
১
‘কবিরা স্বভাবে বোহেমিয়ান। কবি গোলাম সাফদার সিদ্দিকী ছিল প্রকৃত বোহেমিয়ান। কোথায় থাকে কোথায় খায় কেউ বলতে পারে না। পার্কে, স্টেশনে লাইব্রেরির বারান্দায় যেখানে সেখানে রাত কাটিয়ে দিতেন, কোন ঠিকানা ছিল না। এক শীতে চলে এল চটের পোশাক পরে’, রেখায়নে কবি সাবদার সিদ্দিকিকে এভাবেই চিত্রিত করেছেন রাগীব আহসান। বাংলাদেশের কবিতায় ষাটের দশক একটি দ্রোহের দশক, এই দ্রোহ কবিতার বিষয় ও বিন্যাস দু’দিক থেকেই। সময়ের দিক থেকে কবি সাবদার সিদ্দিকি এই দশকের। তবে তিনি জন্মেছিলেন কলকাতায়, ১৯৫০ সালে। জন্মভূমি কলকাতা তার কবিতায় ঠাঁই পেতেছে এভাবে,
‘কলকাতা তোমার মনে নেই? মনে নেই?
পঞ্চাশের কলকাতা?
দাঙ্গামথিত শহরের বাতাসে ধ্বনিত
বিবেকের মতো তোমার, আমার জন্ম চীৎকার?
কিংবা ‘৬৪ দাঙ্গামথিত শহরের
নগ্নভগ্ন মৌলালীর উলঙ্গ দরগাহ
অথবা
রাজপথে নিঃসঙ্গ সুনীল ভগ্ন শঙ্খের
নিঃশব্দ নিনাদ?’
৬৪’র হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার কারণে পিতা গোলাম মাওলা সিদ্দিকি আইন ব্যবসা ছেড়ে সপরিবারে বাংলাদেশের সাতক্ষীরায় চলে আসেন। কবি তখন অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। নতুন পরিবেশে কবির অনুভূতি তার লেখা কবিতায় এভাবেই যেন ধরা পড়ে,
‘যেখানেই পা রাখি
ভিনগ্রহে কিংবা ভিনগাঁয়ে দেখি
পায়ের নিচে টুকরো দুই জমি
হয়ে যায় আপন মাতৃভূমি।’
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তাদের পরিবার কলকাতায় ফিরে যায়, কিন্তু কবি এদেশেই থেকে যান এবং আট নাম্বার সেক্টরে যুদ্ধ করেন। তবে যুদ্ধের এক পর্যায়ে তিনি কলকাতায় ফিরে গিয়ে সাপ্তাহিক ‘স্বদেশ’ প্রকাশ করেন। কলকাতাকে তিনি ধারণ করেছেন গভীর অনুভবে, কলকাতায় বেড়ে ওঠা নিয়ে তার কবিতার লাইন,
‘হাওড়া ব্রিজ যেন লোহার ব্রেসিয়ার তোমার
কলকাতা, যন্ত্রের সমান বয়সী তুমি
কলকাতা, তোমার ইতিহাস
বাইবেলের পিছনে গাদাবন্দুক
বাংলা গদ্যের সমান বয়সী
আমার কিশোর কলকাতা
সন্ন্যাসীর লিঙ্গের মতো নিস্পৃহ তুমি আজ।’
২
‘এর চেয়ে বেশি অন্যভিন্ন কোনো কিছু নয়
বড় বেশি হলে মনে হলে
একলা হয়ে গেলে
তারপর একলা হতে হতে হলে
হয়ে যাওয়া হয়।
বাথরুমে অন্যথায় আত্মহত্যায়
যেরকম ঘুমের ভিতর
একক হতে হতে হয়ে যায়, হয়ে যাও
বড় বেশি হলে একলা হয়ে গেলে
হতে হতে যাওয়া যায়, হয়
এর চেয়ে বেশি কিছু অন্যভিন্ন কোনোকিছু নয়।’
স্বাধীনতার পর তিনি তার নামের একাংশ ‘গোলাম’ বর্জন করে ‘সাবদার সিদ্দিকি’ নামে লেখালেখি শুরু করেন। তার কৈশোর এবং প্রথম যৌবন সাতক্ষীরায় কাটলেও সাহিত্যিক বিকাশ ঘটে ঢাকায়। ১৯৭২ সালে কলকাতা থেকে ঢাকায় ফিরে পুরোদমে সাহিত্য চর্চা চালিয়ে যান। তার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে কবি আবুল হাসান এবং কবি নির্মলেন্দু গুণের সাথে। তারা তিনজনই স্বভাবে বোহেমিয়ান এবং একসাথেই চলে তাদের আড্ডা, ওঠাবসা এবং কাব্যচর্চা। তাকে নিয়ে মুস্তাফা মহিউদ্দীন