
১
রংপুর অঞ্চলে মরিচকে বলে ‘আকালী’। এই আকালী নিয়েই একটা ভাওয়াইয়া গান আছে। রংপুরের জনপ্রিয় শিল্পী শরিফা রানীর কণ্ঠে এই গানটা একসময় প্রায়ই রেডিওতে বাজতো। গানটি হলো,
কানিচাত গারিনু আকাশি আকালী
আকালী ঝুম ঝুম করে ।
আরো ফেলানু চহুরী বতুয়া
বতুয়া হলফল করে রে বন্দুয়া
বাতাসে ঢুলিয়া পড়ে ।
আকালী ছিড়িম মুই পাকা পাকা
বতুয়া তুলিয়া আন্দিম প্যালকা
উয়াতে দিম আরো শলুক নাপা
খাইবেন গন্দে গন্দেরে বতুয়া
শাইলা ধানের ভাতে ।।
আবার পূর্ব বঙ্গ গীতিকায় আছে,
চিকন গোয়ালিনী কয় “শুন কথার নাল” ।
মরিচ যতই পাকে তত হয় ঝাল ।।
সময়ে বয়স যায় নাহি যায় রস ।
মুখের কথায় মোর ত্রিজগত বশ ।।
ফান্দ পাতিয়া চানধরি জমীনে থাকিয়া ।
আমার গুণের কথা জানে যত ভুঞা ।।
— কমলা/ দ্বিজ ঈশান/ পূর্ব বঙ্গ গীতিকা
২
মরিচ নিয়ে এই এতো যে গান-কবিতা সেই মরিচের আমাদের দেশে আগমন ১৫০০ সালের দিকে পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো-দা-গামার হাত ধরে, তবে সম্রাট শাহজাহানের আমলে ভারতের চর্তুদিকে মরিচের প্রচলন ছড়িয়ে পড়ে। এর আগ পর্যন্ত রান্নায় ঝালের পরিপূরক হিসেবে ব্যবহৃত হত গোলমরিচ, পিপলু আর আদা। মরিচের আদি নিবাস দক্ষিণ আমেরিকার বলিভিয়ায়, সেখানে মরিচ ‘উলুপিকা’ নামে পরিচিত। প্রায় ৭৫০০ বছর আগে থেকেই আমেরিকার আদিবাসীরা মরিচ ব্যবহার করে আসছে বলে জানা যায়। ইকুয়েডর এর দক্ষিণ পশ্চিমাংশে পুরাতাত্ত্বিকেরা ৬০০০ বছর আগে মরিচ চাষের প্রমাণ পেয়েছেন। সে দেশের আদিবাসীরা মরিচ খেয়ে আসছে আনুমানিক চার হাজার বছর ধরে। মরিচ নিয়ে ফরিদপুর অঞ্চলের একটি গীত,
নতুন কাচা কাইটাছি
গুয়া নারকেল লাগাইছি
আমও তো বোলাইছে
গুয়াও তো চুমরাইছে
কাঁঠালে ফেলিয়া গেল
মোচা লো বিবি ।
ঐ না কাঁঠাল কাটিতে
ঐ না পাশা খেলিতে
লাইগ্যা গেল ঠাণ্ডা পানির
প্যায়স লো বিবি ।
লাইগ্যা গেল শীতল পানির
প্যায়স লো বিবি ।
ঐ খানে না দাঁড়াইয়া
শোন দুলাল আমার মাদনের
কথারে দুলাল ।
তোমার মাদনের কথা
যেমন বাউল মরিচের
ঝাল ও বিবি ।
— মেয়েলী গীত/ ফরিদপুর
সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে আছে,
মরিচ বাঁটি বাত্ রান্দি
হারাদিন এই সংসারে
হইর্যা মারি কাম ।
কেব্ব্যা হইরা রাইত পোয়ায়
কত দুক্কু মনে রয়
হগনা আপনে জানেন না ।
আমার হাতে হুদাই আপনে
অ্যাত বেশি ইয়ারকি হইবেন না ।
— মেয়েলী গীত/ সিরাজগঞ্জ
আরো আছে,
ছোটো বোউলো
মোরিজ বাঁট
আইজ্কা না-সে খাসের আট
বাড়ির মানুষ কইয়া গ্যাছে
আনবো রুই মাছ
ওনালো
ছোটো বোউ-লো তুই পাটায়
মোরিজ বাঁট ।।
— মেয়েলী গীত
৩
