
১
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ভারত ও চীনের দীর্ঘকালীন দ্বৈরথ বাংলাদেশকে এক কঠিন ‘কৌশলগত উভয়সংকটে’ ফেলে রেখেছে, যেখানে এক শক্তির দিকে ঝুঁকলে অন্যটির সাথে সম্পর্কে ফাটল ধরার ঝুঁকি থাকে। তবে ২০২৬ সালের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে তুরস্ক-সৌদি আরব-পাকিস্তান (TSP) প্রতিরক্ষা বলয় বাংলাদেশের সামনে একটি শক্তিশালী তৃতীয় বিকল্প বা ‘নিরাপত্তা পোর্টফোলিও’ উন্মোচন করছে। এটি কেবল গতানুগতিক সামরিক জোট নয়, বরং বাস্তব রাজনীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি স্বতন্ত্র ‘মুসলিম-মেকানিজম’। এই ব্লকে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ একদিকে যেমন তুরস্কের উন্নত প্রযুক্তি ও সৌদি আরবের বৃহৎ অর্থায়নের সুবিধা নিতে পারবে, তেমনি পাকিস্তানের সামরিক অভিজ্ঞতার সাথেও নিজেদের সমন্বয় ঘটাতে সক্ষম হবে। মূলত ভারত ও চীনের প্রভাব বলয়ের বাইরে এটি ঢাকাকে একটি কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন প্রদান করবে, যা আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। এই জোটের অংশীদারিত্ব বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের দরকষাকষির শক্তি বৃদ্ধি করবে এবং একক কোনো পরাশক্তির ওপর অতি-নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনবে। এরফলে দক্ষিণ এশিয়ায় নিজের সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত রাখতে এই নতুন নিরাপত্তা করিডোরে যুক্ত হওয়া এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।
২
দ্বি-মেরু বিশ্ব বনাম বহুমুখী নিরাপত্তা: ভারত ও চীনের বলয় থেকে উত্তরণ।
ভারত ও চীনের একক আধিপত্যের বাইরে গিয়ে একটি বহুমুখী নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা এখন বাংলাদেশের জন্য কেবল কৌশলগত বিলাসিতা নয়, বরং জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার অপরিহার্য হাতিয়ার। ২০২৬ সালের জটিল ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে তুরস্ক-সৌদি-পাকিস্তান ব্লকে যোগদান ঢাকাকে দ্বিপাক্ষিক চাপের বৃত্ত থেকে বের করে একটি স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে আসীন করবে।
ক। অতি-নির্ভরশীলতার ঝুঁকি ও কৌশলগত সীমাবদ্ধতা।
বাংলাদেশ ভারতের সাথে নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং চীনের সাথে অবকাঠামোগত উন্নয়নে নিবিড়ভাবে জড়িত থাকায় ঢাকার নীতি নির্ধারণী ক্ষমতাকে এক প্রকার সংকুচিত করে ফেলেছে। বর্তমানের মেরুকৃত বিশ্বব্যবস্থায় কোনো নির্দিষ্ট শক্তির ওপর অতি-নির্ভরশীলতা জাতীয় সার্বভৌমত্বের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে যখন দিল্লি ও বেইজিংয়ের স্বার্থ একে অপরের বিপরীতমুখী হয়। ভারত ও চীন—উভয় দেশই বাংলাদেশকে তাদের নিজস্ব প্রভাব বলয়ে রাখতে চায়, যা প্রায়ই ঢাকাকে কঠিন ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যের পরীক্ষায় ফেলে দেয়। এই সীমাবদ্ধতা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে বাংলাদেশকে তার নিরাপত্তা পোর্টফোলিওকে বৈচিত্র্যময় করতে হবে, যেখানে একক কোনো দেশের আধিপত্য থাকবে না। ২০২৬ সালের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে কেবলমাত্র প্রথাগত মিত্রদের ওপর ভরসা না করে নতুন অংশীদার খোঁজা এখন বাংলাদেশের জন্য অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খ। ভারতের নিরাপত্তা বলয়।
দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের নিজস্ব নিরাপত্তা অগ্রাধিকারগুলো অনেক সময় বাংলাদেশের নিজস্ব প্রতিরক্ষা চাহিদার সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে, যা ঢাকাকে আধুনিক সমরাস্ত্র সংগ্রহের ক্ষেত্রে ধীরগতির করে দেয়। দিল্লির ওপর নিরাপত্তা নির্ভরতা ঢাকাকে আঞ্চলিক রাজনীতির নির্দিষ্ট বলয়ে আটকে রাখে, ফলে গ্লোবাল ডিফেন্স চেইনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ সীমিত হয়ে পড়ে। এই স্থবিরতা কাটাতে হলে বাংলাদেশকে এমন সরবরাহকারীর দিকে তাকাতে হবে যারা কেবল ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্ক নয়, বরং দ্রুত প্রযুক্তি হস্তান্তর ও কার্যকর সহযোগিতায় বিশ্বাসী।
