
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ ও নেপালের মতো আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে ‘জেনারেশন জি’ বা জেন-জি আন্দোলন এক নতুন রাজনৈতিক ঢেউ তুলেছে। প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি তীব্র হতাশা, বেকারত্বের জ্বালা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ এই তরুণ প্রজন্মকে এক ছাতার নিচে এনেছে। এই আন্দোলনগুলো প্রমাণ করেছে যে, বয়সের ভিত্তিতে গঠিত একটি দল কতটা দ্রুত এবং কার্যকরভাবে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন করতে পারে। এই ঢেউ এখন ভারতের রাজনৈতিক মহলেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে, বিশেষ করে লাদাখে চলমান জেন-জি আন্দোলনের পর থেকে। যদিও ভারতে এখনও এমন কোনো দেশব্যাপী জেন-জি আন্দোলন শুরু হয়নি কিন্তু ভারতের বিশাল তরুণ জনসংখ্যা, যারা ডিজিটালভাবে সংযুক্ত এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন, তারা এমন একটি পরিবর্তনের দিকে ঝুঁকতে পারে। তাদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ এবং অসন্তোষ একটি স্ফুলিঙ্গের অপেক্ষায় আছে। যদি এই স্ফুলিঙ্গ জ্বলে ওঠে, তবে তা ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে, যা প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে এবং দেশের রাজনৈতিক এজেন্ডাকে নতুন করে সাজাতে বাধ্য করবে।
১
জেন-জি আন্দোলনের সম্ভাব্য কারণ ও ক্ষেত্র।
২০২৩ সালের হিসাবে ভারতের জনসংখ্যা প্রায় ১৪৩ কোটি, এরমাঝে ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেছে এমন জনসংখ্যা ৩৮ কোটি থেকে ৪০ কোটি এবং এটি বিশ্বে সবচেয়ে বড় জেন-জি জনগোষ্ঠী। শতকরা হিসেবে মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৬% থেকে ২৮%। এই বিপুল সংখ্যক জেন-জি প্রজন্ম শুধু ভারতের জনসংখ্যার একটি অংশ নয়, বরং তারা দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সামাজিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। বাংলাদেশ এবং নেপালের মতো ভারতেও ব্যাপক বেকারত্ব, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি তরুণ প্রজন্মের মোহভঙ্গের ঘটনা পরিলক্ষিত হয়। ডিজিটাল মাধ্যমে সংযুক্ত এই প্রজন্ম খুব সহজে নিজেদের ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করতে পারে। তাদের আন্দোলন শিক্ষা, কর্মসংস্থান, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, দুর্নীতির মতো বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে দানা বাঁধতে পারে। শহুরে ও আধা-শহুরে অঞ্চল এই আন্দোলনের প্রধান ক্ষেত্র হতে পারে, যেখানে তরুণরা নিজেদের অধিকার ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বেশি সচেতন।
ক। বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক বৈষম্য।
সাম্প্রতিক সরকারি পরিসংখ্যান অনুসারে ভারতে বর্তমানে সামগ্রিক বেকারত্বের হার ৫.১%। কিন্তু শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেকারত্বের হার সামগ্রিক বেকারত্বের হারের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ২০২৩ সালের চতুর্থ ত্রৈমাসিকের (জানুয়ারি-মার্চ) সার্ভে অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী শিক্ষিত তরুণদের (যারা মাধ্যমিক বা তার চেয়ে বেশি শিক্ষা সম্পন্ন করেছেন) মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল ১৩.