
১
ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার পালাবদল এক নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর দেশটির সর্বোচ্চ নেতার আসনে পরিবর্তন আসায় তেহরানের অভ্যন্তরীণ শক্তিকাঠামোতে ব্যাপক রদবদল লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। তবে তার এই উত্থান ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতা সুসংহত করার নেপথ্যে মূল কারিগর হিসেবে কাজ করছে রহস্যময় ও দুর্ধর্ষ ‘নোপো’ (NOPO) বাহিনী। কালো পোশাকে আবৃত এই এলিট কমান্ডো ইউনিটটি কেবল প্রথাগত সন্ত্রাস দমনে সীমাবদ্ধ নেই, তারা মোজতবা খামেনির ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অস্তিত্বের প্রধান রক্ষাকবচে পরিণত হয়েছে। এই বাহিনীর কঠোর শৃঙ্খলা ও আনুগত্য তেহরানের শাসনব্যবস্থায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। মোজতবার ক্ষমতাকে নিষ্কণ্টক করতে নোপো এখন দেশটির সবচেয়ে প্রভাবশালী ও আস্থাশীল শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে।
২
নোপো: কালো পোশাকের আড়ালে এক দুর্ধর্ষ বাহিনী।
ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বলয়ে ‘নোপো’ (NOPO) এক অবিচ্ছেদ্য এবং রহস্যময় নাম। ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিশেষ বাহিনীটি মূলত দেশটির জাতীয় পুলিশের একটি এলিট উইং হিসেবে পরিচিত। ফার্সি ভাষায় এদের পূর্ণ নাম 'নিরৌয়েহ বিজেহ পাদে ওয়াহশাত', যার অর্থ হলো সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ কমান্ডো শক্তি। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এদের পরিচিতি প্রধানত 'ব্ল্যাক-ক্ল্যাড' বা কালো পোশাকধারী বাহিনী হিসেবে। এই বাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণের মান এতটাই উন্নত যে, অনেক ক্ষেত্রেই এদের কার্যকারিতা শক্তিশালী আইআরজিসি (IRGC)-কেও ছাড়িয়ে যায়। নোপোর প্রধান শক্তিমত্তা হলো তাদের কঠোর শৃঙ্খলা এবং নিখুঁত রণকৌশল। মার্শাল আর্ট থেকে শুরু করে জিম্মি উদ্ধার, প্রতিটি ক্ষেত্রেই তারা আধুনিক বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হিসেবে গণ্য হয়। বিশেষ করে 'আরবান ওয়ারফেয়ার' বা নগর যুদ্ধে তাদের পারদর্শিতা শত্রুপক্ষের জন্য চরম আতঙ্কের কারণ। বর্তমানে কেবল সন্ত্রাস দমন নয়, ইরানের ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় তারা এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। কৌশলগত দিক থেকে এই বাহিনীর অবস্থান এখন যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং তাৎপর্যপূর্ণ।
৩
কেন মোজতবা খামেনির প্রথম পছন্দ নোপো?
সাধারণত ইরানের সর্বোচ্চ নেতাদের নিরাপত্তার চিরাচরিত দায়িত্ব আইআরজিসি’র ওপর ন্যস্ত থাকলেও মোজতবা খামেনির নোপোকে বেছে নেওয়া এক গভীর রাজনৈতিক সমীকরণ নির্দেশ করে। এই সিদ্ধান্তটি আইআরজিসি’র বিশাল কাঠামোর ভেতরে থাকা সম্ভাব্য অভ্যন্তরীণ দলাদলি এড়িয়ে সরাসরি ও ব্যক্তিগত আনুগত্য নিশ্চিত করার একটি সুকৌশলী পদক্ষেপ। নোপোর ক্ষুদ্র অথচ অত্যন্ত দক্ষ ও নির্দয় হিসেবে পরিচিত ইউনিটটি মোজতবার ক্ষমতা সুসংহত করতে এবং যেকোনো অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ বা অভ্যুত্থান দমনে অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য। নিজের শাসনকালকে নিষ্কণ্টক রাখতে এবং ক্ষমতার কেন্দ্রে একটি অভেদ্য ব্যক্তিগত প্রাচীর তৈরি করতেই তিনি এই দুর্ধর্ষ বাহিনীকে প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
ক। নিরঙ্কুশ আনুগত্য।
ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়ে মোজতবা খামেনির জন্য নোপো বাহিনীর প্রধান আকর্ষণ হলো তাদের প্রশ্নাতীত ও নিরঙ্কুশ আনুগত্য। আইআরজিসি বা রেভল্যুশনারি গার্ডস একটি বিশাল ও বহুমুখী প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এর ভেতরে বিভিন্ন রাজনৈতিক লবি বা উপদলের প্রভাব থাকার সম্ভাবনা থাকে, যা অনেক সময় কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারে। এর বিপরীতে নোপো তুলনামূলক ছোট, বিশেষায়িত এবং অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ইউনিট যারা কোনো রাজনৈতিক সমীকরণের ধার ধারে না। তারা সরাসরি এবং একক চেইন অফ কমান্ড অনুসরণ করে যেকোনো সংকটকালীন মুহূর্তে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে সক্ষম। এই সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ও ব্যক্তিগত আনুগত্যের কারণেই মোজতবা খামেনি তাদের ওপর পূর্ণ আস্থা রেখেছেন।
