
১
সাব-সাহারান আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলের স্থলবেষ্টিত দেশ হলো ‘বুরকিনা ফাসো’, যার অর্থ ‘সৎ মানুষের দেশ’। ১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট তারিখে ফ্রান্সের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করা এই দেশটা পূর্বে ‘আপার ভোল্টা’ নামে পরিচিত ছিল। স্বাধীনতা অর্জনের পর দেশটিতে এপর্যন্ত অসংখ্যবার ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে, ২০২২ সালে ৮ম সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মাত্র ৩৫ বছর বয়সী ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ত্রাউরে বুরকিনা ফাসোর ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তার শাসনকে বুরকিনা ফাসোর প্রয়াত বিপ্লবী নেতা ক্যাপ্টেন টমাস সানকারা’র আদর্শের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হয়, যিনি ‘আফ্রিকার চে গুয়েভারা’ নামে পরিচিত ছিলেন। ত্রাউরের এই উত্থানকে ঘিরে দুটি বিষয় খুব আলোচিত হয়, তার একটি হলো সাহিল অঞ্চলের তীব্র চ্যালেঞ্জ এবং অপরটি হলো, সানকারার মতো স্বনির্ভর, বামপন্থী ও পশ্চিমাবিরোধী ‘চে’ স্বপ্ন—জড়িত।
২
সাহারা মরুভূমির দক্ষিণ প্রান্ত বরাবর আটলান্টিক মহাসাগর থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত ৫,৪০০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত অর্ধ-ঊষর সাভানা অঞ্চল, সাহেল বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে সংকটাপূর্ণ অঞ্চলগুলির মধ্যে অন্যতম। সাহেল অঞ্চলের অন্যান্য দেশগুলো হলো সেনেগাল, মৌরিতানিয়া, মালি, বুরকিনা ফাসো, নাইজার, নাইজেরিয়া (আংশিক), চাদ, সুদান (আংশিক) এবং ইরিত্রিয়া (আংশিক)। আল-কায়েদা ও আইএসআইএস সম্পর্কিত সশস্ত্র জিহাদি গোষ্ঠীগুলো এই অঞ্চলে অত্যন্ত সক্রিয়। তারা মালি, বুরকিনা ফাসো এবং নাইজারের মতো দেশগুলোতে ব্যাপক সহিংসতা চালাচ্ছে। এই সহিংসতা বহু বছর ধরে চলে আসছে এবং তা ক্রমশ উপকূলীয় এলাকায়, পশ্চিম আফ্রিকার দিকেও ছড়িয়ে পড়ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অঞ্চলের (মালি, বুরকিনা ফাসো, নাইজার) দেশগুলোতে বারবার সামরিক অভ্যুত্থান ঘটার পিছনে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় বেসামরিক সরকারের ব্যর্থতাকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখানো হয়। এইসব সংঘাত, দারিদ্র্য এবং পরিবেশগত কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ (বিশেষ করে বুরকিনা ফাসো ও মালিতে) বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং তারা স্রেফ মানবিক সহায়তার উপর নির্ভর করে আছে। এছাড়াও অতিরিক্ত খরা, মরুকরণ এবং অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহারের ফলে চাষের জমি ক্রমশ সাহারা মরুভূমির দ্বারা গ্রাস হচ্ছে। জলবায়ুর এই পরিবর্তনের কারণে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যা তীব্র খাদ্য সংকটের জন্ম দিয়েছে। আর এসব কারণে সাহেলকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল মানবিক সংকট’-এর কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখা হয়।
৩
