
১
কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি, আর যা বলে বলুক অন্য লোক।
দেখেছিলেম ময়নাপাড়ার মাঠে কালো মেয়ের কালো হরিণ-চোখ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কালো মেয়ের কালো হরিণ চোখ নিয়ে যে গান লিখেছেন নিষাদ- দ্রাবিড় অধ্যুষিত বাঙলায় তার খানিকটা প্রলেপ দিয়েছিল আবিসিনিয়া বা বর্তমানের ইথিওপিয়ার কিছু ভাগ্যবিরম্বিত মানুষ। আমরা তাদের হাবশি নামে জানি। হাবশি নামটির উৎপত্তি হয় আরবী ‘আল- হাবশ’ শব্দ থেকে। আরবরা আল- হাবশ বলতে বুঝাতো আবিসিনিয়াকে। বাঙলায় হাবশিদের আগমন আরব বণিকদের সঙ্গেই। এরা ছিল ভারবাহী, বিশ্বস্ত এবং অনুগত।
২
১২০৪ খ্রিস্টাব্দে ইখতিয়ারউদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ায় খিলজি বাঙলা জয় করলেও তার আগমনের অনেক আগে থেকেই আরব বণিকদের যাতায়াত ছিল প্রাচীন বাঙলায়। সে সময়ে পূর্ব আফ্রিকাভিত্তিক জাঞ্জিবারে যে দাস ব্যবসা চলতো তা পরিচালনা করতো মূলত ওমানের সুলতান’রা। সগোত্রীয় আরব বণিকদের মাধ্যমেই এদেশে হাবশি ক্রীতদাসদের আগমন। আরব বণিকরা মালাবার- বঙ্গদেশ- কামরূপ হয়েই চীনদেশে যাতায়াত করতো এবং চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী ছিল তাদের প্রবেশ পথ। পরে তাদের পথ ধরে ইরানী এবং আবিসিনিয় বণিকদেরও আগমন ঘটে বাঙলায়। সঙ্গত কারণেই চট্টগ্রামের উপকূল অঞ্চলে এসব ব্যবসায়ীদের সীমিত পরিসরে হলেও বসতি গড়ে ওঠে। এভাবে এ অঞ্চলের উপভাষায় অনেক আরবী শব্দের সংমিশ্রণসহ রক্তের মিশ্রণও ঘটেছে।
৩
স্বাধীন সুলতানি আমলে (১৩৩৮-১৫৩৮) মূলত দুটি উদ্দেশ্যেই বিভিন্ন দাসবাজার থেকে হাবশি ক্রীতদাস কিনে আনা হতো। প্রথমত তাদের বিশ্বস্ততার জেনানা মহল বা হেরেমে প্রহরী হিসেবে নিয়োগ দেবার জন্য খোজা বা নপুংসক শ্রেণীর হাবশি ক্রীতদাসদের কারণে আনা হতো। খোজা বারিক এরকমই একজন ক্রীতদাস, তিনি দীর্ঘকায়, কৃষ্ণবর্ণের এবং মাংসল দৈহিক গড়নের অধিকারী ছিলেন বলে জানা যায়। তার ছিল দীর্ঘ কেশ এবং তিনি সবসময় মেয়েলী পোশাক ও অলঙ্কারাদি ব্যবহার করতেন। সুলতান ফতেহ শাহ্ এর মহিলামহলে তার অবাধ যাতায়াত ছিল। একদিন সুলতান প্রাসাদের খাস কামারায় নিদ্রারত থাকা কালে খোজা বারিক তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে এবং নিজেকে সুলতান শাহজাদা বারবক শাহ্ হিসেবে ঘোষণা করে বাঙলার সিংহাসনে প্রথম হাবশি সুলতান হিসেবে ক্ষমতাসীন হয়। তিনি সুলতান ‘গিয়াস-উদ-দুনিয়া ওয়াদ-দীন আবুল মজফ্ফর বারবক শাহ আস্ সুলতান খল্লাদাল্লাহু মুলফাহু’ উপাধি ধারণ করেন। বাঙলার ইতিহাসে এভাবে ক্রীতদাস অবস্থা থেকে ক্ষমতার শীর্ষে গিয়েছিলেন বারো ভূঁইয়ার অন্যতম ঈসা খাঁ এবং নবাব মুর্শিদকুলি খান। খোজা বারিক আরেক হাবশি ক্রীতদাস মালিক আন্দ্রিল এবং তার সহযোগী খোজা ভৃত্য তাওয়াচি বাশী’র হাতে নিহত হন। মালিক আন্দ্রিল (১৪৮৭-১৪৯০ খ্রিস্টাব্দ) নিজেকে সুলতান ‘সৈফ-উদ-দুনিয়া ওয়াদ-দীন মজফ্ফর ফীরুয শাহ্ আস্ সুলতান খল্লাদাল্লাহু মুলফাহু ওয়া সুলতানহু’, এই উপাধিতে ভূষিত করেন। তার পরে সুলতান কুতব-উদ-দীন আবুল মুজাহিদ মাহমুদ শাহ মাত্র একবছর রাজত্ব করেন। তার পরে শামসুদ্দিন আবুল নসর মুজাফ্ফর শাহ বাঙলার সুলতান ছিলেন। তিনি ছিলেন চতুর্থ এবং শেষ হাবশি সুলতান।