খ। অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ।
মোজতবা খামেনির ক্ষমতা গ্রহণের এই সন্ধিক্ষণে যেকোনো ধরনের অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ বা সামরিক অভ্যুত্থানের ঝুঁকি নস্যাৎ করাই নোপো বাহিনীর প্রধান লক্ষ্য। ক্ষমতার এই নাজুক পরিবর্তনের সময় যেন কোনো বিরোধী পক্ষ বা সেনাবাহিনীর ভেতরে থাকা কোনো অংশ মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, তা নিশ্চিত করতেই এই 'নিষ্ঠুর' হিসেবে পরিচিত বাহিনীকে সামনে আনা হয়েছে। নোপোর সদস্যরা কেবল নিরাপত্তায় দক্ষ নয়, বরং তাদের অতীত কর্মকাণ্ড রাজনৈতিক অস্থিরতা দমনে তাদের কঠোরতার প্রমাণ দেয়। তাদের এই ভয়ংকর ইমেজটি বিরোধীদের মধ্যে একটি মনস্তাত্ত্বিক ভীতির দেওয়াল তৈরি করে, যা যেকোনো সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করতে সক্ষম। মূলত মোজতবার শাসনকাঠামোকে একচ্ছত্র ও নিষ্কণ্টক করার লক্ষ্যেই এই বাহিনীকে দাবার গুটি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
গ। মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব।
নোপো সদস্যদের রণকৌশলী উপস্থিতি এবং তাদের বিশেষ অবয়ব জনমানসে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বিস্তার করে। যেকোনো বিক্ষোভ বা বিরোধিতার মুখে তাদের রণসজ্জা একটি স্পষ্ট ভীতিমূলক বার্তা দেয়, যা প্রতিপক্ষকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দিতে সক্ষম। বর্তমান ইরানের এই অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মোজতবা খামেনির জন্য জনবিক্ষোভ বা অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ দমনে এমন একটি ভয়ংকর ভাবমূর্তি অত্যন্ত জরুরি ছিল। মূলত শক্তির চেয়েও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখাই এখানে নোপোর প্রধান কৌশলগত সার্থকতা।
৪
ঐতিহাসিক ভূমিকা ও মানবাধিকার বিতর্ক।
নোপো বাহিনীর ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় তারা কেবল রাষ্ট্রের সুরক্ষাকবচ নয়, বরং বিভিন্ন সময়ে অভ্যন্তরীণ দমনের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। ১৯৯৯ সালের ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২২ সালের আলোচিত মাহসা আমিনি কেন্দ্রিক বিক্ষোভ, প্রতিটি সংকটকালেই এই বাহিনীকে রাজপথে ‘আয়রন ফিস্ট’ বা কঠোর হস্ত নীতি প্রয়োগ করতে দেখা গেছে। তাদের অতি-আগ্রাসী রণকৌশল এবং বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্মম বলপ্রয়োগের কারণে এই বাহিনী বরাবরই বিতর্কিত। বিশেষ করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগে ২০২১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই বিশেষ ইউনিটের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সাধারণ জনতাকে ভীতি প্রদর্শন এবং যেকোনো গণবিক্ষোভকে অঙ্কুরেই দমন করাই ছিল এই বাহিনীর ঐতিহাসিকভাবে অর্পিত প্রধান কাজ। বর্তমানে মোজতবা খামেনির বিশ্বস্ত বাহিনী হিসেবে তাদের এই দমনমূলক অতীত নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। তাদের এই আক্রমণাত্মক ভাবমূর্তিই এখন তেহরানের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার প্রধান স্তম্ভ হিসেবে কাজ করছে।
৫
৬টি ব্রিগেড ও তেহরানের নিরাপত্তা বলয়।
