
১
২০২২ সালে নৈতিকতা পুলিশের হেফাজতে কুর্দি তরুণী মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আন্দোলনের আগুন নিভে যাওয়ার আগেই আবারও এক নজিরবিহীন গণ-অভ্যুত্থানের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে ইরান। তবে এবারের প্রেক্ষাপট গতবারের চেয়ে অনেকটাই ভিন্ন এবং আরও বেশি গভীর। হিজাব বা ব্যক্তিগত স্বাধীনতার দাবির চেয়েও এবারের আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার ন্যূনতম মৌলিক অধিকারগুলো। কয়েক দশকের মধ্যে ভয়াবহতম অর্থনৈতিক মন্দা, মার্কিন ডলারের বিপরীতে জাতীয় মুদ্রা রিয়ালের অভাবনীয় দরপতন এবং লাগামহীন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। মূলত ব্যবসায়ীদের ডাকা বাজার ধর্মঘট থেকে এই ক্ষোভের সূত্রপাত হলেও তা মুহূর্তেই দাবানলের মতো রাজধানী তেহরান ছাড়িয়ে দেশটির ৩১টি প্রদেশের শতাধিক শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। যেখানে গতবারের আন্দোলনে নির্দিষ্ট একটি সামাজিক শ্রেণির প্রাধান্য ছিল, সেখানে এবারের আন্দোলনে রাজপথে নেমে এসেছেন শ্রমজীবী মানুষ থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ী পর্যন্ত—যাদের সমস্বরে উচ্চারিত হচ্ছে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং দেশটির শাসনব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের দাবি।
২
আন্দোলনের সূত্রপাত: বাজার থেকে রাজপথের উত্তাপ।
এবারের গণ-আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ রাজপথের কোনো রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে নয়, জ্বলে উঠেছে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার কেন্দ্রবিন্দু—অর্থাৎ বাজার থেকে। এই বিক্ষোভের অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে ইরানের মুদ্রাবাজারের নজিরবিহীন ধস। গত কয়েক সপ্তাহে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রা ‘রিয়াল’-এর মান ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। বর্তমানে ১ ডলারের বিপরীতে রিয়ালের বিনিময় হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪ লক্ষের কোটায়। মুদ্রার এই ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন দেশটির আমদানিনির্ভর পণ্যের বাজারকে পুরোপুরি অস্থিতিশীল করে তুলেছে। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল এবং ওষুধের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম রাতারাতি কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা এখন শূন্যের কোঠায়। এই অর্থনৈতিক দমবন্ধ পরিস্থিতির প্রতিবাদে প্রথমে তেহরানের ঐতিহাসিক 'গ্র্যান্ড বাজার'সহ প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোর ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ রেখে ধর্মঘটের ডাক দেন। কিন্তু জীবনযাত্রার অসহনীয় ব্যয়ভারের বিরুদ্ধে সাধারণ ক্রেতা এবং নিম্ন আয়ের মানুষেরা যখন ব্যবসায়ীদের এই কর্মসূচিতে সংহতি জানিয়ে রাজপথে নেমে আসেন, তখনই আন্দোলনের রূপ বদলে যায়। যা ছিল মূলত দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদ, তা মুহূর্তেই কয়েক দশকের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তীব্র সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। রুটি-রুজির এই লড়াই এখন রূপান্তরিত হয়েছে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবিতে, যা তেহরানের গণ্ডি ছাড়িয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে।
৩
রক্তাক্ত রাজপথ ও ক্রমবর্ধমান প্রাণহানি।
