
১
ভয় নেই
আমি এমন ব্যবস্থা করবো যাতে সেনাবাহিনী
গোলাপের গুচ্ছ কাঁধে নিয়ে
মার্চপাস্ট ক’রে চ’লে যাবে
এবং স্যাল্যুট করবে
কেবল তোমাকে প্রিয়তমা।
………………………………………
ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো
স্টেটব্যাংকে গিয়ে
গোলাপ কিম্বা চন্দ্রমল্লিকা ভাঙালে অন্তত চার লক্ষ টাকা পাওয়া যাবে
একটি বেলফুল দিলে চারটি কার্ডিগান।
ভয় নেই, ভয় নেই
ভয় নেই,
আমি এমন ব্যবস্থা করবো
নৌ, বিমান আর পদাতিক বাহিনী
কেবল তোমাকেই চতুর্দিক থেকে ঘিরে-ঘিরে
নিশিদিন অভিবাদন করবে, প্রিয়তমা।
বাংলা একাডেমীর সাহিত্যপত্র ‘উত্তরাধিকার’-এ ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’ নামে এই কবিতাটা প্রথম ছাপা হয়, লিখেছেন কবি শহীদ কাদরী। বাংলা ভাষায় বহুল পঠিত এবং আবৃত্তিশিল্পীদের বহুল উচ্চারিত একটি কবিতা। দেশের প্রায় সব আবৃত্তিশিল্পীদের কণ্ঠে কমবেশি উচ্চারিত হয়েছে কবিতাটা।
২
১৯৭০ সালে তাদের প্রেম এবং ১৯৭১ সালে যুদ্ধের ডামাডোলের মাঝেই কাজী অফিসে তাদের বিয়ে হয়। কবিপত্নীর ভাষায়, ‘মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগের বছরে কাদরীর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। তখন আমি সিদ্ধেশ্বরী কলেজে পড়াই। ঢাকার সাহিত্য–সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আমার উপস্থিতি ছিল নিয়মিত। অনুষ্ঠান–আড্ডা হলেই যোগ দিতাম। এ সময় কাদরী ঢাকার বিউটি বোর্ডিংয়ে কবিদের আড্ডাসহ নানা আড্ডা–অনুষ্ঠানের পরিচিত মুখ। এক অনুষ্ঠানে কথা বলতে গিয়ে কাদরী সুধীন্দ্রনাথ দত্তের একটা কবিতার লাইন মনে করতে পারছিল না। আমি সে লাইনটি বলে দিতেই আমার প্রতি তার নজর পড়ে। আমরা পরিচিত হই। তারপর একসঙ্গে পথচলা শুরু। এখনকার মতো মোবাইল যুগের কথা সে সময় ভাবা যেতো না। ফিক্সড ফোনে কথা বলার ক্ষেত্রেও ছিল নানা বাধা। দেখা করাই ছিল একমাত্র উপায়। কাদরী আমার সঙ্গে নিয়মিত দেখা করতে চাইতো এবং আমরা দেখা করতাম। ঢাকার নানা আড্ডা–আলোচনায় যোগ দিতাম। এটা হবে হয়তো ১৯৭০ সালের নবেম্বর–ডিসেম্বরের কথা।’
দেখতে দেখতে চলে এল একাত্তর, মার্চের উত্তাল দিনগুলোতে শহীদ কাদরীর ভালোবাসার কমতি ছিল না।
শহরে কারফিউ, তার মাঝেই জীবনবাজি রেখে কবি এসেছেন পুরানা পল্টনে, প্রেমিকার বাসায়, বিয়ে করবেন। ‘তুমি আবার কোথায় চলে যাবে, এটাই আমার উৎকণ্ঠা। এত উৎকণ্ঠা নিয়ে বাঁচতে পারব না’, কবি বললেন। ঢাকায় তখন অপারেশন সার্চ লাইট চলছে, চারদিকে পাক হানাদার বাহিনী বাঙালি নিধন করছে। এরকম অবস্থায় প্রেমিকার বাবা মেয়ের বিয়েতে রাজী না, কিন্তু প্রেমিক নাছোড় বান্দা। নাজমুন নেসা পিয়ারি বলেন, ‘১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঢাকায় হামলা করে গণহত্যা শুরু করলে মানুষ ঢাকা ছাড়তে থাকে। আমার বাবা শিক্ষাবিদ এম এ করিম আমাদের তিন বোনকে ৪৩/১ পুরানা পল্টনের বাড়ি থেকে বুড়িগঙ্গার পারে জিনজিরায় আত্মীয়ের বাসায় পাঠিয়ে দেন। মাস তিনেক পরে পরিস্থিতি একটু শান্ত হলে আমরা ঢাকার বাসায় ফিরে আসি। এ সময় কাদরী বিয়ের ব্যাপারটি ওঠায়। বিষয়টি জরুরি হয়ে পড়ে এ কারণে যে, যাতে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কোথাও গেলে একসঙ্গে যাওয়া যায়। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিয়ের সামাজিকতার বিষয়টি অনেকটা অকল্পনীয় থাকায় আমরা কোর্টে গিয়ে বিয়ে করে ফেলি। এ সময় আমি আর কাদরী তার ভাইয়ের বাসায় কিছুদিন থাকি। পরে সিদ্ধেশ্বরীতে একটা বাসা ভাড়া নিয়ে সংসার শুরু করি। কাদরী তখন রাশিয়ার একটা নিউজ এজেন্সিতে কাজ করতো। এজেন্সির অফিসটি ছিল ধানমন্ডি। আমার কর্মস্থল সিদ্ধেশ্বরী কলেজ হওয়ায় বাসা থেকে হেঁটেই কলেজে যেতাম।’
কবি শহীদ কাদরী তার প্রেমিকা নাজমুন নেসা পিয়ারি’কে এই অমর কবিতাটা উৎসর্গ করেছিলেন। কবি তার প্রেমিকা পিয়ারি’র প্রেমে পড়েই লিখেছেন, তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা। এ প্রসঙ্গে পিয়ারি বলেন, ‘আমি ধানমন্ডি ২ নম্বর রোডে আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ-এ ফরাসি ভাষা শিখতে যেতাম। সেখানে সহপাঠী হুদা, সিরাজ অন্যরা মিলে এক সাথে, তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা বলে আমাকে ক্ষেপিয়ে তুলত। এই নিয়ে চলত তুমুল আড্ডা। ছেলেদের সঙ্গে আমি সহজ ভাবে মিশতে পারতাম। নারী-পুরুষে পার্থক্যে বিশ্বাসী ছিলাম না। বাবার ইচ্ছে সায়েন্স বিষয় নিয়ে পড়ার। আমার অন্য কোন বিষয়ে পড়ার ইচ্ছে ছিল। বিয়ের কথা তখন কোন চিন্তার ভেতরেই ছিল না।’
নাজমুন নেসা পিয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ রসায়ন থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি শিক্ষাজীবন শেষ করে সিদ্ধেশ্বরী কলেজে শিক্ষিকা হিসেবে যোগদান করেন। পরে ইডেন মহিলা কলেজেও কিছুদিন শিক্ষকতা করেন। তিনি ১৯৭৬ সালে জার্মান ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলের বাংলা বিভাগে সাংবাদিক হিসেবে যোগদান করেন। তিন বছর বাংলা বিভাগে কাজ করার পর জার্মান ও ইংরেজি বিভাগেও কাজ করেন। ১৯৯০ সালে তিনি প্রথম বিদেশী হিসেবে ডয়েচে ভেলের মার্কেটিং এবং গণসংযোগ বিভাগের সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেন। ২০০৫ সালে তার এলফ্রিডে জেলিনেকের ‘পিয়ানো টিচার’ এর অনুবাদ প্রকাশিত হয়। ২০১৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত তিনি চারটি গ্রন্থ অনুবাদ করেছেন। ভাষা ও সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে ২০২০ সালে একুশে পদক প্রদান করে।
৩
কবি শহীদ কাদরী ১৯৪২ সালের ১৪ আগস্ট ভারতের কলকাতার পার্ক সার্কাসে জন্মগ্রহন করেন। দশ বছর বয়সে ১৯৫২ সালে তিনি ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৮০ সালের দিকে তিনি প্রবাসজীবন কাটাতে শুরু করেন। চলে যান জার্মানিতে। সেখানে বেশ কয়েক বছর ছিলেন। তারপর যুক্তরাজ্যের লন্ডনে এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাস জীবন কাটান। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক বছরসহ জীবনের প্রায় তিন দশক তিনি প্রবাসে বসবাস করেন। প্রবাস জীবনেও তিনি লেখালেখিতে সক্রিয় ছিলেন। লেখালেখির জীবনে দীর্ঘ ছয় দশক বাংলা কবিতায় নিজস্ব এক ঘরানা সৃষ্টির মধ্যদিয়ে এই কবি অসাধারণ কৃতিত্ব রাখেন। চৌদ্দ বছর বয়সে কবি বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত একটি সংকলনে তার লেখা প্রথম কবিতা ছাপা হয়। কবি শহীদ কাদরীর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘উত্তরাধিকার’ প্রকাশ পায় ১৯৬৭ সালে। প্রথম গ্রন্থ প্রকাশ করেই তিনি পুরো সাহিত্যাঙ্গনে ঝাঁকুনি দিয়ে বসেন। গ্রন্থটি প্রকাশের মধ্য দিয়েই শহীদ কাদরী আধুনিক কবিতায় নিজস্ব অবস্থান সৃষ্টি করেন।
দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তমা’ দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে প্রকাশ পায় ‘প্রেম বিরহ ভালবাসার কবিতা’, ‘কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই’ এবং প্রবাসে লেখা কবিতা নিয়ে প্রকাশ পায় ‘আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দিও’। পৃথিবী বিখ্যাত অনেক কবি- সাহিত্যিক আছেন, যাদের গ্রন্থসংখ্যা খুবই অল্প। কবি শহীদ কাদরীও তেমনি একজন। কাব্যসাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য শহীদ কাদরী ১৯৭৩ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। ২০১১ সালে তাকে রাষ্ট্রীয় অন্যতম সর্বোচ্চ সম্মাননা একুশে পদক প্রদান করা হয়।
কবি শহীদ কাদরী ২০১৬ সালের ২৮ আগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে একটি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কবির মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং তার নিজ উদ্যোগে কবির মরদেহ দেশে আনা হয়। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জাতির পক্ষ থেকে শেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের পর কবিকে ঢাকায় দাফন করা হয়।
৪
‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’ শিরোনামে কবিতার বইটা প্রথম মার্চ ১৯৭৪ সালে বের হয়। এর অনেক পরে অক্টোবর ২০১৬ সালে অবসর প্রকাশনা সংস্থার উদ্যোগে কাব্যগ্রন্থটা আবারো প্রকাশিত হয়। অবসরের দ্বিতীয় মুদ্রণের এক কপি আমার সংগ্রহে আছে। এটি উৎসর্গ করা হয়েছে ‘জননী জন্মভূমি’ কে, প্রচ্ছদ করেছেন সব্যসাচী হাজরা। তবে ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’ প্রথমবার যখন প্রকাশিত হয় তখন বইএর প্রচ্ছদ করেছিলেন কাইয়ুম চৌধুরী। প্রথমে প্রকাশিত বইএর উৎসর্গে কবি লিখেছিলেন,
পিয়ারীকে
‘গানগুলো যেন পোষা হরিণের পাল
তোমার চরণ চিহ্নের অভিসারী’
শিল্পীরা সব পারে, যে চলে যেতে চায় তাকেও রেখে দিতে পারে। ছবিতে, কল্পনায়, লেখায়, গানে, কবিতায় সবকিছুতেই রেখে দিতে পারে, শুধু তাদের জীবনে ছাড়া!
৫
আগামীকাল ১৪ আগস্ট, কবি’র ৮০তম জন্মবার্ষিকী। তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
২৯ জানুয়ারি ২০২৬
হদিসঃ
১। রুম নাম্বার ১৪৬- শওকত আহসান ফারুক
২। তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তমা- শহীদ কাদরী
৩। ইন্টারনেট
ছবি- ইন্টারনেট