
১
ঢাকার নাগরিক যন্ত্রণায় নতুন উপাদান যত্রতত্র ব্যাটারিচালিত রিকশার উৎপাত। এসবের না আছে সঠিক কন্ট্রোল সিস্টেম, চালকরা না জানে ঠিক ভাবে চালাতে। রাস্তায় দুর্ঘটনা ঠেকানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধ করার কথা উঠলেও অনেকের কর্মসংস্থান হয়েছে বলে হয়তো কর্তৃপক্ষ নীরব। আর তাই পঙ্গপালের মতো ঢাকার রাজপথ-অলিগলি এসব ব্যাটারিচালিত রিকশা দখল করেছে, চালক এবং যাত্রীর প্রয়োজনে। এই রিকশাগুলোতে ব্যবহৃত লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি চার্জের জন্য যে বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয় তা নিকোলা টেসলার আবিষ্কৃত অল্টারনেটিং কারেন্ট বা এসি ব্যবস্থারই ফল। নগরের ট্রাফিক সিস্টেমকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রাজপথের রাজা এই ব্যাটারিচালিত রিকশাকে তাই লোকে কৌতুক করে টেসলা নামেই ডাকেন। কে এই টেসলা?
নিকোলা টেসলা আধুনিক বৈদ্যুতিক সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম স্থপতি। ১০ জুলাই ১৮৫৬ তারিখে ক্রোয়েশিয়াতে জন্ম নেয়া এই বিজ্ঞানী একজন তড়িৎ প্রকৌশলী, যন্ত্র প্রকৌশলী এবং ভবিষ্যৎদ্রষ্টা। ভুল সময়ে জন্ম নেয়া এই বিজ্ঞানীর যুগান্তকারী আবিষ্কারগুলো আধুনিক প্রযুক্তি ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে অপরিহার্য ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু তার অনেক কাজই সমসাময়িকদের জন্য খুব বেশি আধুনিক বলে তাদের বোধগম্য ছিল না। আর তাই জীবদ্দশায় টেসলা তার অনেক উদ্ভাবনের জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক বা সামাজিক স্বীকৃতি পাননি। টেসলার এসি ব্যবস্থাই আধুনিক বিশ্বের প্রধান বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও তার এই যাত্রা সহজ ছিল না। আর্থিক সংকটে ভুগে এবং ব্যক্তিগত জীবনে নিঃসঙ্গ থেকে তিনি ৭ জানুয়ারি ১৯৪৩ তারিখে ৮৬ বছর বয়সে নিউ ইয়র্কের একটি হোটেলে মারা যান। তবে তার মৃত্যুর পর তার গবেষণা ও আবিষ্কারের গুরুত্ব ধীরে ধীরে স্বীকৃতি পায়। তার সম্মানে চৌম্বকীয় প্রবাহের ঘনত্বের আন্তর্জাতিক একককে ‘টেসলা’ নাম দেওয়া হয় এবং তার নামেই ইলেকট্রিক গাড়ি কোম্পানি টেসলার নামকরণ করা হয়েছে।
নিকোলা টেসলা একসময় থমাস এডিসনের অধীনে কাজ করতেন। কিন্তু বিদ্যুৎ সরবরাহ পদ্ধতি নিয়ে তাদের দুজনের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য দেখা দেয়। এডিসন ডাইরেক্ট কারেন্ট, ডিসি ব্যবস্থাকে সমর্থন করতেন, যা ছিল উচ্চ ব্যয়বহুল এবং দূরবর্তী স্থানে প্রেরণের জন্য অকার্যকর। অন্যদিকে টেসলা অল্টারনেটিং কারেন্ট, এসি ব্যবস্থার পক্ষে ছিলেন, যা ছিল কম খরচে দূর-দূরান্তে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য আদর্শ। এই দ্বন্দ্ব বিজ্ঞানের ইতিহাসে ‘ওয়ার অভ কারেন্টস’ নামে পরিচিত।
২
‘ওয়ার অভ কারেন্টস’ বলতে উনিশ শতকের শেষের দিকে দুটি প্রধান বৈদ্যুতিক সরবরাহ ব্যবস্থার মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা ও দ্বন্দ্বকে বোঝানো হয়। এই দুই ব্যবস্থা হলো ডাইরেক্ট কারেন্ট, যার নেতৃত্বে ছিলেন থমাস এডিসন এবং অল্টারনেটিং কারেন্ট, যার পেছনে ছিলেন জর্জ ওয়েস্টিংহাউস এবং নিকোলা টেসলা। কিন্তু কেন এই যুদ্ধ? বিদ্যুতের বাণিজ্যিক ব্যবহারের শুরুর দিকে, থমাস এডিসন তার ডাইরেক্ট কারেন্ট ব্যবস্থা চালু করেন, যা সরাসরি একমুখী বিদ্যুৎ প্রবাহ তৈরি করে। ডিসি ব্যবস্থা বাতি জ্বালানো ও মোটর চালানোর জন্য কার্যকর হলেও এর সীমিত দূরত্ব এবং ভোল্টেজ পরিবর্তন জনিত কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। এখানে সীমিত দূরত্ব বলতে যেটা বোঝানো হয়, ডিসি বিদ্যুৎ বেশি দূর পর্যন্ত দক্ষতার সাথে পাঠানো যেত না। প্রতি বর্গমাইলে একটি পাওয়ার প্ল্যান্ট বসাতে হতো, যা খরচসাপেক্ষ ছিল। এছাড়াও ডিসি ব্যবস্থায় ভোল্টেজ সহজে বাড়ানো বা কমানো যেত না, যা দূর-দূরান্তে বিদ্যুৎ বিতরণের জন্য একটি বড় সমস্যা ছিল। নিকোলা টেসলা এই সমস্যার সমাধান হিসেবে অল্টারনেটিং কারেন্ট বা এসি ব্যবস্থা তৈরি করেন। এসি ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ তারের মাধ্যমে দিক পরিবর্তন করে প্রবাহিত হয় এবং এর প্রধান সুবিধাগুলো হলো:
ক। দূরবর্তী পরিবহন। এসি বিদ্যুৎ ট্রান্সফরমারের সাহায্যে উচ্চ ভোল্টেজে রূপান্তর করে শত শত মাইল দূরে পাঠানো সম্ভব। এরপর আবার ভোল্টেজ কমিয়ে গ্রাহকের ব্যবহারের উপযোগী করা যায়।
খ। কম খরচ। এসি ব্যবস্থার জন্য কম পাওয়ার প্ল্যান্ট এবং অপেক্ষাকৃত পাতলা তারের প্রয়োজন হয়, যা সামগ্রিকভাবে খরচ অনেক কমিয়ে দেয়।
৩
টেসলা’র এসি ব্যবস্থার নানাবিধ সুবিধা সত্ত্বেও এডিসন তার ডিসি ব্যবস্থার জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে টেসলা ও ওয়েস্টিংহাউসের এসি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালান। যেমন-
ক। নিরাপত্তা নিয়ে ভয়। এডিসন প্রচার করতে থাকেন যে এসি বিদ্যুৎ অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি জনগণের সামনে এসি বিদ্যুৎ ব্যবহার করে কুকুর, বিড়াল, এমনকি একটি হাতিকেও বিদ্যুতের আঘাতে মেরে দেখান, যেন মানুষ এসি-কে ভয় পায়।
খ। ইলেকট্রিক চেয়ার। এডিসনের লোকেরা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য একটি বৈদ্যুতিক চেয়ার তৈরি করে, যেখানে এসি বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়। এর মাধ্যমে এসি বিদ্যুৎ কতটা ভয়ংকর সেটা তারা বোঝাতে চেয়েছিল।
কিন্তু এডিসনের সমস্ত অপপ্রচার সত্ত্বেও, এসি ব্যবস্থার কারিগরি শ্রেষ্ঠত্ব শেষ পর্যন্ত জয়লাভ করে। বিশেষ করে টেসলা’র সহযোগী, জর্জ ওয়েস্টিংহাউস ১৮৯৩ সালের শিকাগো ওয়ার্ল্ডস ফেয়ারে আলোকসজ্জার দায়িত্ব নিয়ে হাজার হাজার এসি বাল্ব ব্যবহার করে প্রমাণ করেন যে এসি বিদ্যুৎ কেবল নিরাপদই নয়, বরং ডিসি ব্যবস্থার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর ও সাশ্রয়ী। এরপর, ১৮৯৫ সালে টেসলা ও ওয়েস্টিংহাউস নায়াগ্রা জলপ্রপাতের শক্তি ব্যবহার করে প্রথম বড় আকারের জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করেন, যা এসি বিদ্যুৎ উৎপাদন করে এবং বাফেলো শহরের প্রায় ৩৫ কিমি দূরে সেই বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। সেসময়ে এটি এসি প্রযুক্তির চূড়ান্ত সাফল্য প্রমাণ করে। এই ঘটনার পর থেকে সারা বিশ্বে বিদ্যুৎ বিতরণের জন্য অল্টারনেটিং কারেন্ট বা এসি ব্যবস্থা প্রধান মান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
৪
অল্টারনেটিং কারেন্ট বা এসি ব্যবস্থা ছাড়াও নিকোলা টেসলা রিমোট কন্ট্রোল, ফ্লুরোসেন্ট ও নিয়ন আলো, টেসলা কয়েল ইত্যাদি আবিষ্কার করেন। এক্স-রে র আবিষ্কারক হিসেবে আমরা উইলহেম রন্টজেনের নাম জানি অথচ টেসলার গবেষণা এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। টেসলা ১৮৯৫ সালে তার গবেষণাগারে এক্স-রে নিয়ে কাজ শুরু করেন এবং এর ছবিও তোলেন। এছাড়াও রেডিও আবিষ্কারক হিসেবে আমরা ইতালীয় বিজ্ঞানী গুগলিয়েলমো মার্কনির নাম জানি, তবে ১৯৪৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয় টেসলাই রেডিওর মূল উদ্ভাবক। মার্কনি তার কাজের জন্য টেসলার ১৭টি পেটেন্ট ব্যবহার করেছিলেন।
টেসলা তারের সাহায্য ছাড়াই পৃথিবীর এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বিদ্যুৎ শক্তি স্থানান্তরের স্বপ্ন দেখেছিলেন। টেসলাই প্রথম রোবোটিক্স যন্ত্রপাতির কথা কল্পনা করেন যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করতে পারে। আসলে তিনি ছিলেন সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা কিংবা ভুল সময়ে জন্ম নেয়া এক বিজ্ঞানী যার কাজ সমসাময়িক বিজ্ঞানীরা উপলব্ধি করতে পারেননি। তবে তার মৃত্যুর পর, তার কাজের প্রকৃত গুরুত্ব উপলব্ধি করা হয় এবং এখন তাকে আধুনিক বিশ্বের অন্যতম স্থপতি হিসেবে গণ্য করা হয়।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