
১
‘আবাল্য শুনেছি মেয়ে বাংলাদেশ জ্ঞানীর আঁতুড়
অধীর বৃষ্টির মাঝে জন্ম নেন শত মহীরূহ,
জ্ঞানের প্রকোষ্ঠে দেখো, ঝোলে আজ বিষণ্ণ বাদুড়
অতীতে বিশ্বাস রাখা হে সুশীলা, কেমন দুরূহ?’
কবিতার লাইন প্রিয় কবি আল মাহমুদের ‘সোনালি কাবিন’ কাব্যগ্রন্থ থেকে নেয়া। কবির ভাষায় এই বাংলা সবসময়ই জ্ঞানী-গুণীদের চারণভূমি। যুগে যুগে এইমাটিতে জন্মেছেন অনেক রথী-মহারথী, তেমনি একজনকে নিয়ে লিখতে যাচ্ছি। তবে সেজন্য ফিরে যেতে হবে আজ থেকে প্রায় সোয়া দুই হাজার বছর পূর্বে।
সময়: ২৯৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দ
স্থান: পাটলিপুত্র, মৌর্য্য সাম্রাজ্যের রাজধানী।
যুবরাজ বিন্দুসার সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের সামনে এসে দাঁড়ালেন। সম্রাট বিন্দুসারের মাথা থেকে যুবরাজের মুকুট সরিয়ে নিজের মাথার মুকুট পরিয়ে দিলেন। চারদিকে পিনপতন নিস্তব্ধতা। কেউ বুঝতে পারছেন না কী করতে হবে। সম্রাট বিন্দুসারের হাত ধরে তাকে সিংহাসনে বসিয়ে দিলেন এবং রীতিসিদ্ধভাবে নিজে মাথা নুইয়ে নতুন সম্রাটকে অভিবাদন জানালেন। উপস্থিত সবাই তাকে অনুসরণ করলেন। মহামন্ত্রী চাণক্য, মন্ত্রী সুবন্ধু, বিন্দুসারসহ অমাত্যদের অনেকে নিষেধ করলেও হেলেনের মৃত্যু সম্রাটের জন্য সিংহাসন ত্যাগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ করে দিয়েছে। রাজ দরবারের পাশের ঘরে গিয়ে রাজপোশাকের ভিতরে একটা কালো রঙের পোশাক পরলেন। জুতো জোড়াও খুলে নগ্ন পা হলেন।
মৌর্য্য সাম্রাজ্যের নতুন সম্রাট বিন্দুসার বুঝতে পারছেন না কি ঘটতে যাচ্ছে! তিনি মন্ত্রণাসভার সবাইকে নিয়ে শুধু দেখলেন, শোকের পোশাকে চন্দ্রগুপ্ত একটা ঘোড়ায় আরোহণ করে দ্রুত চলে যাচ্ছেন।
২
রাজ অভিষেকের দু’দিন পরের কথা।
১২ হাজারের বেশি সন্ন্যাসী জড় হয়েছেন জৈন মন্দিরের সামনে। চন্দ্রগুপ্তও সেখানে উপস্থিত। সন্ন্যাসীরা নির্গন্থ বা দিগম্বর সম্প্রদায়ের তাই উলঙ্গ, তবে চন্দ্রগুপ্ত আপাতত কালো পোশাক পরে আছেন। আচার্য ভদ্রবাহুর আদেশে তার এই বেশ। তীর্থাঙ্কর মহাবীরের রীতি অনুসরণ করে পোশাক ছেড়ে যাওয়ার যে রেওয়াজ, তা একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রম করার পর কার্যকর হবে। আচার্য ভদ্রবাহু উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে কিছু ধর্মীয় নির্দেশনা দিচ্ছেন। প্রস্তুতি পর্ব শেষে আচার্য ভদ্রবাহু চন্দ্রগুপ্তের কাছে গেলেন। তাঁবুর ভেতর থেকে তাকে বের করে বিন্দুসারের সামনে নিয়ে দাঁড়ালেন। তিনি ভাবগম্ভীর কন্ঠে বললেন, চন্দ্র, নতুন সম্রাট তোমার ছেলে। তার কাছ থেকে তোমার বিদায় নেয়া