ইব্রাহিম ত্রাউরে ক্ষমতা গ্রহণের সময় বুরকিনা ফাসো যে গভীর সংকটের মুখোমুখি ছিল, তা বস্তুত সাহেল অঞ্চলের সামগ্রিক চ্যালেঞ্জেরই অংশ। এই চ্যালেঞ্জগুলির মোকাবিলা করাই হলো ইব্রাহিম ত্রাউরের মতো নেতাদের মূল লক্ষ্য, যেখানে তারা থমাস সানকারার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সাহেলের স্বনির্ভরতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বপ্ন দেখছেন। সাহেল অঞ্চলের চ্যালেঞ্জগুলি আন্তঃসংযুক্ত এবং বহুস্তরীয়, যা বুরকিনা ফাসো, মালি ও নাইজারের মতো দেশগুলিকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে। সাহেল অঞ্চলের যেসব চ্যালেঞ্জ ইব্রাহিম ত্রাউরে’কে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি ফেলেছে তা হলো:
ক। নিরাপত্তা ও জিহাদি সন্ত্রাসবাদ।
ইব্রাহিম ত্রাউরের জন্য এটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আল-কায়েদা সংশ্লিষ্ট জামায়াত নুসর আল-ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন (JNIM) এবং ইসলামিক স্টেট ইন দ্য গ্রেটার সাহারা (ISGS)-এর মতো গোষ্ঠীগুলি স্থানীয়ভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে। এই গোষ্ঠীগুলি সাহেল অঞ্চলের বিস্তীর্ণ গ্রামীণ এলাকা (বিশেষত ‘লাইমহীন ভূমি’) নিয়ন্ত্রণ করে, যেখানে সরকারি প্রশাসন, পুলিশ বা বিচার ব্যবস্থা পৌঁছাতে পারে না। সন্ত্রাসীদের আক্রমণে সেখানে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে এবং শুধু বুরকিনা ফাসোতেই অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ২০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে, যা বিশ্বজুড়ে অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল বাস্তুচ্যুতি সংকট। অস্ত্র পাচার, মাদক চোরাচালান এবং মানব পাচারের মতো অপরাধমূলক নেটওয়ার্কগুলি জিহাদি গোষ্ঠীগুলিকে অর্থ ও রসদ সরবরাহ করে। পূর্ববর্তী সরকার এই সমস্যা মোকাবিলায় পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছিল।
খ। নয়া-ঔপনিবেশিকতা ও অর্থনৈতিক শোষণ।
বিপুল পরিমাণ খনিজ সম্পদ (যেমন স্বর্ণ) থাকা সত্ত্বেও বুরকিনা ফাসো বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ। সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তি ফ্রান্সের সামরিক উপস্থিতি সাহেল রাষ্ট্রগুলির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে জনগণের মাঝে ধারণা তৈরি হয়েছে। এর ফলস্বরূপ ফ্রান্সকে বহিষ্কারের দাবি উঠেছে এবং বুরকিনা ফাসো, মালি এবং নাইজার ফ্রান্স থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এই দেশগুলি এখনো আন্তর্জাতিক সংস্থা (যেমন IMF, বিশ্বব্যাংক) এবং পশ্চিমা দাতাদের সাহায্যের উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। তবে ত্রাউরে এই নির্ভরতা কমানোর নীতি গ্রহণ করেছেন। এই অঞ্চলটি সোনা, ইউরেনিয়াম (নাইজার) এবং অন্যান্য খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও, এই সম্পদ থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশ স্থানীয় জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে খুব কমই ব্যবহৃত হয়। ইব্রাহিম ত্রাউরের মতো নেতারা বিদেশি কোম্পানিগুলির অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে কথা বলছেন, যেমন- ত্রাউরের অভিযোগ, বিদেশি কোম্পানি ও নয়া-ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো তাদের খনিজ সম্পদ লুণ্ঠন করে চলেছে।
গ। দুর্বল সরকার ও রাজনৈতিক অস্থিরতা।