গ। চীনের সমরাস্ত্র রাজনীতি ও পশ্চিমা সম্পর্কের টানাপোড়েন।
বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর জন্য চীন আধুনিক ও সাশ্রয়ী সমরাস্ত্রের প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করলেও বেইজিংয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা পশ্চিমা বিশ্বের সাথে ঢাকার দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কের ভারসাম্য নষ্ট করার ঝুঁকি তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বর্তমানে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে অত্যন্ত সতর্ক, এরফলে চীনের সাথে গভীর প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা বা অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। চীনের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদী রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ক্ষেত্রে পশ্চিমা মানদণ্ডের সমান হয় না, যা দীর্ঘ মেয়াদে প্রযুক্তিগত পরনির্ভরশীলতা তৈরি করতে পারে। বেইজিংয়ের প্রভাব বলয় থেকে আংশিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং একই সাথে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করার জন্য বাংলাদেশকে একটি অ-পশ্চিমা অথচ প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত বিকল্প খুঁজতে হচ্ছে।
ঘ। তৃতীয় মেরু হিসেবে TSP ব্লকের উত্থান ও ঢাকার কৌশল।
তুরস্ক-সৌদি-পাকিস্তান (TSP) ব্লকে যোগদান বাংলাদেশের জন্য একটি শক্তিশালী ‘তৃতীয় মেরু’ তৈরি করার সুযোগ এনে দিতে পারে, যা ভারত ও চীন উভয়ের জন্যই কৌশলগত বার্তা হিসেবে কাজ করবে। এই ব্লকে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ ভারতকে বোঝাতে সক্ষম হবে যে ঢাকা নিরাপত্তার জন্য সম্পূর্ণ রূপে দিল্লির ওপর নির্ভরশীল নয়, যা দ্বিপাক্ষিক দরকষাকষিতে বাংলাদেশের হাতকে শক্তিশালী করবে। একইভাবে তুরস্কের মতো ন্যাটোর সদস্য দেশ এবং সৌদি আরবের মতো প্রভাবশালী অর্থনৈতিক শক্তির সাথে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বেইজিংকে বার্তা দেবে যে বাংলাদেশের কাছে বিকল্প লজিস্টিক ও উন্নত প্রযুক্তিগত উৎস রয়েছে। এই ত্রিদেশীয় বলয় বাংলাদেশকে একটি ‘মুসলিম-মেকানিজম’ ভিত্তিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, যেখানে কোনো বৃহৎ পরাশক্তির একচ্ছত্র আধিপত্য নেই। এটি কেবল একটি সামরিক সিদ্ধান্ত নয় বরং একটি সুদূরপ্রসারী ভূ-রাজনৈতিক চাল, যা ২০২৬ সালের অস্থির বিশ্ব রাজনীতিতে বাংলাদেশকে একটি স্বতন্ত্র ও ভারসাম্যপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে।
৩
স্বতন্ত্র ‘মুসলিম-মেকানিজম’: আদর্শিক সংহতি ও কৌশলগত জোট।
ভৌগোলিক সীমারেখা ছাপিয়ে ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক বন্ধনকে যখন সমকালীন প্রতিরক্ষা কৌশলে রূপান্তর করা হয়, তখন তা কেবল একটি জোট নয় বরং এক দুর্ভেদ্য শক্তিতে পরিণত হয়। তুরস্ক-সৌদি-পাকিস্তান ব্লকের এই ‘মুসলিম-মেকানিজম’ বাংলাদেশের জন্য এমন এক আদর্শিক ও কৌশলগত রক্ষাকবচ, যা পশ্চিমা বা আঞ্চলিক প্রভাবের বাইরে এক নতুন ভারসাম্যের জন্ম দেয়।
ক। ত্রিমাত্রিক শক্তির সমন্বয়: প্রযুক্তি, অর্থ ও অভিজ্ঞতা।