উচিত, এছাড়া প্রাক্তন সহকর্মীদেরকেও বিদায় বলো। চন্দ্রগুপ্ত একে একে সবার কাছ থেকে বিদায় নিলেন। নিকোমেডেস, ফাওলিন, স্ট্রেটোনিস সবাইকে বিদায় বলে পুত্রের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তাদের মাঝে সাম্রাজ্য পরিচালনা বা কোন কিছু নিয়েই কোন কথা হলো না, দুজনই বাকরুদ্ধ। আচার্য ভদ্রবাহু কাছে এসে বললেন, চন্দ্র, এখনই যাত্রা শুরু করতে হবে। শ্রাবণাবেলাগোলা অনেক দূরের পথ। চন্দ্রগুপ্ত দলের মাঝে ফিরে গেলেন।
জৈন মন্দিরের সামনে ১২ হাজারের বেশি মানুষের কাফেলা। সেখানে নির্গন্থদের সুশৃঙ্খল পদচালনায় এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে। তাদের সবার দৃষ্টি ভূমির দিকে নিবদ্ধ। মন্ত্রীপরিষদ থেকে শুরু করে রাজপরিবারের সবাই, সাধারণ নাগরিক দাঁড়িয়ে দেখছেন। ক্রমে ক্রমে দলটা মন্দির প্রাঙ্গণ পার হয়ে গেল। দূরে, আরও দূরে যেতে যেতে তারা একসময় মিলিয়ে গেল। কেউ একজন খেয়াল করলো, একটা কালো পোশাক মাটিতে পড়ে আছে, কিছুক্ষণ আগে সেখানে চন্দ্রগুপ্ত দাঁড়িয়েছিলেন।
তীর্থাঙ্কর মহাবীর নিজেও এভাবেই তার রাজকীয় পোশাক ফেলে গিয়েছিলেন। এটাই রীতি, জাগতিক সবকিছু ত্যাগ করে যাওয়া। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি, জৈন ধর্মাবলম্বীদের মাঝে শ্বেতাম্বর ও দিগম্বর নামে দুটি সম্প্রদায় আছে। মৌর্য্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের আমলে গাঙ্গেয় উপত্যকায় দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে জৈনরা দাক্ষিণাত্যে চলে আসেন এবং এরপরই জৈন ধর্মাবলম্বীরা শ্বেতাম্বর (যারা সংসার ত্যাগী সন্ন্যাসী হবার পরেও পরিধেয় গ্রহণ করতেন) ও দিগম্বর (যারা সন্ন্যাস গ্রহণের পর বস্ত্র ত্যাগ করতেন) এই দুই গোষ্ঠীতে ভাগ হয়ে যায়। দিগম্বর জৈনরা মনেকরেন মহাবীর সন্ন্যাস গ্রহণের ১৩তম মাস থেকে তার পরিধেয় বস্ত্র ত্যাগ করেছিলেন এবং জীবনের বাকি সময় তিনি পূর্ণ নগ্নতা পালন করেছিলেন। আচার্য ভদ্রবাহু এবং চন্দ্রগুপ্ত দিগম্বর সম্প্রদায়ের ছিলেন। চন্দ্রগুপ্ত জীবনের শুরুতে বৈদিক ধর্মের অনুসারী হলেও শেষ জীবনে আধ্যাত্মিক গুরু আচার্য ভদ্রবাহুর প্রভাবে জৈনধর্ম গ্রহণ করেন এবং বর্তমান কর্ণাটকের শ্রাবণবেলগোলায় সন্ন্যাসব্রত পালনকালে জৈন ধর্মাচার 'সল্লেখানা' বা স্বেচ্ছায় উপবাসের মাধ্যমে ২৯৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, মাত্র ৪২ বছর বয়সে দেহত্যাগ করেন। যে পাহাড়ে চন্দ্রগুপ্ত অবস্থান করতেন তার নাম চন্দ্রগিরি, সেখানে একটা মন্দির আছে, নাম চন্দ্রগুপ্ত বাসাদি।
