
১
ভারত মহাসাগরের নীল জলরাশির বুকে অবস্থিত চাগোস দ্বীপপুঞ্জ এখন বিশ্ব রাজনীতির এক জটিল সমীকরণের কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে আন্তর্জাতিক আইনের শাসন ও আমেরিকার সামরিক আধিপত্যের লড়াই দৃশ্যমান। ১৯৬০-এর দশকে ব্রিটেন চাগোস দ্বীপপুঞ্জকে মরিশাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দিয়াগো গার্সিয়া দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সামরিক ঘাঁটি হিসেবে লিজ দেয়। বর্তমানে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কেইর স্টারমার চাগোসের সার্বভৌমত্ব মরিশাসের কাছে হস্তান্তরের যে প্রক্রিয়া শুরু করেছেন, তা পেন্টাগনের নীতি নির্ধারকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। যদিও চুক্তিতে ৯৯ বছরের জন্য সামরিক ঘাঁটিটি বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে, তবুও ওয়াশিংটন আশঙ্কা করছে যে মরিশাসের ওপর চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব দিয়াগো গার্সিয়ার কঠোর নিরাপত্তা ও গোপনীয়তাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। বিশেষ করে এই ঘাঁটিতে মোতায়েনকৃত পারমাণবিক সাবমেরিন ও দূরপাল্লার বোমারু বিমানের কার্যক্রম নিয়ে ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা তৈরির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। রিপাবলিকান বিশ্লেষকদের মতে, এই হস্তান্তর ভারত মহাসাগরে পশ্চিমা শক্তির একচ্ছত্র আধিপত্য খর্ব করবে এবং বেইজিংকে এই অঞ্চলে পা রাখার নতুন সুযোগ করে দেবে। ফলে দিয়াগো গার্সিয়া কেবল একটি দ্বীপ নয়, বরং একবিংশ শতাব্দীর ভূ-রাজনীতিতে ঔপনিবেশিক কলঙ্ক মোচন বনাম জাতীয় নিরাপত্তার দ্বৈরথে এক অগ্নিপরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২
দিয়াগো গার্সিয়া: ভারত মহাসাগরের ‘অদম্য দুর্গ’।
ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে চাগোস দ্বীপপুঞ্জের বৃহত্তম প্রবাল দ্বীপ দিয়াগো গার্সিয়া হলো ভারত মহাসাগরের এমন এক স্ট্র্যাটেজিক অবস্থান যেখান থেকে এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল অংশ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এটি কেবল একটি সামরিক আস্তানা নয়, বরং ওয়াশিংটনের বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির এমন এক কেন্দ্রবিন্দু যা আন্তর্জাতিক নৌ-পথের নিরাপত্তা ও শক্তির ভারসাম্য রক্ষা করে।
ক। পারমাণবিক সামর্থ্য।
দিয়াগো গার্সিয়া হলো বিশ্বের অন্যতম সুরক্ষিত এবং গোপনীয় সামরিক ঘাঁটি, যেখান থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক বি-টু স্টিলথ বোমারু বিমান (B-2 Stealth Bomber) এবং দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল অনায়াসে পরিচালনা করা হয়। ভারত মহাসাগরের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত হওয়ায় এটি থেকে আমেরিকা এশিয়ার যেকোনো প্রান্তে পারমাণবিক হামলা চালানোর সক্ষমতা রাখে। এই দ্বীপের বিশাল রানওয়ে এবং বিশেষায়িত হ্যাঙ্গারগুলো এমনভাবে তৈরি যা ভারী বোমারু বিমান ও পারমাণবিক সাবমেরিনগুলোকে দীর্ঘসময় রিফুয়েলিং এবং রক্ষণাবেক্ষণের সুবিধা প্রদান করে। ফলে বৈশ্বিক যেকোনো বড় সংঘাতের সময় পেন্টাগনের পারমাণবিক প্রতিরোধের (Nuclear Deterrence) প্রধান অস্ত্র হিসেবে এই ঘাঁটিটি অপ্রতিদ্বন্দ্বী ভূমিকা পালন করে আসছে।
খ। লজিস্টিক হাব।