৪%। আর যারা স্নাতক ডিগ্রি বা তার চেয়ে বেশি শিক্ষা সম্পন্ন করেছেন, তাদের মধ্যে বেকারত্বের হার আরও বেশি। বিভিন্ন গবেষণায় এই হার ১৫% থেকে ১৯% পর্যন্ত দেখা গেছে। এই তথ্য থেকে বোঝা যায় যে, উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করার পরও যারা চাকরি পেতে হিমশিম খাচ্ছে তারা মূলত জেন-জি (Gen Z)। লাদাখে বেকারত্বের উচ্চ হার জেন-জিদের বিক্ষোভের অংশগ্রহণের অন্যতম প্রধান কারণ। আর তাই বেকারত্বের যদি এই সমস্যা আরও প্রকট হয়, তবে এটি সারা ভারতে জেন-জি আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হতে পারে। বিবিসি’র এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে, ভারত, বাংলাদেশ ও নেপালের মতো দেশগুলোর তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বেকারত্ব, রাজনৈতিক দুর্নীতি এবং পুরোনো নেতৃত্বের প্রতি হতাশার মতো সমস্যাগুলো সাধারণ। বাংলাদেশের আন্দোলন ভারতে একটি আলোচনার জন্ম দিয়েছে যে, একই ধরনের পরিস্থিতি ভারতেও তৈরি হতে পারে। ভারতের রাজনৈতিকদল ভারত রাষ্ট্র সমিতি (BRS) এবং অন্যান্য আঞ্চলিক দলগুলো, সতর্ক করে বলেছে যে বেকারত্ব এবং অন্যান্য সামাজিক সমস্যার কারণে নেপালের মতো একটি জেন-জি আন্দোলন ভারতেও ঘটতে পারে।
খ। ডিজিটাল সংযোগ।
ভারতে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৮৫ কোটির বেশি এবং ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী ভারতীয় তরুণদের শতকরা প্রায় ৯৫ ভাগ স্মার্টফোন ব্যবহার করে থাকে। এছাড়াও বর্তমানে ভারতের মোট জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ৩৩.৭ ভাগ সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয়। ২০২৩ সালের ডেটা অনুযায়ী এই সংখ্যা ছিল ৪৬.২ কোটি এবং ২০২৪-এর শুরুতে এটি বেড়ে ৪৯.১ কোটি হয়েছে। এই ব্যবহারকারীদের মধ্যে বড় একটি অংশ হলো তরুণ জনগোষ্ঠী, যারা বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া যেমন- ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক ইত্যাদির সাহায্যে খুব দ্রুত তথ্য এবং আন্দোলনের বার্তা অনেকের মাঝে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম। একটি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছাড়াই এটি বিক্ষোভে তরুণদের সংগঠিত করতে সাহায্য করতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমরা এমনটা দেখেছি। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস তাদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে ডিজিটাল মাধ্যম, যেমন সোশ্যাল মিডিয়া, কীভাবে তরুণদের একত্রিত করতে এবং নেতৃত্ববিহীন আন্দোলন তৈরি করতে সাহায্য করছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছে। তারা এই মাধ্যমগুলোকে শুধুমাত্র যোগাযোগের হাতিয়ার হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও দেখিয়েছে।
গ। রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের অভাব।
ভারতের তরুণ প্রজন্ম ক্রমবর্ধমান হারে অনুভব করছে যে, দেশের প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলো তাদের চাহিদা এবং প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। এই দলগুলো, যা প্রায়শই পারিবারিক শাসন বা জীর্ণ রাজনৈতিক মতাদর্শ দ্বারা চালিত, তরুণদের আকাঙ্ক্ষা এবং আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে তাল মেলাতে পারছে না। এরফলে তরুণরা রাজনীতি থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন মনে করছে। তাদের কাছে রাজনীতি মানে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার। এই মোহভঙ্গের প্রধান কারণ হলো:
