
১
‘আবাল্য শুনেছি মেয়ে বাংলাদেশ জ্ঞানীর আঁতুড়
অধীর বৃষ্টির মাঝে জন্ম নেন শত মহীরূহ,
জ্ঞানের প্রকোষ্ঠে দেখো, ঝোলে আজ বিষণ্ণ বাদুড়
অতীতে বিশ্বাস রাখা হে সুশীলা, কেমন দুরূহ?’
প্রিয় কবি আল মাহমুদের ‘সোনালি কাবিন’ কাব্যগ্রন্থের অবিস্মরণীয় চরণ যেন আবহমান বাংলার সেই জ্ঞান ও মনীষার ঐতিহ্যকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। এই পুণ্যভূমি যুগে যুগে বহু রথী-মহারথীর জন্ম দিয়েছে, যারা কেবল বাংলা নয়, বৃহত্তর ভারতীয় উপমহাদেশকেও জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করেছেন। এই মহীরুহদের সারিতেই এক প্রাচীন ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছেন বাংলার লোকগুরু মীননাথ। ৭০০ খ্রিষ্টাব্দে চন্দ্রদ্বীপের (বর্তমান বরিশাল) এই বাঙালি মনীষী নাথধর্মের প্রবর্তন করে ভারতবর্ষজুড়ে এক বিশাল ধর্মীয় ও দার্শনিক আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটান। তার প্রচারিত কায়সাধনা এবং শিবত্ব লাভের দর্শন ছিল তৎকালীন বৌদ্ধ সহজযান ও শৈবধর্মের এক অনন্য সংশ্লেষণ। মীননাথ কেবল ধর্মগুরু ছিলেন না, তাকে বাংলা ভাষার আদি কবিদের অন্যতম হিসেবেও গণ্য করা হয়। তার হাত ধরেই নাথসাহিত্য (যেমন- গোরক্ষবিজয়) এবং চর্যাপদের সঙ্গে গভীর সম্পর্কযুক্ত জ্ঞানধারা বিকশিত হয়েছিল। মীননাথের জীবন ও শিক্ষা প্রমাণ করে যে বাংলা সত্যিই জ্ঞানীর আঁতুড়ঘর ছিল, যেখানে আধ্যাত্মিকতা, সাহিত্য ও দর্শনের এক বিশাল ঐতিহ্য সুদূর অতীতেও বিদ্যমান ছিল।
২
মীননাথ: নাথধর্মের প্রবর্তক ও তার পরিচয়।
৭০০ খ্রিষ্টাব্দে চন্দ্রদ্বীপের এক মহান গুরু কীভাবে নাথধর্মের প্রবর্তন করলেন, তার সময়কাল কতটুকু সুনির্দিষ্ট এবং তার কায়সাধনা ও শৈব-বৌদ্ধ সংশ্লেষণের দার্শনিক ভিত্তি কী ছিল, সেই বিষয়ে এবার বিস্তারিত আলোকপাত করা যাক।
ক। মীননাথের পরিচয়, সময়কাল ও বাংলার গৌরব।
নাথধর্মের প্রবর্তক মীননাথ ছিলেন মধ্যযুগে এক বিশাল ধর্মীয় আন্দোলনের মূল স্তম্ভ এবং বাঙালির ইতিহাসে এক গভীর শ্রদ্ধেয় লোকগুরু। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকে তার আবির্ভাব ঘটেছিল বলে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ মত দিয়েছেন। মীননাথের জন্মস্থান নিয়ে ঐতিহাসিক প্রমাণ মেলে প্রাচীন গ্রন্থ ‘কৌলজ্ঞান’-এ, যেখানে উল্লেখ আছে তিনি চন্দ্রদ্বীপের অধিবাসী ছিলেন (বরিশাল জেলার প্রাচীন নাম) । তার বঙ্গীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে ড. শহীদুল্লাহ বাঙালির গৌরব প্রকাশ করে মন্তব্য করেন, একজন বাঙালি হয়ে