
১.১
গতকাল ১৩ এপ্রিল ২০২৫, রবিবার, ঢাকার মেরুল বাড্ডায় আন্তর্জাতিক বৌদ্ধবিহার প্রাঙ্গণে ‘সম্প্রীতি ভবন’ এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান স্যারের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম। সেনাবাহিনীর নিজস্ব অর্থায়নে ২৪ ইঞ্জিনিয়ার কন্সট্রাকশন ব্রিগেডের তত্ত্বাবধানে এই ভবন নির্মিত হবে জেনে ভালো লাগলো। অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বক্তৃতা দেয়ার পর সেনাপ্রধান তাঁর বক্তব্যে বলেন, এ দেশ সবার। সম্প্রীতি বজায় রেখে আমরা একত্রে বসবাস করতে চাই। তিনি হিংসা-বিদ্বেষবিহীন দেশ গড়ার কথা বললেন। বরাবরের মত তিনি দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপরে গুরুত্বারোপ করে হানাহানি-বিদ্বেষ থেকে দূরে থাকার কথার পুনরাবৃত্তি করেন। মতের ভিন্নতা বজায় রেখেও তিনি একে অপরের প্রতি বক্তব্য ও আচরণে শ্রদ্ধাশীল হবার কথা বলেছেন। স্যার এই কথাগুলো অবশ্য জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ের প্রথমদিন থেকেই বলে আসছেন। ‘বিডিআর বিদ্রোহ’ নিয়ে জেনারেল ওয়াকার স্যারের মতামতের সাথে দ্বিমত পোষণ করেই আমি কিছুদিন ধরে তাকে নিয়ে দু’কলম লেখার কথা ভাবছিলাম।
লেখার শুরুতেই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'জীবিত ও মৃত' গল্পের সেই বিখ্যাত লাইনের কথা মনেপড়লো, ‘কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল, সে মরে নাই’। স্যার যেহেতু বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরসম্পর্কের আত্মীয় তাই তাকে কর্ম ও ভাবনায় নিজ অবস্থান যেন বারবার প্রমাণ করতে হচ্ছে। তাঁর কাছে এই বিড়ম্বনা অবশ্য নতুন না, কেননা এই দূর সম্পর্কের আত্মীয়তার কারণে তিনি যথাসময়ে প্রমোশন থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন, তাকে প্রমোশন বোর্ডে অতিক্রান্ত করা হয়েছিল। এই কষ্ট কতোটা নির্মম ও কঠিন তা আমরা জানি, অথচ বরাবর তিনি ছিলেন স্থির এবং অবিচল। সেসময়ে তাঁর সাথে যারা চাকুরী করেছিলেন তাদের অনেকের কাছে শুনেছি, প্রমোশন বোর্ডে বঞ্চিত হওয়া নিয়ে তিনি কখনো আক্ষেপ করেননি।
১.২
আমরা অনেকেই ভেবেছিলাম ৮ বিএমএ লং কোর্সের ক্যাডেট, জেনারেল আজিজ আহমেদ-এর পর তিনিই সেনাপ্রধান হতে যাচ্ছেন। কেননা বিভিন্ন কারণে ১৩ বিএমএ লং কোর্স আর্মিতে একটা নামকরা কোর্স, আর্মিতে তাদের আগে এবং পরে এরকম আরও বেশকিছু কোর্স আছে। বর্তমানে তিন বাহিনীর প্রধান একই কোর্সের, এরকমটা ভবিষ্যতে আর কখনো হবে বলে মনেহয় না। তবে সেবারের ‘ইঁদুর দৌড়’-এ ৯ বিএমএ লং কোর্স থেকে জেনারেল শেখ মোহাম্মদ শফিউদ্দিন আহমেদ সেনাপ্রধান নিযুক্ত হয়েছিলেন। আমরা সবসময়ই জানতাম সেনাপ্রধান হতে হলে নিজের উজ্জ্বল ক্যারিয়ারের পাশাপাশি রাজনৈতিক সরকারের ব্লেসিংস থাকতে হয়, তাই এনিয়ে কারো কাছ থেকে বিরূপ অভিব্যক্তির প্রকাশ দেখিনি। কেননা এই প্রথা পৃথিবীর সবখানেই কম বা বেশি চালু আছে। মুঘল বা সুলতানি আমলে রাজা-বাদশাহরাও তাদের ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজনদের সিপাহসালার হিসেবে নিয়োগ দিতেন। জেনারেল ওয়াকার স্যারের সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ তাই অস্বাভাবিক কিছু ছিল না এবং এনিয়ে আর্মিতে অফিসারদের মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ছিলনা। বরং তিনি সেনাপ্রধান হওয়াতে অফিসারদের বেশিরভাগই খুশী হয়েছিলেন বলে জানি। সেসময়ে ক্ষমতার বলয়ের আশেপাশে বেশকিছু দুর্বৃত্ত জেনারেলের তুলনায় তিনি অনেক ভদ্র-মার্জিত এবং নিরহঙ্কারী। তিনি তাঁর অনাড়ম্বর ও সহজ-সরল জীবন যাপনের জন্য পরিচিত। মৃদুভাষী এই জেনারেলের কাছে যেকোন অফিসার যে কোন প্রয়োজনে পৌঁছাতে পারতো জানি। তবে লেফটেন্যান্ট জেনারেল নূরুদ্দীন খান যেমন প্রেসিডেন্ট এরশাদের রঙ (wrong) সিলেকশন, জেনারেল মঈন উদ্দিন আহমেদ যেমন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রঙ সিলেকশন, তেমনি জেনারেল ওয়াকার- উজ- জামান প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রঙ সিলেকশন। অন্য দু’জন সরকার প্রধান সেটা অনেক আগেই হাড়েহাড়ে টের পেয়েছেন, তেমনই শেখ হাসিনাও বর্তমানে ভারতের মাটিতে বসে তা মর্মেমর্মে অনুভব করছেন। জেনারেল ওয়াকার স্যার সেদিন যথাযথ দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে ছিলেন অবিচল এবং স্থির, আমরা সেটা জানি। সেদিনের ঘটনার প্রতি মিনিটের বর্ণনা একজন অফিসারের কাছে শুনেছি। এই তিন সেনাপ্রধান আসলে দেশের জনগনের হৃৎস্পন্দন বুঝতে পেরেছেন, তাই তাদের সাথে একাত্ম ছিলেন। তারা কেউই নিজের বিপদের কথা না ভেবে জীবনের সেরা ঝুঁকিটা নিয়েছিলেন এবং তারা জানতেন কোন কারণে ফেইল করলে নিজের জীবন বিসর্জন দিতে হতো। বাবলের বাইরে বসে বিরূপ মন্তব্য করা, গলাবাজি বা আস্ফালন করা আর বাবলের ভিতরের তপ্ত হাওয়ায় বসে সিদ্ধান্ত নেয়া এক না! এটা আবালেরা বুঝবে না, এমবিএমএল-এআর(আর)-এআর(আই) এর কঠোর নিয়মের শৃঙ্খলে আবদ্ধ আমরা সামরিক অফিসাররা বুঝি। বিদ্রোহের একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
১.৩
ইতিহাস একদিন জেনারেল ওয়াকার স্যারকে তার অবদানের জন্য স্মরণ করবে। গত শনিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে রাওয়াতে অনুষ্ঠিত সেমিনারে আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক মাহমুদুর রহমান যেভাবে লেফটেন্যান্ট জেনারেল নূরুদ্দীন খান স্যারের অসামান্য অবদানের কথা সেমিনারে উপস্থিত সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
আমি ভাবছিলাম, জেনারেল ওয়াকার স্যারের জায়গায় যদি জেনারেল আজিজ সেনাপ্রধান হিসেবে থাকতেন! কিংবা ক্ষমতালিপ্সু লেফটেন্যান্ট জেনারেল মামুন খালেদ বা মুজিব যদি থাকতেন তাহলে দেশের সামনে কী ভয়াবহ ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করতো! বেপরোয়া হাসিনা এবং তার অনুগত কিছু জেনারেলরা দেশে কীভাবে রক্তের বন্যা বইয়ে দিত তা ভাবলেও গা শিউড়ে ওঠে।
২.১
প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন গত ২৬ মার্চ ২০২৫ তারিখে বঙ্গভবনে স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে সংবর্ধনা ও ইফতার মাহফিলের আয়োজন করেছিলেন। সেই অনুষ্ঠানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, কূটনীতিক ও বিশিষ্টজনদের সাথে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানও অংশ নেন। ইফতারের পর সেখানে মাগরিবের নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা ছিল, জেনারেল ওয়াকার স্যার সেই জামাতে ইমামতি করেন। এর পরপরই ফেসবুকের বিভিন্ন ওয়ালে-গ্রুপে সেটার ছবি ছড়িয়ে পড়ে এবং ভাইরাল হয়। অনেকে এটা নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করলে তাঁর কোর্সমেট এবং বাংলাদেশ ডিফেন্স জার্নালের সম্পাদক লেফটেন্যান্ট আবু রুশদ মোঃ শহিদুল ইসলাম (অবঃ) স্যার সেসব সমালোচনার কড়া জবাব দেন। তিনি লেখেন,
‘আমার বন্ধু জেনারেল ওয়াকারের ইমামতি প্রসঙ্গে: সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার নামাজে ইমামতি করছেন এমন একটি ছবি ভাইরাল হয়েছে। সেনাপ্রধান ইমামতি করেন? উনি কি সেনাপ্রধান হওয়ার পর এটা শুরু করেছেন? প্রশ্ন অনেকের।
আবার অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও তির্যক মন্তব্য করছেন অনেকে! জেনারেল ওয়াকার বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে আমার কোর্সমেটই শুধু ছিলেন না, তিনি আমার রুমমেটও ছিলেন। বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর কোম্পানিতে আমরা একই প্লাটুনে প্রশিক্ষণের দুই বছর কাটিয়েছি ১৯৮৪-৮৫ সালে। আবার তৃতীয় টার্মে দুইজন একই প্লাটুন কমান্ড করেছি। মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষণ কেমন তা নিয়ে বেশিরভাগ মানুষের কোনো ধারণা নেই। বিশেষ করে প্রথম ও দ্বিতীয় টার্মে বাপ-দাদার নাম ভুলে যাওয়ার অবস্থা হয়। একটু ঘুমানোর সময় বের করা এরমধ্যে স্বর্গীয় সুখের মতো অনুভূতি তৈরি করে। আমরা সবাই কোনোভাবে ঘুমাতে পারলে বাঁচি। শীতের রাতে পানি, কাদায় মাখামাখি হয়ে যখন রুমে আসতাম তখন গোসলটা করে সোজা বিছানায়। এর মধ্যেও তদানীন্তন (ক্রমান্বয়ে) জেন্টলম্যান ক্যাডেট-ল্যান্স করপোরাল-কোম্পানি কোয়ার্টার মাস্টার সার্জেন্ট ওয়াকার গোসল করে ওজু করে নামাজ পড়তে দাঁড়িয়ে যেত। কাজা নামাজসহ সব আদায় করে ঘুমাতে যেত।
আমিসহ আমাদের কোর্সের ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ ক্যাডেট ওইভাবে নামাজ আদায় করতে পারিনি। আমাকে কত যে হেদায়েতের চেষ্টা জে. ওয়াকার করেছেন! আই প্রেফারড স্লিপ!!!হি প্রেফারড প্রেয়ার!আরেকজন এমন ছিল কর্নেল নুরুল। উনিও ফাইনাল টার্মে আমার রুমমেট ছিলেন যখন দুইজনই আমরা আন্ডার অফিসার ছিলাম। ওই তরুণ-যুবক বয়সে জেনারেল ওয়াকারকে কাছে থেকে যতোটুকু দেখেছি তাতে তিনি ছিলেন অতি নরম মনের একজন মানুষ। এ নিয়ে আমরা উনাকে খেপাতাম। জুনিয়রদের যেখানে আমি কঠোর, কঠিন, মিলিটারি বুলশিট করতাম উঠতে বসতে যাতে অবধারিতভাবে স্ল্যাং থাকতো সেখানে জেনারেল ওয়াকার একটা স্ল্যাং ইউজ করতো না!
