাব্যগ্রন্থটা রচনার সময়ে কবিচিত্তের কল্পনা জায়সী এবং আলাওল দুজনকেই প্রভাবিত করেছিলো। এই কাব্যে মানবপ্রেম ও অধ্যাত্মপ্রেম, এই দুয়ের মিলন ঘটেছে।
২
বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমারেখার বাইরে মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যে বাংলা সাহিত্য চর্চার বিষয়টা মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা। বাংলা সাহিত্যে আরাকানকে ‘রোসাঙ্গ’ বা ‘রোসাং’ নামে উল্লেখ করা হয়। ‘আইন-ই-আকবরী’ তে এই অঞ্চলটিকে ‘আখরঙ’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগে (১২০১ থেকে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত) উত্তরবঙ্গের কামতা-কামরূপের (অর্থাৎ কোচ রাজবংশের) রাজসভা, পূর্ববঙ্গের ত্রিপুরা ও আরাকানের (রোসাঙ্গ) রাজসভা এবং পশ্চিমবঙ্গে মল্লভূম-ধলভূমের রাজসভায় বাংলা ভাষার বিবিধ কাব্যধারার সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে আরাকানি ধারা বিশিষ্ট। ১৪৩০ খ্রিস্টাব্দে গৌড়ের করদ রাজ্যে পরিণত হওয়ার পর থেকে ১৬৪৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দু’শো বছরেরও বেশি সময় ধরে আরাকানি রাজগণ বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। তাই বাংলা ভাষা ও সাহিত্য উল্লেখযোগ্য ভাবে তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে। আসলে রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলায় মুসলিম শাসকদের অবস্থান স্থায়ী হওয়ার আগে থেকেই আরাকানে সাধারণ মুসলমানদের যাতায়াত ছিলো। খ্রিস্টীয় অস্টম-নবম শতকে আরাকানরাজ মহতৈং চন্দয় (৭৮৮-৮১০) এর রাজত্বকালে এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচার শুরু হয়। প্রায় একইসময়ে চট্টগ্রামেও ইসলামের ব্যাপক প্রসার ঘটতে থাকে। মূলত সে কারণেই এই দুই অঞ্চলের লোকজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে। চট্টগ্রাম ও আরাকানের নৈকট্য এবং একই রাজ্যভুক্ত থাকায় বৃহত্তর বঙ্গ থেকে এর একটা স্বাতন্ত্র্য ছিলো। সেই সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি ও রাজনীতির সূত্রে রোসাঙ্গে বসবাসরত বাঙালীদের একটি পৃথক প্রবাসী সমাজ গড়ে উঠতে থাকে। এরফলে আরাকান রাজ্যে বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চার একটা পরিবেশ গড়ে উঠেছিলো। আরাকানের রাজারা বৌদ্ধধর্মাবলম্বী হলেও তারা মুসলমানদের ব্যাপারে যথেষ্ট উদার ছিলেন এবং যোগ্যতার বিচারে বাঙালী মুসলমানরা আরাকান রাজাদের শাসনকার্যে বিভিন্নভাবে সংশ্লিষ্ট থাকতেন। রোসাঙ্গের ইতিহাসে দেখা যায় এ রাজ্যের রাজাদের প্রধানমন্ত্রী, অমাত্য, সমরসচিব, কাজী বা বিচারক প্রভৃতি উচ্চপদে বিভিন্ন সময়ে মুসলমানরাই দায়িত্ব পালন করেছেন। রাজকার্যে মুসলমানদের এই প্রভাব সতের শতক পর্যন্ত পরিলক্ষিত হয়। আরাকান রাজসভার উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতায় যাঁরা কাব্যচর্চা করেন তাঁদের মধ্যে দৌলত কাজী প্রাচীনতম। তাঁর ‘সতীময়না ও লোরচন্দ্রানী’ প্রথম মানবীয় প্রণয়কাব্য। তিনি এ কাব্যের রচনা শুরু করেন, কিন্তু শেষ করে যেতে পারেননি; শেষ করেন আলাওল। বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে মুসলমানদের বড় অবদান কাহিনীকাব্য বা রোম্যান্টিক কাব্যধারার প্রবর্তন। প্রাচীন ও মধ্যযুগের বৌদ্ধ-হিন্দু রচিত বাংলা সাহিত্যে যেখানে দেবদেবীরা প্রধান এবং মানুষ অপ্রধান সেখানে মুসলমান রচিত সাহিত্যে মানুষ প্রাধান্য পেয়েছে।
