
১
‘অশ্রুধারা, তোমার মৃত্যুর আগে, অনেকের জন্য আমি কেঁদেছি
কিন্তু আমার সকল অশ্রুধারা আজ মরে গেছে।
সান্ত্বনাদানকারীদের জন্য আমার দুই কান খোলা রেখেছি
আর ব্যথা তো আমার হৃদয়ের গহনে রয়েছে।’
লাইনগুলো আরবের একজন বিখ্যাত ও বেশ আলোচিত নারী কবি’র, স্বয়ং হযরত মুহম্মদ (সাঃ) তাঁর কবিতা পছন্দ করতেন বলে জানা যায়। কবি’র নাম আল খানসা, তিনি ৫৭৫ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান সৌদি আরবের নাজদ-এ বানু সুলায়েম গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। ইতিহাস বলে হযরত মুহম্মদ (সাঃ) প্রায়ই তাঁকে কবিতা পাঠ করতে বলতেন এবং এমনকি তিনি বিরতি দিলে বলতেন, ‘চালিয়ে যাও, খানসা’। প্রফেট তাঁকে একজন কবি হিসেবে আরবের বিখ্যাত কবি ইমরুল কায়েস এরচেয়েও বড় মনে করতেন। তিনি তাঁর ভাই শাকরকে নিয়ে বেশ কিছু এলিজি লিখেছিলেন, সেরকম একটা কবিতা,
‘নিশ্চয়, তুমি আমার চোখে কান্না এনে দিয়েছো
তবুও তুমিই আমাকে সবচেয়ে আনন্দ উল্লাস দিয়েছিলে
হাহাকার করা নারীদের মাঝে আমার অশ্রুজল ছিলো অধিক
কারণ বিলাপ তো সবচেয়ে বেশি করার কথা আমারই
আমিই তোমাকে যুদ্ধে পাঠিয়েছিলাম
যখন তুমি জীবিত ছিলে
কিন্তু কে পারে এড়াতে অপ্রতিরোধ্য মৃত্যুকে
যদিও ওরা বলে মৃতের জন্যে কান্না ঠিক নয়
আমার তো মনেহয় তোমার জন্য কাঁদতে পারা সর্বোত্তম কাজ।’
২
আল খানসাকে বলা হয় বিষণ্ণতার কবি, তিনি নিজেও ছিলেন তাঁর কবিতার মতোই বিষণ্ণ সুন্দর। শোক বা বিষণ্ণতাই আল খানসাকে কবি করেছে। তাঁর পুরো নাম তুমাদির বিনতে আমর ইবন আল-হারিথ ইবন আল শারিদ আল সুলামিয়া। খানস শব্দের অর্থ বোঁচা নাক, আরবি ভাষায় সাধারণত সৌন্দর্যের উপমা হিসেবে গ্যাজেল বা বোঁচা নাক বলা হয়। সেসময়ে আরবে বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ লেগেই থাকতো। ৬১২ এবং ৬১৫ খ্রিস্টাব্দে বানু মুররা এবং বানু আসাদ নামে দুই গোত্রের সাথে যুদ্ধে তাঁর প্রিয় ভাই মুয়াইবা শহীদ হন। ভাতৃহত্যার প্রতিশোধ এবং গোত্রের সম্মান রক্ষার্থে তিনি তাঁর আরেকভাই শাকর’কে যুদ্ধে পাঠান। সেই ভাই শত্রুকে হত্যা করে এবং তিনি নিজেও আহত হন। এই ঘটনার প্রায় একবছর পর শাকর মারা যান। আল খানসা তাঁর এই দু’ভাইয়ের স্মৃতিতে শতাধিক এলিজি লিখেছেন, সেরকম একটি এলিজি,
‘আর কোনো দিবস তো বিষণ্ণ ছিলো না অতোটা
যখন শাকর আমায় ছেড়ে চলে গেল। মিষ্ট আর চির তিক্ত।
শাকর আমাদের নেতা, আমাদের প্রধান।
শীতকালে শাকর উৎসব চালু করেছিলো
আর আমাদের পথ দেখাতো উটের পিঠে চড়ে।
আমরা ক্ষুধার্ত হলে শাকর করতো শিকার।
শাকর ছিলো আমাদের পথ নির্দেশক
যেমন পাহাড় চূড়ায় জ্বলন্ত আগুন শিখা।
দৃঢ়, নিখুঁত মুখ তার আর ধার্মিক সে।
ভয়ের ঊষা মুখে সে যুদ্ধের উদ্দীপনা দিতো।’
সেসময়ে আরবে নারী কবিরা কেবল এলিজি লিখতেন এবং বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে এসব কবিতা আবৃত্তি প্রতিযোগিতার প্রচলন ছিল। আল খানসা সাধারণত এরকম প্রতিযোগিতাগুলোতে জয়ী হতেন এবং সেজন্য অন্যতম নারী কবি হিসেবে সম্মানিত হয়েছিলেন।
‘হে আমার চক্ষুদ্বয়, কাঁদো অকাতরে, উদারভাবে,
তুমি কি কাঁদবে না উদার শাকরের জন্য?