সাহেল অঞ্চলটি সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সামরিক অভ্যুত্থানের ঢেউ দেখেছে (মালি, বুরকিনা ফাসো, নাইজার)। স্থানীয় প্রশাসনগুলি জিহাদিদের মোকাবিলায় ব্যর্থ হওয়ায় এবং ব্যাপক দুর্নীতির কারণে জনগণের আস্থা হারিয়েছে, যার সুযোগ নিয়ে সামরিক বাহিনী ক্ষমতায় এসেছে। সাহেল রাষ্ট্রগুলির কেন্দ্রীয় সরকার প্রান্তিক এলাকাগুলিতে পরিষেবা (শিক্ষা, স্বাস্থ্য) এবং নিরাপত্তা সরবরাহ করতে ব্যর্থ। এরফলে স্থানীয় মানুষজন জিহাদি গোষ্ঠীগুলির দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সম্পদ সীমিত হওয়ায় কৃষক ও পশুপালকদের মধ্যে সংঘাত তীব্র হচ্ছে। জিহাদি গোষ্ঠীগুলি প্রায়শই এই জাতিগত বিভেদকে কাজে লাগিয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া চালায়।
ঘ। জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবিক সংকট।
সাহেল অঞ্চল দ্রুত মরুকরণের শিকার হচ্ছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে কৃষিকাজ ও পশুপালন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বাড়িয়ে তুলছে। নিরাপত্তাহীনতার কারণে কৃষিকাজ ব্যাহত হওয়ায় খাদ্য সংকট তীব্র হয়েছে। সীমিত কৃষিযোগ্য জমি এবং জলের অভাবে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রতিযোগিতা এবং সংঘাত সৃষ্টি হচ্ছে, যা নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করছে। সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে ভুগছে, যা সাহেলকে বিশ্বের অন্যতম গুরুতর মানবিক সংকটের কেন্দ্রে পরিণত করেছে।
৪
ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ত্রাউরের সরকার ক্যাপ্টেন থমাস সানকারার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং পররাষ্ট্রনীতি—এই তিনটি মূল ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন এনেছে। ইব্রাহিম ত্রাউরের সরকার সাহেল অঞ্চলের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় যে সুনির্দিষ্ট কৌশল ও নীতি গ্রহণ করেছে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত নিচে তুলে ধরা হলো:
ক। নিরাপত্তা কৌশল: ‘জনগণকে সম্পৃক্ত করে লড়াই’।
ত্রাউরে মনে করেন, কেবল সামরিক বাহিনী দিয়ে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন গণ-অংশগ্রহণমূলক প্রতিরোধ। সেজন্য সরকার Volunteers for the Defence of the Fatherland (VDP) বা ‘পিতৃভূমির প্রতিরক্ষায় স্বেচ্ছাসেবী’ নামক বেসামরিক মিলিশিয়া সংগঠনকে ব্যাপক অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে শক্তিশালী করেছে। তরুণ ও স্থানীয়দের এই বাহিনীতে যুক্ত করা হচ্ছে, যাতে তারা নিজস্ব গ্রাম ও অঞ্চল রক্ষা করতে পারে এবং জিহাদিদের বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করতে পারে। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দ্রুত এবং কার্যকর হওয়ার জন্য সামরিক সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণ বৃদ্ধিতে মনোযোগ দেয়া হয়েছে। এছাড়া সন্ত্রাসীদের হাত থেকে মুক্ত করা অঞ্চলগুলিতে দ্রুত প্রশাসনিক ও সামাজিক পরিষেবা পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে জনগণ রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ফিরে পায়।
খ। পররাষ্ট্রনীতি ও জোটের পরিবর্তন: পশ্চিমাবিরোধী ও স্বনির্ভরতা।