২.২
আমাকে কেউ হাজার কোটি টাকার প্রলোভন দেখালেও আমি মিলিটারি একাডেমির সেসব কঠিন দিনগুলোয় আর ফিরে যেতে চাই না। মিলিটারি একাডেমির দু’বছর সময়ে আমি সম্ভবত কোন শুক্রবারে নামাজ পড়তে মসজিদে যাইনি। কেননা আমার কাছে পুরো সপ্তাহের হাড়ভাঙা ট্রেনিঙের পর শুক্রবার মানে যেন অসাড় হয়ে বিছানায় পড়ে থাকার দিন, একটানা ঘুমানোর দিন। আমরা এমনকি ফার্স্ট টার্মে স্যালুটিং টেস্টে পাশ করার পরও চট্টগ্রাম শহরে ঘুরতে না গিয়ে, জামানের বিরিয়ানি খাবার লোভ সামলে কিংবা একাডেমির অডিটোরিয়ামে ফ্রিতে মুভি না দেখে ডিনারের পূর্বমুহুর্ত পর্যন্ত রুমে ঘুমাতে ভালবাসতাম। আমি জানি আমার মত একই অভিজ্ঞতা আরও অনেকের। অথচ সেই কঠিন দিনগুলোতেও জেন্টলম্যান ক্যাডেট ওয়াকার নিয়মিত নামাজ আদায় করতেন। ধর্মের প্রতি কতোটা অনুগত থাকলে একটা মানুষ এরকম হতে পারেন! আমরা স্যারকে সবসময়ই একজন ধর্মভীরু অফিসার হিসেবেই জেনেছি, সেটা তিনি লাইম লাইটে কিংবা সুপারসিটেড হবার যন্ত্রণা, যেখানেই থাকুন না কেন। অথচ তাকে নিয়ে যেভাবে ট্রলিং করা হয়, অসম্মান করে যেভাবে গালিগালাজ করা হয় তাতে তার অবস্থা গোলগোথা’র যীশুর চেয়ে কোন অংশে কম নয়। আমি জানি জেনারেল ওয়াকারের পরিবর্তে জেনারেল মইন ইউ আহমেদ কিংবা জেনারেল আজিজ সেনাপ্রধানের পদে থাকলে তাদেরকে সাত হাত মাটির ভেতর থেকে হলেও খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নিতেন।
সেনাপ্রধান আসলে ধৈর্য্য ধরতে জানেন এবং তিনি ধৈর্য্য ধরেন। তাকে নেটিজেনদের চরম সমালোচনার মাঝেও অবিচল এবং স্থির দেখে আমি অবাক হই, নিজেকেই জিজ্ঞেস করি তিনি এত শক্তি কোথা থেকে পান? আমার ধারণা তিনি এই শক্তি পান তার নির্ভেজাল ধর্মচর্চা থেকে, কেননা মহান আল্লাহ্তায়ালা বলেছেন,
‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা যখন কোনো দলের মোকাবেলা করবে তখন অবিচলিত থাকবে ও আল্লাহ্কে বেশি ক’রে মনে করবে, যাতে তোমরা সফল হও। আর আল্লাহ্ ও তাঁর রসুলের আনুগত্য করবে আর নিজেদের মধ্যে বিবাদ করবে না; করলে তোমরা সাহস হারাবে ও তোমাদের মনের জোর চলে যাবে। তোমরা ধৈর্য ধরবে, আল্লাহ্ তো ধৈর্য্যশীলদের সঙ্গেই রয়েছেন’ (সুরা আনফালঃ ৪৫-৪৬) ।
২.৩
২৪ মার্চ ২০২৫ তারিখ সকাল সাড়ে দশটায় সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার ঢাকা সেনানিবাসে অফিসার্স এড্রেসে বক্তব্য রাখেন। সেখানে ঢাকা ও মিরপুর সেনানিবাসের অফিসাররা সশরীরে উপস্থিত ছিলেন এবং অন্যান্য ফরমেশন ও ইউএন মিশনের অফিসাররা ভিটিসির মাধ্যমে এড্রেসে’র সাথে যুক্ত ছিলেন। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী এক অফিসারের বর্ণনায় সেনাপ্রধান সেখানে অফিসারদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি দেশ ও জাতি আমাদের এই অবদান আজীবন কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করবে।’ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মহলের প্রভোকেশনের পরও অফিসাররা সবাই যে ঠিকঠাক দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন সেজন্য সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘রিঅ্যাক্ট করো না। নবীর হাদিসে আছে রাগকে দমন করতে হয়। আমাদের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না। আমাদের দায়িত্ব স্ট্যাবিলিটি অর্জনের মাধ্যমে দেশে জনগণের নির্বাচিত সরকার ব্যবস্থা আনতে সর্বাত্মক সহায়তা প্রদান করা। দেশ এবং সেনাবাহিনীর আইন ও নিয়মনীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া ও মেনে চলা। দেশ ও জাতির সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। মনেরাখবে এটা করতে পারাই আমাদের বিজয়। আর এই কাজ করবে সততা, পরিশ্রম, প্রত্যয় ও সহনশীলতার সাথে। কোনো প্রকার প্রভোকেশনে রিঅ্যাক্ট করো না। আমার সৈনিকদেরকেও বলবে এই কথা। প্রজ্ঞা দিয়ে কাজ করো। দেশ ও জাতি আমাদের কাছে অনেক কিছু প্রত্যাশা করে। আর সেটা রক্ষা করা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব।’
২.৪
লেফটেন্যান্ট আবু রুশদ মোঃ শহিদুল ইসলাম (অবঃ) স্যারের আরেকটা বক্তব্য দিয়ে এই পর্বের ইতি টানবো। স্যার লিখেছেন, ‘সমালোচনা করেন ভালো। সমালোচনার অধিকার সবার আছে। আমরা যখন গণতন্ত্র চাই তখন সমালোচনা থাকবেই, কিন্তু সেটা তো সভ্যভাবেও করা যায়। শালীন ভাবেও করা যায়। কিন্তু কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই, আছে অকল্পনীয় অসভ্যতা, চরম বেয়াদবি, অশালীন ভাষা প্রয়োগ। জানি না এখন পরিবারে, মাদ্রাসায়, স্কুলে এসব শিখানো হয় কিনা?!
জেনারেল ওয়াকার নামাজ পড়ে আসছেন বয়স অনুযায়ী সেটা তার ওপর ফরজ হওয়ার পর থেকে। এখনো পড়ছেন, ইমামতিও করছেন। আমি, আমরা বেশিরভাগ সেটা পারিনি। পার্থক্য এখানেই। আর নামাজ, রোজা, হজ সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয়। আল্লাহর সঙ্গে ফয়সালা। ধন্যবাদ’
৩.১
সামরিক পেশা পৃথিবীর আদিমতম পেশার একটি। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর উত্তরসূরি এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পরপর, ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ তারিখে এই বাহিনীর মেরুদণ্ড তথা ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট গঠন করা হয়। ২১ নভেম্বর ১৯৭১ সালে যুদ্ধের ময়দানে যখন সশস্ত্র বাহিনী গঠিত হয় তখন সেনাবাহিনীর শক্তি বলতে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ০৮টি ইউনিটকে বোঝাতো (১ম, ২য়, ৩য়, ৪র্থ, ৮ম, ৯ম, ১০ম, ১১তম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট; ৫ম, ৬ষ্ঠ, ৭ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট পাকিস্তানে মোতায়েন থাকায় যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারে নাই)। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপরে প্রতিষ্ঠিত সেনাবাহিনীর অফিসাররা যুদ্ধ শুরুর অল্পদিনের মধ্যেই ভারতীয় আধিপত্যবাদের স্বরূপ আবিষ্কার করতে সক্ষম হন। মেজর জিয়া ব্যাটেল অভ কামালপুরে এটা মর্মেমর্মে অনুভব করেছেন বলে আমার ধারণা। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অফিসাররা শত্রু-মিত্র চিনতে সক্ষম এবং দু’একজনের পদস্খলনের দায় পুরো বাহিনীর উপরে বর্তায় না। সেনাবাহিনী একটা বিশাল মহীরুহ, যুগেযুগে যেসব বিপথগামীরা দূর্নীতির সাথে জড়িয়েছে কিংবা দেশের সাথে বিট্রে করেছে তারা নিজেরাই ঝরে পড়েছে, ইতিহাস তাদের ক্ষমা করেনি।
সম্প্রতি যে ভারতীয় আধিপত্যবাদের গল্প বলা হয় এই গল্প শুনেছি ১৯৯১ সালে, যখন রংপুর সেনানিবাসে ছিলাম। মেজর জেনারেল আমসাআ আমিন তখন ৬৬ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি, তিনি এই ডিভিশনের নামকরণ করেছিলেন ‘Defender of the Strategic North’, সংক্ষেপে ‘Destranor Division’. তিনিই সর্বপ্রথম শিলিগুড়ি করিডোরের গুরুত্ব উপলব্ধি করে সেটাকে ঘিরে Winter Collective Training conduct করিয়েছিলেন। তখন সবেমাত্র বিএমএ থেকে পাসআউট করে ইউনিটে যোগ দিয়েছি, আমার মনেপড়ে ঠাকুর গাঁ এয়ারপোর্টে সেই ঘটনাবহুল Exercise Called Off হয়েছিল। রংপুর সেনানিবাস অফিসার মেসে একটা স্টাডি পিরিয়ডের আয়োজন করা হয়েছিল, সম্ভবত ১৯৯২/৯৩ সালের দিকে। স্টাডি পিরিয়ডের সাবজেক্ট ছিল ভারতীয় আগ্রাসন এবং আমাদের করণীয়। ভারতীয় সামরিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক আগ্রাসন মিলে সেটা ছিল এক পূর্ণাংগ প্যাকেজ। স্বাধীন বঙ্গভূমি আন্দোলন বা চিত্তরঞ্জন সূতারের গল্প তখন শুনেছি।