দিয়াগো গার্সিয়া হলো ভারত মহাসাগরে মার্কিন সামরিক শক্তির প্রধান লজিস্টিক কেন্দ্র, যেখান থেকে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া এবং পূর্ব আফ্রিকার যেকোনো প্রান্তে অতি দ্রুত সামরিক অপারেশন পরিচালনা করা সম্ভব হয়। এই ঘাঁটিটি মূলত একটি ‘ফ্লোটিং বেস’ হিসেবে কাজ করে, যেখানে বিশাল আয়তনের জ্বালানি ভাণ্ডার, সমরাস্ত্রের মজুদ এবং কয়েক হাজার সেনার আবাসন ব্যবস্থা রয়েছে। ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের সময় এই দ্বীপটিই ছিল মার্কিন বোমারু বিমান ও রসদ সরবরাহের প্রধান লঞ্চপ্যাড, যা ভৌগোলিক দূরত্বের বাধাকে কমিয়ে এনেছিল। এর গভীর সমুদ্র বন্দরটি বিশাল এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার এবং পারমাণবিক সাবমেরিনগুলোর নোঙর ও পুনর্প্রস্তুতির জন্য অপরিহার্য, যা এই অঞ্চলে ওয়াশিংটনের নিরবচ্ছিন্ন উপস্থিতি নিশ্চিত করে।
গ। নজরদারি।
ভারত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌ-পথের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে দিয়াগো গার্সিয়া ঘাঁটিটি আমেরিকার জন্য একটি অভেদ্য পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল এই অঞ্চল দিয়ে বিশ্বের অধিকাংশ জ্বালানি ও পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করে, যার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই ঘাঁটির উন্নত রাডার ও স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং সিস্টেম অপরিহার্য। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব রুখতে এবং বেইজিংয়ের ‘স্ট্রিং অফ পার্লস’ নীতি মোকাবিলায় এটি একটি প্রধান প্রতিরক্ষা প্রাচীর। ফলে সমুদ্রসীমায় যেকোনো ধরনের উস্কানি বা গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে এবং মার্কিন মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই ঘাঁটির কোনো বিকল্প নেই।
সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে এই দ্বীপটি হস্তান্তর করা হলে আমেরিকার দশকের পর দশক ধরে গড়ে তোলা এই অজেয় প্রতিরক্ষা বলয়ে বড় ধরনের ফাটল ধরার ঝুঁকি তৈরি হবে।
৩
সার্বভৌমত্বের আইনি লড়াই: মরিশাসের দাবি ও ব্রিটেনের নতি স্বীকার।
১৯৬৮ সালে মরিশাস ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে স্বাধীনতা লাভ করলেও চাগোস দ্বীপপুঞ্জকে অন্যায়ভাবে বিচ্ছিন্ন করে ‘ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান ওশান টেরিটরি’ (BIOT) হিসেবে নিজেদের অধীনে রেখে দেয় যুক্তরাজ্য। সেই সময় থেকেই মরিশাস এই দ্বীপপুঞ্জকে তাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ দাবি করে আন্তর্জাতিক মহলে আইনি লড়াই চালিয়ে আসছে। এই দীর্ঘ বিবাদের প্রেক্ষিতে ২০১৯ সালে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত (ICJ) এক ঐতিহাসিক রায়ে ঘোষণা করে যে, চাগোস দ্বীপপুঞ্জ থেকে ব্রিটেনের শাসন অনতিবিলম্বে গুটিয়ে নেয়া উচিত কারণ এর বিচ্ছেদ আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী ছিল। পরবর্তীতে ২০২৪-২৫ সালে ব্রিটেনের বর্তমান লেবার সরকার আন্তর্জাতিক চাপ এবং নৈতিক অবস্থান বিবেচনা করে দ্বীপপুঞ্জটির সার্বভৌমত্ব মরিশাসের কাছে হস্তান্তরের চূড়ান্ত ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তবে এই হস্তান্তরের পেছনে প্রধান শর্ত হিসেবে দিয়াগো গার্সিয়া সামরিক ঘাঁটিটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব পেয়েছে। ব্রিটিশ সরকারের এই নতি স্বীকারকে অনেকে ঔপনিবেশিক শাসনের শেষ অবশেষ বিলুপ্তির পদক্ষেপ হিসেবে দেখলেও পেন্টাগনের সামরিক কৌশলে এটি গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক আদালতের রায় কার্যকর করার মাধ্যমেই মরিশাস তাদের হারানো ভূখণ্ড ফিরে পাওয়ার আইনি ভিত্তি মজবুত করেছে। তবে এই সার্বভৌমত্বের লড়াই ভারত মহাসাগরের মানচিত্রে এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে, যা বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করবে।
৪
বর্তমান সংকট: কেন মার্কিন মহলে চরম উত্তেজনা?