মীননাথ গোটা ভারতবর্ষকে একটি ধর্মমত দিয়েছিলেন। মীননাথের সময়কালকে আরও সুনির্দিষ্ট করে ফরাসি পন্ডিত সিলভাঁ লেভী উল্লেখ করেন, তিনি ৬৫৭ খ্রিস্টাব্দে রাজা নরেন্দ্রদেবের রাজত্বকালে নেপালে গমন করেন। তিনি কেবলমাত্র মীননাথ নামেই পরিচিত ছিলেন না, বরং মৎস্যেন্দ্রনাথ বা মচ্ছিন্দ্রনাথ নামেও ভারতীয় উপমহাদেশে বিখ্যাত ছিলেন। তার এই নাথপন্থা ভারতবর্ষজুড়ে গৃহীত হয়েছিল এবং তার শিষ্যরা নাথযোগী নামে পরিচিত ছিলেন।
খ। নাথধর্মের দার্শনিক ভিত্তি ও কায়সাধনার শিক্ষা।
মীননাথ প্রবর্তিত নাথধর্মের মূল দর্শন ছিল দেহবাদ বা কায়সাধনা, যা ছিল মূলত বৌদ্ধদের সহজযানী মতবাদ এবং অনার্য দেবতা শিবের উপাসনার এক অনন্য সমন্বয়। মীননাথের মূল শিক্ষা মানুষের দুঃখ-কষ্টের কারণ হলো তার অপক্ক দেহ এবং এই দেহকে শক্ত ও প্রস্তুত করাই মোক্ষ লাভের পথ। তিনি প্রচার করতেন যোগরূপ অগ্নি দ্বারা এই কাঁচা দেহকে পাকা করে অর্থাৎ কঠোর সাধনালব্ধ শক্তিতে প্রস্তুত করে সিদ্ধদেহ বা দিব্যদেহের অধিকারী হওয়া সম্ভব। এই সিদ্ধিলাভের মাধ্যমেই মানুষ অমরত্ব লাভ করতে পারে। নাথযোগীদের এই সাধনা ছিল গুরুপন্থি, যেখানে গুরুর কাছে দীক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে এই যোগমার্গে প্রবেশ করতে হতো। আধ্যাত্মিক উপাস্যের দিক থেকে এই ধর্ম নিরঞ্জন বা শূন্যকে সৃষ্টির আদি উৎস ও উপাস্য বলে মনেকরতো।
৩
নাথধর্মের দার্শনিক ও মতাদর্শগত ভিত্তি।
নাথধর্মের দার্শনিক ভিত্তি ছিল বাংলার বৌদ্ধ সহজযানী মতবাদ এবং অনার্য দেবতা শিবের (শৈবধর্ম) উপাসনার এক শক্তিশালী সংশ্লেষণ। এই ধর্মের মূল দর্শন দেহবাদ ও কায়সাধনা, যেখানে মীননাথ ঘোষণা করেন মানুষের দুঃখের কারণ হলো অপক্ক দেহ। মতাদর্শগতভাবে নাথরা শূন্যবাদকে মেনে চলতেন, যেখানে সৃষ্টির আদি উৎপত্তিস্থল একমাত্র শূন্য (মহাসুখ ও আনন্দস্বরূপ) । ভারতবর্ষজুড়ে এর জনপ্রিয়তার কারণ ছিল অনার্য দেবতা শিবকে কেন্দ্র করে এর অবস্থান, যিনি আর্যদের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে এক বিরাট লোকশক্তি ছিলেন।
ক। নাথধর্মের মূল দর্শন: কায়সাধনা ও অমরত্বের পথ।
আগেই উল্লেখ করেছি, নাথধর্মের দার্শনিক ভিত্তি ছিল দেহবাদ বা কায়সাধনা, যা লোকগুরু মীননাথের শিক্ষার মূলমন্ত্র। এই দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মানুষের দেহকে আধ্যাত্মিক সিদ্ধিলাভের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা। মীননাথের মতে, মানুষের যাবতীয় দুঃখ-শোকের প্রধান কারণ হলো তার অপক্ক দেহ; অর্থাৎ দুর্বল, সাধনাশূন্য ও ক্ষণস্থায়ী নশ্বর