উলফল্যান্ড রণকৌশল আমাদের মুখস্ত। আমরা ইউনিট- ব্রিগেড- ডিভিশন পর্যায়ে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের রণকৌশল প্রশিক্ষণে উলফল্যান্ড- গ্রিনল্যান্ড আর্মির ন্যারেটিভ পড়ি। ভারত নামের দেশটা অন্যদের জন্য চা পান করতে করতে রকের আড্ডায় খুচরো আলাপের বিষয়বস্তু, কিন্তু আমরা সারাটা জীবন উলফল্যান্ড- গ্রিনল্যান্ড ন্যারেটিভের মাঝে কাটিয়ে দেই। পরে হয়তো ন্যারেটিভের সংজ্ঞা বদলেছে, কিন্তু প্রতিটা অফিসার/ সৈনিক জানে ‘রেড ল্যান্ড’ মানে ‘উলফল্যান্ড’-এর কথা বলা হচ্ছে। আমাদের সৈনিকরা মুখস্ত করে লালদেশ- সবুজদেশ- এর গল্প। তারা জানে সবুজদেশ মানে বাংলাদেশ, এই দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য তাকে জীবন উৎসর্গ করতে হবে। দেশের জন্য যে মায়ার বীজ মিলিটারি একাডেমী বা ট্রেনিং সেন্টারগুলো নিউরনে বপন করে তা থেকে কোনদিনই বের হওয়া সম্ভব না। মৃত্যুর পর এই মায়া শরীরের সাথে মাটিতে মিশে যায়। তাই গলাবাজি বা আস্ফালন করতে গিয়ে একজন সামরিক অফিসারকে ভারতের দালাল বলে গালি দেয়া অনাকাঙ্ক্ষিত।
শুরু থেকেই এমবিএমএল, এআর(আর), এআর (আই) এবং বিভিন্ন সময়ে প্রণীত নির্দেশনা ও নীতিমালা দ্বারা সেনাবাহিনী সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হয়। শৃঙ্খলাই এই বাহিনীর মূল স্তম্ভ, যারা এই স্তম্ভ অতিক্রম করে বিদ্রোহ বা শৃঙ্খলা বিরোধী তৎপরতায় যুক্ত হন তারা যথাসময়ে যোগ্য শাস্তি ভোগ করে থাকেন। অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মকর্তা কর্নেল তাহের সেনাছাউনিতে বিদ্রোহ উস্কে দেয়া, লিফলেট বিতরণ এবং মিলিটারি ক্যু-এর সাথে জড়িত থাকার কারণে কোর্ট মার্শালের রায়ে ২১ জুলাই ১৯৭৬ তারিখে ফাঁসির সাজা ভোগ করেন, এটাই সামরিক বিধান। পিলখানা হত্যাকাণ্ডে জড়িত বিডিআর সৈনিকদের সামরিক আদালতে বিচার হওয়া উচিত ছিল, কারণ তাদের অপরাধ সামরিক বাহিনীর অফিসারদের সাথে জড়িত। ফ্যাসিস্ট হাসিনা কোর্ট মার্শালের রায়ে তাদের সাজা হতে দেয়নি। অথচ ৩০ নভেম্বর ১৯৯৪ সালের আনসার বিদ্রোহ তৎকালীন বিএনপি সরকার সামরিকভাবেই ডিল করেছিলেন। বিদ্রোহী আনসার সদস্যরা ৪০ জন সেনা কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারকে জিম্মি করে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাত করতে চেয়েছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তাতে সায় দেননি, বরং তার নির্দেশে ৪ ডিসেম্বর ১৯৯৪ তারিখে সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হয়। সেই অভিযানে ৪ জন বিদ্রোহী মারা যায় এবং ১৫০ জন আহত হয়। ঘটনার পরে ২,৪৯৬ জন আনসার সদস্যকে গ্রেপ্তার ও চাকরিচ্যুত করা হয়। বিদ্রোহ এভাবেই দমন করতে হয়, হাসিনা যেটা সাহারা খাতুন কিংবা নানক টাইপ কালপ্রিটদের মাধ্যমে দমন করতে চেয়েছিলেন। পৃথিবীর সব দেশেই বিদ্রোহ সামরিক ভাবেই ডিল করা হয়। ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ঘটিত ২২টা সামরিক অভ্যুত্থানের ক্ষেত্রেও একই ইতিহাস। প্রতিটা বিদ্রোহ সামরিক ভাবেই ডিল করা হয়েছে এবং কোর্ট মার্শালে বিদ্রোহীদের মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড শাস্তি প্রদান করা হয়েছে। ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে কোর্ট মার্শালের সম্ভাবনার কথা জেনেও সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার- উজ- জামান ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের আদেশ অমান্য করে ছাত্র- জনতার পাশে দাঁড়িয়েছেন। আমরা আজ তার এই অসামান্য ভূমিকার কথা বলতে ভুলে গেছি। দেশের বাইরে থেকে গলাবাজি করা, ডিবি হারুনের কাছে মুচলেকা দেয়া কিংবা রাজপথে আন্দোলন করা আর একটা দায়িত্বশীল পদে থেকে সরকারের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া এক কথা না। ছাত্রদের তিনি যখন দুষ্কৃতিকারী বলেছিলেন তখন সেটা ছিল বিসিএস চাকরির জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের কোটা আন্দোলন। আর তিনি যখন ফ্যাসিস্ট হাসিনার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন তখন সেটা ছিল জনগনের আন্দোলন, একদফার আন্দোলন। সেনাপ্রধান জনগনের সাথেই ছিলেন এবং এখনও জনগনের সাথেই আছেন। তার ভূমিকার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি।
৩.২
সেনাবাহিনী সবসময়ই একটা চেইন অভ কম্যান্ড অনুসরণ করে কাজ করে। সেনাপ্রধানের বার্তা চেইন অভ কম্যান্ড ফলো কর জুনিয়র সৈনিকের কাছে পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এই স্ট্রাকচার এতটাই সুসংগঠিত যে বাইরের কোন প্রভোকেশন এটিকে সচরাচর ক্ষতিগ্রস্থ করতে পারে না। যে বাহিনী যতোটা প্রফেশনাল সেই বাহিনীর কমান্ড স্ট্রাকচার ততোটাই সুদৃঢ়।সেনাবাহিনীর একজন অফিসার মিলিটারি একাডেমীতে এবং সৈনিকরা ট্রেনিং সেন্টারে নিজনিজ ধর্মগ্রন্থ ছুঁয়ে কমান্ড স্ট্রাকচার এবং রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের শপথ নেয়। এতকিছুর পরও বিভিন্ন কারণে সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে তার শাসনামলে এরকম ২১টা মিলিটারি ক্যু (কিংবা সম্ভবত আরও বেশি) সামলাতে হয় এবং ৩০ মে ১৯৮১ তারিখে ২২তম ক্যু-তে তিনি নিহত হন। আশির দশক জুরে সেনাবাহিনীতে যতগুলো ক্যু কিংবা পাল্টা ক্যু হয়েছে সেসব নিয়ে সেনা ছাউনিগুলোতে প্রকাশ্যে আলোচনা বা স্টাডি পিরিয়ড না হলেও সেনাবাহিনী এসব ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়েছে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের জন্য নতুন নতুন রুলস জারী করেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, ব্রিটিশ বা পাকিস্তান আর্মির পরম্পরায় সেনাবাহিনীতেও একসময় ব্যাটম্যান হিসেবে সৈনিক নিয়োগের প্রথা রহিত করা হয়।
২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত এরকম প্রতিটা ঘটনার প্রেক্ষিতে সেনাবাহিনী অভ্যন্তরীণ নিয়ম- নীতির সংস্কার করেছে এবং এভাবেই একটা ঔপনিবেশিক সেনাবাহিনী থেকে ক্রমাগত এর রূপান্তর ঘটেছে। ১৪তম সেনাপ্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া (অবঃ)-এর সময়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ সংস্কার করা হয় বলে আমার ধারণা। ২০১২ সালে একটা পদাতিক ব্রিগেডের স্টাফ অফিসার হিসেবে নিয়োজিত থাকায় ওনার আমলে জারী করা প্রচুর নির্দেশনা পড়ার এবং তার অনেকগুলোই বাস্তবায়ন করার সুযোগ হয়েছিল। বর্তমানে বিভিন্ন বাহিনীর সংস্কার নিয়ে যে আলোচনা চলছে তা অনেকের কাছে নতুন বলে মনেহলেও সেনাবাহিনীর কাছে এসব সংস্কার নতুন কিছু নয়। সেনাবাহিনী তার মৌলিক সাংগঠনিক কাঠামোকে অক্ষুণ্ণ রেখে এবং একটা ভিশন বা সুদূর কর্মপরিকল্পনাকে সামনে রেখে নিজেকে যুগোপযোগী করে চলছে।
৩.৩
জনাব পিনাকী ভট্টাচার্য বা কনক সারোয়ার সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সম্যক ধারণা রাখেন না বলেই সোশ্যাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে দেশের বাইরে থেকে সৈনিক ও জুনিয়র অফিসারদেরকে প্রভোক করার চেষ্টা করে থাকেন। তারা জানেন না বর্তমান সেনাপ্রধান কতোটা জনপ্রিয়। অফিসার এবং সৈনিকের মাঝে বিদ্যমান বন্ধন আসলে বাইরে থেকে উপলব্ধি করা সম্ভব না। উদাহরণ হিসেবে লেফটেন্যান্ট মুশফিকের ঘটনাটা উল্লেখ করা যেতে পারে। ১৯৯৫ সালের দিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে আমার ক্যাম্পের একজন সৈনিক অসুস্থ হলে সারারাত তার পাশে বসে থেকেছি, তার পরিচর্যা তদারক করেছি। সেই সৈনিক এখনো ফোন করে আমার খোঁজ খবর নেয়। ইউএন মিশনে আমার কোম্পানির সিনিয়র জেসিও এখনো ফোন করে আমার খবর নেন। আমাদের মাঝে এভাবেই বন্ধন দানা বাঁধে। সম্প্রীতির এরকম অজস্র উদাহরণ প্রতিটা অফিসারের ঝুলিতে আছে। অফিসার -সৈনিকদের মাঝে সম্প্রীতির এই বন্ধন জুনিয়র সৈনিক বা জুনিয়র অফিসার থেকে শুরু করে উপরের দিকে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত বিরাজমান। ঔপনিবেশিক শাসকদের মত শুধুমাত্র আদেশ -নির্দেশ দিয়ে প্রায় ২ লক্ষ জনবলের একটা বিশাল বাহিনীকে এতটা সুশৃঙ্খল ভাবে ধরে রাখা সম্ভব হতো না। প্রতিনিয়ত সংস্কারের মাধ্যমে সেনাবাহিনী ঔপনিবেশিক বাহিনী থেকে দেশের জনগণের বাহিনীতে রূপলাভ করেছে। যার সূতিকাগার একাত্তরের রণক্ষেত্র।