চাগোস দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব হস্তান্তরের চুক্তিটি আমেরিকার সামরিক পরিকল্পনাবিদদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে, কারণ এটি দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার গ্যারান্টি নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন তুলেছে। যদিও চুক্তিতে ঘাঁটিটি ব্যবহারের নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে, তবুও ওয়াশিংটন আশঙ্কা করছে যে মরিশাসের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে এই অঞ্চলের গোপনীয়তা ও সার্বভৌম কর্তৃত্ব খর্ব হতে পারে।
ক। নিরাপত্তা ঝুঁকি ও চীনের প্রভাব।
মার্কিন রিপাবলিকান নেতাদের মতে, মরিশাসের সাথে চীনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও কৌশলগত সম্পর্ক থাকায় চাগোস দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব হস্তান্তর আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। যদি সার্বভৌমত্ব মরিশাসের হাতে যায় তবে বেইজিং এই অঞ্চলের অন্যান্য দ্বীপ যেমন পেরোস বানহোস বা সালোমন দ্বীপপুঞ্জে বিনিয়োগ বা অবকাঠামো উন্নয়নের আড়ালে অত্যন্ত শক্তিশালী গোয়েন্দা নজরদারি কেন্দ্র স্থাপন করতে পারে। এরফলে দিয়াগো গার্সিয়া থেকে পরিচালিত অত্যন্ত গোপনীয় সামরিক কার্যক্রম ও পারমাণবিক সাবমেরিনের গতিবিধি চীনের রাডারে চলে আসার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। ভারত মহাসাগরে ওয়াশিংটনের একচ্ছত্র আধিপত্য খর্ব করে সেখানে বেইজিংয়ের প্রভাব বিস্তারের একটি নতুন দুয়ার খুলে যাওয়ার ভয়ই এই উত্তেজনার মূল কারণ।
খ। লিজের স্থায়িত্ব ও আন্তর্জাতিক আইন।
চুক্তি অনুযায়ী ৯৯ বছরের লিজের মাধ্যমে ঘাঁটিটি রক্ষার কথা বলা হলেও, ভবিষ্যতে মরিশাসের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে এই লিজ কতটুকু টেকসই হবে তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর সংশয় রয়েছে। ওয়াশিংটন আশঙ্কা করছে যে, মরিশাসের নতুন কোনো সরকার যদি জনমত বা আন্তর্জাতিক চাপের মুখে লিজ চুক্তি বাতিল বা পুনর্বিবেচনা করে, তবে দিয়াগো গার্সিয়ার আইনগত ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে। এছাড়া মরিশাস যদি ‘পেলিন্ডাবা চুক্তি’র মতো কোনো ‘পারমাণবিক মুক্ত অঞ্চল’ চুক্তিতে কঠোরভাবে স্বাক্ষর করে, তবে আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতায় আমেরিকা এই ঘাঁটি থেকে তাদের পারমাণবিক অস্ত্র ও সাবমেরিন সরাতে বাধ্য হতে পারে। মূলত এই আইনি অনিশ্চয়তাই আমেরিকার দীর্ঘমেয়াদী সামরিক কৌশলের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা ভারত মহাসাগরে তাদের উপস্থিতিকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
৫
রাজনৈতিক বিভাজন: লন্ডন ও ওয়াশিংটনের দ্বিমত।
ব্রিটেনের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কেইর স্টারমার আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে এবং চাগোসীয়দের দীর্ঘদিনের অধিকার প্রতিষ্ঠায় এই চুক্তিটি এগিয়ে নিতে চাইলেও, এটি লন্ডন ও ওয়াশিংটনের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন ও প্রভাবশালী ডানপন্থী রাজনীতিবিদেরা এই সিদ্ধান্তকে ‘বিপজ্জনক আত্মসমর্পণ’ এবং পশ্চিমা নিরাপত্তার জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে ব্রিটেনের এই পদক্ষেপ ভারত মহাসাগরে গত কয়েক দশকের পশ্চিমা ভূ-রাজনৈতিক কর্তৃত্ব স্বেচ্ছায় ত্যাগের শামিল, যা এই অঞ্চলে চীনের আধিপত্য বিস্তারের পথ প্রশস্ত করে দেবে। ওয়াশিংটনের নীতি নির্ধারকেরা আশঙ্কা করছেন ব্রিটেনের এই 'নৈতিক অবস্থান' প্রকারান্তরে মার্কিন সামরিক কৌশলের মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে পারে। এরফলে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়া সত্ত্বেও দিয়াগো গার্সিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে এই দুই দেশের মধ্যে আস্থার সংকট ঘনীভূত হচ্ছে।