শরীর। এই অপূর্ণতাকে দূর করে অমরত্ব লাভ করাই ছিল নাথযোগীদের লক্ষ্য। মুক্তির এই পথটি ছিল কঠোর যোগসাধনার মাধ্যমে। মীননাথের নির্দেশ ছিল, যোগরূপ অগ্নি দ্বারা এই অপক্ক দেহকে পক্ক করে অর্থাৎ সাধনালব্ধ শক্তিতে প্রস্তুত করতে হবে। এই প্রক্রিয়ার ফলস্বরূপ সাধক সিদ্ধদেহ বা দিব্যদেহের অধিকারী হন। এই দিব্যদেহ লাভের চূড়ান্ত পরিণতি ছিল শিবত্ব বা অমরত্ব লাভ, যা ছিল নাথধর্মের পরম পুরুষার্থ। এই ধারণাটি ছিল তৎকালীন বাংলার বৌদ্ধ সহজযানীদের মতবাদের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত, যারা কায়সাধনকেই একমাত্র সত্য মনে করতো এবং রস-রসায়নের সাহায্যে জড় দেহকে দিব্যদেহে রূপান্তরিত করার বিশ্বাস রাখতো, যা নাথধর্ম গ্রহণ করে।
খ। শূন্যবাদ, উপাস্য প্রকৃতি ও বৌদ্ধ-শৈব প্রভাব।
নাথধর্মের মতাদর্শগত ভিত্তি ছিল বৌদ্ধ সহজযান এবং অনার্য শৈবধর্মের (শিবভক্তি) এক অনন্য মিশ্রণ, যা বাংলার ধর্মীয় ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই ধর্মের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো শূন্যবাদ। নাথদের মূলকথা ছিল সৃষ্টির আদি ও অকৃত্রিম উৎপত্তিস্থল হলো একমাত্র শূন্য, যা একই সাথে মহাসুখ এবং আনন্দস্বরূপ। এই শূন্য ঘনীভূত হয়ে প্রথমে শব্দরূপে এবং পরে বিভিন্ন দেবতার রূপ গ্রহণ করে। এই দার্শনিক ধারণার ওপর ভিত্তি করেই নাথদের উপাস্য দেবতা ছিলেন নিরঞ্জন বা শূন্য। তবে নাথপন্থীরা একই সাথে শিবানুসারী ছিলেন। শিব ছিলেন আর্যদের বিশ্বাসের বিপরীত একটি শক্তিশালী অনার্য দেবতা, যার একটি নাম ছিল আদিনাথ। এই মিশ্রণকে ঐতিহাসিক ড. দীনেশচন্দ্র সেন বিশ্লেষণ করে বলেছেন যে, ‘নাথধর্ম বৌদ্ধ ও শৈবধর্মের শ্রেষ্ঠ উপকরণে গঠিত’। এই সমন্বয় নাথধর্মকে বাংলার লোকমানসে জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছিল।
গ। যোগের উৎস ও শিবের জনপ্রিয়তা।
নাথধর্মের মূল সাধনমার্গ যোগ এক প্রাচীন অনার্য ঐতিহ্য। বাংলায় যোগ সাধনার উৎস দ্রাবিড় জাতি, যারা ছিল রহস্যবাদী এবং যোগমার্গকে তাদের প্রধান সাধন পথ হিসেবে ব্যবহার করতো। যোগের মূলে রয়েছে অনার্য দেবতা শিব, যার বিশাল লোকশক্তি আর্যদের ধারণার বিরুদ্ধে জনসমাজে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। এই কারণে নাথধর্ম ভারতবর্ষজুড়ে দ্রুত বিস্তার লাভ করে। নাথদের যোগ সাধনার উদ্দেশ্য ছিল কায়ার মাধ্যমে সিদ্ধিলাভ বা শিবত্ব লাভ করা, যার মাধ্যমে মানুষ অসাধ্য সাধন করতে পারত বলে বিশ্বাস করা হতো। নাথধর্মের এই যোগ ও কায়সাধনার উপর জোর দেয়ার ফলে এর মানবতাবাদী চেতনাও জাগ্রত হয়, যা পরবর্তীকালে ষোড়শ শতকে শ্রীচৈতন্যদেবের ভক্তিবাদী আন্দোলনেও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। এভাবে নাথধর্ম বাংলার ধর্মীয় পটভূমিতে দ্রাবিড়, বৌদ্ধ ও শৈব ঐতিহ্যের সংযোগ ঘটিয়ে এক বিশাল সাংস্কৃতিক পরিবর্তন এনেছিল।
