
১
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে বীরত্বপুর্ন অবদানের জন্য ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭৩ তারিখে বাংলাদেশ সরকার মেজর জিয়াকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বীরত্বের পুরষ্কার ‘বীর উত্তম’ প্রদান করে। এই তথ্যটা সবারই জানা কিন্তু যেটা অনেকেই জানেন না সেটা হলো, মেজর জিয়া ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে খেমকরণ ব্যাটল ফিল্ডে বীরত্বপুর্ন অবদানের জন্য পাকিস্তানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বীরত্বের পুরষ্কার ‘হিলাল-ই-জুরাত’ অর্জন করেছিলেন। তিনি সম্ভবত একমাত্র ব্যক্তি যিনি দুটি দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বীরত্বের পুরষ্কার অর্জন করেছেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে তার অবদান নিয়ে আগেও লিখেছি এবং ভবিষ্যতেও লিখবো, তবে আজ লিখবো ‘দ্য ব্যাটল অভ খেমকরণ’ নিয়ে, যেখানে তিনি ‘হিলাল-ই-জুরাত’ পদক পেয়েছিলেন।
‘দ্য ব্যাটল অভ কুর্স্ক’ পৃথিবীর সামরিক ইতিহাসের বৃহত্তম ট্যাঙ্ক যুদ্ধ, যেখানে প্রায় ৬ হাজার ট্যাঙ্ক, ২০ লক্ষ সৈন্য এবং ৪ হাজার বিমান অংশগ্রহণ করেছিল। এই যুদ্ধের মাধ্যমে পূর্ব ফ্রন্টে জার্মান আক্রমণাত্মক ক্ষমতার চূড়ান্ত সমাপ্তি ঘটে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এরকম আরেকটা বিখ্যাত ট্যাঙ্ক রণক্ষেত্র হলো ‘দ্য ব্যাটল অভ আসাল উত্তর’, এটি ‘দ্য ব্যাটল অভ কাসুর’ নামেও পরিচিত। ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী পাঞ্জাবের তারন তারান জেলার ছোট সীমান্ত শহর খেমকরণের ‘ডাকবাংলো’তে পাকিস্তানকে হুমকি দিয়ে বলেছিলেন যে তারা তাদের পছন্দের একটা যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি করবেন। খেমকরণে যুদ্ধক্ষেত্র খোলার পরে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ভারতের অভ্যন্তরের সেই ‘ডাকবাংলো’ জয় করে এবং পাকিস্তানের পতাকা উড়িয়ে দেয়, তবে এজন্য তাদেরকে প্রচুর মূল্য দিতে হয়েছিল। এই যুদ্ধে ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল। একটি বড় ট্যাঙ্ক যুদ্ধের স্থান ছিল বলে খেমকরণ ট্যাঙ্কের কবরস্থান নামে পরিচিত এবং এই যুদ্ধের ফলে খেমকরণে প্যাটন নগর (বা প্যাটন শহর) সৃষ্টি হয়, কেননা ভারতীয় সেনাবাহিনী পাকিস্তানের যে ৯৭টি ট্যাঙ্ক ধ্বংস করে, তারমধ্যে ৭২টি প্যাটন ট্যাঙ্ক ছিল।
১৯৬৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কাসুর-খেমকরণ অক্ষে সংঘটিত এই রণক্ষেত্র ছোটবড় বেশ কয়েকটি যুদ্ধ এবং সংঘর্ষের সমষ্টি। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাসুর-এ পরিচালিত আক্রমণ, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর খেমকরণ দখল, আসাল উত্তরের যুদ্ধ, ভারতীয় সেনাবাহিনীর খেমকরণ পুনর্দখল প্রচেষ্টা ইত্যাদি।
২
