
১
ভেনেজুয়েলাকে দীর্ঘকাল ‘অভেদ্য দুর্গ’ হিসেবে বিবেচনা করা হতো, যার মূলে ছিল রাশিয়ার তৈরি অত্যাধুনিক এস-৩০০ মিসাইল সিস্টেম, বুক-এম২ এবং শক্তিশালী পেচোরা রাডার নেটওয়ার্কের সমন্বিত সুরক্ষা ব্যবস্থা। দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে রোবাস্ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যে কোনো বড় আকারের বিমান হামলা নস্যাৎ করে দিতে সক্ষম বলে মনেকরা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক মার্কিন সেনাবাহিনীর ডেল্টা ফোর্সের ভেনেজুয়েলাতে সফল অনুপ্রবেশ এবং তাদের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা বিশ্বজুড়ে সামরিক বিশেষজ্ঞদের ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। অভিযানের শুরুতেই মার্কিন ‘ইএ-১৮জি গ্রাউলার’ বিমানগুলো শক্তিশালী ইলেকট্রনিক জ্যামিংয়ের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার রাডারগুলোকে সম্পূর্ণ ব্লাইন্ড করে দিয়ে একটি কার্যকর ‘এয়ার ডিফেন্স ব্ল্যাকআউট’ তৈরি করে। একইসময়ে মার্কিন কমান্ডোরা অত্যন্ত নিচু উচ্চতায় ‘Terrain Following’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে পাহাড় ও বনের আড়ালে রাডার হরাইজনের নিচ দিয়ে অনুপ্রবেশ করে, যা এস-৩০০-এর মতো হাই-অল্টিটিউড সিস্টেমের নজরদারি এড়াতে সক্ষম হয়। এই যান্ত্রিক শ্রেষ্ঠত্বের সাথে যুক্ত হয়েছিল ভেনেজুয়েলার সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতা এবং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার নিখুঁত তথ্য সংগ্রহ। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য যে তাৎক্ষণিক চেইন অব কমান্ড প্রয়োজন মার্কিন সাইবার ও ইনটেলিজেন্স কৌশলের মুখে তা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। এরফলে শক্তিশালী মিসাইল ব্যাটারিগুলো সচল থাকা সত্ত্বেও সঠিক সময়ে সেখানে কোনো পাল্টা প্রতিরোধের নির্দেশ আসেনি। এই ঘটনাটি স্পষ্ট করে দিয়েছে আধুনিক ‘অ্যাসাইমেট্রিক ওয়ারফেয়ার’ যুদ্ধকৌশলের সামনে শুধুমাত্র দামী হার্ডওয়্যার কোন দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম না। আর তাই ভেনেজুয়েলার কোটি কোটি ডলারের বিশাল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ডেল্টা ফোর্সের কৌশলের কাছে কেবলই এক নিরাপত্তার মরীচিকায় পরিণত হয়। মার্কিন সফল অভিযান ভেনেজুয়েলার সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের মিথকে ভেঙে দিয়ে প্রমাণ করেছে প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়াতে না পারলে যেকোনো শক্তিশালী দুর্গ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে।
২
রাডার যখন অন্ধ: ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ারের প্রভাব।
ক। ইলেকট্রনিক জ্যামিং: ভেনেজুয়েলার আকাশ প্রতিরক্ষায় ‘সফট কিল’।