আলাওল মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। আনুমানিক ১৬০৭ খ্রিস্টাব্দে ফরিদপুর জেলার ফতেয়াবাদ পরগনার জালালপুর গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন ফতেয়াবাদের অধিপতি মজলিস কুতুবের একজন অমাত্য। অভিজাত পরিবারের সন্তান হিসেবে আলাওল বাল্যকালে বাংলা, সংস্কৃত, আরবি ও ফারসি ভাষা শেখেন। যুদ্ধবিদ্যা ও সঙ্গীত বিষয়েও তাঁর জ্ঞান ছিলো। একবার পিতার সাথে নৌকাযোগে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে পর্তুগিজ জলদস্যুদের দ্বারা তাঁরা আক্রান্ত হন। এতে তাঁর পিতা নিহত হন এবং আলাওলকে আহত ও বন্দি অবস্থায় আরাকানে নিয়ে যাওয়া হয়। আরাকানে তিনি একজন দেহরক্ষী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং পরে মহন্তের গৃহে সঙ্গীত শিক্ষকের কাজ করেন। এ সময় তাঁর কবিপ্রতিভার স্ফুরণ ঘটলে প্রধান অমাত্য কোরেশী মাগন ঠাকুরের আনুকূল্যে তিনি আরাকানের অমাত্যসভায় স্থান পান। বাঙালি মুসলমান কবিদের মধ্যে আলাওল সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। তাঁর মতো বহুগ্রন্থ প্রণেতা ও পন্ডিত কবি মধ্যযুগে বিরল। এ যাবৎ তাঁর যে পাঁচটি কাব্য পাওয়া গেছে তন্মধ্যে পদ্মাবতী শ্রেষ্ঠ। এটি হিন্দি কবি মালিক মুহম্মদ জায়সীর পদুমাবত অবলম্বনে রচিত হলেও মৌলিকতার কারণে পাঠক নন্দিত।
৩
রাজপুতনার সর্বশ্রেষ্ঠ রাজ্য মেবার ছিলো চারদিক থেকে পাহাড়-পর্বতে ঘেরা। এ কারণে কোনো মুসলমান সুলতান মেবার আক্রমণ করতে সাহসী হননি। কথিত আছে যে, রানা রতন সিংহের অনিন্দ্যসুন্দরী রানী পদ্মাবতী’কে হস্তগত করার জন্য সুলতান আলাউদ্দীন চিতোর আক্রমণ করেন। কিন্তু সমসাময়িক ইতিহাসে এরূপ কোনো ঘটনার উল্লেখ নেই। কবি আমির খসরু চিতোর অভিযানের সময় সুলতানের সাথে ছিলেন। তিনিও এর কোনো উল্লেখ করেননি, ঐতিহাসিকদের মতে, পদ্মাবতীর কাহিনী একটি রূপকথা ছাড়া আর কিছুই নয়। কেএস লালের মতো আধুনিক ঐতিহাসিকরা মনে করেন, পদ্মাবতী কাহিনী হিন্দি কাব্যগ্রন্থ পদ্মাবতীর রচয়িতা মালিক মুহম্মদ জায়সীর কল্পনাপ্রসূত।
কি ছিলো সে কাহিনী?
কাহিনীটা এরকম, চিতোরের রানা রাওয়াল রতন সিং এর স্ত্রী পদ্মাবতী অপরূপ সুন্দরী। একবার রতন সিং তাঁর পরিষদে রাঘবচেতন নামে এক ব্রাহ্মণকে অপমান করেন। অপমানের প্রতিশোধ নিতে ব্রাহ্মণ দিল্লির বাদশাহ আলাউদ্দীনকে পদ্মাবতীর রূপ-গুণের নানা প্রশংসা করে পদ্মাবতীকে হরণে অনুপ্রাণিত করে তোলেন। দিল্লির বাদশাহ আলাউদ্দীন রতন সিং’কে অনুরূপ প্রস্তাব পাঠান। রতন সিং এতে খুব অপমানিত হন এবং প্রতিশোধ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠেন। ফলে আলাউদ্দীন ও রতন সিং-এর মধ্যে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। যুদ্ধে রতন সিং বন্দি হলেও নানা কৌশলে তার মুক্তি ঘটে। সে অনেক কাহিনী। যাহোক পরে দেওপালের সাথে যুদ্ধ বাধলে