এই মেকানিজমের প্রধান শক্তি হলো এর সদস্য দেশগুলোর মধ্যকার সক্ষমতার সুষম বণ্টন, যা বাংলাদেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিরক্ষা বলয়ের অংশ হওয়ার সুযোগ দেয়। তুরস্কের বিশ্বখ্যাত ‘বায়রাক্টার’ ড্রোন প্রযুক্তি, অত্যাধুনিক নৌ-প্রযুক্তি এবং সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতা আধুনিক যুদ্ধের মাঠে ঢাকাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে। এর পাশাপাশি সৌদি আরবের বিশাল অর্থনৈতিক ভাণ্ডার প্রতিরক্ষা প্রকল্পগুলোতে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের নিশ্চয়তা প্রদান করে, যা অনেক সময় বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এককভাবে বহন করা কঠিন। অন্যদিকে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের প্রথাগত যুদ্ধবিদ্যা এবং তাদের পারমাণবিক শক্তির মনস্তাত্ত্বিক সুরক্ষা এই জোটকে অদৃশ্য প্রতিরক্ষা ঢাল প্রদান করে। এই ত্রিমাত্রিক শক্তির সমন্বয় বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীকে কেবল আধুনিকায়নই করবে না, বরং আঞ্চলিক যে কোনো আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।
খ। আদর্শিক সংহতি ও শর্তহীন কৌশলগত অংশীদারিত্ব।
বাংলাদেশের জন্য এই মেকানিজমে যুক্ত হওয়ার অর্থ হলো এমন এক শক্তিশালী ক্লাবে প্রবেশ করা, যেখানে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে গভীর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন বিদ্যমান। পশ্চিম বা প্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের সামরিক সম্পর্ক প্রায়ই কঠিন রাজনৈতিক শর্ত, মানবাধিকার ইস্যু বা ভূ-রাজনৈতিক আনুগত্যের ওপর নির্ভরশীল থাকে। কিন্তু ‘মুসলিম-মেকানিজম’ ভিত্তিক জোটের সম্পর্ক হবে অনেক বেশি টেকসই এবং শর্তহীন কারণ এখানে পারস্পরিক স্বার্থের পাশাপাশি ঐতিহাসিক ভ্রাতৃত্ববোধ কাজ করে। এই জোটের সদস্যপদ ঢাকাকে এমন এক বিশ্বস্ত অংশীদারিত্বের নিশ্চয়তা দেয়, যা সংকটের সময়ে কোনো পরাশক্তির মুখাপেক্ষী না হয়েও জাতীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সক্ষম। এটি মূলত একটি সার্বভৌম নিরাপত্তা বলয়, যা বাহ্যিক চাপের মুখেও বাংলাদেশের কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখবে এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা কূটনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে।
গ। প্রতিরক্ষা করিডোর ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের নতুন উচ্চতা।
এই জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ কেবল সমরাস্ত্র ক্রয়-বিক্রয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি একটি সুদূরপ্রসারী প্রতিরক্ষা করিডোর তৈরির পথ প্রশস্ত করবে। যখন তুরস্কের প্রযুক্তি এবং সৌদি অর্থায়নের সাথে বাংলাদেশের লজিস্টিকস ও কৌশলগত অবস্থান যুক্ত হবে তখন দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্যে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। এটি বাংলাদেশকে এমন এক সক্ষমতা দেবে যাতে সে মিয়ানমারের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে যেকোনো সীমান্ত বিরোধে আরও দৃঢ় অবস্থান নিতে পারে। এই মেকানিজমের মাধ্যমে যৌথ উৎপাদন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের যে সুযোগ তৈরি হবে, তা বাংলাদেশের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পকে শক্তিশালী করবে এবং পরনির্ভরশীলতা কমিয়ে আনবে। এই স্বতন্ত্র মেকানিজমটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে এমন এক স্তরে নিয়ে যাবে যেখানে প্রতিরক্ষা আর কেবল অন্যের দয়ার ওপর নির্ভরশীল থাকবে না, বরং তা হবে নিজস্ব সক্ষমতা ও ভ্রাতৃপ্রতিম জোটের সমন্বিত শক্তির প্রতিফলন।
৪
প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির স্থানান্তর (ToT) ও যৌথ উৎপাদন।
ভারত বা চীন সাধারণত পূর্ণাঙ্গ প্রযুক্তি হস্তান্তর করতে চায় না। কিন্তু তুরস্ক ইতিমধ্যেই তাদের প্রতিরক্ষা শিল্পের অংশীদার হতে মুসলিম দেশগুলোকে আহ্বান জানাচ্ছে।
ক। নিজস্ব উৎপাদন ও প্রযুক্তির স্বয়ংসম্পূর্ণতা।