এই অভিযানে প্রথাগতভাবে ক্ষেপণাস্ত্র বা বোমা বর্ষণ না করে ভেনেজুয়েলার নিশ্ছিদ্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে পঙ্গু করতে ব্যবহার করা হয়েছিল অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক জ্যামিং প্রযুক্তি। মার্কিন নৌ ও বিমান বাহিনীর বিশেষায়িত ‘ইএ-১৮জি গ্রাউলার’ বিমানগুলো অপারেশনাল এলাকার আকাশে অবস্থান নিয়ে অত্যন্ত শক্তিশালী ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক পালস্ এবং হাই-ফ্রিকোয়েন্সি সিগন্যাল চারদিকে ছড়িয়ে দেয়। এই সিগন্যাল ভেনেজুয়েলার রাডার রিসিভারগুলোর কার্যক্ষমতাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, যাকে সামরিক পরিভাষায় ‘সফট কিল’ বলা হয়। এরফলে রাডারগুলো সচল থাকলেও কোনো সংকেত বিশ্লেষণ করতে পারছিল না। এভাবেই ভেনেজুয়েলার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মুহূর্তের মধ্যেই তার দৃষ্টিশক্তি হারায়, যা পুরো বাহিনীকে অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং লক্ষ্যহীন পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়।
খ। এয়ার ডিফেন্স ব্ল্যাকআউট: অদৃশ্য দেয়াল ও কমান্ড সেন্টারের বিপর্যয়।
রাডার সিস্টেম জ্যাম হওয়ার ফলে কারাকাসের কমান্ড সেন্টারে থাকা মনিটর মুহূর্তেই সাদা হয়ে যায় অথবা সেখানে কেবল নিরবচ্ছিন্ন ভাবে ‘নয়েজ’ বা ঝিরঝিরে ছবি দেখা দিতে থাকে। অত্যাধুনিক এস-৩০০ বা পেচোরা রাডার কারিগরিভাবে সক্রিয় থাকলেও সেগুলো আকাশে উড়ন্ত কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুকে ট্র্যাক করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। এই অবস্থাকে সামরিক পরিভাষায় ‘এয়ার ডিফেন্স ব্ল্যাকআউট’ বলে, যেখানে শত্রুপক্ষ চোখের সামনে থাকলেও প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতায় চিহ্নিত করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। মার্কিন বাহিনীর ডেল্টা ফোর্সের হেলিকপ্টারগুলো এভাবেই কোনো প্রকার পাল্টা হামলার ভয় ছাড়াই মিশন সফল করতে পেরেছে। কমান্ড সেন্টারে থাকা অপারেটরদের অসহায়ত্ব এবং প্রযুক্তির চরম বিপর্যয় প্রমাণ করেছে আধুনিক যুদ্ধে জয়ী হতে হলে শুধু শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র থাকলেই চলে না, বরং ইলেকট্রনিক যুদ্ধে টিকে থাকার সক্ষমতাও সমানভাবে অপরিহার্য।
৩
রাডারের নিচ দিয়ে ডেল্টা ফোর্সের কৌশলগত অনুপ্রবেশ।
ক। রাডার হরাইজনের নিচে: ‘টেরেইন ফলোয়িং’ প্রযুক্তির ব্যবহার।
ভেনেজুয়েলার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মূল শক্তি ছিল রাশিয়ার তৈরি অতিউচ্চ ইন্টারসেপ্টর মিসাইল, যা মূলত দ্রুতগতির ফাইটার জেট শনাক্ত করতে সক্ষম। তবে মার্কিন ডেল্টা ফোর্স এবং স্পেশাল অপারেশন এভিয়েশন রেজিমেন্টের কমান্ডোরা ভেনেজুয়েলার এই শক্তির সীমাবদ্ধতাকে অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে কাজে লাগিয়েছিল। অভিযানের জন্য ব্যবহৃত ‘এমএইচ-৬০ ব্ল্যাক হক’ এবং ‘এমএইচ-৪৭ চিনুক’ হেলিকপ্টারগুলোতে যুক্ত ছিল অত্যাধুনিক ‘Terrain Following’ রাডার প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তির সাহায্যে পাইলটরা ঘন অন্ধকার রাতেও অত্যন্ত নিচু দিয়ে, প্রায় মাটি ঘেঁষে পাহাড়ের খাঁজ এবং বনের আড়াল ব্যবহার করে উড়ে আসতে সক্ষম হন। রাডার সিগন্যাল সোজা রেখায় চলে বলে পাহাড় বা মাটির ঢিবির ওপারে থাকা লক্ষ্যবস্তুকে দেখতে পায় না। প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে মার্কিন হেলিকপ্টার ভেনেজুয়েলার রাডার নেটওয়ার্কের নিচে একটি ‘ডেড জোন’ তৈরি করে অনুপ্রবেশ নিশ্চিত করেছিল।