তুমি কি কাঁদবে না সেইসব সাহসী বীরদের জন্য,
লম্বা আর চটপটে যুবক যারা অধিকার করেছিল
নেতৃত্বের যোগ্যতা আর তার মানুষদের চালানোর যোগ্যতা?’
৩
তিনি ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে নিজের গোত্রের প্রতিনিধি হিসেবে মদিনায় গিয়ে হজরত মুহম্মদ (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁকে কবিতা পাঠ করে শোনান। তিনি স্বপরিবারে যখন ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেন তখন তাঁর বয়স ছিল আনুমানিক ৫৫ বছর। সমকালের একজন বিখ্যাত আরব কবি আল-নাবিগাহ আল দুবিয়ানি একবার আল খানসা’কে বলেছিলেন, ‘আপনি জিন ও মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম কবি’। আরেকটা উপাখ্যান এরকম, Al-Nabigha told Al-Khansāʾ, ‘If Abu Basir had not already recited to me, I would have said that you are the greatest poet of the Arabs. Go, for you are the greatest poet among those with breasts’. She responded by saying, ‘I’m the greatest poet among those with testicles, too’. [ref: Arab Women Writers: A Critical Reference Guide, 1873-1999 by Radwa Ashour, Hasna Reda-Mekdashi]. তিনি এতটাই ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ছিলেন যে বেশি বয়সের অজুহাতে দুরায়েদ ইবন আল-সিম্মাহ আল জুশামি নামে একজন বিখ্যাত গোত্রপতি’র বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিতে দ্বিধা করেননি। তবে আল খানসা দু’বার বিয়ে করেছিলেন এবং তাঁর ছয় সন্তানের মধ্যে চার পুত্র ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে আল-কাদিসিয়ার যুদ্ধে শহীদ হন। তাঁর কাছে সন্তানদের শহীদ হওয়ায় খবর পৌঁছালে তিনি শোক না করে বরং বলেন, ‘Praise be to God who honored me with their martyrdom. And I have hope from my Lord that he will reunite me with them in the abode of his mercy.’ তাঁর সন্তানরাও কবি ছিলেন বলে জানা যায়। যুদ্ধে শহীদ চার সন্তান ইয়াজিদ, মুয়াবিয়া, আমর এবং আমরাহ-এর জন্য তিনি ‘আমার পুত্রেরা’ নামে এলিজি লিখেছেন,
‘আমার পুত্রেরা আমি তোমাদের ধারণ করেছি যন্ত্রণায়
আর বড় করেছি যত্নে
তোমরা আজ ইসলামের জন্যে প্রাণ দিয়েছো
কে বলে তোমরা মৃত
তোমরা আরো বেশি জীবিত
আর বেঁচে আছো সম্মানের সাথে
আমি গর্বিতবোধ করি শহীদের জননী হতে পেরে।’
কবি আল-খানসা ৬৪৪ খ্রিস্টাব্দে প্রায় ৭০ বছর বয়সে নাজদ-এ মৃত্যুবরণ করেন বলে জানা যায়। আব্বাসীয় খেলাফতের প্রথম দিকে ইবন আল সিক্কিত তার এলিজিগুলো সংগ্রহ করেন। ১৯৭৩ সালে আর্থার ওয়ার্মহাউট আল-খানসা’র কবিতা সংকলনের ইংরেজি অনুবাদ ‘The Diwan’ প্রকাশ করেন।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
৪ নভেম্বর ২০২৪