গত দুই সপ্তাহ ধরে চলা এই গণ-আন্দোলনে ইরানের রাজপথগুলো এখন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর রণসজ্জার বিপরীতে সাধারণ মানুষের বুকফাটা আর্তনাদ আর স্লোগান প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। সরকারের কঠোর দমননীতি ও বিক্ষোভকারীদের অনড় অবস্থানের কারণে পরিস্থিতি প্রতিদিন আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষকদের দেয়া তথ্যমতে সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতের এই তালিকায় যেমন রয়েছেন ৪৮ জন সাধারণ বিক্ষোভকারী, তেমনি বিক্ষুব্ধ জনতার পাল্টা প্রতিরোধে প্রাণ হারিয়েছেন নিরাপত্তা বাহিনীর অন্তত ১৪ জন সদস্য। তেহরান, মাশহাদ এবং তাবরিজের মতো বড় শহরগুলোতে পুলিশ এবং এলিট ফোর্স ‘রেভল্যুশনারি গার্ড’ (IRGC) টিয়ার গ্যাস, জলকামান এমনকি সরাসরি তাজা গুলি ছুড়েও আন্দোলন দমানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দমন-পীড়ন যত বাড়ছে, বিক্ষোভের তীব্রতা যেন ততই বহুগুণে বৃদ্ধি পাচ্ছে। নিহতদের জানাজাকে কেন্দ্র করে নতুন করে জনসমাগম তৈরি হচ্ছে, যা আন্দোলনের আগুনে ঘি ঢালছে। একদিকে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর ব্যারিকেড, অন্যদিকে ক্ষুব্ধ জনতার মরণপণ লড়াই—সব মিলিয়ে ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ও অনিশ্চিত এক অধ্যায়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
৪
সংকটে স্বাস্থ্যসেবা: হাসপাতালের করিডোরে দীর্ঘশ্বাস ও হাহাকার।
বিক্ষোভের দ্বিতীয় সপ্তাহে এসে ইরানের ভঙ্গুর স্বাস্থ্যসেবা খাত এক চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়েছে। দেশটির বড় শহরগুলোর চিকিৎসা কেন্দ্রগুলো এখন আহত রোগীদের চাপে কার্যত অচল। বিশেষ করে তেহরানের বিশেষায়িত চক্ষু হাসপাতাল এবং ট্রমা সেন্টারগুলোতে এখন আর তিল ধারণের ঠাঁই নেই। বিবিসির এক লোমহর্ষক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, নিরাপত্তা বাহিনীর ছোড়া রাবার বুলেট এবং ধাতব ছররা গুলির আঘাতে শত শত বিক্ষোভকারী গুরুতর আহত হয়েছেন, যাদের একটি বড় অংশেরই চোখ চিরতরে নষ্ট হওয়ার পথে। হাসপাতালের ভেতরে কর্তব্যরত একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, জরুরি বিভাগে আসা রোগীদের ভিড় সামলাতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে; বিশেষ করে দক্ষ সার্জনের অভাব প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। সার্জনদের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় এতটাই নগণ্য যে, গুরুতর জখম হওয়া অনেক রোগীকে দীর্ঘ সময় অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় বসে থাকতে হচ্ছে, যার ফলে অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিক চিকিৎসাটুকু দেয়ার আগেই অনেকে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়েছেন। একদিকে ওষুধের তীব্র সংকট, অন্যদিকে গোয়েন্দা নজরদারির ভয়ে অনেক আহত বিক্ষোভকারী হাসপাতালে আসতেও আতঙ্ক বোধ করছেন।
৫
তথ্য বিভ্রাট ও ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট: অন্ধকারে অবরুদ্ধ ইরান।
আন্দোলনের তীব্রতা দমন করতে এবং রাজপথের প্রকৃত চিত্র বহির্বিশ্ব থেকে আড়াল করতে ইরান সরকার দেশজুড়ে এক কঠোর ‘ডিজিটাল ব্ল্যাকআউট’ জারি করে। বিক্ষোভের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় রুখতে মোবাইল ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রায় পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। সেই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ গণমাধ্যমগুলোর ওপর নজিরবিহীন কড়া সেন্সরশিপ আরোপ করায় প্রকৃত নিহতের সংখ্যা, আহতের পরিসংখ্যান এবং পরিস্থিতির ভয়াবহতা সঠিকভাবে নিরূপণ করা এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের জন্য তথ্য সংগ্রহ করা এখন এক চরম ঝুঁকিপূর্ণ কাজে পরিণত হয়েছে। তবে এই কঠোর নিষেধাজ্ঞার দেয়াল ভেঙে বিকল্প পথে এবং স্যাটেলাইট সংযোগের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু অস্পষ্ট ও বিচ্ছিন্ন ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ছে। সেসব ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন রাজপথে হাজার হাজার মানুষ বুকফাটা আর্তনাদে স্লোগান দিচ্ছেন- ‘রুটি, কাজ, স্বাধীনতা’ এবং ‘একনায়কের পতন হোক’। ইন্টারনেটের এই অন্ধকার গহ্বর একদিকে যেমন বিক্ষোভকারীদের যোগাযোগে বাধা দিচ্ছে, অন্যদিকে সরকারের দমন-পীড়নের তথ্য চাপা দেয়ার এক পরিকল্পিত হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে, যা দেশটিকে কার্যত বাকি পৃথিবী থেকে এক দুর্ভেদ্য বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত করেছে।
৬
বিশ্লেষকদের মতামত: অস্তিত্বের সংকটে ইরান প্রশাসন।
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের এক অনিবার্য বিস্ফোরণ। তাদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে কয়েক দশক ধরে চলা কঠোর পশ্চিমা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ইরানের মেরুদণ্ড ভেঙে দিলেও, সরকারের অভ্যন্তরীণ নীতি নির্ধারণী ব্যর্থতা এবং নজিরবিহীন দুর্নীতি এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। ২০২২ সালে মাহসা আমিনি পরবর্তী আন্দোলনে মূলত নারী অধিকার, পোশাকের স্বাধীনতা এবং সামাজিক সংস্কারের দাবিগুলো প্রধান ছিল, যা সমাজের একটি নির্দিষ্ট অংশকে আন্দোলিত করেছিল। কিন্তু এবারের আন্দোলনে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র। হিজাব বা সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার চেয়েও এবার প্রাধান্য পাচ্ছে ‘বেঁচে থাকার অধিকার’। শ্রমজীবী, নিম্নবিত্ত এবং প্রান্তিক মানুষ—যারা মুদ্রাস্ফীতির যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে এখন আক্ষরিক অর্থেই অনাহারের সম্মুখীন, তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমে এসেছেন। যখন একটি আন্দোলনের চালিকাশক্তি হয় ‘পেটের ক্ষুধা’, তখন তা মোকাবিলা করা যেকোনো সরকারের জন্য সবচেয়ে কঠিন হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবির সাথে যখন এই তীব্র অর্থনৈতিক হাহাকার যুক্ত হয়, তখন তা কেবল একটি বিক্ষোভ থাকে না, বরং শাসনব্যবস্থার অস্তিত্বের জন্য এক চরম হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। সাধারণ মানুষের এই মরণপণ অংশগ্রহণ ইরান সরকারকে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
৭
ইরানের রাজপথে চলমান এই জনস্রোত কেবল কোনো সাময়িক বিক্ষোভ নয়, বরং এটি একটি জাতির দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত যন্ত্রণা ও বেঁচে থাকার লড়াইয়ের বহিঃপ্রকাশ। হিজাব বিতর্ক থেকে শুরু করে মুদ্রাস্ফীতির কষাঘাত—ইরানের সাধারণ মানুষ বারবার প্রমাণ করেছে যে, দমন-পীড়ন দিয়ে ক্ষণিকের জন্য রাজপথ জনশূন্য করা গেলেও মানুষের মনের ভেতরে জ্বলতে থাকা পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে নেভানো অসম্ভব। এবারের আন্দোলনে অর্থনৈতিক হাহাকার আর রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবি যেভাবে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে, তা দেশটির বর্তমান শাসনকাঠামোর জন্য এক অশনিসংকেত। আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ আর অভ্যন্তরীণ কঠোর সেন্সরশিপের দেয়াল ভেদ করে ইরানের এই আর্তনাদ আজ বিশ্ববিবেকের দরজায় কড়া নাড়ছে। আগামীর দিনগুলোতে ইরান সরকার সংস্কারের পথে হাঁটবে, নাকি আরও কঠোর দমননীতি বেছে নেবে—তার ওপরই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের এই প্রভাবশালী দেশটির ভবিষ্যৎ। তবে ইতিহাসের শিক্ষা হলো, যখন একটি জাতির বৃহৎ অংশ ‘রুটি ও স্বাধীনতা’র দাবিতে রাজপথে নেমে আসে, তখন বন্দুকের নল দিয়ে সেই প্রবাহকে চিরতরে আটকে রাখা কোনো শাসকগোষ্ঠীর পক্ষেই সম্ভব হয় না।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১১ জানুয়ারি ২০২৬