ত্রাউরে সরকার পশ্চিমা সামরিক প্রভাব প্রত্যাখ্যান করে নতুন কৌশলগত অংশীদারিত্ব তৈরি করেছে। ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই ত্রাউরে সরকার সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তি ফ্রান্সের সামরিক উপস্থিতি আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করে এবং ফরাসি বিশেষ বাহিনীকে বুরকিনা ফাসো থেকে বহিষ্কার করে। তাছাড়া সরকার ফরাসি ভাষার ওপর নির্ভরতা কমানোর নীতি গ্রহণের ইঙ্গিত দিয়েছে। ফ্রান্সের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পর বুরকিনা ফাসো রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করেছে। দেশে রাশিয়ার ওয়াগনার বাহিনী মোতায়েন করার খবরও পাওয়া গেছে (যদিও সরকার এই বিষয়ে সরাসরি কিছু জানায়নি)। ক্যাপ্টেন ত্রাউরে মালি ও নাইজারের সামরিক সরকারের সাথে মিলে ‘আলায়েন্স অফ সাহিল স্টেটস’ (AES) গঠন করেছেন। এই জোটের মূল লক্ষ্য হলো, পশ্চিমা নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা।
গ। অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ ও সম্পদ নিয়ন্ত্রণ।
ক্যাপ্টেন থমাস সানকারার বামপন্থী অর্থনৈতিক আদর্শ অনুসরণ করে ত্রাউরে সরকার দেশের অর্থনীতিতে জাতীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। দেশের স্বর্ণখনিসহ অন্যান্য মূল্যবান খনিজ সম্পদের উপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো হয়েছে। বেশ কয়েকটি খনি বিদেশি মালিকানা থেকে রাষ্ট্রীয় মালিকানার অধীনে নিয়ে আসা হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারী খনি কোম্পানিগুলির জন্য নতুন নিয়ম জারি করা হয়েছে। এখন কোনো বিদেশি কোম্পানিকে বুরকিনা ফাসোতে ব্যবসা করতে হলে সরকারকে ১৫ শতাংশ অংশীদারত্ব দিতে হবে। বিদেশি কোম্পানিগুলিকে স্থানীয় জনগণের কাছে প্রযুক্তি ও দক্ষতা হস্তান্তরের শর্ত দিয়েছে সরকার, যাতে দীর্ঘমেয়াদে বুরকিনা ফাসোর মানুষ নিজেরাই এই শিল্প পরিচালনা করতে পারে। কৃষি খাতে বিনিয়োগ এবং সেচ ব্যবস্থার উন্নতির মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন বাড়িয়ে খাদ্য স্বনির্ভরতা অর্জনের চেষ্টা করা হচ্ছে, যা সানকারার অন্যতম লক্ষ্য ছিল। এই পদক্ষেপগুলির মাধ্যমে ত্রাউরে সাহিলের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি বিপ্লবী ও পশ্চিমাবিরোধী পথ বেছে নিয়েছেন, যা তাকে আফ্রিকাজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছে।
৫
ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ত্রাউরে প্রায়ই তার পূর্বসূরি ক্যাপ্টেন থমাস সানকারা-এর ভাবধারার অনুসারী হিসেবে বিবেচিত হন, যাকে ‘আফ্রিকার চে গুয়েভারা’ বলা হয়। তিনি নিজেকে সানকারার উত্তরসূরি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে আফ্রিকান জনগণের মধ্যে আত্মমর্যাদা, মুক্তি ও নতুন ভবিষ্যতের স্বপ্ন জাগিয়ে তুলেছেন। তার স্বপ্ন ও নীতিগুলো সানকারা এবং বিপ্লবী চে গুয়েভারার আদর্শের দ্বারা প্রভাবিত, যার মূল বিষয়গুলো হলো:
ক। ক্যাপ্টেন থমাস সানকারার আদর্শ অনুসরণ।
সানকারার মতো ত্রাউরেও নয়া-উপনিবেশবাদ ও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়েছেন। তিনি আফ্রিকান নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান তারা যেন পশ্চিমা দেশগুলোর ‘ইশারায় পুতুলের মতো নাচা বন্ধ করেন’। এছাড়া তার সামরিক পোশাক, দৃঢ়চেতা ভাষণ এবং পশ্চিমাদের প্রতি তার চ্যালেঞ্জিং মনোভাব তাকে দেশের তরুণ সমাজের কাছে আশার প্রতীক করে তুলেছে। সানকারার মডেল অনুসরণ করে তিনি জিহাদিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জনগণকে সম্পৃক্ত করে স্থানীয় প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য গণমিলিশিয়া সংগঠনের মাধ্যমে তরুণদের সশস্ত্র প্রতিরোধে যুক্ত করছেন। তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং যুবকদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে গুরুত্বারোপ করেছেন। থমাস সানকারার মতো তিনিও নারী স্বাধীনতা এবং গণস্বাস্থ্যের উন্নয়নে মনোযোগ দিয়েছেন।