খ। স্টিলথ সক্ষমতা ও সেকেন্ডের ব্যবধানে পরাজয়।
প্রযুক্তিগত কৌশলের দ্বিতীয় ধাপে মার্কিন হেলিকপ্টারগুলোতে ব্যবহৃত বিশেষ ‘স্টিলথ’ কোটিং বড় ভূমিকা রেখেছে। এই বিশেষ কোটিং রাডার থেকে আসা তরঙ্গ প্রতিফলিত না করে শুষে নেয়, ফলে ভেনেজুয়েলার অটোমেটেড ডিফেন্স ইউনিটগুলোর মনিটরে কোনো সতর্ক সংকেত ফুটে ওঠেনি। হেলিকপ্টারগুলো পাহাড়ের আড়াল থেকে হঠাৎ সামনে এলে শুধুমাত্র তখনই ভেনেজুয়েলার সেনারা প্রথমবারের মত খালি চোখে দেখতে সক্ষম হয়। আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় রাডার শনাক্তকরণ থেকে ট্রিগার চাপা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটির জন্য যে সময়ের প্রয়োজন হয় তার আগেই মার্কিন কমান্ডোরা তাদের পজিশন নিয়ে ফেলেছিল। এরফলে ভেনেজুয়েলার সেনাদের কাছে প্রতিক্রিয়া জানানোর বা মিসাইল সক্রিয় করার মতো কোনো সুযোগ ছিল না। নিখুঁত টাইমিং এবং রাডার ফাঁকি দেয়ার এই কৌশলের কাছে ভেনেজুয়েলার কোটি কোটি ডলারের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম শেষ পর্যন্ত প্রদর্শনীর বস্তুতে পরিণত হয়েছিল।
৪
কমান্ড সেন্টারের সমন্বয়হীনতা ও সিদ্ধান্তহীনতা।
ক। কমান্ড চেইন ধস: সাইবার সাবোটাজ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা।
ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতার পেছনে কেবল প্রযুক্তির লড়াই ছিল না, বরং ছিল কমান্ড ও কন্ট্রোল সিস্টেমের এক নজিরবিহীন ধস। রাশিয়ার তৈরি এস-৩০০ বা বুক-এম২-এর মতো শক্তিশালী মিসাইল ব্যাটারিগুলো এককভাবে কাজ করতে পারে না; এগুলোর জন্য একটি সমন্বিত চেইন অব কমান্ড এবং রিয়েল-টাইম ডাটা লিঙ্কের প্রয়োজন হয়। অভিযানের শুরুতেই মার্কিনিরা সাইবার অপারেশনের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার সামরিক কমিউনিকেশন নেটওয়ার্ককে লক্ষ্যবস্তু করেছিল। এরফলে রাডারগুলো যখন জ্যামিংয়ের শিকার হয় তখন স্থানীয় ইউনিটগুলো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে জরুরি নির্দেশ পায়নি। মার্কিন ইনটেলিজেন্সের নিখুঁত পরিকল্পনায় ভেনেজুয়েলার ইন্টারনাল নেটওয়ার্ককে এমনভাবে অকেজো করে দেয়া হয়েছিল যে, কমান্ড সেন্টারে থাকা অপারেটররা এক প্রকার বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়েছিলেন। এই কৌশলগত প্যারালাইসিস-এর কারণে কোটি কোটি ডলারের সমরাস্ত্র থাকা সত্ত্বেও সেগুলো যথাযথ সময়ে একটি গোলাও নিক্ষেপ করতে পারেনি।
খ। গোয়েন্দা অনুপ্রবেশ ও সাংগঠনিক পঙ্গুত্ব।
