
১
‘O church of the dead village, there will be no more singing of psalms, no more reverences before the flowering altars, no more bridesmaids, or chanted Passions, no more Te Deums, or Misereres.’
(হে মৃত গ্রামের গির্জা, আর কোনো সংহিতা গাওয়া হবে না, পুষ্পশোভিত বেদীর সামনে আর কোনো ভক্তি নিবেদন হবে না, আর কোনো নববধূ বা মন্ত্রোচ্চারিত ক্রুশবিদ্ধকরণ হবে না, আর কোনো প্রার্থনা হবে না)
লাইনগুলো চেক কবি ভিক্টর ফিশল-এর ‘মৃত গ্রাম’ কবিতা থেকে নেয়া হয়েছে। তিনি লিডিস গণহত্যার খবর শুনে এক রাতেই ‘The Dead Village’ নামে এক দীর্ঘ শোকগাথা লিখেন। কবে এবং কিভাবে হয়েছিল লিডিসের সেই গণহত্যা এবার সেদিকেই দৃষ্টি ফেরানো যাক।
২
১০ জুন ১৯৪২।
ঝলমলে এক গ্রীষ্মের সকালে চেকোস্লোভাকিয়ার শান্ত ও সুন্দর গ্রাম লিডিস ইউরোপের মানচিত্র থেকে মুছে গিয়েছিল। মধ্য ইউরোপের এক প্রান্তে, বোহেমিয়া অঞ্চলের লিডিসে সেদিন যে সূর্য উঠেছিল তা ছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম মর্মান্তিক একটি দিনের সাক্ষী। সেদিন লিডিসের জমিতে জন্ম নেয়া প্রতিটি ঘাস, সেখানকার মাটির প্রতিটি কণা এবং আকাশের প্রতিটি মেঘ- সবই হয়ে উঠেছিল এক ভয়ংকর, মর্মস্পর্শী আর্তনাদের প্রতীক। এই আর্তনাদ শুধু একটি গ্রাম ধ্বংসের জন্য নয়, বরং মানবতার উপর নেমে আসা এক অন্ধকারাচ্ছন্ন বর্বরতার জন্য। নাৎসি জার্মানির বর্বরোচিত প্রতিশোধের আগুনে সেদিন পুড়ে ছাই হয়েছিল শুধু এর ঘরবাড়ি নয়, এর প্রতিটি প্রাণ, এর ইতিহাস এবং এর হাসি-কান্না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসে এটি কেবল একটি গণহত্যা নয়, এটি আসলে মানবতাবিরোধী অপরাধের এক বীভৎস উদাহরণ, যা আজও বিশ্বকে নাৎসি পাশবিকতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
৩
হেইড্রিখের পতন: প্রতিশোধের আগুনে দগ্ধ এক গ্রাম।
লিডিস গণহত্যার মূল কারণ নিহিত ছিল নাৎসি জার্মানির অন্যতম কুখ্যাত এবং ক্ষমতাধর ব্যক্তি রাইনহার্ড হেইড্রিখের হত্যাকাণ্ডে। ‘প্রাগের কসাই’ নামে পরিচিত হেইড্রিখ ছিলেন হিটলারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং হলোকাস্টের অন্যতম প্রধান স্থপতি। তার নেতৃত্বে চেকোস্লোভাকিয়ায় দমন-পীড়নের এক বিভীষিকাময় অধ্যায় চলছিল। ২৭ মে ১৯৪২ তারিখে ব্রিটিশ-প্রশিক্ষিত চেক ও স্লোভাক প্রতিরোধ যোদ্ধারা (অপারেশন অ্যানথ্রোপয়েড) প্রাগে হেইড্রিখের উপর এক সফল হামলা চালায়, যার ফলে ৪ জুন ১৯৪২ তারিখে তার মৃত্যু হয়। হেইড্রিখের মৃত্যু হিটলারকে উন্মত্ত করে তোলে। প্রতিশোধের নেশায় অন্ধ হয়ে তিনি আদেশ দেন ‘বোহেমিয়া ও মোরাভিয়ার প্রটেক্টোরেটের’ মধ্যে এমন একটি গ্রামকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে, যা প্রতিরোধ যোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছে বলে সন্দেহ করা হয়। তবে লিডিস গ্রামকে সেদিন বেছে নেয়ার কোনো জোরালো প্রমাণ ছিল না; এটি ছিল কেবল নাৎসিদের সন্ত্রাস সৃষ্টির একটি ইচ্ছাকৃত ও নির্বিচার সিদ্ধান্ত।
৪
১০ জুন ১৯৪২: লিডিসের শেষ সূর্যোদয়।