৪
সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অবদান।
নাথধর্ম বাংলা সাহিত্যের জন্মলগ্নে এক মৌলিক ভূমিকা পালন করেছিল, যার প্রবর্তক মীননাথকে ঐতিহাসিকেরা বাংলা ভাষার আদি কবিদের অন্যতম বলে মনেকরেন। মীননাথের রচিত ‘বাহ্যান্তর-বোধিচিত্ত বঙ্গোপদেশ’ গ্রন্থটিকে বাংলা ভাষার প্রথম নিদর্শন হিসেবে গণ্য করা হয়। এই ধর্মকে কেন্দ্র করেই ‘গোরক্ষবিজয়’ ও ‘ময়নামতীর গান’-এর মতো বিখ্যাত নাথসাহিত্য রচিত হয়েছিল। নাথসাহিত্যের সঙ্গে চর্যাপদের গভীর সম্পর্ক ছিল, যা উভয় ধারায় সাধারণ সিদ্ধনাম পাওয়ার মাধ্যমে প্রমাণিত।
ক। আদি বাংলা ভাষার নিদর্শন ও প্রবর্তক।
মীননাথকে ঐতিহাসিকেরা বাংলা ভাষার আদি কবিদের অন্যতম বলে মনে করেন। এই স্বীকৃতি বাঙালি সাহিত্যিক ঐতিহ্যের প্রাচীনত্বকে নির্দেশ করে। গবেষকরা মীননাথের রচিত ‘বাহ্যান্তর-বোধিচিত্ত বঙ্গোপদেশ’ নামক গ্রন্থটিকে পন্ডিতেরা বাংলা ভাষার প্রথম নিদর্শনগুলির মধ্যে অন্যতম বলে গণ্য করেন। এটি প্রাকৃত ও অপভ্রংশের পর্যায় থেকে বাংলা ভাষার নিজস্ব রূপে উত্তরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
খ। স্বতন্ত্র সাহিত্যধারা: নাথসাহিত্য।
নাথধর্মকে কেন্দ্র করেই বাংলায় এক শক্তিশালী ও স্বতন্ত্র সাহিত্যধারা গড়ে উঠেছিল, যা নাথসাহিত্য নামে পরিচিত। এই সাহিত্য প্রধানত গুরু-শিষ্যের কাহিনি, অলৌকিক ক্ষমতা ও কায়সাধনার পদ্ধতি নিয়ে রচিত। এই ধারার দুটি বিখ্যাত ও জনপ্রিয় কাব্য হলো, গোরক্ষবিজয় এবং ময়নামতীর গান। গোরক্ষনাথের গুরু মীননাথ ছিলেন প্রাজ্ঞ যোগী এবং মহাজ্ঞানের অধিকারী। মীননাথ নাথধর্ম প্রচারের জন্য একসময় কদলীনগরে যান। সেই নগরে পৌঁছে নারীদের দেখে মীননাথের মধ্যে কামভাব জাগ্রত হয় এবং তিনি ধর্মচূত হন। শেখ ফয়জুল্লাহ তার ‘গোরক্ষবিজয়’ কাব্যে মীননাথ এর অবস্থা এভাবে তুলে ধরেছেন:
‘কহিলেন মীননাথ মনে মায়া ধরি।
জগতেও পাই যদি এমন সুন্দরী।
বিচিত্র শয্যাতে থাকি হেন নারী লই।
রঙ্গ কৌতুকরসে রজনী পোয়াই।’
ময়নামতীর গান কাব্যে রানী ময়নামতী ও তার পুত্র গোপীচন্দ্রের কাহিনি অবলম্বনে রচিত, যেখানে যোগসাধনার মহিমা তুলে ধরা হয়েছে। এই কাব্যগুলি শুধু সাহিত্য নয়, বাংলার লোকসংস্কৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং পালাগানের মাধ্যমে যুগ যুগ ধরে সমাজে প্রচলিত থেকে বাংলার সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে।