খ। মূল সামরিক ও পররাষ্ট্রনীতি।
ত্রাউরে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুনভাবে সাজানো এবং দেশের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তাই ক্ষমতায় আসার পরপরই তিনি ফ্রান্সের সঙ্গে সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেন এবং দেশ থেকে ফরাসি বিশেষ বাহিনীকে (Burkina Faso’s Special Forces) বহিষ্কার করেন। ‘জিহাদি’ সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ‘জনগণকে সম্পৃক্ত করে’ লড়াই করা এবং তরুণদের সশস্ত্র প্রতিরোধে যুক্ত করার জন্য গণমিলিশিয়া সংগঠন তৈরি করেছেন। এরপর তিনি পশ্চিমা বলয় থেকে সরে এসে রাশিয়া, মালি ও নাইজারের মতো সামরিক-শাসিত দেশগুলোর সঙ্গে একটি নতুন আঞ্চলিক জোট গড়ে তুলেছেন। রাশিয়ার সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধি করেছেন এবং রুশ ওয়াগনার ব্রিগেড মোতায়েন করেছেন বলে জানা যায়। তিনি আন্তর্জাতিক ফোরামে সরাসরি পশ্চিমা নীতিগুলোর সমালোচনা করেন এবং আফ্রিকা মহাদেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন।
গ। অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ।
ত্রাউরের লক্ষ্য বিদেশি সাহায্য, বিশেষ করে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ঋণ এবং পশ্চিমা শর্তযুক্ত আর্থিক সহায়তা প্রত্যাখ্যান করে দেশের নিজস্ব সম্পদের ওপর নির্ভর করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন করা। এজন্য তিনি বামপন্থী অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করে দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্বর্ণের খনি রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নিয়ে এসেছেন। ইউরোপে অপরিশোধিত সোনা রপ্তানি বন্ধ করার মাধ্যমে দেশের খনিজ সম্পদের উপর জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় স্টেপস নিয়েছেন। বিদেশি খনি সংস্থাগুলোর জন্য কঠোর নিয়ম জারি করা হয়েছে; এখন দেশটিতে ব্যবসা করতে হলে বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে সরকারকে কমপক্ষে ১৫ শতাংশ অংশীদারত্ব দিতে হবে এবং স্থানীয়দের কাছে প্রযুক্তি ও দক্ষতা হস্তান্তর করতে হবে। এছাড়াও কৃষি খাতে বিপ্লব আনা, যেমন গ্রামীণ কৃষকদের জন্য কৃত্রিম খাল তৈরি এবং সৌরশক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করার মতো কাজগুলোয় হাত দেয়া হয়েছে।
৬
ইব্রাহিম ত্রাউরের বিপ্লবী ভাবমূর্তি তাকে আফ্রিকাজুড়ে জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছে, কিন্তু বাস্তবে তার সামনে কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। তার নেতৃত্বাধীন বুরকিনা ফাসোর সফলতা এবং চ্যালেঞ্জগুলো হলো:
ক। জনপ্রিয়তা ও আশা।
