
১
গাজায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মদদ নিয়ে ইসরায়েল যে গণহত্যা চালাচ্ছে তার প্রতিবাদে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ তারিখে ওয়াশিংটনে ইসরায়েলের দূতাবাসের সামনে ২৫ বছর বয়সী মার্কিন বিমানবাহিনীর সদস্য অ্যারন বুশনেল নিজের শরীরে আগুন ধরিয়ে দিয়ে আত্মাহুতি দিয়েছেন। ম্যাসাচুসেটস থেকে আগত এই বোকা যুবক ২০২০ সালের মে মাসে সান আন্তোনিওর ল্যাকল্যান্ড এয়ার ফোর্স বেইজে যোগদান করেন। আগুনে পুড়ে মরে যাওয়ার সময় তিনি চীৎকার করে বলেছিলেন, ‘ফিলিস্তিনিদের মুক্ত করো।’২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ তারিখের এই আত্মাহুতির ঘটনা ০১ জানুয়ারি ১৯৭৩ সালে কিছু বোকা যুবকের আরেকটা আত্মাহুতির কথা মনে করিয়ে দেয়। এই ঘটনার সাথেও জড়িয়ে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী ভূমিকা। সেদিন কি ঘটেছিল?
২
৭২ সালের শেষ দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনাম যুদ্ধকে তীব্রতর করার লক্ষ্যে ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়, হাই ফং প্রভৃতি শহরে ই-৫২ বোমারু বিমান দিয়ে হামলা শুরু করে। তাদের নাপাম বোমার আঘাতে ভিয়েতনামের গ্রাম-শহর পুড়ে যেতে থাকে। রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করে ফসলের ক্ষেত জ্বালিয়ে দেয়া হয়, যেন মানুষ খাদ্যের অভাবে মারা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের এই নৃশংসতা সেদিন সারা বিশ্বের বিবেক কাঁপিয়ে দিয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে এদেশের ছাত্র সমাজের পক্ষ থেকেও ধিক্কার জানানো হয় এবং ১৯৭২ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসেই বেশকিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে, যেমন- ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত ইনস্টিটিউটে ভাংচুর-অগ্নি সংযোগ, চট্টগ্রামে ইউএসআইএস-এর সামনে বিক্ষোভ ও ভাংচুর, ঢাকায় বাংলা একাডেমি বই মেলায় ইউএসআইএস-এর বইয়ের স্টল তছনছ করে দেয়া ইত্যাদি। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এদেশের মানুষের তীব্র ক্ষোভের কারণে ঢাকার রাজপথে শ্লোগান ওঠে, ‘তোমার নাম, আমার নাম-ভিয়েতনাম, ভিয়েতনাম’, ‘বিশ্বজুড়ে দু’টো নাম- বাংলাদেশ আর ভিয়েতনাম।’
ছাত্র-জনতার বিক্ষিপ্ত প্রতিবাদগুলোকে সংঘটিত রূপ দেয়ার জন্য ০১ জানুয়ারি ‘ভিয়েতনাম সংহতি দিবস’ হিসেবে পালন করা এবং এর অংশ হিসেবে মার্কিন দূতাবাসে গিয়ে স্মারকলিপি দেয়া হবে মর্মে ছাত্র ইউনিয়ন ও ডাকসু যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নেয়। এই কর্মসূচির মূল দাবি ছিল ভিয়েতনামে মার্কিন বাহিনীর বোমাবর্ষণ বন্ধ করতে হবে। প্রতিবাদ সমাবেশ ও বক্তৃতা শেষে সেদিন মতিঝিলের আদমজী কোর্টস্থ আমেরিকান দূতাবাস অভিমুখে মিছিল রওনা করে। সেদিনের সেই মিছিলে পুলিশের গুলিতে জহুরুল হক হলের ছাত্র ইউনিয়ন নেতা মতিউল ইসলাম এবং ঢাকা কলেজের ছাত্র ইউনিয়ন নেতা মীর্জা কাদেরুল ইসলাম নিহত হন, গুলিতে পরাগ মাহবুব-এর কণ্ঠনালী ছিঁড়ে যায়। এছাড়াও ছাত্র ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি আবুল কাসেমের হাতের তালু ও বাহু ভেদ করে গুলি চলে যায়। সেদিন আহত হয়েছিলেন ফরিদ হোসেন, আমিরুল ইসলাম, সুলতান আহমেদ, বাংলার বাণীর ফটোসংবাদিক রফিকুর রহমান সহ আরও অনেকেই।
৩
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের এক বছরের মাথায় স্বাধীন বাংলাদেশে সেদিন এভাবেই মতিউল ইসলাম এবং মীর্জা কাদেরুল ইসলাম ভিয়েতনামে মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে আত্মাহুতি দেন। এখন সময় পাল্টেছে, প্রতিবাদের ধরণ পাল্টেছে। আমরা এখন অনেক বাস্তববাদী। যেকোন অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিবাদ তাই এখন ফেসবুকেই সীমাবদ্ধ থাকে। প্রতিবাদের আগুনে এখন ঢাকার রাজপথ নয়, ফেসবুকের পাতা ঝলসে যায়। তবে মতিউল, কাদেরুলদের মত কিছু যুবক এখনও পাল্টায়নি, অ্যারন বুশনেল-এর মত কিছু যুবক এখনো বোকা!
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
২৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৪