কাসুরের উপর আক্রমণ দিয়ে এই যুদ্ধের সূচনা ঘটে। ভারতীয় সেনাবাহিনী’র জিওসি ৪র্থ মাউন্টেন ডিভিশন (৭ম এবং ৬২তম মাউন্টেন ব্রিগেড) কাসুর দখল করে লাহোরের দিকে অগ্রসর হওয়ার প্ল্যান করেছিলেন। কিন্তু তাদের এই আক্রমণ প্রতিহত করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী যুদ্ধকে ভারতীয় ভূখণ্ডের ভিতরে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়। ৭ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫ তারিখে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৬ ল্যান্সার্স-এর একটা স্কোয়াড্রন ভারতীয় সেনাবাহিনীর তীব্র প্রতিরোধের মধ্যেও ভালতোহা দখল করে কিন্তু পদাতিক বাহিনীর সাপোর্টের অভাবে রাতে তাদের বেস ক্যাম্প খেমকরণে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। এখানে যে ট্যাঙ্ক যুদ্ধ হয় তাতে ৯টা ভারতীয় ট্যাঙ্ক ধ্বংস হয়। ৮ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫ তারিখে মেজর জেনারেল নাসির খানের নেতৃত্বে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১ম আর্মার্ড ডিভিশন এবং ১১ পদাতিক ডিভিশন আক্রমণ চালিয়ে পাঞ্জাবের অমৃতসর এবং বিয়াস নদীর উপর জলন্ধর পর্যন্ত দখল করার প্ল্যান করেন। কিন্তু সেটা সম্ভব না হলেও তারা খেমকরণ শহর সম্পূর্ণ রূপে দখল করতে সক্ষম হন। পরিস্থিতি বিবেচনা করে জিওসি ৪র্থ মাউন্টেন ডিভিশন, মেজর জেনারেল গুরবকশ সিং তার বাহিনীকে পিছু হটতে এবং আসাল উত্তরকে সেন্টার পয়েন্টে রেখে ঘোড়ার নালের আকৃতিতে প্রতিরক্ষা অবস্থান নেয়ার নির্দেশ দেন।
আসাল উত্তরের প্রতিরক্ষায় ভারতীয় সেনাবাহিনী একটা অভিনব প্ল্যান আঁটে। তারা রাতের আঁধারে প্রতিরক্ষা এলাকার আখ ক্ষেত প্লাবিত করে রাখে। পরের দিন সকালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১ম আর্মার্ড ডিভিশনের পাকিস্তানি ট্যাঙ্কগুলি, যার মধ্যে প্রধাণত এম৪৭ এবং এম৪৮ প্যাটন ট্যাঙ্কগুলো ছিল, সেগুলো ঘোড়ার নালের ফাঁদে আটকে যায়। জলাভূমি পাকিস্তানি ট্যাঙ্কগুলির অগ্রযাত্রাকে ধীর করে দেয় এবং কাদামাটির কারণে তাদের অনেকেই আর নড়াচড়া করতে পারেনি। এই যুদ্ধে ৯৭টা পাকিস্তানি ট্যাঙ্ক (বেশিরভাগ প্যাটন, কয়েকটি শেরম্যান এবং চাফি) ধ্বংস এবং ৪০জনেরও অধিক সৈন্য ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে বন্দি হয়। অপরপক্ষে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৩২টা ট্যাঙ্ক ধ্বংস হয়েছে।
আসল উত্তরে বিজয়ের পর ভারতীয় সেনাবাহিনী পাকিস্তানীদের কাছে হারানো শহর খেমকরণ পুনরুদ্ধারের জন্য অনেক প্রচেষ্টা চালায়। ১২ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫ তারিখে তাদের প্রথম প্রচেষ্টায় ১২৫ জন ভারতীয় সৈন্য পাকিস্তানিদের হাতে বন্দি, ৮টি ট্যাঙ্ক ধ্বংস এবং অনেক ট্যাঙ্ক শত্রুর দখলে যায়। তারা এরপরও ২১-২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫ তারিখে যেসব প্রচেষ্টা চালায় তা পাকিস্তানি সেনাবাহিনী প্রতিহত করতে সক্ষম হয়। যুদ্ধের শেষ অবধি খেমকরণ এলাকা পাকিস্তানের হাতেই ছিল এবং তাসখন্দ চুক্তির সময় তা ভারত সরকার ফিরে পায়। এই রণক্ষেত্রে ভারত প্রায় ৩ হাজার সৈন্য, ৩০০ বর্গমাইল এলাকা, প্রায় ১৭৫ টি ট্যাঙ্ক এবং ৬০-৭৫ টি বিমান হারিয়েছিল। অন্যদিকে পাকিস্তান প্রায় ৪ হাজার সৈন্য, ৭০০ বর্গমাইল এলাকা, ২০০ টি ট্যাঙ্ক এবং ২০ টি বিমান হারিয়েছিল।