ত্রাউরের ইচ্ছে বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তরুণ প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণা তৈরি করা। ক্যাপ্টেন সানকারার উত্তরসূরি হিসেবে নিজের ক্যারিশম্যাটিক ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের সেবক হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে তাই তিনি সচেষ্ট। তরুণ প্রজন্মও তাকে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী নেতা হিসেবে দেখছে। অথচ বুরকিনা ফাসোর নিরাপত্তা পরিস্থিতির তেমন কোনো বড় ধরনের উন্নতি ঘটেনি। দেশের এক-তৃতীয়াংশের বেশি অংশ এখনো জিহাদিদের দ্বারা অবরুদ্ধ বা আক্রান্ত। দেশের প্রধান এবং সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো চলমান জিহাদি সন্ত্রাসবাদ দমন করে দেশের আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এক্ষেত্রে বেসামরিক স্বেচ্ছাসেবী মিলিশিয়াদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে সমস্যা তৈরি করতে পারে।
খ। জাতীয়তাবাদ।
বুরকিনা ফাসোর খনিজ সম্পদের (বিশেষ করে সোনা) ওপর জনগণের মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে দু'টি স্বর্ণখনি জাতীয়করণ করা হয়েছে। এছাড়াও ইউরোপে অপরিশোধিত সোনা রপ্তানি বন্ধ করা এবং দেশে স্বর্ণ শোধনাগার নির্মাণ করে দেশীয় প্রক্রিয়াকরণে জোর দেয়া হয়েছে। তার উদ্দেশ্য খনিজ সম্পদের ওপরে বিদেশি নিয়ন্ত্রণ কমানো ও সম্পদের রাষ্ট্রীয় মালিকানা প্রতিষ্ঠা। তবে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণ করায় দেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অভাব রয়েছে। আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকের শর্তযুক্ত আর্থিক সহায়তা ও ঋণ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে এবং সরকারের ব্যয় সংকোচনে মন্ত্রী-আমলাদের বেতন বৃদ্ধি বন্ধ করা হয়েছে। বুরকিনা ফাসো পশ্চিম আফ্রিকার অন্যতম দরিদ্র দেশ (৬৪.৫% মানুষ বহুমাত্রিক দরিদ্র)। তাই জাতীয় সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিলেও স্বল্প সময়ে ব্যাপক দারিদ্র্য দূর করা এবং অর্থনীতির মৌলিক পরিবর্তন আনা বেশ কঠিন। তাছাড়া পশ্চিমা অর্থসাহায্য প্রত্যাখ্যান করার পর দেশের উন্নয়নের জন্য বিকল্প অর্থায়ন ও বিনিয়োগের উৎস খুঁজে বের করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
গ। বিপ্লবী ভাবমূর্তি।
সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তি ফ্রান্সের সঙ্গে সামরিক চুক্তি বাতিল এবং ফরাসি সামরিক বাহিনীকে দেশ থেকে প্রত্যাহার করে তিনি একটা পজিটিভ ইমেজ তৈরি করেছেন। এছাড়া আফ্রিকান নেতাদের প্রতি তার জোরালো বক্তব্য (‘সাম্রাজ্যবাদীদের ঘোরানো ছড়ির ইশারায় পুতুলের মতো নাচা বন্ধ করুন’) তাকে সমগ্র আফ্রিকায় জনপ্রিয় করে তোলে। তবে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা এবং গণতান্ত্রিক নির্বাচনকে দীর্ঘ সময়ের জন্য স্থগিত (২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার সিদ্ধান্ত) করার কারণে তিনি আন্তর্জাতিক মহলে যথেষ্ট সমালোচিত হয়েছেন। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য তার বিরুদ্ধে ভিন্নমত দমন এবং বাকস্বাধীনতা খর্ব করার অভিযোগ উঠেছে।
৭
সংক্ষেপে ইব্রাহিম ত্রাউরে সাহিল অঞ্চলের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ঔপনিবেশিক প্রভাব থেকে মুক্তির যে স্বপ্ন দেখাচ্ছেন, তা বুরকিনা ফাসোর জনগণের মনে ‘চে গুয়েভারার’ উত্তরাধিকারী থমাস সানকারার আদর্শের পুনর্জাগরণ ঘটিয়েছে। তবে তার বিপ্লবী নীতিগুলি বাস্তবে দেশের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কতটুকু উন্নত করতে পারে, তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গেই প্রমাণিত হবে।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
২ নভেম্বর ২০২৫