রেখায়নে লিখেছেন, ‘জাত বোহেমিয়ান ছিলেন কবি সাবদার সিদ্দিকী। তার ছালা দিয়ে তৈরি কোট, ক্যাম্পাসে নিউজপ্রিন্ট বিছিয়ে ঘুমানো, মদ্যপান থেকে আফিমসহ হেন নেশা ছিল না যা তিনি করতেন না। জীবনকে নিয়ে খেলেছেন তিনি। একমাত্র সিনসিয়ার ছিলেন পরীক্ষাধর্মী কাব্যচর্চায়। আর সব কিছুই ছিল গৌণ। প্রচলিত সমাজ কাঠামোকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আত্মবিধ্বংসী খেলায় যেন মেতে উঠেছিলেন। শেষতক বেশি দিন বাঁচেন নি। ঝরে গেছেন নীরবে। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।’
যারা আপাতদৃষ্টিতে বোহেমিয়ান কিন্তু তলে তলে হিসেবের খাতা ঠিক রাখেন, তিনি তাদের মতো নন। তার পোশাক যেমন ছিল একান্তই তার নিজস্ব পরিকল্পনা মোতাবেক তৈরি, জীবনকেও তিনি তেমনি নিজের ধরণে বুনন করে গেছেন। স্বনির্বাচিত ছালা বা তোষকের কাপড়ের তৈরি আলখাল্লা, গোল চশমা, খালি পা, কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ, ব্যাগের মধ্যে একটা মাটির পাত্র এবং লম্বা চুলে তাকে দেখলে মনেহতো উম্মাদ। অথচ তার মগজের ভেতরে কবিতার লাইন, মুখ খুললে বিশুদ্ধ বাংলায় তা ঝরে পড়তো,
‘আমার জন্য অপেক্ষায় জেগে থাকে
একটি শহর, বিষণ্ণ একটি শহর
আমার আসন্ন আগমনে
কম্পাস কাঁটার মতো কাঁপে
কাঁপতে কাঁপতে কাঁপতে থাকে
নতুন ব্লেডের মতো ঝকমকে একটি শহর।’
৩
‘দিল্লী বহুত দূরস্থ’ উদাসীন চোখে বাইরের দিকে তাকিয়ে টেন্ডুপাতার বিড়িতে কষে টান দিয়ে বিরক্তির সুরে, ‘কবিতা লেখে নির্মল, তুমি লিখে কি করবে। পড়াশোনা করগে’ কথাটা বলেছিলেন আলমগীর রেজা চৌধুরীর উদ্দেশ্যে। তিনি রেখায়নে যেমনটা লিখেছেন, ‘থাকি ইন্দিরা রোডে। মধ্যরাতে রেখায়ন-এর আড্ডা শেষ করে বাসায় ফিরতে গেলে সাবদার ভাই সঙ্গী হত। সাবদার ভাই পারিবারিক পরিবেশে বেমানান চরিত্র। মফস্বল থেকে এসে আমি তার সাথে খাপ খাওয়াতে পারিনি। বিরোধ হয়েছে। কবিতার অন্তঃশীলা ফল্গুধারায় অবগাহন করতে করতে আবার আমার ডেরায় সাবদার ভাইকে নিয়ে এসেছি। কবি সাবদার সিদ্দিকীর পিতৃপুরুষ কোলকাতা নিবাসী। কোলকাতার কোন এক কনভেন্টে ও-লেভেল স্ট্যান্ডার্ড পর্যন্ত লেখাপড়া করেছিল। তারপর কাব্যমাতাল কবি অজানা এক পথে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়েছিল যা মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে সাড়ে তিন হাত মাটিতে স্থায়ী নিবাস করে নিয়েছে।’
তিনি ‘কৃষ্ণের লাল পাখি’ নামে একটা লিটল ম্যাগ সম্পাদনা করতেন। কবিতার শরীরে তিনি প্রকরণগত বৈচিত্র্যে খুঁজে বেড়াতেন ইতিহাস, দর্শন, যাপিত জীবনের সূক্ষ্মতার নান্দনিকতা। ঘর-সংসার-নারী এসবে তার কোন আগ্রহ ছিল না। তিনি সংসার পাতেননি এমনকি কোন নারীর সাথে লিপ্ততার কথাও কখনো শোনা যায়নি। জীবিত থাকাবস্থায় তার কোন কাব্যগ্রন্থ বের হয়নি। অথচ অনেক কবিতা বা ক্যালিগ্রাফি রচনা করেছেন। দু’একটা নিউজপ্রিন্টে বা নীলচে পুস্তিকা বাদে কোন পুরু মলাটের শক্ত বাঁধাইয়ের বই পর্যন্ত বের হয়নি। আসলে জীবন যাপনে উদাসীনতার কারণে সামাজিক সম্মানের চেয়ে তিনি অনাদর বেশি পেয়েছেন।