অফিসারদের মধ্যে একটা অংশ যে বিভিন্ন ধরণের অপকর্ম বা দুর্নীতির সাথে জড়িয়ে পড়ে না তা নয় তবে সেই সংখ্যাটা অতি নগণ্য। আসলে সেনাবাহিনীর ভিতরে দুর্নীতির সুযোগ কম। যারা সেনাবাহিনীর বাইরে ডেপুটেশনে বিভিন্ন বাহিনী- সংস্থা- প্রতিষ্ঠানে বদলী যায় তাদের একটা অংশ অসৎ সঙ্গে পড়ে দুর্নীতির সাথে জড়িয়ে পড়ে। সংখ্যাটা ৫% হবে কী না আমার সন্দেহ আছে। বাংলাদেশের অন্যান্য সংস্থার দিকে তাকালে দেখা যাবে অবসরে যাবার পর তাদের অনেকেই চাকুরিদাতা হিসেবে আবির্ভুত হন অথচ সেনাবাহিনীর অফিসারদেরকে আজীবন চাকুরি করে যেতে হয়, অবসরে যাবার পরও। এটাই বাস্তবতা। সৈনিকদের অবস্থাও এর ব্যতিক্রম না। নিজেদের আত্মীয়স্বজন যারা সেনাবাহিনীতে আছেন তাদের দিকে তাকালেই এটা পরিষ্কার হবে।
৩.৪
১৯৯৬ সালে ৭ম সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিম, বীর বিক্রম (অবঃ) এবং ১২তম সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন উ আহমেদ (অবঃ) এর মিলিটারি ক্যু-এর দিকে তাকালে বোঝা যাবে এখানে ৯ম পদাতিক ডিভিশনের একটা বড় ভূমিকা ছিল। ৯ম পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল ইমামুজ্জামান বীরবিক্রম এবং মেজর জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী’র ভূমিকার দিকে তাকালে বর্তমান সেনাপ্রধান তার আস্থাভাজন কাউকে যে এই ডিভিশনের জিওসি হিসেবে রাখবেন সেটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া এই ডিভিশন আর্মি রিজার্ভ হেতু সরাসরি সেনাপ্রধানের অধীনে থাকে। তিনি ৯ম পদাতিক ডিভিশনকে তার আস্থায় রেখেই গার্মেন্টস সেক্টরসহ বিভিন্ন আন্দোলন- কর্মসূচী, অরাজকতা বা অচলাবস্থা সামাল দেয়ার চেষ্টা করছেন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সেনাপ্রধান অনুগত, তা অনেকবার তার কথা এবং কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন। এই প্রসঙ্গে ছোট একটা উদাহরণ দেই, ১২ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে 'প্যালেস্টাইন সলিডারিটি মুভমেন্ট বাংলাদেশ' নামে একটি প্ল্যাটফর্মের উদ্যোগে ‘মার্চ ফর গাজা’ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, হেফাজতে ইসলাম, ইসলামী আন্দোলনের বিভিন্ন নেতা, ইসলামি বক্তাসহ নানা শ্রেণি- পেশার মানুষ এই কর্মসূচিতে একাত্মতা জানান। এই কর্মসূচিকে দেশ- বিদেশের কোন স্বার্থন্বেসী মহল জঙ্গি তকমা দিয়ে বাংলাদেশকে জঙ্গি রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব পরিচিত করাতে না পারে, বা তারা সরকারকে যেন বিব্রত না করাতে পারে সেজন্য সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা ও তল্লাশি চৌকিগুলো জনসাধারণকে কালো রঙের ব্যানার (হামাসের ব্যানারের অনুরূপ) বহন করতে দেয়নি। বিষয়টা আপাতদৃষ্টিতে ক্ষুদ্র বলে মনেহলেও এটা গভীর গুরুত্ব ও তাৎপর্য বহন করে। সেনাবাহিনীর সদস্যরা সবসময় উর্ধতন কর্তৃপক্ষের আদেশে কাজ করে। কালোপতাকা সিজ করার এই আদেশ উপর থেকেই এসেছিল। সেনাবাহিনী এভাবেই ৫ আগস্ট ২০২৪ পরবর্তী প্রতিটা ঘটনায় সরকারের পাশে থেকে অর্পিত দায়িত্ব সুচারুরূপে পালন করেছে।
৪.১
মুক্তিযুদ্ধ এবং যুদ্ধপরবর্তী ইতিহাসের ওপরে এযাবৎ যত বই পড়েছি তারমধ্যে পিনাকী ভট্টাচার্য’র লেখা ‘স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ’ বইটা এককথায় অসাধারণ। বইয়ে উল্লেখ করা প্রায় সব তথ্যের সূত্র ভেরিফাই করে সঠিক পেয়েছি। তার অনলাইনের বক্তব্য নাকি তার লেখা বই, কোনটার সংস্পর্শে আগে এসেছি সেটা মনে নেই, তবে তার লেখা বই এবং হাসিনার আমলে তার বানানো ইস্যুভিত্তিক কনটেন্টগুলো আমাকে সমৃদ্ধ করেছে। ফাহাম আবদুস সালামের মত তার ইউটিউবের কনটেন্টগুলো চিন্তা-ভাবনার জগতকে নাড়া দেয়। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আওয়ামী ন্যারেটিভের বিপরীতে নতুন কিছু ভাবতে শেখায়। গত এক/দেড় বছর ধরে ইউটিউবে তার কথা শুনতাম এবং প্রতিনিয়ত পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায় থাকতাম। ভিডিওর শুরুতে যে ওয়েলকাম টিউন বাজে তা আমার ছেলের মুখস্ত, বাজলেই ছুটে আসে। হাসিনার আমলে আমি একটু চিন্তিত থাকতাম এই কারণে যে, ছেলে স্কুলের বন্ধুদের সাথে এসব নিয়ে না আবার আলোচনা করে! ছেলে রাজনীতি বোঝে না, বোঝার বয়সও না। তবে পিনাকীদার কথা এবং আমার অভিব্যক্তিতে সে এটুকু বুঝেছে যে হাসিনা একজন খারাপ মানুষ। সে এই অভিজ্ঞতা নিয়ে বড় হবে এবং একদিন সত্যিটা খুঁজে নিবে, ছেলের বয়স এখন আট। দাদা আপনাকে ধন্যবাদ আপনি একটা শিশুর ভাবনার জগতে আপনার ন্যারেটিভ গেঁথে দিতে পেরেছেন। আপনার কাছে প্রশ্ন, আপনার বর্তমান ভিডিওগুলো কি ছেলেকে শোনানো সম্ভব? ছেলে গালিগালাজ শিখে বন্ধুদের মাঝে প্রয়োগ করুক একজন অভিভাবক হিসেবে তা মেনে নেয়া যায় কি? আমি নিশ্চিত আমার জায়গায় থাকলে আপনিও তা করতেন না। এসব গালাগালি না করেও তো গঠনমূলক সমালোচনা করা যায়। সমাজে আলোচনা-সমালোচনা, তর্ক-বিতর্ক এসব থাকলে মানুষের চিন্তা-ভাবনার জগত বিস্তৃত হয়, মানুষ ভাবতে শেখে এবং সমাজ উপকৃত হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রাম একটা অপারেশনাল এলাকা, যেখানে কাউন্টার ইন্সারজেন্সি অপারেশন চলছে। আমাদের অনেক অফিসার-জেসিও-সৈনিক সেখানে দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন। আমার মনেপড়ে ক্যাম্প থেকে অপারেশনে বের হবার সময় অস্ত্র-গোলাবারুদ নিয়ে প্রস্তুতি শেষে ধর্মীয় শিক্ষক মোনাজাত ধরতেন, আমরা তার সাথে দোয়ায় শরিক হতাম। তিনি কুরআন শরীফের আয়াত তেলওয়াত করতেন, ‘জীব মাত্রকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। তারপর তোমাদের সকলকে আমারই কাছে ফিরিয়ে আনা হবে’ (সূরা আল আনকাবুত: আয়াত-৫৭) । এতসব কিছুর বিনিময়ে এই বাহিনীর গালিগালাজ প্রাপ্য কি? ভারতের অনেক কিছুই আমার অপছন্দের, মেনে নেয়া যায় না, কিন্তু সেখানে একটা জিনিস দেখে খুব ভালো লেগেছে, জনসাধারণ সেনাসদস্যদের ভালোবাসে, সম্মান করে। আমি বাংলাদেশী হওয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র সেনাঅফিসার জেনে রাজস্তানে আমার ট্যুর গাইড ২/৩দিন ধরে যে সম্মান দেখিয়েছেন সেই স্মৃতি এখনো মনে গেঁথে আছে। তারা জানেন দেশের বিপদে যে মানুষগুলো সবার আগে তাদের পাশে এসে দাঁড়াবে তারা সেনা সদস্য। দেশের অখন্ডতা ও সার্বভৌমত্ব তাদের হাতেই রক্ষা পাবে। অথচ বাংলাদেশে সম্প্রতি আমরা কি দেখছি? ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর, ৮ আগস্ট তারিখে এই সরকার গঠিত হলো। মাঝের ৩টা দিন এই দেশকে কারা আগলে রাখলো! বন্যা, পার্বত্য চট্টগ্রামে কুকি-চিন সন্ত্রাস, দেশের ভিতরে অরাজকতা, পাহাড়ি-বাঙালি দাঙ্গা, হিন্দু-বৌদ্ধ ভাইবোনদের উৎসব ঘিরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা এতসব কিছু কারা সামলাচ্ছে? পুলিশ তো এখনো অনেক জায়গায় নির্লিপ্ত। একবার ভেবে দেখুন তো সেনাসদস্যদের যদি এই মুহুর্তে ব্যারাকে ফিরিয়ে আনা হয় তাহলে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কীরকম দাঁড়াবে! আমাদের সৈনিকরা পুলিশের কাজে অভ্যস্ত না, প্রশিক্ষণ নেই, তবুও তারা ধৈর্য্য ধরে কাজ করার চেষ্টা করছেন। একবার সেই অফিসার কিংবা সৈনিকদের মনের অবস্থা ভেবে দেখুন তো, যারা সারাদিনের কাজের ক্লান্তি শেষে রাতে ইউটিউবে এসব গালিগালাজ শুনছে! এটাই কী তাদের প্রাপ্য!
