
১
গত দু’দিন ধরে ফেসবুকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রামযুক্ত নাম-স্বাক্ষরবিহীন একটা বিবৃতি দেখা যাচ্ছে। বিবৃতিটা চারুকলা অনুষদের ২৬তম ব্যাচের সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে মতপ্রকাশের সর্বচ্চো স্বাধীনতা থাকা সত্ত্বেও (কেননা এখন যে কেউই যখন-তখন সেনাপ্রধান বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধানের প্রতি ন্যুনতম শ্রদ্ধাপোষণ না করেই যা তা বলছেন, তারেক জিয়াকে ব্যঙ্গ করে কার্টুন আঁকা হয়েছে, কিন্তু এজন্য কাউকে আইনের আওতায় নেয়া হয়েছে শুনিনি) বিবৃতিতে কারো নাম না থাকায় বেনামী পত্রটা আসলে কোন গোষ্ঠীর তা বোঝা যাচ্ছে না। তবে ধারণা করি যারা নিজেদের বাংলাদেশের বা বাঙালি সংস্কৃতির সোল এজেন্ট বলে মনেকরেন বা যারা মনেকরেন যে তাদেরকে বাঙালি সংস্কৃতি ইজারা দেয়া হয়েছে, এটা তাদের বক্তব্য। মূলত সেইসব চেতনাধারী সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশ্য করেই আমি এই নিবন্ধটা লিখেছি।
১৯৮৫ সালের ১৪ এপ্রিল তারিখে যশোরের চারুপীঠ আর্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে প্রথমবারের মতো ‘বর্ণিল বর্ষবরণ শোভাযাত্রা’ ব্যানারে একটা র্যালি বের করা হয়েছিল। ওই র্যালি’র অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন চারুপীঠ আর্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ ও সাধারণ সম্পাদক জনাব মাহবুব জামিল শামীম। কয়েক বছর পর, ১৯৮৯ সালে তিনিই ঢাকার চারুকলা অনুষদে গিয়ে ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে বিভিন্ন রঙ ও রকমের মুখোশ তৈরি করিয়ে রাজধানীতে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ নামে একটা র্যালি বের করার উদ্যোগ নেন। সেসময়ে বাঙালির উপকথা বা লোকজ উৎস থেকে সংগৃহীত বিভিন্ন উপাদান, যেমন- বাঘ, হাতি, ঘোড়া, কুমির, টেপা পুতুল, লক্ষ্মীপেঁচা বা দৈত্য, ভূত ইত্যাদির মুখোশ তৈরি করে র্যালিটা করা হয়। তবে ১৯৯০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ এককভাবে এই শোভাযাত্রার নিয়ন্ত্রণ নেয়।
২
১৯৮৫ সালে যশোরে শুরুতে এই র্যালি ‘বর্ষবরণ শোভাযাত্রা’ নামে আয়োজন করা হলেও এবং এরপরে, ১৯৮৯ সালে ঢাকায় ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ নামে র্যালি করা হলেও পরবর্তীতে ‘ছায়ানট’ (ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর বেশ কয়েকটি ন্যারেটিভ প্রজনন ক্ষেত্রের একটি) এর খপ্পরে পড়ে এই র্যালির ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামকরণ করা হয়। ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা ওয়াহিদুল হক ও শিল্পী এমদাদ হোসেন ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামকরণ করেন। বাঙালি সংস্কৃতি উপস্থাপনের পাশাপাশি এরশাদের স্বৈরাচারী শাসনের বিরূদ্ধে মানুষের ঐক্য এবং একইসঙ্গে শান্তির বিজয় ও অপশক্তির অবসান কামনা করা এই র্যালির মূল বিবেচ্য বিষয় ছিল। চারুপীঠ আর্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সভাপতি হারুন-অর-রশীদ ২০২৩ সালে প্রথম আলোকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরিতে সাদা-কালো পোশাকে খালি পায়ে আমরা গভীর শোক পালন করি। ঠিক তার উল্টো অনাবিল আনন্দ, উৎসাহ আর উদ্দীপনায় বাংলা বর্ষবরণ উদ্যাপনের লক্ষ্যে যশোরে বর্ষবরণ শোভাযাত্রার সূচনা করা হয়েছিল। ওই শোভাযাত্রা মৌলবাদী গোষ্ঠীকে প্রতিহত করে গোটা যশোরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল।’ অর্থাৎ শুরুথেকেই এই র্যালি একটা বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শে পরিচালিত হয়েছিল।
আমরা বিগত পনেরো বছর আওয়ামী লীগ সরকারের প্রশাসনিক উদ্যোগ এবং র্যাব-পুলিশ-বিজিবি’র নিবিড় নিরাপত্তাবেষ্টনীর মাঝে এই র্যালি আয়োজন হতে দেখেছি। ৩০ নভেম্বর ২০১৬ তারিখে আওয়ামী লীগ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আবেদনের প্রেক্ষিতে ইউনেস্কো এই র্যালিকে অস্পর্শনীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান দেয়। অর্থাৎ শুরুতে এই র্যালি একটা সামাজিক-সাংস্কৃতিক আয়োজন হলেও পরবর্তীতে এটি আওয়ামী লীগ সরকারের সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের আয়োজন হিসেবে এজেন্ডাভুক্ত হয়।