গ। চর্যাপদ ও ভাষার ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্ক।
নাথসাহিত্যের সঙ্গে বৌদ্ধ সহজযানী সিদ্ধাচার্যদের রচিত চর্যাপদের গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। এই উভয় ধারার মধ্যেকার যোগসূত্রটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তার ‘বাংলা সাহিত্যের বিকাশের ধারা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, নাথসাহিত্য ও চর্যাপদ—উভয় ধারাতেই সিদ্ধদের কয়েকটি সাধারণ নাম পাওয়া যায়। এই সাধারণ নামগুলি প্রমাণ করে যে নাথযোগী এবং সিদ্ধাচার্যরা একই আধ্যাত্মিক ও সাহিত্যিক ঘরানার অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ভাষাতাত্ত্বিক দিক থেকে নাথযোগী এবং সিদ্ধাচার্যরাই বাংলা ভাষার জন্মকালে অবহট্টের নতুন ঐতিহ্য নির্মাণ করেছিলেন। গোপাল হালদারের মতে এই অবহট্টের ঐতিহ্য বাংলা সাহিত্যের জন্মকথার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে নাথপন্থীরা কেবল ধার্মিক গুরু ছিলেন না, তারা বাংলা ভাষা ও তার আদি সাহিত্যের আদি নির্মাতা ও সংরক্ষক ছিলেন।
৫
সামাজিক প্রথা ও নাথযোগীর জীবন।
নাথযোগীদের জীবনযাত্রা ছিল কঠোরভাবে গুরুপন্থি এবং সুনির্দিষ্ট আচার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। নিচে বিস্তারিত ভাবে উল্লেখ করছি:
ক। দীক্ষা পদ্ধতি ও জীবনশৈলী (গুরুপন্থি)।
নাথযোগীদের জীবনধারা ছিল কঠোরভাবে গুরুপন্থি এবং তা ছিল অত্যন্ত স্বতন্ত্র। দীক্ষা গ্রহণের প্রক্রিয়াটি ছিল তিন দিনের একটি সুনির্দিষ্ট আচার। প্রথম দিনে গুরু শিষ্যের চুল কেটে দিতেন, যা নতুন জীবনে প্রবেশের প্রতীক। দ্বিতীয় দিনটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ, যখন শিষ্যের কানে কুন্ডুল পরানো হতো। চূড়ান্ত তৃতীয় দিনে উপদেশী দীক্ষা প্রদান করা হতো এবং রাতে অনুষ্ঠিত হতো বিশেষ উৎসব ‘জ্যোৎস্না-জাগান’, যেখানে সারারাত দীপ জ্বেলে অনুষ্ঠান করা হতো। এই যোগীরা ছিলেন মূলত গৃহত্যাগী সাধক, যাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল কায়সাধনার মাধ্যমে সিদ্ধি অর্জন। তাদের খাদ্য তালিকার মধ্যে বিদ্যমান কচুশাক এবং কুলবৃক্ষ হিসেবে বকুলকে গণ্য করা লোকায়ত জীবনশৈলীর পরিচয় দেয়।
খ। বেশভূষা ও অন্ত্যেষ্টি প্রথা।