৩
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের পক্ষে যুদ্ধ করা বাঙালী সামরিক অফিসার, সেনাসদস্যদের নিয়ে ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ তারিখে কুর্মিটোলা সেনানিবাসে 'দ্য ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট' এর প্রথম ইউনিট, ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট গঠন করা হয়। লে. কর্ণেল আতিক হকের নেতৃত্বে ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে এই যুদ্ধে বামবাওয়ালি-রাভী-বেদিয়ান খাল (বিআরবি খাল) বরাবর প্রতিরক্ষা অবস্থান নিয়ে লাহোর শহর রক্ষার দায়িত্ব দেয়া হয়। মেজর জিয়াউর রহমান একজন কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে ৪৬৬ জনবল নিয়ে খেমকরণ এলাকায় যুদ্ধ করেছিলেন। তার কোম্পানিই সর্বপ্রথম ভারতীয় বাহিনীর সামনে পড়ে। এসময় তাজুল ইসলাম নামে তার কোম্পানির একজন এনসিও নিজের বুকে মাইন বেঁধে ভারতীয় ট্যাঙ্ক বহরের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মাহুতি দেন।
এই যুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বেশ কিছু ট্যাঙ্ক ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের দখলে আসে। এরকম একটা ট্যাঙ্ক, পিটি-৭৬ আজও চট্টগ্রাম সেনানিবাসে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টার মিউজিয়ামের সামনে রাখা আছে। এই ট্যাঙ্কটা ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৭ লাইট ক্যাভালরি ইউনিটের ‘সি’ কোম্পানির অধীনে ছিল। ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ‘এ’ কোম্পানির লে মাহমুদুল হাসান এ্যান্টি ট্যাঙ্ক অস্ত্র, রকেট লঞ্চার টাইপ-৫৬ দিয়ে চাট্টানওয়ালা গ্রামের কাছে ভারতীয় ট্যাঙ্কটি ধ্বংস করেন। সিনিয়র টাইগার্সের সৈনিকরা সেটা ভারতের অভ্যন্তরের রণক্ষেত্র থেকে নিজ এলাকায় নিয়ে আসে। এরপর কর্নেল এম এ জি ওসমানী’র প্রচেষ্টায় ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে জয়ের স্মারক হিসেবে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানের চট্টগ্রাম সেনানিবাসে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে আনা হয়।
মেজর জিয়ার কোম্পানি খেমকরণের যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদান রাখায় সর্বোচ্চ সংখ্যক বীরত্বের পুরস্কার পেয়েছে। তিনি নিজেও সাহসিকতার জন্য দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক পদক 'হিলাল-ই-জুরাত' লাভ করেন। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে বীরত্বের জন্য ১ম ইস্ট বেঙ্গল মোট ১২টা পদক লাভ করে। তারমধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক পদক 'হিলাল-ই-জুরাত' ১টা, তৃতীয় সর্বোচ্চ সামরিক পদক 'সিতারা-ই-জুরাত' ২টা, চতুর্থ সর্বোচ্চ সামরিক পদক 'তামঘা-ই-জুরাত' ৯টা। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি পদক অর্জন করে ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
২০ মার্চ ২০২৫