
১
কেল্টরা বিশ্বাস করত যে ৩১ অক্টোবর রাতে গ্রীষ্মের শেষ এবং অন্ধকারের (শীতের) শুরুর সন্ধিক্ষণে জীবিত ও মৃতদের জগতের মধ্যকার পর্দা সবচেয়ে দুর্বল হয়ে যায়। এই রাতে মৃত আত্মারা পৃথিবীতে ফিরে আসে। প্রায় ২০০০ বছর আগে প্রাচীন কেল্টিক জাতিগোষ্ঠীর ‘সাহউইন’ উৎসব থেকে হয়েছিল, যারা বর্তমান আয়ারল্যান্ড, ইংল্যান্ড এবং উত্তর ফ্রান্সে বসবাস করত।
২
সাহউইনদের এই উৎসব ছিল তাদের ফসল কাটার শেষ এবং নতুন বছরের শুরুর উৎসব (১ নভেম্বর)। তারা আত্মাদের স্বাগত জানাতে এবং অশুভ আত্মাদের তাড়াতে আগুন জ্বালাতো এবং পশুর চামড়ার পোশাক পরত। পরবর্তীতে খ্রিস্টান ধর্ম প্রসার লাভ করলে এই উৎসবটি ‘অল হ্যালোজ’ ইভ’ (All Hallows’ Eve) নামে পরিচিত হয়, যার অর্থ ‘পবিত্র সন্ধ্যা’। ১ নভেম্বর পালিত হয় ‘অল সেইন্টস ডে’ (All Saints’ Day)। এই মিশ্রণ থেকেই আধুনিক হ্যালোইন উৎসবের উৎপত্তি। বর্তমানে হ্যালোইন উৎসবটি মজাদার এবং ভৌতিক থিমের মাধ্যমে উদযাপন করা হয়। এর প্রধান প্রথাগুলো হলো:
ক। ট্রিক অর ট্রিট।
শিশুরা ভূতের, সুপারহিরোর বা মজার পোশাকে সেজে বাড়ি বাড়ি যায়। দরজায় কড়া নেড়ে বলে, ‘ট্রিক অর ট্রিট!’ (হয় আমাকে মিষ্টি দিন, না হয় আমি দুষ্টুমি করব)। বাড়ির লোকেরা সাধারণত তাদের মিষ্টি, চকোলেট বা ক্যান্ডি দিয়ে থাকে।
খ। কস্টিউম পরা।
মানুষ বিভিন্ন ভৌতিক পোশাক (যেমন: ভূত, জম্বি, ডাইনি) অথবা জনপ্রিয় চরিত্র বা মজার পোশাকে সাজে। এটি মূলত প্রাচীন কেল্টিকদের অশুভ আত্মাদের থেকে নিজেদের আড়াল করার প্রতীকী প্রথা থেকে এসেছে। বাংলাদেশে অনেক ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল সীমিত পরিসরে শিশুদের জন্য কস্টিউম পার্টি বা ‘ট্রিক অর ট্রিট’-এর মতো মজাদার অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এছাড়াও তরুণ-তরুণীরা নিজেদের মধ্যে ছোট ছোট পার্টি করে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভৌতিক সাজের ছবি আপলোড করে এই উৎসবে অংশ নেয়।
গ। জ্যাক-ও’-ল্যান্টার্ন।
এটি হ্যালোইনের সবচেয়ে পরিচিত প্রতীকী কুমড়োর লণ্ঠন। কুমড়োর ভেতরের অংশ ফাঁপা করে তার গায়ে ভয়ংকর মুখ বা নকশা খোদাই করা হয় এবং ভেতরে মোমবাতি জ্বালানো হয়। এটি মূলত অশুভ আত্মাদের দূরে রাখার জন্য তৈরি করা হতো। বাংলাদেশের বিভিন্ন পরিবার, যারা পশ্চিমা সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত বা যেখানে প্রবাসীরা বসবাস করেন, তারা নিজেদের বাড়িতে জ্যাক-ও’-ল্যান্টার্ন তৈরি এবং বাচ্চাদের মধ্যে ক্যান্ডি বিতরণের মতো প্রথাগুলো পালন করে।
ঘ। ভৌতিক পার্টি ও সাজসজ্জা
বাসা-বাড়িতে ভূতের থিমে সাজসজ্জা করা হয়। বন্ধুরা মিলে হ্যালোইন পার্টি করে, যেখানে কস্টিউম প্রতিযোগিতা এবং ভয়ের সিনেমা দেখানো হয়। ঢাকার বিভিন্ন বড় এবং বিলাসবহুল হোটেলগুলোতে (যেমন- ঢাকা রিজেন্সি, লা মেরিডিয়ান ইত্যাদি) প্রতি বছর ৩১ অক্টোবর বা এর কাছাকাছি সময়ে ‘হ্যালোইন নাইট’ বা ‘স্পুকট্যাকুলার পার্টি’-র আয়োজন করা হয়। এসব পার্টিতে সাধারণত ভৌতিক সাজসজ্জা, ডিজে মিউজিক, বিশেষ খাবার ও পানীয় এবং বেস্ট কস্টিউম অ্যাওয়ার্ড প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা থাকে। শেফ’স টেবিলসহ কিছু থিম্যাটিক রেস্তোরাঁ ও ক্যাফেও হ্যালোইন উপলক্ষে বিশেষ ইভেন্ট বা ভূতুড়ে থিমের মেনু অফার করে।
ঙ। আপেল ববিং খেলা।
এটি একটি ঐতিহ্যবাহী খেলা যেখানে একটি জলের টবে আপেল ভাসানো থাকে। হাত ব্যবহার না করে শুধু দাঁত দিয়ে টব থেকে আপেল তোলার চেষ্টা করা হয়।
৩
হ্যালোইন উৎসব বাংলাদেশের মূলধারার কোনো উৎসব নয়। এটি মূলত একটি পশ্চিমা সাংস্কৃতিক ট্রেন্ড, যা শহুরে এবং আধুনিক জীবনধারার মধ্যে ধীরে ধীরে পরিচিতি পাচ্ছে। ভিডিওতে নিউইয়র্ক সিটির একটি হ্যালোইন প্যারেড, যেটাতে মাইকেল জ্যাকসনের ‘থ্রিলার’ অ্যালবামের ইফেক্ট আনা হয়েছে।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১ নভেম্বর ২০২৫