ভেনেজুয়েলার সামরিক কাঠামোর ভেতরে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর যে গভীর অনুপ্রবেশ ছিল এই অভিযানটি তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। অভিযানের প্রতিটি ধাপ এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যে ভেনেজুয়েলার ফিল্ড অফিসাররা একপর্যায়ে পরিস্থিতি বুঝতে পারলেও পাল্টা ব্যবস্থা নেয়ার সক্ষমতা যেন তাদের হাতে না থাকে। স্থানীয় কমান্ড পোস্টগুলো যখন হাই-কমান্ডের সাথে যোগাযোগের শেষ চেষ্টা চালায়, তখন দেখা যায় মূল যোগাযোগ লাইনগুলো আগেই অদৃশ্য কোনো শক্তির মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়েছে। এটি কেবল প্রযুক্তির লড়াই ছিল না বরং এটি ছিল একটি মনস্তাত্ত্বিক বিজয়, যেখানে ভেনেজুয়েলার সেনারা নিজেদের দুর্গের ভেতরেই চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল। তাদের সেনা ইউনিট ট্রিগারে হাত দেবার আগেই ডেল্টা ফোর্সের কমান্ডোরা লক্ষ্যবস্তুতে সফল অভিযান পরিচালনা করে আকাশপথে নিরাপদ দূরত্বে চলে গিয়েছিল।
৫
আধুনিক সমরাস্ত্র বনাম অপারেশনাল ডকট্রিন।
ভেনেজুয়েলার এই বিপর্যয় সামরিক বিশ্বের সামনে একটি কঠোর বাস্তবতা তুলে ধরেছে যে কেবল দামী ও অত্যাধুনিক অস্ত্র থাকলেই কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্র নিরাপদ না, যদি না তার বিপরীতে সমমানের কাউন্টার-টেকনোলজি এবং বিদ্যুৎগতিতে সিদ্ধান্ত নেয়ার সক্ষমতা থাকে। ভেনেজুয়েলা রাশিয়ার কাছ থেকে বিলিয়ন ডলারের হার্ডওয়্যার কিনলেও সেগুলোকে মার্কিন যুদ্ধ কৌশল ঠেকানোর মতো স্তরে উন্নিত করতে পারেনি। মার্কিন বাহিনী প্রথাগত যুদ্ধের পথে না গিয়ে ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার, সাইবার সাবোটাজ এবং স্টিলথ অনুপ্রবেশের যে সমন্বয় ঘটিয়েছিল, তার কোনো কার্যকর পাল্টা ডকট্রিন বা প্রতিরক্ষা কৌশল ভেনেজুয়েলার সামরিক বাহিনীর কাছে ছিল না। মূলত প্রযুক্তির ওপর অতি-নির্ভরশীলতা এবং সেনাদের আধুনিক যুদ্ধের উপযোগী প্রশিক্ষণের অভাবই তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখন রাডার ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাগুলো পঙ্গু হয়ে যায়, তখন ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে কীভাবে প্রতিরোধ গড়তে হয়, সেই অপারেশনাল ডকট্রিনের প্রয়োগ সেখানে দেখা যায়নি। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যুদ্ধের ময়দানে অস্ত্রের চেয়েও অস্ত্রের ব্যবহারের কৌশল এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে দ্রুত খাপ খাইয়ে নেয়ার দক্ষতাই শেষ পর্যন্ত জয়-পরাজয় নির্ধারণ করে দেয়।
৬
ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ও রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া।
ভেনেজুয়েলার এই সামরিক বিপর্যয় কেবল কারাকাসের জন্য নয়, বরং বিশ্বজুড়ে ক্রেমলিনের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবের ওপর একটি বড় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই ঘটনার সুদূরপ্রসারী প্রভাব:
ক। রাশিয়ার সমরাস্ত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা সংকট।
ভেনেজুয়েলার এস-৩০০ এবং বুক-এম২ সিস্টেমের ব্যর্থতা বিশ্ববাজারে রাশিয়ান প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে রাশিয়া এই ঘটনাকে তাদের প্রযুক্তির ব্যর্থতা নয়, বরং ভেনেজুয়েলার সেনাদের অদক্ষতা এবং মার্কিন ইলেকট্রনিক সাবোটাজ হিসেবে দাবি করেছে।
খ। দক্ষিণ আমেরিকায় মার্কিন আধিপত্যের পুনরুত্থান।