৬
ভবিষ্যৎ প্রেক্ষাপট: ভারত মহাসাগরে আধিপত্যের রূপরেখা।
দিয়াগো গার্সিয়ার ভবিষ্যৎ কেবল একটি ক্ষুদ্র দ্বীপের মালিকানা পরিবর্তন নয়, বরং এটি একবিংশ শতাব্দীর সমুদ্র রাজনীতির এক জটিল ও প্রতীকী দ্বৈরথ। এই দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ হারানোর অর্থ হলো ভারত মহাসাগরে দীর্ঘদিনের পশ্চিমা একক আধিপত্যের অবসান এবং উদীয়মান শক্তি হিসেবে চীনের জন্য নতুন কৌশলগত দ্বার উন্মোচন। শেষ পর্যন্ত এই সংকটের সমাধানই নির্ধারণ করবে আন্তর্জাতিক আইন বনাম সামরিক শক্তির লড়াইয়ে আগামী দিনে বিশ্বশক্তির ভারসাম্য কার অনুকূলে থাকবে।
ক। চীনের সুযোগ।
পশ্চিমী মিত্রদের মধ্যে এই কূটনৈতিক টানাপোড়েন চীনের জন্য ভারত মহাসাগরে তার ‘স্ট্রিং অফ পার্লস’ নীতিকে আরও সুসংহত করার এক অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি করে দিতে পারে। ওয়াশিংটন ও লন্ডনের মধ্যে আস্থার ফাটলকে কাজে লাগিয়ে বেইজিং মরিশাসের সাথে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত অংশীদারিত্ব বাড়িয়ে কৌশলগতভাবে এই অঞ্চলের ওপর প্রভাব বিস্তারের পথ প্রশস্ত করবে। পশ্চিমা শক্তির এই দ্বিধাদ্বন্দ্বই ভারত মহাসাগরের মানচিত্রে চীনের সামরিক ও বাণিজ্যিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার নতুন দুয়ার খুলে দেয়ার সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলেছে।
খ। ভারতের অবস্থান।
ভারত ঐতিহাসিকভাবে ঔপনিবেশিকতা বিলোপের পক্ষে থাকায় মরিশাসের সার্বভৌমত্বের দাবিকে সমর্থন দিয়ে আসলেও, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দিয়াগো গার্সিয়াতে মার্কিন উপস্থিতি বজায় রাখাকেই নিজের নিরাপত্তার জন্য অনুকূল মনে করে। নয়াদিল্লির আশঙ্কা এই দ্বীপপুঞ্জ থেকে পশ্চিমা প্রভাব হ্রাস পেলে ভারত মহাসাগরে চীনের নৌ-শক্তির একাধিপত্য তৈরি হবে, যা ভারতের সামুদ্রিক সীমান্ত ও বাণিজ্য পথের জন্য বড় হুমকি। তাই আদর্শিক সমর্থন ও বাস্তবসম্মত প্রতিরক্ষা কৌশলের এক কঠিন ভারসাম্য বজায় রেখে ভারত চায় এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা যেন কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয়।
৭
দিয়াগো গার্সিয়া সংকট আজ বিশ্ববাসীর সামনে প্রমাণ করে দিয়েছে সামরিক শক্তি এবং আন্তর্জাতিক নৈতিকতা যখন একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়ায়, তখন কোনো পক্ষই এককভাবে জয়ী হতে পারে না। ব্রিটেন যদি শেষ পর্যন্ত সার্বভৌমত্ব হস্তান্তর করে এবং মরিশাস তার দেয়া কৌশলগত প্রতিশ্রুতিগুলো রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তবে ভারত মহাসাগরে আমেরিকার কয়েক দশকের অপ্রতিদ্বন্দ্বী আধিপত্যে এক ভয়াবহ ফাটল ধরবে। এই ফাটল কেবল একটি সামরিক ঘাঁটির দুর্বলতা নয় বরং এটি সমগ্র ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্যকে আমূল বদলে দিতে পারে, যা প্রকারান্তরে চীনের মতো উদীয়মান শক্তিগুলোর জন্য নতুন সুযোগের দুয়ার খুলে দেবে। আইনি বাধ্যবাধকতা পূরণ করতে গিয়ে ওয়াশিংটন যদি তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘লঞ্চপ্যাড’ হারায় তবে বিশ্বজুড়ে মার্কিন নিরাপত্তা বলয় সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। চাগোস দ্বীপপুঞ্জের এই সার্বভৌমত্বের লড়াই কেবল একটি ভূখণ্ডের মালিকানা পরিবর্তনের বিষয় নয়, এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এক নতুন ও জটিল অগ্নিপরীক্ষা।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১৩ মার্চ ২০২৬