হাবশিদের আমদানি করার দ্বিতীয় কারণটি হলো অশ্বারোহী যোদ্ধার প্রয়োজন মেটানো। দক্ষতা ও বিশ্বস্ততার কারণে শাসকরা তাদেরকে প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেয়। এমনকি মালিক বা অমাত্য পদেও এই হাবশিদের অবস্থান লক্ষ্য করা যায়। সুলতান রুকনউদ্দিন আবুল মুজাহিদ বারবক শাহ্ (১৪৫৯-১৪৭৪ খ্রিস্টাব্দ) এর অশ্বারোহী যোদ্ধাদের কথা অনেক ঐতিহাসিক উল্লেখ করেছেন। মালিক আন্দ্রিল নামে একজন হাবশি ক্রীতদাস ছিল তার অন্যতম সেনাপতি। হাবশি যোদ্ধারা ছিল যুদ্ধজয়ের নিয়ামক শক্তি। এ ধরণের হাবশিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন মালিক কাফুর, তিনি সুলতান শামসুদ্দিন আবুল মুজাফ্ফর ইউসুফ শাহ (১৪৭৪-১৪৮১ খ্রিস্টাব্দ) এবং সুলতান জালাল উদ্দিন আবুল মুজাফ্ফর ফতেহ্ শাহ (১৪৮১-১৪৮৭ খ্রিস্টাব্দ) এর আমলে অন্যতম সেনাপতি ছিলেন। সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের আমলেও হাবশিগণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তার রাজত্বকালে ৮১৩ হিজরিতে হাবশি ইয়াকুত আলী গিয়াসী মক্কা ও মদিনাতে সুলতানের পক্ষ থেকে ধনসম্পদ নিয়ে যায়। তার মাধ্যমে সুলতান মদিনায় ‘আল-মাদ্রাসা-আল বাঙালিয়া’ নামে একটি মাদ্রাসা স্থাপন এবং আরাফাতের ময়দানের ঝর্নাধারা সংস্কারের জন্য অর্থ প্রেরণ করেন।
৪
একটি পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায় যে, ১৪৫০ খ্রিস্টাব্দে এক চালানে ৮,০০০ হাবশি ক্রীতদাস আমদানি করা হয়েছিল। একসঙ্গে এতজন হাবশি’র আগমন এবং প্রশাসন ও সেনাবাহিনীতে নিয়োগ লাভের ফলে আফ্রকীয় জনগোষ্ঠীর প্রাধান্য সূচীত হয়। এরপর থেকে পরবর্তি প্রায় তিনশত বছর ধরে বাঙলায় ৩২,০০০ হাবশি ক্রীতদাসের আগমন ঘটে। অবশ্য তারিখ-ই-ফিরিশতায় উল্লেখ করা হয়েছে যে শুধুমাত্র বারবক শাহ্ একাই বাঙলায় ৮০,০০০ হাবশি আমদানি করেছিলেন। নিজ প্রতিভা এবং দক্ষতার কারণে হাবশিরা রাজদরবারে উঁচু পদগুলোতেও অধিষ্ঠিত হতে সক্ষম হয়। একটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী হওয়া সত্ত্বেও তাদের প্রতিপত্তি ক্রমান্বয়ে এত বেড়ে যায় যে, তারা একটি হাবশি রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। সুলতান ফতেহ শাহ এই হাবশিদের ক্ষমতা খর্ব করতে উদ্যোগ নিলে খোজা বারিক কর্তৃক নিহত হন।
আরব বংশদ্ভুত সৈয়দ বংশীয় সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ্ (১৪৯৩-১৫১৯ খ্রিস্টাব্দ), যিনি হাবশি সুলতান শামসুদ্দিন আবুল নসর মুজাফ্ফর শাহ (১৪৯১- ১৪৯৪ খ্রিস্টাব্দ) এর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তার নেতৃত্বেই বাঙলায় হাবশি বা আফ্রিকীয় প্রাধান্য যুগের সমাপ্তি ঘটে। তিনি হাবশিদের হাত থেকে শাসন ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে তাদেরকে সেনাবাহিনী ও প্রশাসন থেকে বিতাড়িত করেন। এই বহিষ্কৃত হাবশিদের একটা ক্ষুদ্র অংশ গুজরাট এবং দাক্ষিণাত্যের দিকে চলে গেলেও বড় অংশটি বাঙলার সেসময়ের রাজধানী গৌড় অঞ্চল (বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের মালদহ, চাঁপাই নবাবগঞ্জ ও নওগাঁ), রাজশাহী এবং দিনাজপুর অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে কৃষকরূপে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকে। তাদের বংশগতির ধারা বরেন্দ্র অঞ্চলে মূলত স্থানীয় মুসলিম জনগোষ্ঠীর সাথে মিশে যায়। বাঙালি জনগোষ্ঠীতে দীর্ঘ আকারের দেহ সৌষ্ঠব এবং কালো রঙের ওপরে আরেকটু মৃদু প্রলেপ ঢেলে দিয়েছিল এই ইথিওপিয়ানরাই। তাইতো কবি খুঁজে পেয়েছিলেন,
মেঘলা দিনে দেখেছিলেম মাঠে কালো মেঘের কালো হরিণ-চোখ।
ঘোমটা মাথায় ছিল না তার মোটে, মুক্তবেণী পিঠের 'পরে লোটে।
কালো? তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
৩১ জানুয়ারি ২০২৬
হদিস:
১। বাংলায় আফ্রিকান অভিবাসী- আখতার উদ্দিন মানিক
২। বাংলাপিডিয়া
৩। ইন্টারনেট