নোপো বাহিনীর সাংগঠনিক কাঠামো অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং শক্তিশালী এক প্রতিরক্ষা বিন্যাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই বিশেষ বাহিনীর মোট ৬টি দুর্ধর্ষ ব্রিগেডের মধ্যে ৪টিই কৌশলগত কারণে সার্বক্ষণিকভাবে রাজধানী তেহরানে মোতায়েন রাখা হয়েছে। তেহরানে এই বিপুলসংখ্যক সদস্যের অবস্থান নিশ্চিত করার উদ্দেশ্য একেবারেই পরিষ্কার, ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে যেকোনো মুহূর্তের অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক চ্যালেঞ্জ কঠোরভাবে মোকাবিলা করা। রাজধানীর শাসন কাঠামোকে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়ে ঘিরে রাখাই এই বিন্যাসের প্রধান লক্ষ্য। অন্যদিকে বাহিনীর বাকি দুটি ব্রিগেড মাশহাদ এবং ইসফাহানের মতো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল শহরগুলোতে অবস্থান করে। এই শহরগুলোতে নোপো সদস্যদের মোতায়েন মূলত সারা দেশে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা এবং যেকোনো আঞ্চলিক অস্থিরতা দ্রুত প্রশমনের একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। তেহরানকে সুরক্ষিত রেখে প্রান্তিক শহরগুলোতে এই বাহিনীর উপস্থিতি মোজতবা খামেনির শাসনকে এক শক্তিশালী প্রশাসনিক ভিত্তি প্রদান করেছে। এই নিপুণ বিন্যাসই বর্তমানে ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার প্রধান স্তম্ভ হিসেবে কাজ করছে।
৬
ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ।
মোজতবা খামেনির বিশ্বস্ত নোপো বাহিনীর এই নাটকীয় উত্থান মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন এবং জটিল সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। এই বাহিনী যদি কেবল অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার গণ্ডি পেরিয়ে রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযানে লিপ্ত হয়, তবে তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে ইরানের সামগ্রিক পররাষ্ট্রনীতিতে। বিশেষ করে বর্তমানে ইসরায়েল এবং আমেরিকার সাথে তেহরানের যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে, সেই প্রেক্ষাপটে নোপোর ক্রমবর্ধমান শক্তি এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। মোজতবার এই ব্যক্তিগত বাহিনীর শক্তিমত্তা প্রদর্শন এখন আর কেবল অভ্যন্তরীণ সংহতি রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি বহির্বিশ্বকে, বিশেষ করে পশ্চিমা শক্তিগুলোকে এক শক্তিশালী ও কড়া বার্তা দেওয়ার কৌশল। এর মাধ্যমে তেহরান স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, যেকোনো মূল্যে তারা ক্ষমতার স্থিতিশীলতা ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। ভবিষ্যতের ইরান যদি আরও বেশি রক্ষণশীল ও হার্ডলাইন নীতি গ্রহণ করে, তবে নোপো হবে সেই নীতির প্রধান প্রয়োগকারী শক্তি। মোজতবার অধীনে এই বাহিনীর ভূমিকা আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যে এক নতুন মেরুকরণ তৈরি করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে নোপো বাহিনীর এই প্রভাব ইরানের কূটনৈতিক ও সামরিক অবস্থানকে এক ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে যাবে।
৭
মোজতবা খামেনির বর্তমান ক্ষমতা কেবল উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া কোনো আলঙ্কারিক পদ নয়; বরং এই ক্ষমতাকে নিষ্কণ্টক রাখতে ‘নোপো’ (NOPO) বাহিনীর মাধ্যমে এক দুর্ভেদ্য ‘স্টিল শিল্ড’ বা ইস্পাত সদৃশ দেওয়াল তৈরি করা হয়েছে। ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে এই এলিট বাহিনীর ভূমিকা এখন আর কেবল প্রথাগত নিরাপত্তারক্ষীর গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। বরং তেহরানের ক্ষমতার অলিন্দে যেকোনো বড় ধরনের নীতি নির্ধারণ বা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তারা হয়ে উঠতে পারে প্রধান কারিগর। মোজতবার রাজনৈতিক অস্তিত্ব ও নোপোর দুর্ধর্ষ সমরশক্তি এখন একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে। এই বাহিনীর ক্রমবর্ধমান প্রভাব ইঙ্গিত দেয় যে, ইরানের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থায় যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তারা হবে শেষ কথা। ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা থেকে শুরু করে যেকোনো বিদ্রোহ দমন—সবক্ষেত্রেই নোপোর অবস্থান হবে অত্যন্ত নির্ণায়ক। আগামী দিনে ইরানের রাজনৈতিক মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে এই বাহিনীটিই হবে তেহরানের তুরুপের তাস।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচ এস, ঢাকা
১৫ মার্চ ২০২৬