দীর্ঘদিন ধরে লাতিন আমেরিকায় চীন ও রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই অভিযান একটি শক্ত বার্তা। মাদুরোর পতন এবং মার্কিন কমান্ডোদের অবাধ বিচরণ এই অঞ্চলে ওয়াশিংটনের ‘মনরো ডকট্রিন’-এর নতুন সংস্করণের প্রকাশ ঘটিয়েছে, যা অন্য বামপন্থী সরকারগুলোর জন্য একটি প্রচ্ছন্ন সতর্কবার্তা।
গ। মস্কোর কৌশলগত পিছুটান।
ভেনেজুয়েলা ছিল দক্ষিণ আমেরিকায় রাশিয়ার সবচেয়ে বড় কৌশলগত এবং বাণিজ্যিক অংশীদার। মাদুরোকে সরিয়ে দেয়ার মাধ্যমে রাশিয়ার এই অঞ্চলে সামরিক ঘাঁটি তৈরির সম্ভাবনা এবং তেল খাতে তাদের বিশাল বিনিয়োগ হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছে। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে মার্কিন স্বার্থে আঘাত হানার হুমকি দিলেও, নিজ বলয়ের গভীরে এভাবে মার্কিন অনুপ্রবেশ রাশিয়ার সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সীমাবদ্ধতাকে প্রকাশ করে দিয়েছে।
ঘ। নতুন স্নায়ুযুদ্ধের মেরুকরণ।
এই ঘটনা জাতিসংঘে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। চীন ও রাশিয়া এই অভিযানের বিরুদ্ধে সরব হলেও, কলম্বিয়া বা ব্রাজিলের মতো প্রতিবেশী দেশগুলো একে স্বৈরাচার থেকে মুক্তির পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে। এরফলে দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলটি আবারও বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রক্সি যুদ্ধের ময়দান হয়ে ওঠার আশঙ্কায় রয়েছে।
৭
ভেনেজুয়েলার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নাটকীয় পতন বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু সামরিক ও কৌশলগত শিক্ষা প্রদান করে, যেমন-
ক। দামী সমরাস্ত্র বনাম প্রযুক্তিগত উপযোগিতা।
ভেনেজুয়েলার কাছে রাশিয়ার সেরা অস্ত্র ছিল, কিন্তু তারা সেগুলো মার্কিন ইলেকট্রনিক জ্যামিংয়ের বিরুদ্ধে কার্যকর রাখতে পারেনি। বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা হলো কেবল দামী মিসাইল কেনাই যথেষ্ট নয়; সেই অস্ত্রগুলো যেন আধুনিক ইলেক্ট্রনিক ওয়ারফেয়ার এবং সাইবার অ্যাটাক মোকাবেলা করতে পারে, সেই প্রযুক্তি নিশ্চিত করা। আধুনিক যুদ্ধে হার্ডওয়্যার-এর চেয়ে সফটওয়্যার বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
খ। রাডার ব্লাইন্ড স্পট ও নিচু উচ্চতার হুমকি।
ডেল্টা ফোর্স পাহাড়ের আড়াল দিয়ে এবং রাডার হরাইজনের নিচ দিয়ে অনুপ্রবেশ করেছিল। বাংলাদেশের ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটে (বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং উপকূলীয় অঞ্চলে) শত্রুপক্ষ এই কৌশল ব্যবহার করতে পারে। তাই বাংলাদেশের কেবল দীর্ঘপাল্লার রাডার নয় বরং প্রচুর পরিমাণে লো-লেভেল রাডার এবং পোর্টেবল এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম মোতায়েন করা উচিত যা নিচু দিয়ে উড়ে আসা হেলিকপ্টার বা ড্রোন ধ্বংস করতে পারে।
গ। চেইন অব কমান্ড ও যোগাযোগের বিকল্প ব্যবস্থা।