(১) প্রজন্মগত ব্যবধান। প্রচলিত রাজনীতিকরা প্রায়শই এমন নীতি এবং কৌশল নিয়ে কাজ করেন, যা পুরোনো প্রজন্মের জন্য প্রাসঙ্গিক। কিন্তু জেন-জি প্রজন্ম কর্মসংস্থান, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ডিজিটাল স্বাধীনতার মতো নতুন বিষয়গুলোতে আগ্রহী। এই প্রজন্মগত ব্যবধান বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামোকে তরুণদের কাছে অপ্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস লাদাখে চলমান আন্দোলনকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে কভার করেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, এই আন্দোলনটি শুধুমাত্র স্থানীয় দাবি (রাজ্যের মর্যাদা ও সাংবিধানিক সুরক্ষা) নিয়ে নয়, বরং এটি তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক কাঠামোর প্রতি তাদের অবিশ্বাসকে তুলে ধরে।
(২) দুর্নীতির ব্যাপকতা। তরুণরা দেখে যে, দুর্নীতির কারণে তাদের চাকরির সুযোগ কমে যাচ্ছে এবং সমাজের অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ছে। তারা মনে করে, রাজনীতিবিদরা তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থে কাজ করছেন, জনগণের জন্য নয়। এই উপলব্ধি তাদের মধ্যে গভীর হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
(৩) নেতৃত্বের সংকট। পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোতে নতুন ও মেধাবী নেতৃত্বের অভাব রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে, নেতৃত্ব বংশানুক্রমিকভাবে হস্তান্তরিত হয়, যা তরুণদের মধ্যে যোগ্যতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্বাচনের আকাঙ্ক্ষাকে আঘাত করে। তরুণরা এমন নেতৃত্ব চায়, যারা প্রযুক্তি বোঝে, বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে সচেতন এবং সততার সাথে কাজ করবে।
২
ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জেন-জি আন্দোলনের সম্ভাব্য প্রভাব।
জেন-জি আন্দোলন যদি দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে, তবে প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হবে, যা তাদের নীতি ও কৌশল পরিবর্তনে বাধ্য করবে। নতুন ধরনের, তরুণ-কেন্দ্রিক রাজনৈতিক শক্তি বা নেতৃত্ব এই আন্দোলনের মাধ্যমে উত্থান লাভ করতে পারে। এর ফলে রাজনৈতিক আলোচনা বেকারত্ব, পরিবেশ এবং প্রযুক্তির মতো বিষয়গুলোতে স্থানান্তরিত হবে। সব মিলিয়ে, এই আন্দোলন ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।
ক। প্রচলিত দলগুলোর ওপর চাপ।
যদি জেন-জি আন্দোলন ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে বিজেপি, কংগ্রেস এবং অন্যান্য আঞ্চলিক দলগুলো তরুণ ভোটারদের সমর্থন ধরে রাখতে ব্যাপক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। ভারতের রাজনৈতিক মহল এবং গণমাধ্যম বাংলাদেশের জেন-জি আন্দোলনকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা, বিশেষ করে বিরোধী দলগুলো এই ধরনের যুব আন্দোলনের সম্ভাবনা নিয়ে সতর্ক বার্তা দিয়েছেন। কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, বেকারত্ব বা অন্যান্য সামাজিক সমস্যার কারণে ভারতেও একই ধরনের আন্দোলন দানা বাঁধতে পারে। তাই তাদের নীতি ও কৌশল পরিবর্তন করতে বাধ্য হবে, এবং তরুণদের কর্মসংস্থান ও অন্যান্য সমস্যা সমাধানে আরও বেশি মনোযোগ দিতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে, বিশেষ করে বিরোধী শিবিরে বাংলাদেশের আন্দোলনের স্লোগান থেকে অনুপ্রেরণা নেয়ার খবর পাওয়া গেছে। যেমন- বাংলাদেশের আন্দোলনের স্লোগান ‘দফা এক, দাবি এক, হাসিনার পদত্যাগ’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে পশ্চিমবঙ্গে ‘দফা এক, দাবি এক, মমতার পদত্যাগ’ স্লোগান ব্যবহৃত হয়েছে।
খ। নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান।