৪.২
বাইরে থেকে যতই জুনিয়র অফিসার বনাম সিনিয়র অফিসার কিংবা সৈনিক বনাম অফিসার ধরণের উদ্ভট প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর চেষ্টা করা হোক না কেন বাহিনীর ভিতরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি কোনভাবেই সফল হবে না। দেশের বাইরে থেকে যাই ভাবুন না কেন বা যতই প্রভোক করার চেষ্টা করা হোক না কেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জেনারেল ওয়াকার স্যারের নিয়ন্ত্রণে। উনি যথেষ্ট পপুলার। সবাই জানেন তিনি একজন ধর্মভীরু, সৎ, নির্লোভ, নিষ্কলুষ চরিত্রের সেনা অফিসার। ওনার সাথে বিভিন্ন সময়ে যারা চাকুরি করেছেন তারাই এসব বলেন। উনি উচ্চাকাঙ্ক্ষী হলে জেনারেল আজিজের পর তিনিই সেনাপ্রধান হতে পারতেন। কিংবা ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পর মিছিলের শ্লোগান শুনে তিনি দেশের ক্ষমতা দখল করতে পারতেন। সেনাপ্রধান শুধুমাত্র একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটা প্রতিষ্ঠান, এটা মাথায় রাখা দরকার।
একেকজন সেনাসদস্য ৩০/৩৫ বছর ধরে ইউনিফর্ম পরতে পরতে কখন যে সেটা শরীরের চামড়ায় পরিণত হয় বোঝা যায় না। আমি একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা হলেও সেনাবাহিনীকে গালিগালাজ করলে তাই সেটা অনুভূতিতে আঘাত হানে। যেকোন নাগরিকের দেশের একটা বাহিনীর ওপরে রাগ, ক্ষোভ ইত্যাদি থাকতেই পারে, সেজন্য সমালোচনাও করা যায় কিন্তু গালিগালাজ করা যায় কি? এখন সময়টা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার। এভাবে গালিগালাজ করে নিজেদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করলে আমাদের শত্রুরাই লাভবান হবে, তারা সীমান্তের ওপারে এজন্যই অপেক্ষারত। এভাবে আমরা কার স্বার্থরক্ষা করছি!
০৮ আগস্ট ২০২৪ তারিখে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে মতবিনিময় সভা শেষে ৫৫ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি, মেজর জেনারেল মোহাম্মদ মাহবুবুর রশীদের বক্তব্যটা উল্লেখ করতে চাই। তিনি বলেছেন, ‘আমরা ভুল করেছি, ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শেষ সময়ে কুষ্টিয়ায় একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। কয়েকজন মারা গেছেন। এটা আশা করিনি। সব মিলিয়ে একটা ক্রান্তিকাল পার করছি। এটা থেকে বের হতে সেনাবাহিনী একা পারবে না। আপনাদের সহযোগিতা দরকার।’
৪.৩
হাসিনার পতনের পর সেনাপ্রধানের চারপাশে যেসব সিনিয়র অফিসার ছিলেন তারা কারা? তারা কি শত্রু? নাকি মিত্র? কথাটা শুনতে খারাপ লাগলেও বাস্তবতার নিরিখে বলতে হয়, ভারতের সাথে তাদের কার সম্পর্ক কতদূর পর্যন্ত কিংবা কতোটা গভীর? আবার দীর্ঘদিন চাকুরির সুবাদে অফিসার-সৈনিকদের মাঝে কার প্রভাব কেমন তা হঠাৎই বোঝা সম্ভব না। বাইরে থেকে আমরা ঘটনাগুলো যেভাবে বোঝার চেষ্টা করি বাবলের ভেতরে বসে সেটুকু ঠাহর করা কঠিন! আমার কোর্সমেট লে কর্নেল মুস্তাফিজ অনেক আগে চাকুরি ছেড়ে দিয়ে এখন আমেরিকায় বাস করছেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে যেসব তথ্য দিচ্ছেন সেসবের যোগানদাতা কারা? যারা তার সাথে চাকুরি করেছেন বা যাদের সাথে তার পরিচয় আছে তারাই সেসব সত্য- অর্ধসত্য- মিথ্যা তথ্যের যোগানদাতা। উদাহরণ হিসেবে কর্নেল তাহেরের কথাও বলা যেতে পারে, বলশেভিকদের বিপ্লবী আদর্শে বিশ্বাসী এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল তাহের মতবিরোধ ও ব্যক্তিগত আক্ষেপের কারণে ১৯৭২ সালে সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর নারায়ণগঞ্জে ড্রেজার অর্গানাইজেশনে যোগ দিলেও সৈনিক এবং অফিসারদের সাথে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। এরফলে তার পক্ষে ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বরে সিপাহী-জনতার বিপ্লবে নেতৃত্ব দেয়া সম্ভব হয়। এজন্যই নানাদিক ভেবে সেনাপ্রধানকে সতর্ক পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। ৫ আগস্টের আগে এবং পরের কয়েকটা দিন লেফটেন্যান্ট জেনারেল মুজিব, লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাইফ, মেজর জেনারেল জিয়া, মেজর জেনারেল হামিদ ইত্যাদি অফিসাররা প্রকাশ্যে/অপ্রকাশ্যে যেরকম সক্রিয় ছিলেন তাতে সেনাপ্রধানকে ধীরে সুস্থে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে কারণ তার একটা ভুল সিদ্ধান্ত অনেকের জীবন হুমকিতে ফেলতে পারতো। ভুল সিদ্ধান্ত নেয়ার চেয়ে দেরীতে সিদ্ধান্ত নেয়াই উত্তম। এরফলে অনেকেই সুযোগ বুঝে পালিয়ে গেছেন এটা ঠিক কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ায় বাঁধা নেই। তাদের অপরাধগুলো ফৌজদারি অপরাধ, আমরা জানি ফৌজদারি অপরাধ কখনো তামাদি হয় না। ইন্টারপোলের মাধ্যমে তাদেরকে গ্রেফতার করে কিংবা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব। পৃথিবীতে এরকম অজস্র উদাহরণ আছে।
ডিজিএফআই, এনটিএমসি, বিজিবি কিংবা এনএসআই সেনাপ্রধানের অধীনে আগেও যেমন ছিল না, এখনও নেই। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই ১৯৭২ সালে গঠিত হবার সময় ডিএফআই নামে পরিচিত ছিল। ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সংস্থার কাঠামোগত পরিবর্তন করে ডিজিএফআই নামকরণ করেন। শেখ মুজিবের সরকার থেকে শুরু করে বর্তমান সময় অবধি এই সংস্থাটি বরাবর সরকার প্রধানের অধীনে ছিল। ১৯৭২ সালে গঠিত হবার পর থেকে এনএসআই বরাবরই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন একটি সংস্থা। এনটিএমসি এবং বিজিবি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সংস্থা/বাহিনী। অথচ অনেকেই বলেন বা বলতে চান এসব বাহিনী সেনাপ্রধান চালাচ্ছেন। খোঁজ নিয়ে জেনেছি, এটা ভুল ধারণা। এরকম অসংখ্য ভূল ধারণা চারপাশে ছড়িয়ে আছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাজের ধরণটা এমন, সেখানে কেউ অন্যকারোর কাজের খবর রাখেন না। মৌচাকের মত সেখানে অসংখ্য প্রকোষ্ঠ, সেই প্রকোষ্ঠে যার ঠিক যতোটা জানা প্রয়োজন তিনি ঠিক ততোটাই জানেন। সেনাপ্রধান ডিজিএফআই কিংবা এনএসআই-এর কাজকর্ম সম্পর্কে পুরোপুরি জ্ঞান রাখবেন এটা তাই একটা ভুল ধারণা। তার অধীনস্ত গোয়েন্দা সংস্থা অপারেশনাল কাজে তাদের সাথে হয়তো তথ্যের আদান-প্রদান বা সমন্বয় করে থাকে, তার গণ্ডি ততটুকুই।
৪.৪
অভ্যুত্থানের পরপর সেনাপ্রধানকে অনেক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়তো দেরি হয়েছে। কারণ তখন তিনি জানতেন না কে তার কতোটুকু অনুগত! উদাহরণ হিসেবে ৪৬ ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার ইমরান এবং ৯ম পদাতিক ডিভিশনের ৮১ ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার সাইফুল্লাহ’র কথা বলা যেতে পারে। তারা পূর্বপরিচয়ের সূত্রধরে সরাসরি হাসিনার সাথে যোগাযোগ করতেন শুনেছি। একইভাবে এনটিএমসি কিংবা ডিজিএফআই প্রধান সরাসরি মেজর জেনারেল তারেক সিদ্দিকী (অবঃ) কিংবা প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে অর্ডার রিসিভ করতেন। এরকম পরিস্থিতিতে জেনারেল ওয়াকার স্যারকে একটু রয়েসয়ে পদক্ষেপ নিতে হয়েছে অথচ আমরা জানি সেই দিনগুলোতে প্রতি মুহুর্তে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটছিল। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমাদের চাওয়া এবং তার পদক্ষেপ নেয়ার মাঝে অনেক সময়ক্ষেপণ হয়েছে এটা ঠিক। তবে আমার মনেহয় ওরকম পরিস্থিতিতে এটাই স্বাভাবিক ছিল।
এলোমেলো অবস্থায় প্রথমদিকে কে শত্রু-কে মিত্র তা বুঝতে সমস্যা হয়েছে কিন্তু তারপর আমরা কী দেখি! দেশের বাইরে বা ভিতর থেকে উস্কানিমূলক কথা-বার্তা বলে মবজাস্টিস বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে যেভাবে অরাজকতা তৈরি করা হয়েছিল তা ধীরে ধীরে মিইয়ে এসেছে। তিনি পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন। সেনাবাহিনীর ভিতরে তিনি প্রথমত অভিযুক্ত অফিসারদেরকে কমান্ড থেকে সরিয়েছেন, তারপর সবার কাছ থেকে তাদেরকে আইসোলেটেড করেছেন, এরপর চাকুরি থেকে টারমিনেট করেছেন। কয়েকজন পালিয়ে গেলেও যারা পালাতে পারেননি সম্প্রতি তাদেরকে ক্লোজ অ্যারেস্ট করা হয়েছে। বহুল আলোচিত লে কর্নেল রেদোয়ানকে বিচারের সম্মুখীন করা হচ্ছে। অন্যদিকে বিগত বছরগুলোয় যাদেরকে অন্যায়ভাবে চাকুরিচ্যুত করা হয়েছে তাদের বিষয়টা দেখার জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছে, সম্প্রতি লেফটেন্যান্ট ফিরোজ ইফতেখার নামে একজন অফিসার কর্নেল হিসেবে চাকুরি ফিরে পেয়েছেন শুনেছি। ব্রিগেডিয়ার আযমি স্যারের বিষয়টা নিস্পত্তি করা হয়েছে। ১৫ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে ইলিয়াস হোসেনের লাইভ অনুষ্ঠানে কর্নেল হাসিন স্যারের কাছ থেকে শুনলাম সেনাপ্রধান ২০১৬ সালে আজিমপুরে তথাকথিত ক্রস ফায়ারে নিহত মেজর যায়িদ-এর স্ত্রীকে সন্তানসহ সেনানিবাসে আশ্রয় দিয়েছেন। বাচ্চাদের স্কুলে ভর্তি’র ব্যবস্থা এবং ৫০ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছেন। শেখ হাসিনা সরকারের আমলে কুখ্যাত মেজর জেনারেল তারেকের কারণে সেনাপ্রধান এই কাজটা করতে পারেননি।
৪.৫
‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিত বিল্ডিংটাকে ‘জয়েন্ট ইন্টেরোগেশন সেল’ নামেই আমরা জানি এবং সেটা অনেক আগে থেকেই আছে। পৃথিবীর প্রতিটা দেশেই এরকম জিজ্ঞাসাবাদ কেন্দ্র থাকে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্যই এসবের দরকার হয়। কিন্তু সেখানে কি হয় তার খবর রাখেন শুধুমাত্র সরকার প্রধান বা তার প্রতিনিধি, যেমন নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রধান। সেনাপ্রধানের এই বিষয়ে কিছুই জানার থাকে না। ২০১৫ সাল থেকে শুরু করে ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখ পর্যন্ত ‘জয়েন্ট ইন্টেরোগেশন সেল’ বা জেআইসি সম্পর্কিত যে কোন ঘটনার দায়ভার লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ আকবর হোসেইন (অবঃ) (২০১৩-১৭), লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ সাইফুল আবেদিন (অবঃ) (২০১৭-২০), লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোঃ সাইফুল আলম (অবঃ) (২০২০-২১), লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহম্মদ তাবরেজ শামস চৌধুরী (অবঃ) (২০২১-২২), মেজর জেনারেল হামিদুল হক (অবঃ) (২০২২-২৪) এর। ডিজিএফআই কোন কিছুর আলামত সংরক্ষণ করে না। সরকার পরিবর্তনের সাথেসাথেই পূর্বের সবকিছু রিসাইকেল বিনে ফেলে ফ্রেস স্টার্ট করে। এটাই এসওপি, ডিজিএফআই-এর কাজের ধরণটাই এমন। একারণে পরবর্তী দু’জন ডিজি ডিজিএফআই, লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোঃ ফয়জুর রহমান এবং মেজর জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম পূর্বের ঘটনার বিষয়ে কতোটা বলতে পারবেন জানি না। একেকটা সংস্থার কাজের প্যাটার্ন একেকরকম। সেজন্যই ব্রিগেডিয়ার আযমি স্যারের ‘আয়নাঘর’ থেকে বের হয়ে সেনাপ্রধানের সাথে দেখা করতে বাঁধেনি। কর্নেল হাসিন স্যার বিভিন্ন ইস্যুতে সেনাবাহিনীর সাথে কাজ করছেন বলে জানি। অথচ সেনাবাহিনীর অফিসার হয়েও তাদেরকে গুমের শিকার হতে হয়েছে। আমার কোর্সমেট মেজর সুমন আহমেদ (অবঃ) কেও গুমের শিকার হতে হয়েছে অথচ মেজর জেনারেল জিয়া (অবঃ)ও আমাদের কোর্সমেট। ‘আয়নাঘর’ সংশ্লিষ্ট যেকোন বিষয়ের দায়ভার সেনাপ্রধানের উপরে বর্তায় না। উনি এই বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করেন না। ডিজিএফআই-এর বর্তমান ভূমিকা নিয়ে কারো মনে সন্দেহ থাকলে প্রধান উপদেষ্টা কিংবা নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে জিজ্ঞেস করাই বাঞ্ছনীয়, কেননা এই বাহিনী এখন তাদের অধীনে।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় ঢাকার পরিস্থিতি সামলাতে বিজিবি সীমান্ত অরক্ষিত করে কিংবা সীমান্তের নিরাপত্তার দায়িত্ব বিএসএফ-এর হাতে তুলে দিয়ে ঢাকায় ফোর্স এনেছে। একারণে ৫ আগস্ট পরবর্তী বেশ কিছুদিন সীমান্ত একদম উম্মুক্ত ছিল। আমি বিশেষ করে যশোর অঞ্চলের খবর জানি, সেখানে এই অবস্থা ছিল বেশ কয়েকদিন ধরে এবং অনেকেই তখন ভারতে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। যশোর সেনানিবাসে আশ্রয় নিয়েছিলেন মাত্র ০১ জন। ১০ আগস্ট ২০২৪ তারিখে গোপালগঞ্জে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সেনাবাহিনীর সদস্যদের ওপরে হামলা চালায়। উত্তেজিত নেতাকর্মীরা সেনাবাহিনীর দু’টি গাড়ি ভাঙচুর করে এবং আরেকটি গাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেয়। এছাড়া অ্যাম্বুলেন্সসহ দু’টি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। এ ঘটনায় ৪ সেনাসদস্য, সংবাদকর্মী ও স্থানীয় জনতাসহ অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। ৫৫ ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মোহাম্মদ মাহবুবুর রশীদ এই বিষয়টা যেভাবে সামলেছেন তাতে তার প্রশংসা করতেই হবে।
আমরা অনেকেই হয়তো জানি ঢাকার বারিধারায় ভারতের হাই কমিশনার অফিসের পাশাপাশি চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী এবং সিলেটে ৪ জন সহকারী হাই কমিশনার নিযুক্ত আছেন। ভারতেও অনুরূপ ভাবে বাংলাদেশের হাই কমিশনার অফিস নয়াদিল্লী ছাড়াও কলকাতা, ত্রিপুরা, চেন্নাই, গুয়াহাটি এবং মুম্বাইয়ে অবস্থিত। আমার কোর্সমেট লে কর্নেল মুস্তাফিজ খুলনা সেনানিবাসে ভারতীয় বাহিনীর আশ্রয় নেয়ার যে তথ্য দিয়েছে সেটা সঠিক না। তারা মূলত খুলনায় অবস্থিত ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পরিবার। পরিবর্তীত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তারা সেখানে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার এদেশে অবস্থিত যেকোন দেশের হাইকমিশনার বা দূতাবাসে কর্মরতদের নিরাপত্তা দিতে বাধ্য।
আমার কোর্সমেট, মেজর জেনারেল মোহাম্মদ মাহবুবুর রশীদের আরেকটা কথা দিয়ে এই পর্বের ইতি টানতে চাই, তিনি কুষ্টিয়ার সেই মতবিনিময় সভায় বলেছেন, ‘এখন ভেঙে পড়ার সময় না, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সবাই কাজ করে যাব। আগামীর ভোরটা হবে নতুন ভোর।’
৫.১
২৫ মার্চ ২০০৯ তারিখে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের কয়েকমাস আগে আমার ঘনিষ্ট কোর্সমেট মেজর মিজানের সাথে এসআইএন্ডটি, সিলেটে ইউনিট কমান্ড কোর্স করেছিলাম। কোর্স থেকে ছুটিতে ওর গাড়িতে ঢাকায় আসা-যাওয়া করেছি। ও আমাদের কোর্সের একজন ভদ্র এবং অমায়িক স্বভাবের অফিসার। প্রায়ই ওকে এটাসেটা নিয়ে ক্ষ্যাপাতাম, ও ক্ষেপতো, রাগ করতো, আবার কিছুক্ষণ পর সবকিছু ভুলেও যেতো। আমার এই নিরীহ কোর্সমেটকে পিলখানায় হত্যা করা হয়েছে। পিলখানা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন মিলিটারি একাডেমিতে প্রথম টার্মে আমার প্লাটুন কমান্ডার কর্নেল মোহাম্মদ আখতার হোসেন। স্যার তখন ক্যাপ্টেন ছিলেন, কিছুদিন পরই মেজর হলেন। প্লাটুন কমান্ডারদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ছিলেন কিন্তু তিনি জানতেন কীভাবে তার প্লাটুনটাকে সন্তানস্নেহে আগলে রাখতে হয়। আমরা, প্লাটুনের সব ক্যাডেট স্যারকে ভীষণ ভালোবাসতাম। আমাদেরকে সিভিলিয়ান থেকে মিলিটারি অফিসার বানানোর তিনিই মূল কারিগর।
পিলখানায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন বহুল আলোচিত কর্নেল গুলজার উদ্দীন আহমেদ। ২০০৭ সালে আমি তখন র্যাব-১০এর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড, আমার কমান্ডিং অফিসার লে কর্নেল মানিক স্যার একদিন জানতে চাইলেন আমি কখনো গুলজার স্যারের সাথে চাকুরি করেছি কীনা। উত্তরে জানালাম স্যারের সাথে বগুড়ার অফিসার মেসে, টিভি রুমে প্রায়ই দেখা হলেও একসাথে চাকুরি করা হয়নি। স্যার বললেন খুব চেষ্টা করেছি কিন্তু তোমাকে বোধহয় আর ইউনিটে ধরে রাখা গেল না। মানিক স্যারের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকালে তিনি জানালেন গুলজার স্যার আমাকে তার স্টাফ অফিসার হিসেবে র্যাব ফোর্সেস সদর দপ্তরে পোস্টিং করে নিতে যাচ্ছেন। গুলজার স্যারের সাথে আমার পরিচয় র্যাবেই, পরপর কয়েকটা সফল অস্ত্রউদ্ধার অপারেশনের কৃতিত্বে তিনি আমাকে পছন্দ করতেন। হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন কর্নেল মো. রেজাউল কবীর। সিয়েরা লিওনে শান্তিরক্ষী মিশনে স্যার আমাদের সিনিয়র লজিস্টিকস অফিসার ছিলেন, একদম বড় ভাইয়ের মত, খুব স্নেহ করতেন এবং বন্ধুর মত মিশতেন। অনেক দুষ্টামি করতাম বলে আমাদেরকে চোখে চোখে রাখতেন। আমার ইয়ংরো সিওবি (কোম্পানি অপারেশন বেজ) ছিল একটা উঁচু টিলা কিংবা পাহাড়ের ঢালে, নীচেই আটলান্টিকের তটরেখা। দিনভর-সারারাত সমুদ্রের গর্জন ভেসে আসতো। স্যার প্রায়ই সন্ধ্যার পর কিংবা বিকেলে আমার ক্যাম্পে ঘুরতে আসতেন, সমুদ্রের পাড়ে বসে উচ্ছৃঙ্খল জলরাশির দিকে তাকিয়ে থাকতেন, ঢেউ গুনতেন। আমি স্যারের জন্য সেখানে নারকেল পাতার ছাউনি আর বিচ চেয়ারের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম।
এইযে মানুষ গুলোর কথা বললাম, এদের সবাইকে আমি ভালোবাসি। আমার জীবনে এনাদের ঘিরে টুকরো টুকরো অসংখ্য স্মৃতি আছে। এই মানুষগুলো উন্মত্ত দানবের হিংস্র থাবায় স্রেফ হারিয়ে গেছেন। পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনার সময়ে আমার পোস্টিং ছিল যশোর সেনানিবাসে। লে কর্নেল কাজী রবি রহমান স্যারের বাড়ি মাগুরাতে, স্যারকে চিনতাম না। যশোর থেকে মাগুরাতে গিয়ে হেলিকপ্টারে আগত স্যারের ডেডবডি সংগ্রহ করেছিলাম এবং সামরিক কায়দায় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করি। আমার এক কোর্সমেটকে কোয়ার্টারগার্ডের সামনে তার ৫/৭ বছরের দু’বাচ্চার সামনে গুলি করে হত্যা করতে গিয়ে খুনিরা কীভেবে ছেড়ে দিয়েছিল।
যশোর সেনানিবাস থেকে ‘অপারেশন রেবেল হান্ট’-এ কুষ্টিয়া, মাগুরা, ঝিনাইদহ এলাকায় আত্মগোপনে থাকা পিলখানা থেকে পলাতক ১৫/১৬ জন বিডিআর সৈনিকদের গ্রেফতার করেছি। সে বছরই মে/জুনের দিকে র্যাবে পোস্টিং হলে গোয়েন্দা উইঙের সাথে সংযুক্ত করে আমাকে টিএফআই-এ পাঠানো হলো। অফিসটা র্যাব-১ এর সাথেই, তবে আমার নতুন কর্মক্ষেত্র হলো পিলখানা, টানা ছয়মাস একটা ইন্টেরোগেশন টিমের দায়িত্বে ছিলাম। মেজর হামিদ স্যারের সাথে সেখানে শুরু থেকেই কাজ করেছি। ২৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে কীভাবে কি ঘটেছে সেসব বিডিআর জওয়ানদের মুখেই শুনেছি। র্যাব থেকে কঙ্গোতে সামরিক পর্যবেক্ষক হিসেবে পোস্টিং হলো, মিশন শেষে একটা পদাতিক ব্রিগেডের স্টাফ অফিসার হিসেবে জয়েন করলাম পিলখানায়। কারণ আমাদের ব্রিগেড তখন পিলখানায় সিকিউরিটির দায়িত্বে, আদালতের কার্যক্রম চলছিল। এভাবেই বিভিন্ন পার্সপেক্টিভ থেকে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের উপরে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের পর বিদেশে বসে কেউ নতুন বয়ান শোনাতে এলে হাসি পায়। তারচেয়েও বেশি হাসি পায় যখন কেউ বিডিআর সদস্যদেরকে নিরাপরাধ বলতে চায়। Those bloodsuckers should go to hell.
