
১
গত ১৩ আগষ্ট ২০২৪ তারিখে কোটা সংস্কারের দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচি চলাকালে ১৬ জুলাই ঢাকা কলেজের সামনে সংঘর্ষে দুজন নিহত হন। তাদের মধ্যে একজন ছাত্র এবং অন্যজন একজন হকার। এ ঘটনায় নিউমার্কেট থানায় দুটি হত্যা মামলা হয়। এই হত্যার ঘটনায় ইন্ধনদাতা হিসেবে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আমার প্রশ্ন হলো কারা কিভাবে এসব মামলা সাজাচ্ছেন। কারণ এই প্রসঙ্গটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পর অপরাধের তদন্ত কাজের জন্য মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স এর পাশাপাশি র্যাবের ইন্টেলিজেন্স উইং-এর নেতৃত্বে টিএফআই গঠিত হয়। টিএফআই-এ বিভিন্ন বাহিনী/সংস্থার সদস্য প্রতিনিধি হিসেবে থাকতেন। র্যাবের গোয়েন্দা শাখায় চাকরির সুবাদে আমি নিজেও টিএফআই-এর সাথে সংযুক্ত ছিলাম। সেখানকার অভিজ্ঞতার আলোকেই বর্তমান আন্দোলনে হত্যাকাণ্ড সমূহের মামলার প্রস্তুতিপর্ব নিয়ে আমার অবজারভেশন জানাবো। পিলখানাতে আমরা অপরাধের তদন্ত, আসামীদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং মামলার কাগজপত্র তৈরি করতাম। সেখানে বিদ্রোহের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ড, লুটতরাজ, ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ বিভিন্ন রকমের ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল। আমাদের টাস্ক ফোর্সের অনেকগুলো সাব-গ্রুপ ছিল, প্রতিটা সাব-গ্রুপেই গোয়েন্দা সংস্থা, সশস্ত্র বাহিনী এবং পুলিশের প্রতিনিধি থাকতেন। র্যাব গোয়েন্দা ইউনিট থেকে আমরা সার্বিক বিষয়াদি সমন্বয় করতাম। এছাড়াও তৎকালীন এসপি আব্দুল কাহার আকন্দ আমাদেরকে তদন্তকার্যে নানারকম পরামর্শ দিতেন। তিনি আসামীদের বিচারিক আদালতে তোলা, তদন্ত এবং অভিযোগ গঠন পরবর্তী কাজগুলো দেখভাল করতেন। আমার মতে কোটা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচি পালনকালে হত্যাকাণ্ডসহ রাজপথে কিংবা রাজপথের বাইরে যেসব অপরাধ সংঘটিত হয়েছে সেসবের জন্য পিলখানা হত্যাকাণ্ডের তদন্ত এবং অভিযোগ গঠন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা যেতে পারে। এভাবেই সঠিক অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে অভিযুক্তদের সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত করা সম্ভব।
২
একটা মামলা কতোটা শক্ত হবে বা অভিযুক্তের শাস্তি কতোটা কঠোর হবে তার মান নির্ভর করে আইও হিসেবে যাকে নিয়োগ করা হয়েছে তার কর্মদক্ষতার উপরে। র্যাবে যেটা দেখেছি, সরাসরি এসআই হিসেবে যারা নিয়োগ পান তাদের চেয়ে প্রমোশন পেয়ে যারা এসআই বা ইন্সপেক্টর পদে উন্নীত হন তারা এজাহার লেখা বা তদন্ত কাজে বেশি পারদর্শী হয়ে থাকেন। এটা আমার ব্যক্তিগত অবজারভেশন, বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন হলেও হতে পারে। একজন তদন্ত কর্মকর্তা কতোটা বুদ্ধিদীপ্ত এবং চৌকশ তার ওপরে মামলার ভাগ্য অনেকটা নির্ভর করে। একজন বিচারকের অনেকসময়ে কিছুই করার থাকেনা। তিনি ফ্যাক্টস এন্ড ফিগারের ওপরে তার জাজমেন্ট দিয়ে থাকেন, কেননা তার কাছে মামলার বাদী এবং অভিযুক্ত উভয়ই সমান।
শুরুতেই আসে মামলার বাদীর প্রসঙ্গ, একজন বাদীকে গভীরভাবে বুঝতে হবে তিনি কি অভিযোগ আনতে যাচ্ছেন। তারপর আইও’র সহযোগিতায় বা তিনি তার নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা অনুযায়ী পুরো ঘটনাটা সুন্দরভাবে এজাহারে লিপিবদ্ধ করবেন। সেখানে ঘটনার দিনক্ষণ, প্লেস অভ অকারেন্স, কোন সাক্ষি থাকলে তাদের নাম ঠিকানা বয়স, মামলার কাজে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হতে পারে এমন কিছু নিদর্শন বা এভিডেন্স ইত্যাদি উল্লেখ থাকতে হবে। তদন্ত কর্মকর্তা এজাহারে উল্লেখিত সাক্ষিদের জেরা করে ঘটনার বিস্তারিত জেনে নিবেন এবং তিনি নিশ্চিত হবেন যে ময়নাতদন্তের রিপোর্টের সাথে এজাহারে উল্লেখিত ঘটনার মিল আছে। প্লেস অভ অকারেন্সের নকশা এবং অন্যান্য এভিডেন্সসহ পুরো মামলাটা সাজানোর পর তিনি আদালতের মাধ্যমে অভিযুক্তকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেন। রিমান্ড মঞ্জুর না হলে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেন। অভিযুক্ত যখন দেখবেন যে তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ এমনভাবে গঠন করা হয়েছে যে তার অস্বীকার করার উপায় নেই বা অস্বীকার করে কোন লাভ হবে না। এমতাবস্থায় অভিযুক্ত অপরাধ স্বীকার করে স্বেচ্ছায় ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি দিয়ে থাকেন। কিন্তু অভিযুক্তকে যদি জোরপুর্বক বা নির্যাতন বা ভয়ভীতি দেখিয়ে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি নেয়ার চেষ্টা করা হয় তাহলে তিনি ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে গিয়ে অস্বীকার করতে পারেন, এমনকি আইও’র বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে পারেন। সেক্ষেত্রে মামলার মান দুর্বল হয়ে যায়। এজন্য একটা মামলার ফলাফল কতোটা যৌক্তিক হবে তা নির্ভর করে মামলার আইও এবং তার সুপারভাইজারের পেশাগত দক্ষতার ওপরে।
৩
সালমান এফ রহমান এবং আনিসুল হক ঢাকা কলেজের সামনে দু’জন ব্যক্তিকে হত্যায় ইন্ধন যুগিয়েছেন এটা আইও কিভাবে প্রমাণ করবেন? তার কাছে কি কোন কল রেকর্ড আছে? তারা কি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন? তাদের পদমর্যাদা অনুযায়ী তাদের তো প্লেস অভ অকারেন্সে থাকার সুযোগ নেই। আবার প্রতিটা হত্যাকাণ্ডের এজাহারে অজ্ঞাতনামা আসামীর কথা উল্লেখ করা হচ্ছে, কেন? সালমান এফ রহমান দেশের অর্থনীতি যেভাবে লুটপাট ও মুদ্রা পাচার করে দেশের বারোটা বাজিয়েছেন তার সাক্ষ্য প্রমাণ তো চাইলেই বের করা সম্ভব এবং তা দিয়ে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব। আনিসুল হক দেশের বিচার ব্যবস্থাকে যেভাবে তছনছ করেছেন, এর পাশাপাশি টিভিতে বক্তব্যের সূত্র ধরে তাকে ইন্ধনদাতা বা হুকুমের আসামী করা হয়তো সম্ভব। এছাড়া তার আরও অনেক অপরাধ রয়েছে।
জাতিসংঘের হিসেব অনুযায়ী ৩২জন শিশুসহ গত ১৬ জুলাই ২০২৪ থেকে ৬ আগস্ট ২০২৪ তারিখ পর্যন্ত মোট ৬৫০ জন নিহত হয়েছেন। আমরা জানি এই সংখ্যাটা পুর্ণাঙ্গ না, এরপর আরও অনেকে মারা গেছেন, এমনকি আজকেও একজন আন্দোলনকারী চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।
আমার মতে এত বিপুল সংখ্যক ব্যক্তির হত্যাকাণ্ডের তদন্ত কার্যক্রম পুলিশ আগের নিয়মেই করছে। এরফলে অভিযুক্তদের অনেকেরই মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্য অপরাধের দায় থেকে মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এজন্য পিলখানা হত্যাকাণ্ডের তদন্ত কার্যক্রমের মত টাস্কফোর্স গঠন করে বা বিভিন্ন সাব-গ্রুপ তৈরি করে মামলার তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে। এই কাজে প্রয়োজনবোধে কোটা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের কর্মীদের, আইনপেশা থেকে প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। তাদের কাজ হবে মামলার জন্য প্রয়োজনীয় এভিডেন্স সংগ্রহ করে আইও-কে সহযোগিতা করা এবং তদন্ত কাজে যেন কোন ধরণের বিচ্যুতি না হয় তা নিশ্চিত করা। লে. জেনারেল জাহাঙ্গীর (অবঃ) স্যার আজকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। স্যার নিজেও সেনাবাহিনী থেকে পিলখানার তদন্ত কার্যক্রমের সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি সেসময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জেরা করতে চেয়েছিলেন, তবে তাকে সে সুযোগ দেয়া হয়নি বলেই জানি। তার তদন্ত রিপোর্ট কখনো আলোর মুখ দেখেনি শুনেছি।
৪
পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত (অবঃ) স্যারের কাছে ইউনিফর্ম এবং লোগো পরিবর্তনের দাবী জানিয়েছিলেন বলে পত্রিকা মারফত জেনেছি। তাদের ইউনিফর্মের লোগো পরিবর্তন করলেও ইউনিফর্ম এখনই পরিবর্তন করা ঠিক হবে না। প্রথমত অর্থনীতির এই অবস্থায় এটা অপ্রয়োজনীয় খরচ। দ্বিতীয়ত তারা বা বাহিনীর বেশকিছু সদস্য যে অপরাধ করেছেন সেই অপরাধের গ্লানিবোধ কাঁধে নিয়েই তাদের তদন্ত কাজ শেষ করে অপরাধীদের সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত করতে হবে। তারা এই কাজটা যদি সঠিক ভাবে করতে পারেন তবেই পুরস্কার স্বরূপ তাদেরকে উন্নত বিশ্বের ন্যায় আধুনিক ইউনিফর্ম দেয়া যেতে পারে। তার আগে নয়। একজন ইনকাম ট্যাক্স পেয়ার হিসেবে এটাই আমার দাবী।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১৬ আগস্ট ২০২৪