ভেনেজুয়েলার প্রধান ব্যর্থতা ছিল যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। কমান্ড সেন্টার থেকে নির্দেশ না আসায় সেনারা ট্রিগার চাপতে পারেনি। বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা হলো, সামরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে কেবল ডিজিটাল সিস্টেমের ওপর নির্ভর না করে বিকল্প এনালগ বা এনক্রিপটেড রেডিও কমিউনিকেশন ব্যবস্থা রাখা যাতে সাইবার হামলার সময়ও ফিল্ড অফিসাররা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
ঘ। দেশীয় গোয়েন্দা নজরদারি ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা।
মার্কিন বাহিনী ভেনেজুয়েলার সামরিক বাহিনীর ভেতরে গভীর অনুপ্রবেশ ঘটাতে পেরেছিল। এটি প্রমাণ করে শক্তিশালী অস্ত্রের চেয়েও শক্তিশালী কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স জরুরি। দেশের ভেতরে যেন কোনো বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থা প্রভাব বিস্তার করতে না পারে সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখা সার্বভৌমত্বের জন্য অপরিহার্য।
ঙ। মাল্টি-লেয়ারড বা বহুমুখী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
ভেনেজুয়েলা রাশিয়ান প্রযুক্তির ওপর অতি-নির্ভরশীল ছিল। শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট দেশের প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল থাকলে শত্রুপক্ষ সহজেই তার দুর্বলতা বের করে ফেলে। বাংলাদেশের উচিত মাল্টি-ভেন্ডর ডিফেন্স পলিসি অনুসরণ করা, অর্থাৎ বিভিন্ন দেশের ভিন্ন ভিন্ন প্রযুক্তির সমন্বয়ে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা যাতে জ্যামিং করা কঠিন হয়ে পড়ে।
চ। ড্রোন ও অ্যাসাইমেট্রিক যুদ্ধের প্রস্তুতি।
ভেনেজুয়েলার ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে প্রথাগত যুদ্ধবিমান নয় বরং কমান্ডো অপারেশন এবং ড্রোনের মাধ্যমে যেকোনো সময় পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। বাংলাদেশকে ড্রোন প্রযুক্তি এবং অ্যান্টি-ড্রোন ডিফেন্স সিস্টেমে ব্যাপক বিনিয়োগ করতে হবে কারণ ভবিষ্যতের যুদ্ধগুলো হবে ছোট, দ্রুত এবং প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত জটিল।
৮
ভেনেজুয়েলার এই সামরিক বিপর্যয় বিশ্ববাসীকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে কেবল দামী সমরাস্ত্রের মজুদ কোনো রাষ্ট্রকে অপরাজেয় করে তোলে না। কোটি কোটি ডলারের এস-৩০০ মিসাইল সিস্টেম বা শক্তিশালী রাডার নেটওয়ার্কের পতন প্রমাণ করেছে যে, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার এবং নিখুঁত গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয়ে গঠিত মার্কিন ‘অ্যাসাইমেট্রিক ওয়ারফেয়ার’ যে কোনো প্রথাগত প্রতিরক্ষা ব্যূহকে চুরমার করে দিতে সক্ষম। ডেল্টা ফোর্সের ঝটিকা অভিযান কেবল একজন শাসকের পতন ঘটায়নি, বরং দীর্ঘদিনের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের মিথ এবং রাশিয়ার সমরাস্ত্রের অপরাজেয় ভাবমূর্তিকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সাথে খাপ খাওয়াতে না পারলে এবং দক্ষ চেইন অব কমান্ড বজায় রাখতে ব্যর্থ হলে যেকোনো শক্তিশালী দুর্গই যেকোন সময় নিরাপত্তার মরীচিকায় পরিণত হতে পারে।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১০ জানুয়ারী ২০২৬