২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে রাওয়ার অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধান বলেছেন ‘Enough is enough’, আমি স্যারের বক্তব্যের সাথে একমত। তিনি সেদিন পরিষ্কার করে বলেছেন, ‘কিছু কিছু সদস্যের দাবি তারা ২০০৯ সাল থেকে আজ পর্যন্ত শাস্তি পেয়েছেন, অনেকে বলছেন তারা অযাচিত শাস্তি পেয়েছেন। এ ব্যাপারে আমি পদক্ষেপ নিচ্ছি………আমার স্ট্যান্ড পয়েন্ট হচ্ছে, যদি কেউ অপরাধ করে থাকে সেটার জন্য কোনো ছাড় হবে না, ডিসিপ্লিন ফোর্সকে ডিসিপ্লিন থাকতে দেন। এই দেশের সব কিছু ভেঙে পড়লেও সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী টিকে আছে কারণ তাদের মধ্যে ডিসিপ্লিন আছে।’
৫.২
সাংবাদিক ইলিয়াস হোসেনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন পছন্দ করি। মেজর ডালিম স্যারের মত একজন লিভিং লিজেন্ডকে নিয়ে তার সাক্ষাৎকার ভিডিওটা অসাধারণ। স্যারের লেখা ‘আমি মেজর ডালিম বলছি’, ‘কিছু কথা কিছু ব্যাথা’ এবং ‘যা দেখেছি যা বুঝেছি যা করেছি’ বই ৩টা পড়া হয়েছে বেশ আগেই। তারপরও তার সাক্ষাৎকার থেকে অনেক কিছু জেনেছি। ইলিয়াস হোসেন এই সাক্ষাৎকার আয়োজনের জন্য ধন্যবাদ প্রাপ্য। যেটা আর কেউ পারেনি তিনি সেটা করে দেখিয়েছেন। তবে এরচেয়েও বেশি ধন্যবাদ প্রাপ্য বিডিআর হত্যাকাণ্ড নিয়ে চমৎকার প্রতিবেদনটার জন্য। কী দারুণ মেধা ও শ্রমের স্বাক্ষর! আমার কোর্সমেট মেজর সুমন আহমেদ (অবঃ) সেখানে অনেক কিছুই বলেছেন। আমরা যারা পিলখানা হত্যাকাণ্ডের তদন্তের সাথে জড়িত ছিলাম তারা জানি এই ঘটনার সাথে বাইরের শক্তি জড়িত ছিল। এই বিষয়টা আমার আরেক কোর্সমেট লে কর্নেল মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান (অবঃ) অসংখ্যবার তার বক্তব্যে পরিষ্কার করেছেন। আমার প্রিয় জুনিয়র, ইউনিট অফিসার মেজর মনির (অবঃ) এই বিষয়ে অনেক গুরুত্বপুর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তবে সাংবাদিক ইলিয়াসের সমস্ত প্রয়াস পানসে হয়ে যায় যখন তিনি বিডিআর সদস্যদেরকে ইনোসেন্ট বলে দাবী করেন। নিষ্পাপ দেবদূতদের স্বার্থে, তাদের নিয়ে, তিনি এরপর থেকে ঢালাওভাবে যা যা করছেন সেটাকে বলে নোংরামি।
সেনাপ্রধান স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘একটা জিনিস আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে, এই বর্বরতা কোনো সেনাসদস্য করে নাই। এই ঘটনার সম্পূর্ণটাই তদানীন্তন বিডিআর-এর সদস্য দ্বারা সংগঠিত। ফুল স্টপ, এখানে কোনো ইফ এবং বাট নাই।’ আমি স্যারের এই বক্তব্যকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন জানাই। পিলখানা হত্যাকাণ্ড নিয়ে তিনি আরও বলেছেন, ‘যে সব সদস্য শাস্তি পেয়েছে তারা শাস্তি পাওয়ার যোগ্য। এখানে কোনো রাজনৈতিক নেতা যুক্ত ছিলেন কিনা, বাহিরের কোনো শক্তি যুক্ত ছিল কিনা, সেটার জন্য কমিশন করা হয়েছে। কমিশনের চেয়ারম্যান এখানে আছেন। তিনি এসব বের করবেন এবং আপনাদের জানাবেন।’ দেশের বাইরের শক্তির সম্পৃক্ততা এবং পলিটিক্যাল ইন্ধন নিয়ে তিনি আর কিছু বলেননি কারণ গত বছরের ডিসেম্বরে কমিশনস অফ ইনকোয়ারি অ্যাক্ট ১৯৫৬ এর অধীনে মেজর জেনারেল আ ল ম ফজলুর রহমানকে (অবঃ) সভাপতি করে 'পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহের নামে সংঘটিত বর্বরতম হত্যাযজ্ঞের' বিষয়ে 'জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন' গঠন করা হয়েছে। সেনাপ্রধান আশা করেছেন এই কমিশন বাইরের শক্তির জড়িত থাকার বিষয়টা উদঘাটন করবে। একটা দায়িত্বশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে বসে এরচেয়ে বেশি কিছু বলা যায় না।
৫.৩
১১ মার্চ ২০২৫ তারিখে সেনাপ্রধান সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ এবং সারজিস আলমকে সেনানিবাসে ডেকে নিয়ে ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’ এর কথা বলেছেন বলে হাসনাত আবদুল্লাহর ফেসবুক স্ট্যাটাসকে নেত্র নিউজ ইতিমধ্যে ‘সম্পূর্ণ রাজনৈতিক স্টান্টবাজি বৈ অন্য কিছু নয়’ বলে উল্লেখ করেছে। সারজিস আলম এবং নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী পরবর্তীতে হাসনাত আবদুল্লাহর স্ট্যাটাসকে শিষ্টাচারবর্জিত বলেছেন। আন্দোলনে রাজপথের নেতৃত্বে তারা যেমন ছিলেন, আমরা অবসরপ্রাপ্ত সামরিক অফিসাররাও সেসময় তাদের পাশে ছিলাম। ঘটনাটা সেসময় বেশ আলোচিত হয়েছিল। মিরপুর ডিওএইচএস এবং পরবর্তীতে মহাখালী ডিওএইচএস-এ বিশাল র্যালি হয়েছে। অফিসাররা সপরিবারে আন্দোলনের দাবীর পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। ১৫ জুলাই ২০২৪ তারিখে আমার ওয়ালে একটা পোস্ট দিয়ে আন্দোলনের সাথে একাত্বতা ঘোষণা করি। এরপর আন্দোলনের স্বপক্ষে লিখেছি, ছবি-ভিডিও পোস্ট করেছি। ১০ আগস্ট ২০২৪ তারিখে আমার ফেসবুক ওয়ালে লিখেছিলাম, রাজপথের আন্দোলন আর রাজনৈতিক দল গঠন করে প্রথাসিদ্ধ রাজনীতি করা এক কথা নয়। এমনকি ছাত্ররা যে একসময় দুর্নীতিতে জড়িয়ে যেতে পারে সেটাও সেদিনের ওয়ালে লিখেছিলাম। সেই পোস্টে লেখা অনেক বিষয় পরবর্তীতে সত্যি প্রমাণিত হয়েছে।
সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে আমার কোর্সমেট লে কর্নেল মোস্তাফিজ (অবঃ) যেসব অভিযোগ উত্থাপন করেছেন সে বিষয়ে স্যারের যে বক্তব্য রাখার স্কোপ নেই সেটা মোস্তাফিজ ভালোভাবে জানে। তবে আমার ধারণা জেনারেল ওয়াকার স্যার তার কর্মের মাধ্যমে ধীরেধীরে সবকিছু পরিষ্কার করে দিবেন। তারপরও অনেককিছুই রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে অপ্রকাশিত থেকে যাবে। শুধুমাত্র অফিসিয়াল সিক্রেট এক্ট-১৯২৩ এর কারণে নয়, দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কিছুকিছু বিষয় গোপন রাখার জন্য আমরা নিজেরাই নিজেদের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। সেনাপ্রধানকে নিয়ে মোস্তাফিজের এন্তার অভিযোগের কারণে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, বিকল্প কে? ওর জানা আছে কীনা জানিনা, জেনারেল আজিজের পর জেনারেল ওয়াকার স্যার সেনাপ্রধান না হওয়া আমাদেরকে বরং বিস্মিত করেছিল। আমার ধারণা আত্মীয়তার যোগসূত্র থাকলেও স্যার বিতর্কিত আমি-ডামি নির্বাচন আয়োজনের দায়ভার নিতে চাননি। অথচ শেখ হাসিনার ছুঁড়ে দেয়া সেই কাদা জেনারেল শেখ শফিউদ্দিন সানন্দেই শরীরে মেখেছেন। ০৫ জানুয়ারি ২০১৪ তারিখে খালি আসনের নির্বাচন, ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে রাতের নির্বাচন এবং ৭ জানুয়ারি ২০২৪ তারিখে আমি-ডামি নির্বাচন আয়োজনে সহযোগিতার জন্য যথাক্রমে জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া, জেনারেল আজিজ আহমেদ এবং জেনারেল শেখ মোহাম্মদ শফিউদ্দিন আহমেদ তাদের দায় এড়াতে পারবেন না বলে মনেকরি। এই নির্বাচনগুলো সেনাবাহিনীকে দেশে-বিদেশে বিতর্কিত করেছে। সেনাবাহিনীর উপরে মানুষের এইযে এত ক্ষোভ, এর একমাত্র কারণ এই তিনটি নির্বাচনে সেনাবাহিনীর ঘৃণ্য ভূমিকা। ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে সেনাবাহিনীর ইতিবাচক ভূমিকা জনগণের ক্ষোভ কিছুটা হলেও লাঘব করেছে বলে মনেকরি। জেনারেল ওয়াকার স্যারকে ধন্যবাদ, তিনি সেনাবাহিনীর জুনিয়র অফিসার এবং জনগণের পালস বুঝতে পেরে সঠিক সময়ে কঠিন সিদ্ধান্তটা নিতে পেরেছেন বলে।