ইউরোপীয়দের মধ্যে ক্রিস্টোফার কলম্বাসই প্রথম ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে মরিচের দেখা পান। কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের পর থেকে মরিচ সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। দিয়েগো আলভারেজ চানকা নামের একজন চিকিৎসক কলম্বাসের দ্বিতীয় অভিযানের সময়ে পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ থেকে স্পেনে মরিচ নিয়ে আসেন এবং পরবর্তীতে ভাস্কো-দা-গামার বদৌলতে তা চলে আসে প্রাচীন জম্বুদ্বীপ বা ভারতে। ভাস্কো-দা-গামা মরিচ ছাড়াও সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন কামরাঙ্গা, আনারস, টমেটো ইত্যাদি ফল। এ দেশের আভ্যন্তরীণ বাণিজ্যেও মরিচ জায়গা করে নেয়, যেমন ঢাকা অঞ্চলের মেয়েলী গীতে আছে,
ষোল নাসি তুল গো সুন্দন নাসি লিলা
লিলা তোমার গায়ে গো
রদাত্র গো লাগে
তোমার গায়ে গো ছিদ্রি লাগে ।
কেমুন শালায় করছে বিয়া তরে লিলা
হুকুম যদি দিতা গো লিলা
নাকখান বইয়্যাতাম আমি
আমার সাদু গেছেরে কুমার
সেই লংকার ব্যাপারি
সেই লংকার বাণিজ্যে ।
সেইখান থাইক্যা আন কুমার
পেটনা ভরে বেমর
সেইন্যা বেমর পিদারে কুমার
ঘুরিয়া তামাশা চাইবাম আমি
কুমার ঐ রে বসিয়া তামাশা
চাইবাম আমি ।
— মেয়েলী গীত/ ঢাকা
কিংবা পূর্ব বঙ্গ গীতিকায় যেমন পাওয়া যায়,
দৈবের নির্বন্ধ কথা শুন মন দিয়া ।
পূবাল্যা ব্যাপারী যায় সাত ডিঙ্গা বায়্যা ।।
এক ডিঙ্গায় ধান চাউল আর ডিঙ্গায় দর ।
মরিচ লবন আদা লইয়াছে বিস্তর ।।
— মইষাল বন্ধু/ পূর্ব্ববঙ্গ গীতিকা
মধ্যযুগে মুকুন্দরামও তার বিখ্যাত চণ্ডীমঙ্গল কাব্যগ্রন্থে লিখেছেন,
আপনার মত পাই তবে গ্রাসে কত খাই
পোড়া মাছে জমিরের রস ।।
নিধানী করিয়া খই তথি মহিষের দই
কুল করঞ্জা প্রাণসম বাসি ।।
যদি পাই মিঠা ঘোল পাকা চালিতার ঝোল
প্রাণ পাই পাইলে আমসী ।।
কিছু ভাই রাই-খাড়া চিঙ্গুড়ির তোল বড়া
সজারু করহ শিকপোড়া ।।
পোড়া মৎসে লেম্বুরস কই মৎসে রান্ধ ঝশ
দিবে তথি মরিচের ঝাল ।
৪
লেখা শুরু করেছিলাম রংপুরের বিখ্যাত ভাওয়াইয়া শিল্পী শরীফা রাণী এবং তার ভাওয়াইয়া গান ‘কানিচাত গারিনু আকাশি আকালী, আকালী ঝুম ঝুম করে’ দিয়ে। ভাওয়াইয়া গানের রানী হিসেবে খ্যাত রংপুরের এই জনপ্রিয় শিল্পী আজ বৃহস্পতিবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৩ সকাল ১০টা ৫ মিনিটে ঢাকায় শ্যামলী রিং রোডের সেন্ট্রাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত এই গানের সুর মাথায় এলেই মনেপড়ে শরীফা রাণী’র কথা। এই আর্টিকেল তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে নিবেদিত।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
৩০ জানুয়ারি ২০২৬
হদিসঃ
১। কবি মুকুন্দরাম – ক্ষেত্র গুপ্ত
২। ভাওয়াইয়া - সিধুভাই কল্যাণ ট্রাস্ট
৩। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি- গোলাম মুরশিদ
৪। ইন্টারনেট