বাংলাদেশ যদি তুরস্ক-সৌদি-পাকিস্তান (TSP) ব্লকের অংশ হয়, তবে নিজস্ব মাটিতে তুর্কি প্রযুক্তিতে ড্রোন বা ছোট যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের এক ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হবে। তুরস্কের ‘টেকনোলজি ট্রান্সফার’ বা প্রযুক্তি হস্তান্তরের উদার নীতি বাংলাদেশের স্থানীয় প্রতিরক্ষা শিল্পকে শক্তিশালী করবে যা আগে কেবল আমদানিনির্ভর ছিল। এরফলে দেশীয় প্রকৌশলীদের দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রতিরক্ষা খাতে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে। এই যৌথ উদ্যোগ বাংলাদেশকে কেবল একজন ক্রেতা নয়, বরং একজন উৎপাদনকারী হিসেবে আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বাজারে নতুন পরিচিতি এনে দেবে। এটি মূলত স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ার পথ প্রশস্ত করবে, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য।
খ। সাশ্রয়ী লজিস্টিকস চেইন ও ফোর্সেস গোল ২০৩০।
এই ব্লকের অধীনে একটি কার্যকর লজিস্টিকস চেইন গড়ে তোলা সম্ভব, যেখানে সৌদি আরবের অর্থায়নে পাকিস্তানে উৎপাদিত সামরিক সরঞ্জাম বাংলাদেশে আনা বা যৌথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে। ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণে এই প্রক্রিয়াটি পশ্চিমা দেশগুলো থেকে সরঞ্জাম আমদানির চেয়ে অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও দ্রুততর হবে। এটি বাংলাদেশের উচ্চাভিলাষী ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ অর্জনে একটি সহায়ক ও প্রভাবক ভূমিকা পালন করবে, যা আধুনিক সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গতি আনবে। এই অর্থায়ন ও লজিস্টিকস কাঠামো ঢাকাকে বাজেটের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উন্নত সমরাস্ত্র সংগ্রহের সুযোগ করে দেবে। ফলে, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের সামরিক অবস্থান আরও সুসংহত এবং কার্যকর হয়ে উঠবে।
৫
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে প্রভাব: ক্ষমতার নতুন ভারসাম্য।
ভারত ও চীনের একক আধিপত্যের চিরাচরিত বৃত্ত ভেঙে তুরস্ক-সৌদি-পাকিস্তান ব্লকের উত্থান দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তির এক নতুন কেন্দ্রবিন্দু তৈরি করবে। এই কৌশলগত মেরুকরণ ঢাকাকে আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যে কেবল একটি দর্শক নয়, বরং একজন প্রভাবশালী নিয়ন্ত্রক হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সুযোগ দেবে। এই ব্লকে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি দক্ষিণ এশিয়ায় একটি বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন আনবে:
ক। মিয়ানমার সংকটে কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব।
রোহিঙ্গা সংকট বা সীমান্ত উত্তেজনার মতো জটিল ইস্যুতে শক্তিশালী মুসলিম ব্লকের সমর্থন ঢাকাকে মিয়ানমারের ওপর সামরিক ও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগে একচ্ছত্র সুবিধা দেবে। তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো সামরিক শক্তিগুলোর রাজনৈতিক সংহতি আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থানকে দৃঢ় করবে, যা নেপিডোকে উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করবে। এই ব্লকের মাধ্যমে প্রাপ্ত উন্নত গোয়েন্দা তথ্য এবং সমরাস্ত্র সহযোগিতা বাংলাদেশের সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি যেকোনো আঞ্চলিক অস্থিরতায় ঢাকাকে কার্যকর ‘ডিটারেন্স’ বা প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রদান করবে।
খ। বঙ্গোপসাগরে নৌ-আধিপত্যের নতুন সমীকরণ।