৫.৪
কনক সারওয়ার তার বিষোদাগার চ্যানেলে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ক্যাম্পেইন চালানো ছাড়া প্রোডাকটিভ কিছু করেন বলে মনেহয় না। উনি যদি আওয়ামী লীগের বয়ানের বিরুদ্ধে পিনাকীর মত কাউন্টার ন্যারেটিভ দাঁড় করাতেন কিংবা ইলিয়াসের মত যদি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন কিংবা অন্তত কাজী রুনা’র মত যদি বিশ্লেষণধর্মী কনটেন্ট বানাতেন তাহলে লোকজনের অনেক কিছু জানা ও বোঝার সুযোগ হতো। তবে আমার ধারণা এক্টিভিজমে পিনাকী-ইলিয়াস-কনকের চেয়েও সাহসী ভূমিকা রেখেছেন ডাঃ জাহেদ। ওনারা তো বিদেশে হাসিনার ধরাছোঁয়ার বাইরে বসে কাজ করতেন তাই তাদের নিয়ে কোন ভয় ছিলনা। কিন্তু ডাঃ জাহেদ হাসিনা সরকারের নাকের ডগায় বসে দিনের পর দিন যেসব কথা বলতেন সেজন্য আমি তাকে নিয়ে ভয়ে থাকতাম, দোয়া করতাম এই প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরের জন্য।
‘হাসনাত না ওয়াকার’ জাতীয় স্লোগান কিংবা এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদের আস্ফালন সত্যই হাস্যকর! ব্যারিস্টার ফুয়াদের মত যারা গলাবাজি করেন তাদেরকে কখনো যুদ্ধের ময়দানে খুঁজে পাওয়া যাবে না আমি নিশ্চিত। তারা মূলত পত্রিকার শিরোনামে জায়গা পেতে আর ইউটিউবের ভিউ ব্যবসায়ীদের জন্য এরকম আওয়াজ দেন। নির্বাচনের মাঠে তারা ভেসে যাওয়া শ্যাওলার মতন। ‘গ্লোসারি অভ অপারেশনাল টার্মস’ থেকে দু’একটা শব্দ বা সান জু’র ‘প্রিন্সিপ্যাল অভ ওয়ার’ থেকে দু’চার লাইন শিখে তিনি আজ বিশাল রণকৌশলবিদ। সেনাপ্রধানের প্রতি অনুরোধ তাকে পার্বত্য চট্টগ্রামের কোন একটা ইউনিটের সাথে দুর্গম পাহাড়ে অপারেশনে পাঠানো হোক, দেশপ্রেমের পরীক্ষাটা হয়ে যাক। তাকে নিয়ে মেজর রেজা (অবঃ) যে বক্তব্য রেখেছেন আমি তার সাথে একমত। ব্যারিস্টার সাহেব জানেন না দেশের প্রতিটা নাগরিকের মত আমরাও প্রতিবছর ইনকাম ট্যাক্স দেই। আমরা রাষ্ট্র থেকে ১১ মাসের বেতন নিয়ে ১২ মাস সার্ভিস দেই, কেননা একমাসের বেতনের সমপরিমাণ টাকা ইনকাম ট্যাক্স বাবদ রাষ্ট্রের কোষাগারে জমা করতে হয়। জেনারেল ওয়াকার অত্যন্ত ধৈর্যশীল, ভদ্র এবং প্রফেশনাল বলেই সবকিছু ধীর-স্থির ভাবেই হ্যান্ডেল করেছেন। ঠাণ্ডা মাথায় হাসনাত আবদুল্লাহকে বলেছেন, ‘ইউ পিপল নো নাথিং। ইউ ল্যাক উইজডোম এন্ড এক্সপিরিয়েন্স। উই আর ইন দিজ সার্ভিস ফর এটলিস্ট ফোর্টি ইয়ার্স। তোমার বয়সের থেকে বেশি।’
৫.৫
পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্বপ্রাচীন নৃগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে একটি হলো মুরং বা ম্রো জনগোষ্ঠী। তাদের প্রধান ধর্মীয় উৎসবের নাম ‘চিয়া-ছট-প্লাই’, এই অনুষ্ঠানের এক সপ্তাহ আগে তারা পাড়ার ঠিক মাঝখানে সবাই মিলে একটা বাঁশের ঘের তৈরি করে এবং এর ভিতরে একটা ষাঁড় বেঁধে রাখে। উৎসবের রাতে নাচার প্রস্তুতি নিয়ে মুরং যুবতীরা নানা ধরনের রুপার অলংকার ও রংবেরঙের ফুলে রূপসজ্জা করে বাঁশের ঘেরের পাশে সমবেত হয়। মুরং যুবকরা বিশেষ এক ধরণের বাঁশি নিয়ে তাদের সাথে অনুষ্ঠানে যোগ দেয়। যুবতীদের পায়ের ঘুঙুরের আওয়াজে রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে দেয়। ছেলেদের বাঁশির সুরে তাল মিলিয়ে তারা নাচতে থাকে। অদ্ভুত বাঁশির সুর ষাঁড়কে যেন ঘুম পাড়িয়ে দেয়। বাঁশির সুরে ও নাচের তালে সেও শেষ জাবর কাটতে থাকে। সারারাত ধরে এমনতরো আচার চলে। সকালে একজন হাতে ধারালো বল্লম আর মুখে আদার জলের মিশ্রিত মদ মুখে পুরে ষাঁড়ের গায়ে ফুঁ দেয় এবং মন্ত্র উচ্চারণ করে। মন্ত্র পড়া শেষ হওয়ার সাথে সাথেই তিনি ষাঁড়ের ডান পার্শ্ব হৃদপিণ্ড বরাবর বল্লমের খোঁচা দেন। বল্লমের আঘাতে যখন ষাঁড়টি মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে থাকে তখন মুরং যুবক-যুবতীদের নাচ ও বাঁশির সুরের গতি ক্রমাগত বাড়তে থাকে। অন্যরাও ষাঁড়টিকে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত ও উল্লাস করতে থাকে। মুরংদের এই অনুষ্ঠানের পিছনে আছে এক মজার উপকথা তবে সে প্রসঙ্গে আরেকদিন লিখবো। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনীর অবস্থাটা যেন বাঁশের ঘেরে আবদ্ধ সেই ষাঁড়ের মত। কিছু এক্টিভিস্ট দেশের বাইরে বসে বাক্যবাণে ক্রমাগত খুঁচিয়ে সেনাবাহিনীর সদস্যদের হৃদয় রক্তাক্ত করার প্রয়াস চালাচ্ছেন। কারণ এদেশ বা দেশের রাস্ট্রযন্ত্রের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা নেই, জন্মসূত্রে তারা বাংলাদেশী হলেও তাদের বর্তমান জাতীয়তা বাংলাদেশী না। বলয়ের বাইরে বসে সাহসী উচ্চারণ না করে দেশে ফিরে দায়িত্ব নিন, আমরা ভালো থাকতে চাই।
২১ নভেম্বর ১৯৭১ তারিখে সশস্ত্র বাহিনীর জন্মের পর থেকে কম রক্তক্ষরণ হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের পরপর স্বাধীন বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর বিপরীতে রক্ষীবাহিনীকে দাঁড় করিয়ে এই ক্ষরণের সূচনা, তারপর আশির দশক জুড়ে ক্যু, পাল্টা-ক্যুতে কম রক্তক্ষরণ হয়নি। এরপর বেনিন প্লেন দূর্ঘটনা, পিলখানা হত্যাকাণ্ড ইত্যাদিতে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে কিন্তু এই বাহিনী কখনো ভেঙ্গে পড়েনি, ভেঙ্গে পড়বে না কারণ এই বাহিনীর জন্ম কোন রাজনৈতিক নেতার ড্রইং রুমে না, যুদ্ধের মাঠে। ৩ নভেম্বর ১৯৭৭ তারিখের মিলিটারী ক্যুর বিপরীতে ৭ নভেম্বরের মিলিটারী ক্যু বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গতিপথ নির্ধারণ করে দিয়েছে। এই বাহিনী এদেশের মাটি আর মানুষের কাছে দায়বদ্ধ। যে দু’চারজন দেশের মানুষের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন তারা আজ ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। পিলখানা হত্যাকাণ্ডের সময় নপুংসকের ভূমিকায় জেনারেল মইন ইউ আহমেদ আজ একটা ঘৃণিত নাম। অথচ ৯০ এর গণঅভ্যুত্থানের সময় জনগণের পাশে থাকায় বর্তমানে যেমন শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হচ্ছে লেফটেন্যান্ট জেনারেল নুরউদ্দীন খানের নাম, ৫ আগস্টের আন্দোলনে জনগণের পাশে থাকার কারণে একদিন শ্রদ্ধাভরে উচ্চারিত হবে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান স্যারের নাম।
স্যারের জন্য শুভ কামনা।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
২৬ এপ্রিল ২০২৫