জেন-জি আন্দোলন কোনো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের অংশ না হয়েও একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে। এটি নতুন রাজনৈতিক দল বা জোটের উত্থানে সহায়তা করতে পারে, যারা প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে কাজ করবে। এক্ষেত্রে লাদাখের আন্দোলন প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের উজ্জ্বল উদাহরণ। এই আন্দোলন কোনো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল দ্বারা শুরু বা পরিচালিত হয়নি, বরং এর নেতৃত্বে আছেন পরিবেশকর্মী এবং শিক্ষাবিদ সোনাম ওয়াংচুক এবং স্থানীয় যুবসমাজ। এই আন্দোলনটি প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর নির্ভর না করে নিজেদের দাবিগুলো সরাসরি জনগণের কাছে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে।
লাদাখের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তরুণ প্রজন্ম তাদের রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণের জন্য পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর ভরসা রাখতে চায় না। তারা এমন একটি ব্যবস্থার পক্ষে, যেখানে তাদের নিজেদের প্রতিনিধিরা তাদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করবে। লাদাখের জেন-জি আন্দোলন স্থানীয় সংগঠনগুলোকে একত্রিত করে একটি শক্তিশালী জোটে পরিণত করেছে, যা কেন্দ্রীয় সরকারকে তাদের দাবিগুলো শুনতে বাধ্য করেছে। এটি প্রমাণ করে যে, প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরেও একটি আন্দোলন কীভাবে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারে এবং নতুন নেতৃত্ব ও একটি ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্ম দিতে পারে। লাদাখের এই মডেল ভারতের অন্য অঞ্চলের জন্যও একটি দৃষ্টান্ত হতে পারে, যেখানে তরুণরা পুরোনো রাজনৈতিক ধারার প্রতি বিরক্ত এবং নতুন সমাধানের খোঁজে রয়েছে।
গ। নীতি নির্ধারণে পরিবর্তন।
জেন-জি আন্দোলন যদি সফল হয়, তবে তা সরকারের নীতি নির্ধারণে পরিবর্তন আনতে পারে। যুব সমাজের চাহিদা অনুযায়ী কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও পরিবেশের মতো বিষয়গুলো রাজনৈতিক এজেন্ডায় আরও গুরুত্ব পেতে পারে।
ঘ। রাজনৈতিক মেরুকরণ।
জেন-জি আন্দোলন যদি ভারতের রাজনীতিতে বড় পরিসরে প্রভাব ফেলে, তবে এর অন্যতম প্রধান ঝুঁকি হবে রাজনৈতিক মেরুকরণ বৃদ্ধি। এই আন্দোলনগুলো সাধারণত প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে থেকে আসে এবং তাদের প্রচলিত কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করে। এর ফলে সরকার এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে একটি স্পষ্ট বিভাজন তৈরি হতে পারে। সরকার যদি এই আন্দোলনকে শুধুমাত্র আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখে এবং কঠোর দমন-পীড়নের পথ বেছে নেয়, তাহলে মেরুকরণ আরও তীব্র হবে। এরফলে তরুণ প্রজন্মের কাছে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ তাদের প্রতি বিশ্বাসহীনতা তৈরি করবে। তারা মনে করবে, সরকার তাদের দাবিকে গুরুত্ব না দিয়ে শুধু দমন করতে চাইছে। দমনের চেষ্টা করলে আন্দোলন আরও সহিংস এবং তীব্র হতে পারে, কারণ আন্দোলনকারীরা নিজেদের অধিকারের জন্য আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিবাদ করতে পারে। এবং এই সংঘাত সমাজের অন্যান্য অংশকেও বিভক্ত করতে পারে। কেউ সরকারের পক্ষে অবস্থান নেবে, আবার কেউ আন্দোলনকারীদের পক্ষে। এই বিভাজন দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। উদাহরণ হিসেবে লাদাখের কথা বলা যেতে পারে, সেখানে সোনাম ওয়াংচুকের আন্দোলনকে যখন সরকার আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখতে শুরু করে, তখন তরুণদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়ে। দীর্ঘদিন শান্তিপূর্ণভাবে চলা এই আন্দোলন গত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে রূপ নেয় সহিংসতায়, যখন রাজধানী লেহতে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) আঞ্চলিক কার্যালয় বিক্ষুব্ধ তরুণদের আগুনে ভস্মীভূত হয়। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত চারজন নিহত ও বহু মানুষ আহত হয়েছেন বলে জানা যায়। যদি এধরনের একটি আন্দোলন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে, তবে তা একটি বৃহত্তর সংঘাতের জন্ম দিতে পারে, যা সমাজের বিভিন্ন স্তরে গভীর ফাটল সৃষ্টি করবে এবং রাজনৈতিক মেরুকরণকে আরও জটিল করে তুলবে।
৩
জেন-জি আন্দোলনের ভবিষ্যৎ।
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে জেনারেশন জেড বা জেন-জি আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ও বিস্তারিত তথ্য না পাওয়া গেলেও কিছু গণমাধ্যম লাদাখে চলমান বিক্ষোভকে ‘জেন-জি আন্দোলন’ বলে অভিহিত করেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, লাদাখের আন্দোলনটি মূলত একটি স্থানীয় ইস্যু, যা জেন-জি প্রজন্মের নেতৃত্বে একটি বৃহত্তর রূপ নিয়েছে। লাদাখের আন্দোলন প্রমাণ করে যে, ভারতের তরুণ প্রজন্ম শুধুমাত্র রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় নয়, বরং তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অত্যন্ত সচেতন। এই আন্দোলনটি সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে এবং লাদাখের রাজনৈতিক সমস্যাগুলোকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, যদি ভারতের অন্যান্য রাজ্যেও বেকারত্ব বা রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের অভাবের মতো সমস্যাগুলো তীব্র হয়, তাহলে লাদাখের মতো জেন-জি আন্দোলন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে ভারতে এই আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে বেশ কিছু বিষয়ের ওপর:
ক। আন্দোলনের নেতৃত্ব ও কৌশল।
লাদাখের আন্দোলনটি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্বে পরিচালিত হয়নি। বরং এটি সোনাম ওয়াংচুকের মতো একজন সমাজকর্মী এবং স্থানীয় তরুণদের দ্বারা পরিচালিত হয়েছে। এছাড়াও জানা যায় যে, দলগতভাবে এই আন্দোলনটির নেতৃত্বে রয়েছে মূলত স্থানীয় নাগরিক সংস্থা লেহ অ্যাপেক্স বডি (LAB) এবং কারগিল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (KDA)। এই আন্দোলনকারীরা সোশ্যাল মিডিয়া, লাইভ স্ট্রিমিং এবং অনলাইন প্রচারণার মাধ্যমে নিজেদের বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছে। এই ডিজিটাল কৌশলগুলোই আন্দোলনকে দ্রুত সারা দেশের নজরে এনেছে। তবে আন্দোলনটি যদি এটি বিশৃঙ্খল এবং লক্ষ্যহীন হয়, তবে তা দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
খ। সরকারের প্রতিক্রিয়া।
সরকার যদি আলোচনা এবং সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করে, তবে তা শান্তিপূর্ণ সমাধানে সাহায্য করতে পারে। লাদাখের বিক্ষোভে সেখানকার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আন্দোলনকারী একজন পরিবেশ কর্মী, সোনম ওয়াংচুক-এর বিরুদ্ধে উসকানি দেয়ার অভিযোগ এনেছে, যেখানে তিনি নেপাল ও বাংলাদেশের জেন-জি বিক্ষোভের প্রসঙ্গ টেনেছিলেন। ভারতের সরকার এই ধরনের যুব আন্দোলনের প্রভাব সম্পর্কে সচেতন। তাই আন্দোলনের লাগাম টানতে জলবায়ু কর্মী ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুক, যিনি লাদাখের এই দাবিগুলোর সমর্থনে অনশন ধর্মঘট করেছিলেন, তাকে সহিংসতার পর, গত ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট (NSA)-এর অধীনে আটক করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের অভিযোগ তিনি ‘উস্কানিমূলক বক্তব্যের’ মাধ্যমে সহিংসতা উসকে দিয়েছেন। সোনম