১০ জুন ১৯৪২ তারিখ সকালে নাৎসি বাহিনী লিডিস গ্রামটিকে প্রথমে ঘিরে ফেলে। গ্রামের মানুষজন তখন তাদের দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত ছিল, কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি যে এটিই তাদের জীবনের শেষ দিন। নাৎসি সৈন্যরা গ্রামে প্রবেশ করে এবং নির্মমভাবে সব পুরুষকে একত্রিত করে। গ্রামের ১৫ বছরের বেশি বয়সী সকল পুরুষকে (প্রায় ১৭৩ জন) ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের কোনো বিচার হয়নি, কোনো সুযোগ দেয়া হয়নি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের। এক মুহূর্তের মধ্যে তাদের গুলি করে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে যখন ঘৃণা অস্ত্র তুলে নেয় তখন আসলে ন্যায়বিচার বা মানবিকতার কোনো স্থান থাকে না। তাদের অপরাধ ছিল কেবল লিডিসের বাসিন্দা হওয়া। এরপর শুরু হয় নারীদের উপর পাশবিক অত্যাচার। গ্রামের ২০৩ জন নারীকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাভেনসব্রুক কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানো হয়। এই মায়েরা জানতেন না তাদের বাচ্চাদের ভাগ্য কী হতে চলেছে। ক্যাম্পে নারীদের উপর চালানো অমানবিক নির্যাতন তাদের বেঁচে থাকার ইচ্ছাকে ম্লান করে দিয়েছিল। সেখানে অমানবিক পরিস্থিতিতে প্রায় ৪৯ জন মহিলা মারা যান। তবে শিশুদের ভাগ্য ছিল আরও মর্মান্তিক। লিডিস গণহত্যার সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অংশ হলো ১০৫ জন শিশুর ভাগ্য। নাৎসিদের বিকৃত ‘জাতিগত পরীক্ষা’র পর তাদের মধ্যে ১৭ জনকে জার্মানিকরণের জন্য জার্মান পরিবারে পাঠিয়ে পরিচয় মুছে ফেলা হয়। অবশিষ্ট ৮২ জন শিশুকে পোল্যান্ডের খেমনো নির্মূল কেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে গ্যাস ভ্যান ব্যবহার করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এই শিশুরা বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম নীরব শিকার, যাদের অপরাধ ছিল কেবল সেই গ্রামে জন্ম নেয়া।
লিডিসের ৩০৪ জন গ্রামবাসীকে বিভিন্নভাবে হত্যা করার পর, নাৎসিরা বুলডোজার ও বিস্ফোরক ব্যবহার করে লিডিসের প্রতিটি বাড়ি, গির্জা, স্কুল এবং এমনকি কবরস্থান পর্যন্ত ধ্বংস করে দেয়। তারা চেয়েছিল লিডিসের কোনো চিহ্ন যেন পৃথিবীর বুকে অবশিষ্ট না থাকে। মানচিত্র থেকে লিডিসের নাম মুছে ফেলার জন্য তারা পুরো এলাকাটিকে সমতল করে চাষের জমিতে পরিণত করার চেষ্টা করে।
৫
বিশ্বব্যাপী প্রতিক্রিয়া এবং ‘Lidice Shall Live’।
নাৎসিরা ভেবেছিল এই নৃশংসতা বিশ্বের বুকে ভয় সৃষ্টি করবে এবং প্রতিরোধ আন্দোলনকে দমন করবে। কিন্তু ফলাফল হয়েছিল উল্টো। লিডিসের খবর সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়লে তা তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার জন্ম দেয়। মিত্রশক্তির দেশগুলোতে নাৎসিদের বর্বরোচিত আচরণের বিরুদ্ধে একজোটে আওয়াজ ওঠে। ব্রিটেনে শুরু হয় ‘Lidice Shall Live’ নামে আন্তর্জাতিক আন্দোলন। এই আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল লিডিসের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখা এবং যুদ্ধ শেষে নতুন করে গ্রামটিকে পুনর্নির্মাণ করা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও শহর লিডিসের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে এবং তাদের নিজেদের শহরের নাম বা নতুন নামকরণ করে লিডিসের প্রতি শ্রদ্ধা জানায়।