ভদ্রবাহু যে গুহায় থাকতেন তার নাম ভদ্রবাহু গুহা (ছবি সংযুক্ত) ।
৩
আনুমানিক ৩৬৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পুণ্ড্রবর্ধনের কোটিকপুরে ভদ্রবাহু জন্মগ্রহণ করেন, ঐতিহাসিক ও দিগম্বর জৈন ঐতিহ্য অনুসারে এই তথ্য জানা যায়। তবে এসংক্রান্ত কোনো সুনির্দিষ্ট প্রত্নতাত্ত্বিক লিপি পাওয়া যায়নি। তার জন্মস্থান সম্পর্কিত তথ্যটি প্রাচীন জৈন ঐতিহ্য এবং তার নামে প্রচলিত গ্রন্থগুলির মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে চলে এসেছে। ঐতিহাসিকরা ধর্মীয় ঐতিহ্যকে পুণ্ড্রবর্ধনের প্রত্নতাত্ত্বিক এবং লিপিগত প্রমাণের সাথে মিলিয়ে ভদ্রবাহুর জীবন ও সময়কাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। তাকে জৈনধর্মের ষষ্ঠ শ্রুতকেবলী বলা হয়। তার বাবার নাম সোমশর্মা এবং মায়ের নাম সোমশ্রী।
৭০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পার্শ্বনাথস্বামী পুণ্ড্রবঙ্গ এবং তাম্রলিপ্তিতে এসে বহু লোককে জৈনধর্মে দীক্ষিত করেন। এরপর, ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মহাবীর এবং তারপরে তার শিষ্য সুধর্মস্বামী এবং প্রশিষ্য জম্বুস্বামী পৌণ্ড্রবর্ধনে এসে জৈনধর্ম প্রচার করেন। সেসময় পুণ্ড্রবর্ধনে প্রচুর জৈনধর্মের অনুসারীদের বাস ছিল। ভদ্রবাহু’র বাবা সোমশর্মা কোটিকপুরের রাজা পদ্মরথের পুরোহিত ছিলেন। শৈশবেই ভদ্রবাহু জৈনধর্মে দীক্ষিত হন এবং ৪৫ বছর গৃহবাসে থেকে প্রাকৃত ভাষায় ‘কল্পসূত্র’সহ উপসর্গহয়স্তোত্র, শত্রুঞ্জয়কল্প এবং আবশ্যক সূত্র, দশবৈকালিক সূত্র, উত্তরাধ্যয়ন সূত্র, সূত্র- কৃতাঙ্গ সূত্র, দশাশ্রুত স্কন্দসূত্র, কল্পসূত্র, ব্যবহার সূত্র, সূর্যপ্রজ্ঞপ্তি সূত্র, আচারাঙ্গ সূত্র ও ঋষিভাষিত সূত্র নামে ১০টা নির্যুক্তিনামক গ্রন্থসহ বহু জৈনশাস্ত্র রচনা করেন। মুনি রত্নসূরি ভদ্রবাহুর ১০নির্যুক্তিকে ঋগ্বেদের ১০মণ্ডলের সাথে তুলনা করেছেন। এছাড়াও জাতকাম্ভোনিধি, ভদ্রবাহু সংহিতা ও নর্মদাসুন্দরীকথা নামে কয়েকটা গ্রন্থে জৈনধর্মের মাহাত্ম কীর্তন করেছেন। ভদ্রবাহুর শিষ্য গোদাস থেকে জৈনদের কোটিবর্ষীয়া, পুণ্ড্রবর্ধনীয়া, তাম্রলিপ্তিকা এবং দাসীকর্বটিয়া শাখার উৎপত্তি হয়। আচারাঙ্গ সূত্রে তিনি প্রতি ধরণের অঙ্গের ক্ষেত্রে জৈনগণ কিরকম আচরণ করবেন তা লিপিবদ্ধ করেছেন। তার মতে একজন জৈনধর্ম অনুসারীকে ৫টি বিষয় মেনে চলা উচিত। আচারাঙ্গ সূত্র মতে সেই ৫টি বিষয় হলো অহিংসা, সত্য, অস্ত্যেয়, ব্রহ্মচর্য এবং অপরিগ্রহ।