৩
যশোরে শুরু করা বর্ষবরণ শোভাযাত্রা পরবর্তীতে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র মাধ্যমে একপর্যায়ে আওয়ামী লীগের সরকারি প্রজেক্টে পরিণত হয়। তারা এই র্যালিকে জামায়াতে ইসলাম এবং বিএনপি’কে দমন করার কাজে ব্যবহার করে। চারুকলার নিরীহ ছাত্রছাত্রীরা আমাদের লোকজ সংস্কৃতির দৈত্যের যে আদল তাতে দাঁড়ি-টুপি পরিয়ে বাঙালি মুসলমানের ধর্মীয় অনুভূতিতে করেছে। ২০১৯ সালে একটা র্যালিতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে বেগম খালেদা জিয়ার প্রতিকৃতি বানিয়ে তার হাতে পেট্রোল বোমা ধরিয়ে দেয়া হয়। এভাবে বিগত সরকারের সময় র্যালি বা শোভাযাত্রা সবসময়ই রাজনৈতিক মতাদর্শ ঠেকানোর হাতিয়ার হয়েছে। চারুকলার ছাত্রছাত্রীরা হয়তো বলবেন, একাত্তরের ঘৃণিত অপশক্তি রাজাকারদেরকে তারা দৈত্যের মোটিফে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন। ঠিক আছে, কিন্তু তাদের পরনে ইসলামি লেবাস কেন? ইসলাম ধর্ম নিয়ে তাদের একরকমের চুলকানি আছে জানি তবুও জিজ্ঞেস করলাম। তারা হয়তো জানেন না তাদের চেতনাবাজ কিন্তু ভীরু, অথবা অপুরুষ পূর্ব-পুরুষদের সময়ে লেখক হুমায়ুন আহমেদ তার নাটকে ‘রাজাকার’ শব্দটা উচ্চারণ করার সাহস দেখিয়েছিলেন। তিনি তার গল্প-উপন্যাস-নাটক-সিনেমায় একজন মসজিদের ইমামকে মুক্তিযোদ্ধা এবং দাঁড়ি-টুপি ছাড়াই রাজাকার চরিত্র উপস্থাপন করে দেখিয়েছেন।
সবাইকে একই ছায়াতলে আনার যে মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এই র্যালির উদ্ভব তা একসময় সরকারি উদ্যোগে পরিকল্পিতভাবে ঘৃণা ছড়ানোর কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রতিবছর লেখা হয়েছে নতুন নতুন ন্যারেটিভ। এমনকি তাদের এই অপকর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা হলে সেটাকে বাংলার আবহমান সংস্কৃতির উপরে হামলা বলে চিত্রিত করা হয়েছে। এভাবেই ‘ছায়ানট’ বা ‘চারুকলা অনুষদ’ এই র্যালিকে আওয়ামী লীগের আর দশটা রাজনৈতিক প্রজেক্টের মতো একটাতে পরিণত করেছে। আর তাই ৫ আগস্ট বা ৩৬ জুলাইয়ের পর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বৈশাখের এই র্যালি থাকা বা না থাকায় আসলে কারো তেমন যায় আসেনা। তবে এই র্যালি আয়োজন করা হলে তাতে অবশ্যই বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতিকে ধারণ করতে হবে। যে ধর্মীয় পরিচয়ের করাতে বাঙালি দু’ভাগ হলো তাতে চেতনার নামে মলম লাগানোর প্রয়োজন দেখিনা। গঙ্গা-পদ্মায় ইতোমধ্যে অনেক জল প্রবাহিত হয়েছে, এই ভাঙন আর কখনো জোড়া লাগবেনা। সংস্কৃতি উপদেষ্টার সাথে বিভিন্ন বিষয়ে আমার মতপার্থক্য থাকলেও বৈশাখের র্যালিকে তার আদিনামে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া বা ‘ছায়ানট’ অধ্যায় থেকে মুক্ত করা এবং ‘সর্বজনীন চেতনা’ থেকে বাঙালি ও সমতল কিংবা পাহাড়ে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীকে একসাথে নিয়ে র্যালি করার আয়োজনকে সাধুবাদ জানাই। আমাদের জাতীয়তা একটাই, আমরা বাংলাদেশী।
৪
২৪ এপ্রিল ১৯৭২ তারিখে বাংলাদেশের সেসময়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান (আমি জেনেবুঝেই ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি ব্যবহার করিনি, কারণ স্বাধীনতা যুদ্ধের পূর্বে তাকে এই উপাধিটা দিয়েছিল ডাকসু, আবার ১৯৭৩ সালে ডাকসু তাকে দেয়া এই উপাধিটা ফিরিয়ে নিয়েছিল) জাতীয়তা প্রশ্নে রাষ্ট্রে যে বিভাজনের সূচনা করেছিলেন তার বিপরীতে ধর্ম-বর্ণ-জাতিসত্তা নির্বিশেষে ‘নতুনধারার শোভাযাত্রা বা র্যালি’ আয়োজন একটা চমৎকার উদ্যোগ বলেই মনেকরি। পরিশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ২৬তম ব্যাচের চেতনাধারী সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের কাছে প্রশ্ন, প্রতিবছর মঙ্গল শোভাযাত্রায় মোটিফ হিসেবে দৈত্যের পরনে টুপি-পাঞ্জাবি এবং মুখে দাঁড়ি দিয়ে বাঙালি মুসলমানের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার কারণ কি? এজন্য যদি বলা হয় চারুকলার ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ আসলে আওয়ামী লীগের বিরোধী গোষ্ঠীকে একটা দানবীয় রূপ দেয়ার প্রবণতা উদ্ভূত সাংস্কৃতিক প্রকল্প, তাহলে ভুল বলা হবে কি?
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
২৮ মার্চ ২০২৫