নাথযোগীদের বাহ্যিক বেশভূষা ছিল তাদের দেবতা শিবের বেশের অনুরূপ। তারা মাথায় জটা ধারণ করতেন এবং সর্বাঙ্গে ছাইভস্ম মেখে থাকতেন। তাদের কানে কড়ি ও কুন্ডল, বাহুতে রুদ্রাক্ষ, গলায় সুতা, হাতে ত্রিশূল এবং কাঁধে ঝুলি ও কাঁথা থাকতো। এই বেশভূষা তাদেরকে লোকসমাজে সহজে চিহ্নিত করতো এবং সন্ন্যাসী পরিচয়কে তুলে ধরতো। মারা গেলে নাথধর্মের অনুসারীদের জন্য অন্ত্যেষ্টক্রিয়া প্রথা ছিল অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের থেকে আলাদা। তাদের নিয়ম অনুযায়ী মৃতদেহ কবর দেয়া হতো, যদিও তাদের সংস্কারের ক্ষেত্রে কিছু নিয়মকানুন সনাতন ধর্মালম্বীদের মতো ছিল, যা নাথধর্মের বৌদ্ধ, শৈব ও লোকায়ত ঐতিহ্যের সংমিশ্রণকে নির্দেশ করে।
৬
নাথধর্মের বিলুপ্তি এবং পরবর্তী প্রভাব।
একাদশ শতকে সেন রাজাদের পীড়ন ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে বাংলায় নাথধর্ম বিলুপ্ত হয়ে যায়, যার ফলে এর অনুসারীরা ‘যুগী’ নামে পরিচিত হন। তবে এর বিশ্বাস সম্পূর্ণরূপে মুছে যায়নি। নাথধর্মের মানবতাবাদী চেতনা এবং যোগের আদর্শ পরবর্তীকালে শ্রীচৈতন্যদেবের ভক্তিবাদী আন্দোলন এবং আজকের হিন্দুধর্মে স্থায়ীভাবে মিশে এক গভীর সাংস্কৃতিক প্রভাব রেখে গেছে।
ক। বিলুপ্তির কারণ ও সেন রাজাদের পীড়ন।
খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকে বাংলার লোকগুরু মীননাথের মাধ্যমে নাথধর্মের উত্থান হলেও, একাদশ শতকের পরে এটি বাংলায় বিলুপ্তির পথে যায়। এই পতনের প্রধান কারণ ছিল সে সময়কার রাজনৈতিক পটপরিবর্তন। একাদশ শতকে ব্রাহ্মণ্যবাদী সেন রাজারা বাংলার ক্ষমতা দখল করেন এবং তাদের শাসনকালে হিন্দু ধর্মের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। সেন শাসকেরা নাথযোগীদের ধর্মহীন আখ্যা দিয়ে নির্মমভাবে পীড়ন ও অত্যাচার শুরু করেন। পীড়ন ও রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাব শক্তিশালী নাথ আন্দোলনের সাংগঠনিক ভিত্তি হারায়। এরফলে নাথপন্থীরা তাদের ধর্মীয় পরিচিতি ও সামাজিক মর্যাদা রক্ষা করতে পারেননি, যা বাংলায় এই প্রাচীন লোকধর্মের বিলুপ্তিকে অনিবার্য করে তোলে।
খ। নাথযোগীদের পরিণতি: ‘যুগী’ পরিচয়ে রূপান্তর।
সেন রাজাদের অত্যাচার ও ধর্মীয় নিপীড়নের মুখে নাথযোগীরা তাদের মূল সাধনমার্গ থেকে সরে আসতে বাধ্য হন। এই পীড়নের ফলে তাদের সামাজিক পরিচয় ও বৃত্তিগত ক্ষেত্রে এক বিশাল পরিবর্তন আসে। নাথযোগীরা তাদের পূর্বের গুরুপন্থি সাধনমার্গ ত্যাগ করে নিজেদের ‘যুগী’ নামে পরিচয় দিতে শুরু করেন। জীবনধারণের জন্য তারা তাদের মূল বৃত্তি হিসেবে বেছে নেন কাপড় বোনা। এই পরিবর্তন একাধারে ছিল তাদের অসহায়তা ও টিকে থাকার সংগ্রাম। এক সময়ের শক্তিশালী এবং ভারতবর্ষজুড়ে বিস্তৃত একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অনুসারীরা এভাবে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে এক প্রান্তিক অবস্থানে চলে আসেন। ‘যুগী’ পরিচয়টি নাথধর্মের বিলুপ্তির পরে তাদের পরিবর্তিত সামাজিক অবস্থানকে চিহ্নিত করে।