আচার্য ভদ্রবাহু সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের ১৬টি স্বপ্নের ব্যাখা প্রদান করেছিলেন বলে জানা যায়। সেসব স্বপ্নের মাঝে সূর্যের গ্রহণ, চন্দ্রের বিভাজনসহ বাঁদরের সিংহাসনে আরোহন, তরুণ ষাঁড়দের কাজে অংশগ্রহণসহ আরও বেশ কিছু স্বপ্ন ছিল। এরমাঝে চন্দ্র বিভাজনের যে স্বপ্নটি ছিল ভদ্রবাহু তার অনুবাদ করেন এভাবে, তার পরে জৈনধর্ম ২টি ভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে। এছাড়াও তিনি উদ্ধৃত করেন, চন্দ্রগুপ্তকৃত বিজয়াভিযানের কারণে রাজ্যে ১২ বছরের জন্য দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে এবং একারণে সাম্রাজ্যের পতন ঘটবে। স্বপ্ন অনুবাদ করে তিনি প্রায় ১২ হাজার অনুসারীসহ দক্ষিণ ভারতের শ্রাবণবেলাগোলার দিকে যাত্রা করেন, চন্দ্রগুপ্ত নিজেও তার গুরু ভদ্রবাহুর সাথে যাত্রা করেন।
ভদ্রবাহু ভারতীয় শাস্ত্রে সম্ভাব্যতার ধারণা জন্মদানে ভুমিকা রেখেছিলেন। এই বিষয়ে পিসি মহলানবিশ বলেন, ভদ্রবাহুর পাণ্ডুলিপিতে আমরা সিদ্ধবাদের ধারণায় সম্ভাবনার একটা প্রাচীন ব্যাখ্যা পাই। তিনি এটিকে ৭টি অভিজ্ঞতামূলক বিবৃতিতে বিভক্ত করেছেন, (১) হতে পারে, এটি হয়; (২) হতে পারে, তা নয়; (৩) হতে পারে, এটি এবং তা নয়; (৪) হতে পারে, এটি অবর্ণনীয়; (৫) হতে পারে, এটি এখনও অবর্ণনীয়; (৬) হতে পারে, এটি নয় এবং এটি অবর্ণনীয়ও; (৭) এটি হতে পারে এবং এটিও নয় এবং এটি অবর্ণনীয়। ভদ্রবাহুর হাত দিয়ে জৈনধর্মের প্রধান ৩টি ধর্মীয় গ্রন্থ লিপিবদ্ধ হয়েছিল বলে জানা যায়, এর সাথে তিনি নিরুক্তি সমূহকেও পুনঃলিপিবদ্ধ এবং জৈনধর্মের ১২টি প্রধান বইয়ের মাঝে ১০টি বইতে টীকা সংকলনের কাজও সম্পাদনা করেন। ভদ্রবাহু দিগম্বর জৈনদের মাঝে এখনও একজন গুরু হিসেবে পরিচিত এবং জৈনধর্মের মতো অতি অহিংস একটি ধর্মের সর্বশেষ অবিভক্ত ধর্মাচার্য হিসেবে আসীন। আধুনিক ইতিহাসবিদদের মতে তিনি আনুমানিক ২৯৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, ৬৯ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন বলে জানা যায়। তবে এটা ঠিক, আচার্য ভদ্রবাহুর জন্ম ও মৃত্যুর সময়কাল নিয়ে জৈন ঐতিহ্য এবং আধুনিক পণ্ডিতদের মধ্যে মতভিন্নতা রয়েছে। ভদ্রবাহু অখণ্ড জৈন ধর্মমতের সর্বশেষ আচার্য, কেননা তার পরবর্তীতে জৈন ধর্ম দিগম্বর এবং শ্বেতাম্বর, এই দুই শ্রেণীতে পুরোপুরি বিভক্ত হয়ে যায়।
৪
বঙ্গ সন্তান ভদ্রবাহু’র জন্মস্থান নিয়ে সুনির্দিষ্ট প্রত্নতাত্ত্বিক লিপি না পাওয়া গেলেও, ঐতিহাসিকরা পুণ্ড্রবর্ধন বা পৌণ্ড্রবর্ধনে জন্মের বিষয়ে মোটামুটি একমত। এবার জানা যাক এই নগরীটি কোথায়? বা আসলেই কি এইনামে প্রাচীন কোন নগরী ছিল? পুরাণ বা প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য এবিষয়ে কি বলে?
অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গশ্চ পুণ্ড্র সুহ্মশ্চ তে সুতাঃ ।
তেষাং দেশা সমাখ্যাতাঃ স্বনাম্না কথিতা ভুবি ।।
[মহাভারত আদিপর্ব ১০৪-৫]
মহাভারত অনুযায়ী অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুণ্ড্র ও সুহ্ম এই পাঁচটি পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতারা একই বংশের সন্তান, দীর্ঘতমার গর্ভে রাজা বলির পুত্র। পুণ্ড্র, পৌণ্ড্র, পুণ্ড্রবর্ধন ও পৌণ্ড্রবর্ধন একই জনপদ। পুণ্ড্র ও পৌণ্ড্র দেশবাচক এবং পুণ্ড্রবর্ধন বা পৌণ্ড্রবর্ধন নগরবাচক শব্দ। মহাভারতে পুণ্ড্র বা পৌণ্ড্র ভারতবর্ষের একটি রাজ্য হিসাবে বর্ণিত হয়েছে। প্রাচীন সাহিত্যে পুণ্ড্র, পৌণ্ড্র, পুণ্ড্রক ও পৌণ্ড্রিক এই কয়েকটি নাম পাওয়া যায়। বৌদ্ধযুগ এবং তারপরের গ্রন্থ ও প্রশস্তিলিপিতে পুণ্ড্রবর্ধন ও পৌণ্ড্রবর্ধন এই দুই নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে ঋগ্বেদের ঐতরেয় ব্রাহ্মণ এবং সাংখ্যায়ন স্রৌতসূত্রে সর্বপ্রথম পুণ্ড্রের উল্লেখ পাওয়া যায়। উভয়গ্রন্থেই পুণ্ড্র বিশ্বামিত্র ঋষির অধঃপতিত বংশধর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ভাগবত মতে পুণ্ড্রগণ যযাতির পুত্র অণুর বংশীয়। ব্রাহ্মাণ্ডপুরাণ, রামায়ণ, মার্কণ্ডেয়পুরাণ এবং মৎস্যপুরাণে পৌণ্ড্রদেশ ভারতের পূর্বাংশে অবস্থিত বলে উল্লেখ আছে। যেমন-
‘প্রাগজ্যোতিষাশ্চ পৌণ্ড্রাশ্চ বিদেহাস্তাম্রলিপ্তকাঃ ।
মালামাগধগোনন্দাঃ প্রাচ্যাং জনপদাঃ স্মৃতাঃ ।।’
[ব্রাহ্মাণ্ডপুরাণ ১/৪৮/৫, মার্কণ্ডেয়পুরাণ ৫৮/১৩ এবং মৎস্যপুরাণ ১১৩/৪৫]
পৌণ্ড্রদেশ যে ভারতের পূর্বাংশে তা রামায়ণে বর্ণিত আছে,
‘অধিগচ্ছ দিশং পূর্বং সশৈলবনকাননং
ব্রহ্মমালান বিদেহাংশ্চ মালবান কাশিকোশলাম ।।
মাগধাংশ্চ মহাগ্রামান পুণ্ড্রাস্ত্বঙ্গাংস্তথৈব চ ।’
[রামায়ণ কিষ্কিন্ধাকাণ্ড ৪০ সর্গ]
এছাড়াও বিদ্যাবদানের কোটিকর্ণাবদানে উপালি বুদ্ধদেবকে জিজ্ঞেস করেছেন, ‘অন্ত বা সীমান্ত কোন স্থানে এবং প্রত্যন্ত বা সীমান্তের বাহিরে কোন স্থান?’ উত্তরে গৌতম বুদ্ধ বলেছেন,
‘পূর্বেনোপালি পুণ্ড্রবর্ধনং নাম নগরং, তস্য পূর্বেণ পুণ্ডকক্ষো নাম পর্বতঃ, ততঃপরেণ প্রত্যন্তঃ।’
অর্থাৎ ‘হে উপালি, পূর্বদিকে পুণ্ড্রবর্ধন নামক নগর এবং তার পূর্বদিকে পুণ্ডকক্ষে নামক পর্বত, অতঃপর প্রত্যন্ত।’
এখানে গারো পাহাড়কে পুণ্ডকক্ষো পর্বত নামে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া বরাহমিহির তার বৃহৎসংহিতা নামে জ্যোতিষশাস্ত্রে ভারতের পূর্বভাগে পৌণ্ড্রদেশের অবস্থান বলে জানিয়েছেন। তারমানে পুণ্ড্র বা পুণ্ড্রবর্ধন বা পৌণ্ড্রবর্ধন নামে জনপদ আসলেই ছিল। এখন প্রশ্ন হলো সেই জনপদের বর্তমান অবস্থান কোথায়?
