
১
‘কবিতার নেশায় এক উদভ্রান্ত জীবন কাটাতো সুমন সেসময়। মেডিকেলে চান্স পেয়েও কবিতাকে ভালোবেসে বাংলায় ভর্তি হয়েছিল। সেখানেও ক্লাস ফাঁকি দিতে দিতে অনিয়মিত হয়ে পড়েছিল। পরে বিএ পাশ করেছিল পাসকোর্সে। কবিতার জন্য এরকম সবকিছু ছেড়েছুড়ে দিতে দেখেছি আরেকজনকে- অগ্রজ কবি আবুল হাসান।’
কথাগুলো কবি মুস্তাফা মহিউদ্দীনের।
তিনি ‘রেখায়ন’-এ লিখেছেন, ‘গুলিস্তানে রেক্স রেস্তোরায় সিনিয়র প্রতিষ্ঠিত লেখক-কবিদের একটা নিয়মিত আড্ডা ছিল। ওখানে আসতেন কবি শহীদ কাদরী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস প্রমুখেরা। সুমনের সাথেই আমি প্রথম যাই রেক্স রেস্তোরায়। শহীদ কাদরীর সঙ্গে তার কি কাজ আছে একথা বলে ও আমাকে সঙ্গে নিল। ওখানেই প্রথম দেখি আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে, মুখে পাইপ আর চারপাশে ধোঁয়া। দেখি সৈয়দ শামসুল হককে। খেলারাম খেলে যা উপন্যাসের জন্য তিনি তখন বেশ জনপ্রিয়। শহীদ কাদরী সুমনকে নিয়ে অন্য এক টেবিলে বসে আলাপ শুরু করলেন। অগ্রজেরা বেশ জমিয়ে কাটলেট খাচ্ছিলেন। আমাদের চা সাধলেন। আমার কিছুটা জড়তা লাগছিল, ভদ্রভাবে না বললাম। বের হয়ে সুমন বলল, ভালো করেছো মুস্তাফা, কিছু না খেয়ে। ওরা কাটলেট খাবে আর আমরা খাব চা? চলো, আজ আমরা কাবাব খাব!’
কবি’র নাম সুমন আল ইউসুফ। সুমন নামে পত্র-পত্রিকায় লিখলেও তার আসল নাম হাবিবুর রহমান রেণু, ১৯৫২ সালের ১৬ নভেম্বর কিশোরগঞ্জ জেলার চিকনিরচরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি গুরুদয়াল কলেজে পড়াকালীন দৈনিক পত্রিকার সাহিত্যপাতায় নিজের অবস্থান তৈরি করে নিয়েছিলেন। তার লেখা,
‘তোমার হাতের তলে মেঘের মতন শুয়ে বসে
ঝকঝক করে
বিকেলবেলার কোলে লালটালি বাড়ির মতন
স্বপ্ন দেখে;
শুধু স্বপ্ন দেখে।
তোমার মনের ভিতরের গাছগাছালির গাঢ়
ছায়া ও জ্যোৎস্নায়
আমার হৃদয় আজ পাগলের পাপড়ি ছড়ায়’
২
ঢাকায় এসে কবি সুমন আল ইউসুফ নাম বদলে হয়ে গেলেন কবি সুমন সরকার। এই নামেই অজস্র কবিতা লিখেছেন। পত্র-পত্রিকা, লিটলম্যাগের পাতায় ছাপা হতে থাকে সেসব,
‘তোমার দেহ হাওর, আর মন
অর্চনার ডালটি, স্মরণীয়া
ফেরে না ও যে নৌকা বিবাগীয়া-
কে যেন এল দোচালা ছায়া পড়ে।
জ্যোৎস্নারাতে কলার পাতা ছিঁড়ছে যন্ত্রণা
হৃদয়কালা তোমাকে আর না দেয় যেন মরার মন্ত্রণা’
দেশ স্বাধীনের পর কবি সুমন সরকার, আর কবিবন্ধু আজহার (নাম বদলে নিজের নাম রেখেছিলেন শিহাব সরকার) মাতিয়ে রাখতেন সাহিত্যের আড্ডা। পত্রিকার পাতায় প্রায়ই দুজনের কবিতা পাশাপাশি ছাপা হতে লাগলো। কবি মান্নান সৈয়দ দুজনকে চাঁদ আর সূর্যের সাথে তুলনা করে কবিতা লিখেছিলেন। এসময় কবি রফিক আজাদের প্ররোচনায় কবি সুমন সরকার আবারও নাম বদলে হয়ে গেলেন আবিদ আজাদ। তবে কবি শিহাব সরকারকে বলা হলেও তিনি আর নাম বদলাননি।
৩
‘তরুণতম কবিদের মধ্যে আবিদ আজাদ একটি বিরল ক্ষমতার অধিকারী। তাঁর কণ্ঠস্বরের স্বাতন্ত্র্যকে আমি সহজেই সনাক্ত করতে পারি। বলাবাহুল্য এটি একটি জরুরি ও দুর্লভ গুণ যা তাঁর সমকালীন কবিদের মধ্যে দুই একজন ছাড়া একেবারেই অনুপস্থিত।
আমার বিশ্বাস গৌণ কবিদের মতো কোনো এক বিশেষ দশকের সীমায় বন্দি না থেকে আবাহমান বাংলা কবিতার ধারায় তাঁর রচনাসমূহ একদিন অবশ্যই বিচার্য হয়ে উঠবে’,
কবি শহীদ কাদরী কথাগুলো লিখেছিলেন জুলাই ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত ‘ঘাসের ঘটনা’ কাব্যগ্রন্থের ফ্ল্যাপে। প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের সাথে সাথেই তিনি তরুণতম কবি হিসেবে পাঠক ও বোদ্ধা মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হন। ষাটের দশকের সংগ্রাম-আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ সত্তরের দশকের কবিদের মানস গঠনে ক্রিয়াশীল ছিল। তিনিও এর ব্যতিক্রম নন। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ চিহ্নিত হয়ে আছে এক মাইলফলক হিসেবে।
আমি সংগ্রহ করেছি নভেম্বর ২০২৩ সালে ঐতিহ্য প্রকাশিত প্রথম সংস্করণ, প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। তার কবিতা পাঠ করলে সমসাময়িক কবিদের লেখা বলে ভ্রম হয়, তার কবিতা কালজয়ী।
‘স্বপ্নের ভিতর সেই প্রথম আমি মানুষের হাত ধরতে গিয়ে
স্তব্ধতার অর্থ জেনে ফেলেছিলাম,
মানুষকে আমার প্রান্তরের মতো মনে হয়েছিল-
যে রাহুভুক।
অন্যমনস্কভাবে আমার এই পুনর্জন্ম দেখেছিল:
তিনজন বিষণ্ণ অর্জুন গাছ।
সেই থেকে আমার ভিতরে আজো আমি স্বপ্ন হয়ে আছি’
৪
সারাক্ষণ কবিতামগ্নতায় ঘোরলাগা এক কবির নাম আবিদ আজাদ। চিত্রধর্মীতা তার কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য, তবে সেই চিত্র বাস্তবধর্মী এবং কল্পনাশ্রয়ী।
‘এক সময় ওরা আমার প্রতিবেশী ছিল
এক পঙ্ক্তি আলো আর এক পঙ্ক্তি হাওয়া
এলোমেলোমি ভালবাসত বলে সেইভাবে থাকত, কিন্তু
আমার মনে হতো কেমন গোছানো-মোছানো সবকিছু ওদের
এক পঙ্ক্তি নির্জলা সংসারে
ওরা নিরিবিলি দম্পতি
ওদের যেন শিশু নেই
আমার মনে হতো একজন আরেকজনের সন্তান
এই দুজন
এক সময় ওরা আমার সবচে ভাললাগা
জুটি হয়ে উঠেছিল’
৫
কবি ২০০৫ সালের ২২ মার্চ, ৫২ বছর বয়সে ঢাকার শমরিতা হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি তার প্রথম কাব্যগ্রন্থে বন্ধু কবি মুস্তাফা মহিউদ্দীনকে ‘শব্দ ভুল হলে’ কবিতাটা উৎসর্গ করেন,
‘শব্দে ভুল হয়েছিল তাই আমি তোমাকে পাইনি।
শব্দে ভুল হলে এত কিছু হয়? এত অনুতাপ?
অনুতাপে পুড়ে যায় সব। তোমাকে গভীরভাবে
চেয়েছিল আমার হৃদয়। তুমি তা জানোনি আজো।
শব্দে ভুল হয়েছিল, শব্দে-শব্দে সেই ভুল আজো
বেজে যায়- ক্ষমা চাই, নাকি তোমাকেই চাই বলো
দংস্ট্রা-মধুর সাজে, পুস্পে, বীজে। আমাকে রোপণ
করেছিলে তবে ভুলে? বলো, কেন ভুলে থাকা যায়?’
কবি মুস্তাফা মহিউদ্দীন তাকে নিয়ে লিখেছেন,
‘দশকের বিচারে কবির কবিতা বিচার্য নয়। তবু যদি বলতে হয় সত্তর দশক কবিতাকে কী দিয়েছে? আমার সোজাসাপ্টা উত্তর- হ্যাঁ, সত্তর দশক কবিতাকে আবিদ আজাদ উপহার দিয়েছে।’
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
৩ জুলাই ২০২৪
তথ্যসূত্র:
১। ঘাসের ঘটনা- আবিদ আজাদ
২। কবিতাসমগ্র - আবিদ আজাদ
৩। রেখায়ন- সম্পাদনায়: শওকত আহসান ফারুক, ফখরুল ইসলাম রচি, রেজা সেলিম
৪। ইন্টারনেট