গ। বিশ্বাসের জগতে নাথধর্মের স্থায়ী অবদান।
নাথধর্ম বাংলায় সাংগঠনিকভাবে বিলুপ্ত হলেও, এর আদর্শ ও বিশ্বাস বাঙালির মনোজগতে স্থায়ী প্রভাব ফেলে গেছে। এই ধর্মটি পরবর্তীকালে শিবের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আজকের হিন্দুধর্মে মিশে গেছে এবং লোকায়ত বিশ্বাসের অংশ হয়ে টিকে আছে। নাথধর্মের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান এর মানবতাবাদী চেতনা, যেখানে কায়সাধনা এবং সরল জীবনযাপনকে গুরুত্ব দেয়া হতো। এই মানবতাবাদী আদর্শ ষোড়শ শতকের শ্রীচৈতন্যদেবের প্রবর্তিত ভক্তিবাদী আন্দোলনের অন্যতম অনুপ্রেরণা ছিল বলে ঐতিহাসিকেরা মনেকরেন। এইভাবে সরাসরি নাথধর্ম টিকে না থাকলেও এর শূন্যবাদ, যোগের ধারণা এবং মানবতাবাদের মতো মূল উপাদানগুলি বাংলার ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক ধারাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে আজও প্রাসঙ্গিক হয়ে আছে।
৭
বাংলার লোকগুরু মীননাথ সূচিত নাথ ধর্ম বৌদ্ধ সহজযান ও অনার্য শৈবধর্মের উপাদানে গঠিত হয়েছিল, যেখানে কায়সাধনা এবং যোগের মাধ্যমে শিবত্ব বা অমরত্ব লাভ করাই ছিল প্রধান লক্ষ্য। মীননাথ শুধু ধর্মগুরুই ছিলেন না, তাকে বাংলা ভাষার আদি কবিদের অন্যতম মনে করা হয় এবং নাথসাহিত্য তার হাত ধরেই বিকশিত হয়েছিল। যদিও সেন রাজাদের পীড়নে এই ধর্ম একাদশ শতকের পরে বিলুপ্ত হয়ে এর অনুসারীরা ‘যুগী’ নামে পরিচিত হন, তবুও নাথধর্মের প্রভাব বাংলা থেকে মুছে যায়নি। এর শূন্যবাদ ও মানবতাবাদী চেতনা পরবর্তীকালের শ্রীচৈতন্যদেবের ভক্তিবাদী আন্দোলন এবং আজকের লোকায়ত হিন্দুধর্মে স্থায়ীভাবে মিশে গেছে। মীননাথ প্রবর্তিত এই প্রাচীন আন্দোলন তাই বাংলার ধর্মীয়, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অম্লান ধারা হিসেবে আজও বিদ্যমান।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
২৯ নভেম্বর ২০২৫
হদিস:
১। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ- বাঙলা সাহিত্যের কথা
২। ড. দীনেশচন্দ্র সেন- বঙ্গভাষা ও সাহিত্য
৩। ড. আর এম দেবনাথ- সিন্ধু থেকে হিন্দু।
৪। আজহার ইসলাম-বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস (প্রাচীন ও মধ্য যুগ)
৫। বাংলাপিডিয়া
৬। ইন্টারনেট