দেওপাল নিহত ও রতন সিং আহত হন। এরকম টালমাটাল সময়ে আলাউদ্দীন চিতোর আক্রমণ করেন। এরপর আলাউদ্দীন বিজয়ী বেশে চিতোর রাজপ্রাসাদে পৌঁছলে দেখতে পান, চিতোরের রানা রাওয়াল রতন সিং মারা গেছেন এবং রানী পদ্মাবতী স্বামীর সঙ্গে জ্বলন্ত চিতায় দাহ হচ্ছেন। আলাউদ্দীন চিতার প্রতি সনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করে ফিরে আসেন। কিন্তু বাস্তবতা ছিলো ভিন্ন। যুদ্ধে মেবারের রানা রতন সিংহ বীরবিক্রমে সুলতান আলাউদ্দীনকে বাধা দিলেও শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়ে তিনি পালিয়ে যান এবং রাজপুত রমণীরা অগ্নিকুণ্ডে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ বিসর্জন দেয়। চিতোর দুর্গ বিজয়ের পর পুত্র খিজির খানের ওপর এর শাসনভার অর্পণ করে সুলতান দিল্লিতে প্রত্যাবর্তন করেন।
৪
হিন্দি সাহিত্যের কবি মালিক মুহম্মদ জায়সী ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দে ইতিহাসের ছায়া অবলম্বনে ‘পদুমাবৎ’ কাব্যটি লেখেন এবং তার প্রায় ১০০ বছর পর আরাকানের রোসাংরাজ সাদ উমাদার বা ছাদো উমংদারের রাজত্বকালে তার মহাপাত্র বা প্রধানমন্ত্রী মাগন ঠাকুরের নির্দেশে আলাওল ১৬৪৮ খ্রিস্টাব্দে পদ্মাবতী নামে তা বাংলায় অনুবাদ করেন। পদ্মাবতীকে আলাওলের শ্রেষ্ঠ কাজ বলে গণ্য করা হয়। আগেই যেটা বলেছি পদ্মাবতী কাব্যের কাহিনীতে ঐতিহাসিকতা কতটুকু তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বাংলায় পদ্মাবতী রচনায় আলাওল মূলত পয়ার ও ত্রিপদী ছন্দের আশ্রয় নিয়েছেন। মধ্যযুগের ধর্মীয় সাহিত্যের ঘনঘটার মধ্যে এই পদ্মাবতী কাব্যগ্রন্থ স্বতন্ত্ররীতির এক অনুপম শিল্পকর্ম। তবে পদ্মাবতী মৌলিক না হলেও সাবলীল ভাষার ব্যবহার ও মার্জিত ছন্দের নিপুণ প্রয়োগে তা আলাওলের কবি প্রতিভার স্বাক্ষর বহন করে। এ কাব্যের প্রতিপাদ্য হলো প্রেম, এখানে ইতিহাস এসেছে ছায়ার মতো। কবিরা ইতিহাস বর্ণনায় তৎপর হননি, বরং ঐতিহাসিক তাৎপর্যের মধ্যে একটি প্রণয় উপাখ্যানকে উপস্থাপন করেছেন মাত্র- যা পাঠককে আনন্দ দেবে। জায়সী ছিলেন সুফি প্রেমমার্গীয় কবি। তিনি রোমান্টিক কাব্যের আড়ালে সুফি আধ্যাত্মতত্ত্বের স্বরূপ ব্যাখ্যা করেছেন। জায়সীর ‘পদুমাবৎ’ কাব্যটি তাই সম্পূর্ণ রূপকাশ্রিত। ইতিহাস ভিত্তিক হলেও ইতিহাস সত্যকে ছাপিয়ে সুফি দর্শনজাত তত্ত্বীয় জীবনবাস্তবতা বিশ্লেষিত। কিন্তু আলাওল রোমান্টিক প্রণয় কাব্য রচনায় প্রয়াসী ছিলেন। বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের একটি উজ্জ্বল নিদর্শন হলো বাঙালি কবি আলাওলের অনুবাদ কাব্যগ্রন্থ ‘পদ্মাবতী’।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
২৫ মার্চ ২০২২
তথ্যসূত্রঃ
১। আলাওল পদ্মাবতী – সৈয়দ আলী আহসান
২। পদ্মাবতী মালিক মুহম্মদ জায়সী- মুহম্মদ জালালউদ্দীন বিশ্বাস
৩। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস- মাহবুবুল আলম
৪। পুরাতন বাংলা সাহিত্যের তথ্য ও কালক্রম- সুখময় মুখোপাধ্যায়
৫। বাংলা রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান- ওয়াকিল আহমদ
৬। মহাকবি আলাওল জীবন ও কাব্য- ওয়াকিল আহমদ
৭। বাংলা পিডিয়া
৮। ইন্টারনেট