‘স্মৃতির মধ্য থেকে চলে যাচ্ছো
চলে যাচ্ছো
বিস্মৃতির গভীরে গভীরে আরো
গভীরে
বিস্মৃতির গভীরে অন্ধকার
শুধু অন্ধকার
আর কুয়াশার বিশাল সংসার
তুমি চলে যাচ্ছো
তুমি সেই বিস্মৃতির গভীরে
আমূল প্রোথিত হচ্ছো।
নক্ষত্রপুঞ্জের মতো হে আমার স্মৃতিপুঞ্জ।’
কবি দারুণ আড্ডাবাজ ছিলেন। কলকাতার কফি হাউজের আড্ডা থেকে শুরু করে ঢাকায় ভাস্কর রাশা কিংবা রেখায়নের আড্ডায় তাকে পাওয়া যেত। এমনকি আড্ডা মারতে নারায়ণগঞ্জ অবধি চলে যেতেন, সেখানে ‘বোস কেবিন’, ‘আলম কেবিন’ প্রভৃতিতে তরুণদের সাথে চুটিয়ে আড্ডা মারতেন। এসব আড্ডার বিষয়বস্তুর কোন সীমা-পরিসীমা ছিল না, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি থেকে রাজনীতির সর্বশেষ পরিস্থিতি, সবকিছু নিয়েই খোলামেলা আলোচনা হতো। আড্ডার পাশাপাশি তিনি পর্যটনপ্রিয় ছিলেন। প্রায় কপর্দকশূন্য অবস্থায় বা সামান্য সঞ্চয়ে বাংলাদেশের কক্সবাজার-চট্টগ্রাম থেকে শুরু করে ভারতের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছেন। অনেকসময় হেঁটেই ঘোরাঘুরি করতেন। রাজশাহী জেলেও তাকে কিছুদিন কাটাতে হয়েছে। এভাবেই ১৯৯৪ সালে ঘুরতে ঘুরতে দিল্লীতে চলে গিয়েছিলেন। সেখানে অসুস্থ হয়ে পড়লে কলকাতায় ফিরে আসেন। কলকাতায় তখন তার পিতা এবং বড় বোন আইন ব্যবসায় যুক্ত কিন্তু কলকাতা শহর তাকে টানেনি, বাংলাদেশে ফেরার জন্য ব্যাকুল হয়েছিলেন। শরীরের ঐ অবস্থাতেই সাতক্ষীরার সীমান্তে এসে মৃত্যুবরণ করেন। সেখানেই, বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এক নির্জন পল্লীতে তাকে সমাহিত করা হয়। মাত্র ৪৪ বছর বয়সে মরে গেলেও তিনি রেখে যান কিছু অক্ষর, যে-
‘অক্ষরগণ শব্দ হন
শব্দগণ বাক্য হন
ব্যাকরণ ধ্বনি হন
ধ্বনিগণ হন প্রতিধ্বনি।’
৪
কবি সাবদার সিদ্দিকি’র মৃত্যুর পর কবি আব্দুল মান্নান সৈয়দের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রচনা সংগ্রহ করে ১৯৯৭ সালে ‘ঘাস ফুল নদী প্রকাশনী’ একটা কাব্যগ্রন্থ বের করেছে। এর অনেকপর ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘ঐতিহ্য’ কবি আবদুল মান্নান সৈয়দের সম্পাদনায় ‘সাবদার সিদ্দিকি কবিতাসংগ্রহ’ নামে একটা কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেছে। কেননা তার-
‘প্রত্যেকটা কবিতাই যেন
এক একটি স্বাধীনতার সনদ।
প্রত্যেকটা কবিতাই যেন
পোস্টারে উৎকীর্ণ
আগ্নেয় ভাষা।
প্রত্যেকটা কবিতাই যেন
মিছিলে উচ্চারিত
প্রতিবাদের ভাষা,
প্রতিরোধের ভাষা।
প্রত্যেকটা কবিতাই যেন
স্বাধীনতার ভাষা।’
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১৩ জুলাই ২০২৪
তথ্যসূত্র:
১। রেখায়ন – সম্পাদনায়: শওকত আহসান ফারুক, ফখরুল ইসলাম রচি, রেজা সেলিম
২। রুম নাম্বার ১৪৬ –শওকত আহসান ফারুক
৩। সাবদার সিদ্দিকি কবিতাসংগ্রহ- সম্পাদনা: আবদুল মান্নান সৈয়দ