৫
বঙ্কিমচন্দ্র তার ‘বিবিধ প্রবন্ধ’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘এই পাণ্ডুয়াই (মালদহের) যে প্রাচীন পৌণ্ড্রবর্ধন, এমত বিবেচনা করিবার বিশেষ কারণ আছে’। কিন্তু তিনি এর স্বপক্ষে কোন প্রমাণ দেননি। তিনি পোদ জাতিকে পুণ্ড্রজাতি মনেকরে মালদহের পাণ্ডুয়ার কাছে তাদের বসবাস হেতু সে এলাকাটিকেই পুণ্ড্রবর্ধন ধরে নিয়েছেন। পণ্ডিত উমেশচন্দ্র বটব্যাল লিখেছেন, ‘ইহার বর্তমান নাম পাঁড়ুয়া প্রাচীন পুণ্ড্র নামের অপভ্রংশ মাত্র এবং এই স্থানেই প্রাচীন পুণ্ড্রদেশের রাজধানী অবস্থিত ছিল।’ তিনি আরেক জায়গায় লিখেছেন, ‘গঙ্গাস্রোতের সহিত মহানন্দার আদি সঙ্গমস্থানের নিকটেই প্রাচীন পুণ্ড্রনগর অবস্থিত ছিল।’ আবার পণ্ডিত রজনীকান্ত চক্রবর্তী ‘গৌড়ের ইতিহাস’ বইএ লিখেছেন, ‘করতোয়া তীরবর্তী মহাস্থান পুণ্ড্রবর্ধন নহে। মালদহ জেলার পাণ্ডুয়াই প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধন। তিনটি কারণে এইরূপ অনুমিত হয়, প্রথম কারণ পাণ্ডুয়ার নিকটবর্তী প্রদেশে পুণ্ড্রজাতির বাস। দ্বিতীয়ত জৈনদের পূর্বদেশে যে তিনটি প্রধান শাখা ছিল, তাহার নাম পুণ্ড্রবর্ধনীয়, কোটীবর্ষীয়, শিলাদ্বীপীয়। মহাস্থান শিলাদ্বীপ সংলগ্ন, দেবকোটের প্রাচীন নাম কোটীবর্ষ। কাজেই পুণ্ড্রবর্ধন মহাস্থান নয়। তৃতীয় কারণ পুণ্ড্রবর্ধন হিন্দুনগর ছিল, মুসলমানেরা মসজিদ নির্মাণ কালে মন্দিরগুলি ভাঙ্গিয়া ফেলিয়াছে। প্রসিদ্ধ আদিনা মসজিদ নির্মাণকালে বহু হিন্দু ও জৈনমন্দির বিধ্বস্ত হইয়াছে। আদিনা মসজিদের তলে অনেক জৈন তীর্থঙ্কর ও হিন্দু দেবমূর্তি পাওয়া যাইতেছে। হিন্দু ও জৈন মূর্তিদ্বারা গর্ত পূরণ করা হইয়াছিল। যদি পাণ্ডুয়া পুণ্ড্রবর্ধন ভিন্ন অন্য নগর হইত, তবে অবশ্যই মুসলমানদের কোন গ্রন্থে পাওয়া যাইত।’
রমেশচন্দ্র শেঠ বলেছেন, ‘যে কেহ বরিন্দ অঞ্চলে একবার মাত্র ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিবেন, তিনি উত্তর দক্ষিণে বিস্তারিত হিন্দুকীর্তি, পুষ্করিণীসমূহ ও ভগ্নকরপদ বিশিষ্ট নাসাকর্ণ খণ্ডিত মুণ্ড-প্রস্তর প্রতিমা ও হলকৃষ্ট ক্ষেত্রমধ্যে প্রাচীন প্রাচীরের প্রোথিত ভিত্তিমূল, ইষ্টকবিনির্মিত রথ্যা বা সেতুর ভগ্নাবশেষ অথবা ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত ইষ্টকরাশি দেখিয়া শ্রীযুক্ত শ্যামুয়েল সাহেবের উক্তির যাথার্থ্য উপলব্ধি করিবেন, এবং এই অঞ্চলেই পাণ্ডুয়ার অবস্থান পাণ্ডুয়াকে প্রাচীন পৌণ্ড্রবর্ধন ও বরিন্দ অঞ্চলকে প্রাচীন পুণ্ড্ররাজ্যের একাংশ বলিয়া সিদ্ধান্ত করিবেন।’ বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস-ব্রাহ্মণকাণ্ড এবং বিশ্বকোষ ১১শ ভাগ-পুণ্ড্রবর্ধন প্রস্তাবে নগেন্দ্রনাথ বসু প্রাচ্যবিদ্যামহার্ণব সিদ্ধান্তবারিধি মহাশয় পাণ্ডুয়াকে পৌণ্ড্রবর্ধন বলে উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু পরে ভুল বুঝতে পেরে মত পরিবর্তন করেন। তিনি ১৩২০ বঙ্গাব্দের বিজয়া মাসিক পত্রিকায় পৌণ্ড্রবর্ধন শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘পূর্বে বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস ব্রাহ্মণকাণ্ডে আমি প্রমাণ করিতে চেষ্টা করিয়াছি যে, বর্তমান মালদহের উত্তরে যে বারদোয়ারী পাড়ুয়া বা হজরৎ পাণ্ডুয়ার বিস্তীর্ণ ধ্বংসাবশেষ পড়িয়া আছে, তাহাই আদিশূর জয়ন্তের রাজধানী পৌণ্ড্রবর্ধন। এখন কিন্তু গৌড়াধিপ জয়ন্তের শতবর্ষ পূর্ববর্তী চীন পরিব্রাজক হিউএন সিয়ঙ্গের ভ্রমণবিবরণী হইতে অন্যরূপ মনে হইতেছে। চীন পরিব্রাজক রাজমহলের নিকট গঙ্গা পার হইয়া পূর্বদিকে একশত মাইলের অধিক দূরে গমন করিয়া পৌণ্ডবর্ধন নগরী প্রাপ্ত হন। মালদহ জেলাস্থ উক্ত পাণ্ডুয়া গঙ্গাতীর হইতে অধিক দূর নয়। এরূপ স্থানে দিনাজপুর, রঙ্গপুর বা বগুড়ার মধ্যে পৌণ্ড্রবর্ধন রাজধানী খুঁজিয়া বাহির করিতে হইবে। ……বর্ধনকুটী হইতে ১২ মাইল দক্ষিণে বগুড়া শহর হইতে ৭ মাইল উত্তর পশ্চিমে মহাস্থানগড় নামক যে সুপ্রাচীন স্থান বর্তমান, চীন পরিব্রাজক ও রাজতরঙ্গিণীর বর্ণনা অনুসারে এই স্থানকেই আমরা জয়ন্তের রাজধানী পৌণ্ড্রবর্ধন নগরী মনে করিতেছি।’
১৯১০ সালের বগুড়া ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার থেকে জানা যায় যে, বগুড়া ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার লেখার সময় জেলার ম্যাজিস্ট্রেট মি. জে.এন. গুপ্তকে উপকরণ সংগ্রহের জন্য মহাস্থানের অনেক জায়গায় খুঁড়তে হয়েছিল এবং মহাস্থান সম্পর্কে তার অনেক বিষয় জানার সুযোগ ঘটেছিল। তিনি মহাস্থানকেই পৌণ্ড্রবর্ধন বলেছেন। এনশিয়েন্ট জিওগ্রাফি অফ ইন্ডিয়া অনুসারে, সার্ভেয়ার জেনারেল ও প্রসিদ্ধ প্রত্নতত্ত্ববিশারদ আলেকজান্ডার কানিংহাম প্রথমে পাবনা’কে পৌণ্ড্রবর্ধন ভেবে ভুল করলেও পরে নিজের ভুল বুঝতে পেরে মত পরিবর্তন করেন। আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া, পঞ্চদশ খণ্ডে তিনি উপযুক্ত প্রমাণ সহকারে বর্তমান বগুড়া জেলার মহাস্থানকেই পৌণ্ড্রবর্ধন বলেছেন। রাজশাহী বিভাগের কমিশনার এফ.জে. মোনাহান কলিকাতার চৈতন্য লাইব্রেরিতে বক্তৃতায় বগুড়া জেলার মহাস্থানকে পৌণ্ড্রবর্ধন স্বীকার করেছেন।
৬
বগুড়া জেলার মহাস্থান গড়ে একসময় প্রচুর জৈনধর্মের অনুসারীদের বসবাস ছিল। অথচ বর্তমান সময়ে এই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের কাউকে দেখা যায় না। চীনা পরিব্রাজক হিউএন সিয়ঙ্গ ৬২৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৬৪৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতবর্ষ ভ্রমণকালে, ৬৪০ খ্রিস্টাব্দে চম্পা, কজঙ্গল হয়ে গঙ্গা নদী পার হয়ে পৌণ্ড্রবর্ধনে এসেছিলেন। তিনি তার ভ্রমণ কাহিনীতে লিখেছেন, পৌণ্ড্রবর্ধনের পরিধি ৮০০ মাইল এবং রাজধানীর পরিধি ৬ মাইল। নগরটা জনবহুল এবং পুষ্করিণী, পুষ্পোদ্যান ও বৃক্ষরাজিতে সুন্দর ও সুশোভিত। এখানকার লোকজন সাধারণত মাটির দেয়াল আর তৃণ আচ্ছাদিত ঘরে বাস করে, তবে সম্পদশালীরা ইটের ঘরে বসবাস করে। এখানে প্রচুর ধান ও কাঁঠাল ফলে, স্থানীয়রা কাঁঠাল খেতে ভালোবাসে। নগরের আবহাওয়া ভালো এবং অধিবাসীরা বেশ বিদ্যানুরাগী। এখানকার পুরুষেরা মাথায় টুপি ব্যবহার করে আর মেয়েরা কাঁধ পর্যন্ত কাপড় দ্বারা আবৃত করে। এখানে হীনযান ও মহাযান মতাবলম্বী বৌদ্ধদের ২০টি সঙ্ঘারাম আছে, সেখানে ৬০০০ ভিক্ষুর বাস। হিন্দুদের মধ্যে শৈব, বৈষ্ণব ও কার্তিকের উপাসক বেশি, ১০০টি হিন্দু দেবালয় আছে। তবে দিগম্বর সম্প্রদায় বা নির্গন্থদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। এছাড়াও অবদান কল্পলতা থেকে জানা যায় যে, শ্রাবস্তিকন্যা বৌদ্ধ সুমাগধা পৌণ্ড্রবর্ধনের বৃষভদত্তের সাথে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। সুমাগধা তার শ্বশুরবাড়ি পৌণ্ড্রবর্ধনে জৈনদের প্রাবল্য দেখেছিলেন। সেসময় পৌণ্ড্রবর্ধনের লোকজন বৌদ্ধধর্মের অস্তিত্ব সম্পর্কে অবগত ছিলনা। সুমাগধা মুণ্ডিতকেশ ও উলঙ্গ জৈনধর্মের অনুসারীদের দেখে যথেষ্ট নিন্দা করেন। সুমাগধার চেষ্টায় বুদ্ধদেব পৌণ্ড্রবর্ধনে এসে নিজ ধর্ম প্রচার করেন। পৌণ্ড্রবর্ধনের যেখানে বুদ্ধদেব ধর্মোপদেশ দিতেন চন্দ্রগুপ্তের দৌহিত্র সম্রাট অশোক পরবর্তীতে সেখানে একটা স্তূপ নির্মাণ করেছিলেন।
মৌর্য্য সম্রাট অশোকের সময়ে বৌদ্ধধর্ম রাজানুকূল্য পেলেও পৌণ্ড্রবর্ধনে তীর্থিক বা বৌদ্ধধর্ম বিরোধী ব্রাহ্মণ এবং জৈন সম্প্রদায় অত্যন্ত প্রবল অবস্থায় ছিল। জৈনধর্ম অনুসারীরা পরবর্তীতে কিভাবে পৌণ্ড্রবর্ধন থেকে অবলুপ্ত হলেন সেসম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না, তবে এই প্রসঙ্গে সম্রাট অশোকের সময়ের একটা ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। সম্রাট অশোকের সহোদর বীতশোক বৌদ্ধধর্মে আস্থাবান না থাকায় অশোকের বিরাগভাজন হন এবং মগধ থেকে পালিয়ে পৌণ্ড্রবর্ধনে আসেন। তিনি এখানে তীর্থিকদের সাথে মিলিত হয়ে প্রকাশ্যে বুদ্ধের নিন্দা করতে থাকেন। অশোক তার ভাইয়ের এমন আচরণে রাগান্বিত হয়ে তার প্রাণবধ করার নির্দেশ দেন। পরে তিনি জানতে পারেন যে, পুণ্ড্রবর্ধনের নির্গন্থরাই সব ষড়যন্ত্রের মূল। এটা জানতে পেরে তিনি রাগান্ধ হয়ে তাদের হত্যার নির্দেশ দেন। তার আদেশে একদিনে ১৮,০০০ হাজার জৈন ধর্মের অনুসারী নিহত হন। ধর্মমতের ভিন্নতার কারণে এসব হত্যাযজ্ঞ যুগেযুগে দেখা যায়, যেমন- ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাজন, বর্তমান ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাত, ১৯৯০-এর দশকে বসনিয়ান যুদ্ধ এবং গণহত্যা, উত্তর নাইজেরিয়ার মুসলিম বনাম দক্ষিণ নাইজেরিয়ার খ্রিস্টান। এসব উদাহরণে দেখা যায় ধর্মীয় ভিন্নতা সংঘাতকে এমনভাবে চালিত করে যে, একসময় এক গোষ্ঠী অন্য গোষ্ঠীর উপর বিদ্বেষ ও সহিংসতা প্রয়োগ করে হত্যাযজ্ঞের দিকে পরিচালিত করে। সময় বদলেছে, মানুষ বদলায়নি।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
২৬ নভেম্বর ২০২৫
হদিস:
১। মৌর্য – আবুল কাসেম
২। মহাস্থান- মোঃ মোশারফ হোসেন ও মোঃ বাদরুল আলম।
৩। পৌণ্ড্রবর্ধন ও করতোয়া- শ্রীহরগোপাল দাসকুণ্ডু
৪। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা
৫। ইন্টারনেট