
১
কে সোরাহি সুরা দিও, একটু রুটির ছিলকে আর
প্রিয়া সাকী, তাহার সাথে একখানি বই কবিতার,
জীর্ণ আমার জীবন জুড়ে রইবে প্রিয়া আমার সাথ,
এই যদি পাই চাইব নাকো তখৎ আমি শাহানশার!
আজ প্রেম ও বিরহের কবি, পারস্যের কবি ওমর খৈয়ামের ৯৭৫তম জন্মদিন।
০৫ মে ১০৪৮ সালে পারস্যের, বর্তমান ইরানের খোরাসনের নিশাপুরের এক অতি দরিদ্র পরিবারে কবি, দার্শনিক, চিকিৎসক, গণিতবিদ ওমর খৈয়ামের জন্ম। পিতা ইব্রাহিম ছিলেন একজন খৈয়াম বা তাঁবু নির্মাতা। পিতার কাজকে সম্মান দেখিয়ে নিজের নামের সাথে খৈয়াম যুক্ত করেন। পুরো নাম গিয়াত আদ-দীন আবুল ফিত্তাহ ওমর ইবনে ইব্রাহিম আল খৈয়াম নিশাপুরী। ইরানের নিশাপুরে জন্মগ্রহণ করলেও যুবা বয়সে তিনি সমরখন্দে চলে যান এবং সেখানে শিক্ষা সমাপ্ত করেন। তাঁর বীজগণিতের গুরুত্বপূর্ণ ‘Treatise on Demonstration of Problems of Algebra’ গ্রন্থে তিনি ত্রিঘাত সমীকরণ সমাধানের একটি পদ্ধতি বর্ণনা করেন। এই পদ্ধতিতে একটি পরাবৃত্তকে বৃত্তের ছেদক বানিয়ে ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান করা হয়। ধারণা করা হয় রনে দেকার্তের আগে তিনি বিশ্লেষণী জ্যামিতি আবিষ্কার করেন। তিনি স্বাধীনভাবে গণিতের দ্বিপদী উপপাদ্য আবিষ্কার করেন। বহুমুখী প্রতিভার দৃষ্টান্ত দিতে হলে বিশ্বসাহিত্য কিংবা ইতিহাসে যাদের নাম উপেক্ষা করা কঠিন ওমর খৈয়াম তাদের মধ্যে অন্যতম। তবে কাব্য-প্রতিভার আড়ালে তাঁর গাণিতিক ও দার্শনিক ভূমিকা অনেকখানি ঢাকা পড়েছে। তিনিই প্রথম রুবাই বা সনেট বা চতুস্পদী রচনা করেন।
চতুষ্পদী কবিতা হলো চার লাইনের ছন্দ কবিতা। যাকে আরবী ও ফার্সিতে রুবাই বা রুবাইয়াত বলে। রুবাইয়াতে ককখক অন্তমিল থাকে। তাঁর রুবাই চতুস্পদী ছন্দে লেখা কবিতা যা পাঠক হৃদয় দখল করে। বাংলা ভাষায় অনেকে খৈয়ামের কবিতার অনুবাদ করেছেন। তবে এদের মধ্যে কবি কাজী নজরুল ইসলাম-এর "রুবাইয়াত ই ওমর খৈয়াম" অন্যতম। তাঁর করা আরেকটা অনুবাদ,
বিশ্ব- দেখা জামশেদিয়া পেয়ালা খুঁজি জীবন- ভর
ফিরনু বৃথাই সাগর গিরি কান্তার বোন আকাশ- ক্রোড়।
জানলাম শেষ জিজ্ঞাসিয়া দরবেশ এক মুর্শিদে
জামশেদের এই জাম- বাটি এই আমার দেহ আত্মা মোর।
২
যুক্তি ও আবেগের করুণ রসের প্রভাবে ওমর খৈয়ামের চার-লাইন বিশিষ্ট কবিতাগুলো কবিতা জগতে হয়ে উঠেছে অনন্য। দার্শনিকরা একটি বই লিখেও যে ভাব পুরোপুরি হৃদয়গ্রাহী করতে পারেন না, গভীর অর্থবহ চার-লাইনের একটি কবিতার মধ্য দিয়ে ওমর খৈয়াম তা সহজেই তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন,
সৃষ্টির রহস্য জানো না তুমি, জানি না আমি
এ এমন এক জটিল বাক্য যা পড়তে পারো না তুমি, না আমি
পর্দার আড়ালে তোমায় ও আমার মাঝে চলছে এ আলাপ
পর্দা যেদিন উঠে যাবে সেদিন থাকবে না তুমি ও আমি।
ওমর খৈয়াম ঠিক কতগুলো রুবাই লিখে গেছেন তার সঠিক হিসাব কারো জানা নেই। তবে তাঁর অমর গ্রন্থ রুবাইয়াৎ-ই-খৈয়ামে ৭২২ টি রুবাই পাওয়া গেছে। রুবাই ছাড়াও কবিতা গজল লিখেও তিনি খ্যাতি পান। ১৮৫৯ সালে ইংল্যান্ডের এডওয়ার্ড ফিটজেরাল্ড ওমর খৈয়ামের কবিতা ইংরেজীতে অনুবাদ করলে পারস্যের বাইরের পাঠকের খৈয়ামকে জানার সুযোগ ঘটে। এ অনুবাদের মাধ্যমে ফিটজেরাল্ড নিজেও খ্যাতিমান হয়েছেন। তার এই অনুবাদ গ্রন্থ দশ বার মুদ্রিত হয়েছে এবং ওমর খৈয়াম সম্পর্কে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার প্রবন্ধ ও বই লিখিত হয়েছে। ইংরেজী ছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ভাষায় ওমর খৈয়ামের কবিতা অনূদিত, বহুল পঠিত ও সমাদৃত হয়েছে। প্রখ্যাত সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী ওমর খৈয়ামের একটি বিখ্যাত রুবাই-এর ভাবানুবাদ করেছিলেন এভাবে,
রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে,
প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে,
কিন্তু বইখানা অনন্ত- যৌবনা- যদি তেমন বই হয়।
৩
জীবনের অনেক ঘাত প্রতিঘাত পার হয়ে ৪ ডিসেম্বর ১১৩১ সালে ৮৩ বছর বয়সে বিশ্বখ্যাত কবি ও মহামনীষী ওমর খৈয়াম ইন্তেকাল করেন। নিশাপুরে তাঁর সমাধি দেখতে অনেকটা তাঁবুর মতো। ওমর খৈয়াম তাঁর মৃত্যুর শেষ ইচ্ছে এঁকেছেন নিজ কাব্যে। কবি কাজী নজরুল ইসলাম কবিতাটা অনুবাদ করেছিলেন, এই লেখা শুরু করেছি সেই অনুবাদ দিয়ে। ওমর খৈয়াম লিখেছিলেন,
তুঙ্গী ময় লল খোয়াম ওয়া দিওয়ানী
সদ্দ রমকী বায়েদ ওয়া নিফসে নাজি
ওয়াজ গাস মান ওয়াতু নিসফতে দর ওয়ারাজি
খোশতর বুদ আম সামলাকাত সুলতানী
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১৮ মে ২০২৩