ওয়াংচুক-এর স্ত্রী, গীতাঞ্জলি জে. আংমো অবশ্য তার আটককে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে হেবিয়াস কর্পাস পিটিশন দাখিল করেছেন। ২৯ অক্টোবর ২০২৫ তারিখের শুনানিতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি অরবিন্দ কুমার এবং এন ভি আঞ্জারিয়ার বেঞ্চ গীতাঞ্জলি জে. আংমোর সংশোধিত আবেদন গ্রহণ করেছে এবং কেন্দ্র ও লাদাখ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের প্রশাসনের কাছে ১০ দিনের মধ্যে জবাব চেয়েছে। পরবর্তী শুনানি ২৪ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে ধার্য করা হয়েছে।
গ। অন্যান্য সামাজিক গোষ্ঠীর সমর্থন।
শুধু তরুণদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, জেন-জি আন্দোলন যদি সমাজের অন্যান্য শ্রেণী, যেমন কৃষক বা শ্রমিকদের সমর্থন লাভ করে, তবে এটি একটি বৃহৎ গণআন্দোলনে পরিণত হতে পারে। যেমন লাদাখে ২০২০ সাল থেকেই পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা এবং ভারতীয় সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলে অন্তর্ভুক্তির দাবিতে আন্দোলন চলছে। সম্প্রতি, ২০২৫ সালে এসে এই আন্দোলন সহিংস রূপ নিয়েছে এবং এর নেতৃত্ব দিচ্ছে তরুণ প্রজন্ম। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং কিছু রাজনৈতিক নেতা এই আন্দোলনকে ‘জেন-জি বিক্ষোভ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং অভিযোগ করেছেন যে এটি নেপাল ও বাংলাদেশের আন্দোলনের দ্বারা অনুপ্রাণিত। একইভাবে বিহারে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ঘিরে চাকরিপ্রত্যাশীদের আন্দোলন এবং আসামে ‘তফসিলি উপজাতি’ মর্যাদার দাবিতে মোড়ান সম্প্রদায়ের আন্দোলন হয়েছে। যদিও এগুলিকে সরাসরি জেন-জি আন্দোলন বলা হয়নি, তবে এই বিক্ষোভগুলোতে তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ ছিল লক্ষণীয়।
৪
লাদাখের জেন-জি আন্দোলন শুধুমাত্র একটি ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়, এটি ভারতের রাজনৈতিক landscape-এ একটি paradigm shift-এর ইঙ্গিত। বাংলাদেশ ও নেপালের মতো প্রতিবেশী দেশে জেন-জি দের সাফল্য ভারতীয় তরুণদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তারা এখন প্রচলিত রাজনীতির বাইরে গিয়ে নিজেদের কণ্ঠস্বর প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। এই আন্দোলন যদি সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে, তবে তা শুধুমাত্র বেকারত্বের মতো অর্থনৈতিক সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা রাজনৈতিক সংস্কার, নেতৃত্ব পরিবর্তন এবং গণতন্ত্রের মৌলিক নীতির ওপরও প্রভাব ফেলবে।
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার যদি সহনশীল মনোভাব না দেখিয়ে লাদাখের আন্দোলনকে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে দমন করার চেষ্টা করে, তবে তা তরুণ ও কর্তৃপক্ষের মধ্যে সংঘাত তৈরি করতে পারে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। অন্যদিকে, যদি সরকার তাদের দাবিগুলো আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসে, তবে তা একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। লাদাখে জেন-জি দের এই আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে তরুণদের ঐক্য, তাদের ডিজিটাল মাধ্যমের ব্যবহার এবং প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়ার ওপর। তবে এটা বলা যেতেই পারে, লাদাখে জেন-জি আন্দোলন ভারতের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে, যা ভবিষ্যতের জন্য এক নতুন রাজনৈতিক মডেল তৈরি করতে পারে।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
৫ নভেম্বর ২০২৫