৬
একটি নীরব আর্তনাদের চিরন্তন উত্তরাধিকার।
লিডিসের ঘটনা আমাদেরকে মনে করিয়ে দেয় মানবতাকে কেবল যুদ্ধ বা গণহত্যা দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। মানবতা লুকিয়ে থাকে ঘৃণার মাঝেও সহমর্মিতা দেখানোর ক্ষমতায়, ধ্বংসের পরেও পুনর্নির্মাণের সাহসে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে জেগে ওঠা সম্মিলিত কণ্ঠে। লিডিস আজ কেবল একটি গ্রামের নাম নয় এটি আমাদের কাছে একটি সতর্কবার্তা, যেন আমরা কখনো ঘৃণা, বিভেদ ও চরমপন্থাকে আমাদের সমাজকে গ্রাস করতে না দেই। এই ঘটনার উপরে জোয়ান এম. উলফ Someone Named Eva নামে উপন্যাস লেখেন। চেক সুরকার বোহুস্নাভ মার্টিনু ১৯৪৩ সালে Memorial to Lidice নামে আবেগপূর্ণ সঙ্গীত রচনা করেন, যা লিডিসের নিহতদের প্রতি উৎসর্গীকৃত একটি স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত। নিচে এই ঘটনার উপরে নির্মিত দুটি মুভির ইউটিউব লিঙ্ক দিলাম,
https://www.youtube.com/results?search_query=lidice+movie
https://www.youtube.com/results?search_query=hangmen+also+die+1943+full+movie
৭
লিডিস গণহত্যা শুধু চেকোস্লোভাকিয়ার একটি জাতীয় ট্র্যাজেডি নয়, এটি মানবজাতির ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়। এটি নাৎসি জার্মানির অমানবিকতা এবং যুদ্ধের ভয়াবহতার এক চিরন্তন প্রতীক। লিডিস আমাদের শিখিয়ে দেয় মানবতা যখন পরাজিত হয়, তখন তার মূল্য দিতে হয় হাজার নিরপরাধ প্রাণের বিনিময়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মূল ধ্বংসাবশেষের পাশে একটি নতুন লিডিস গ্রাম গড়ে তোলা হয়েছে। পুরনো ধ্বংসের স্থানে একটি মর্মস্পর্শী স্মৃতিসৌধ স্থাপন করা হয়েছে, যা আজও সেই ভয়াবহ দিনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এখানে রয়েছে নিহত শিশুদের জন্য তৈরি করা ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য, যা তাদের অকাল মৃত্যুর এক নীরব আর্তনাদ। এই ভাস্কর্যগুলি বিশ্বকে মনে করিয়ে দেয় যুদ্ধ শিশুদের কাছ থেকে তাদের শৈশব, পরিবার এবং জীবন কেড়ে নিয়েছিল। এই লেখা শেষ করবো কবি ভিক্টর ফিশল-এর কবিতার লাইন দিয়ে,
‘It is no more; it is no more the tongueless bells no longer ring only the smoking walls remain and one stray dog who walks alone searching in vain from stone to stone.’
(এটি আর নেই; এটি আর নেই জিহ্বাবিহীন ঘণ্টা আর বাজছে না শুধুমাত্র ধূমায়িত দেয়ালগুলো অবশিষ্ট এবং একটি পথহারা কুকুর একা হেঁটে চলেছে পাথর থেকে পাথরে বৃথা খুঁজে ফিরছে)
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
৫ ডিসেম্বর ২০২৬