বঙ্গোপসাগরের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের প্রেক্ষাপটে তুরস্ক ও পাকিস্তানের উন্নত নৌ-সক্ষমতার সাথে বাংলাদেশের মেরিটাইম স্ট্র্যাটেজি যুক্ত হলে এই অঞ্চলে ভারত বা চীনের একাধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। তুরস্কের আধুনিক যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ প্রযুক্তি এবং পাকিস্তানের নৌ-অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের নৌবাহিনীকে শক্তিশালী ব্লু-ওয়াটার নেভিতে রূপান্তরিত করতে সহায়ক হবে। এর ফলে বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত জলসীমায় বাংলাদেশের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক নৌ-রুটে ঢাকা প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান জানান দিতে পারবে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যে প্রভাব ফেলবে।
গ। বাফার স্টেট থেকে নিরাপত্তা রপ্তানিকারক দেশে রূপান্তর।
বাংলাদেশ ত্রিদেশীয় প্রতিরক্ষা কাঠামোর অংশ হলে দক্ষিণ এশীয় রাজনীতিতে তখন কেবল একটি ‘বাফার স্টেট’ বা সংকটের মধ্যস্থতাকারী নয়, বরং একটি ‘নিরাপত্তা রপ্তানিকারক’ দেশ হিসেবে আবির্ভূত হবে। যৌথ উৎপাদন ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশ তার সামরিক সক্ষমতাকে এমন একপর্যায়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হবে যা প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তার জন্য মডেল হিসেবে কাজ করবে। এই রূপান্তর ঢাকাকে আঞ্চলিক রাজনীতিতে কেবল পরনির্ভরশীলতা থেকে মুক্তি দেবে না, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ তার ভূ-রাজনৈতিক পরিচয়কে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার সুযোগ পাবে।
৬
চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা।
তুরস্ক-সৌদি-পাকিস্তান (TSP) ব্লকে যোগদানের পথে বাংলাদেশের জন্য বেশ কিছু জটিল চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি রয়েছে যা সতর্কতার সাথে মোকাবিলা করা প্রয়োজন। ভারত এই জোটকে দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানের প্রভাব বৃদ্ধির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখে নিরাপত্তা শঙ্কায় ভুগতে পারে, অন্যদিকে চীন এটিকে তাদের দীর্ঘদিনের একচেটিয়া সমরাস্ত্রের বাজার হারানোর হুমকি হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের উচিত হবে- এই জোটে অংশগ্রহণকে কোনোভাবেই ‘ভারত-বিরোধী’ বা ‘চীন-বিরোধী’ কোনো পদক্ষেপ হিসেবে প্রচার না করা। বরং একে আন্তর্জাতিক মহলে ডিফেন্স ডিভার্সিফিকেশন হিসেবে পেশাদারিত্বের সাথে উপস্থাপন করতে হবে। ২০২৬ সালের বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থায় জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কেবল একটি বা দুটি শক্তির ওপর অতি-নির্ভরশীল হওয়া চরম ঝুঁকিপূর্ণ। তাই নিরাপত্তার একাধিক ‘পোর্টফোলিও’ বজায় রাখাই হবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
৭
২০২৬ সালের জটিল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তুরস্ক-সৌদি-পাকিস্তান (TSP) ব্লকে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান কেবল একটি সামরিক কৌশল নয়, বরং এটি জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার এক দূরদর্শী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হতে পারে। ভারত ও চীনের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক প্রতিযোগিতার চাপে পিষ্ট না হয়ে একটি স্বতন্ত্র ‘মুসলিম-মেকানিজম’ ভিত্তিক নিরাপত্তা পোর্টফোলিও গ্রহণ করা এখন বাংলাদেশের সময়ের দাবি। এই জোট একদিকে যেমন তুরস্কের উন্নত ড্রোন ও নৌ-প্রযুক্তি এবং সৌদি আরবের আর্থিক বিনিয়োগের পথ খুলে দেবে, অন্যদিকে পাকিস্তানের সামরিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ অর্জনকে ত্বরান্বিত করবে। এটি বঙ্গোপসাগরে ঢাকার ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি মিয়ানমার ইস্যুতে বাংলাদেশের দরকষাকষির সক্ষমতাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১৮ জানুয়ারি ২০২৬