
১
একবিংশ শতাব্দীতে যুদ্ধের ময়দান কেবল ভৌগোলিক সীমান্ত বা আকাশসীমায় সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিক যুগে একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের স্নায়ুপ্রান্ত হলো তার সাইবার অবকাঠামো, আর এই ডিজিটাল রণক্ষেত্রে ইসরায়েলের সবচেয়ে শক্তিশালী ও রহস্যময় হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে Unit 8200 (হিব্রু ভাষায় ‘Shmone Matayim’)। ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেস (IDF)-এর ইন্টেলিজেন্স ডিরেক্টরেটের এই বিশেষ শাখাটি মূলত সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স (SIGINT) এবং কোড ব্রেকিংয়ের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে, যা তাদের বিশ্বের অন্যতম সেরা সাইবার গোয়েন্দা সংস্থায় পরিণত করেছে। এই ইউনিটটি কেবল শত্রু দেশের সামরিক যোগাযোগ নজরদারি করে না, বরং জটিল অ্যালগরিদম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে সম্ভাব্য হামলার পূর্বাভাস দিতে এবং সাইবার ম্যালওয়্যারের মাধ্যমে শত্রুর কৌশলগত স্থাপনা অচল করে দিতে পারদর্শী। ভৌগোলিক আয়তনে ছোট দেশ হয়েও ইসরায়েল যে আজ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি ও সামরিক শক্তিতে বিশাল প্রভাব বিস্তার করছে, তার নেপথ্যে রয়েছে এই ইউনিটের প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব। বর্তমান বিশ্বের 'প্রক্সি ওয়ার' বা ছায়াযুদ্ধে Unit 8200 এমন এক অদৃশ্য বাহিনী, যারা কোনো বুলেট খরচ না করেই কিবোর্ডের কমান্ডে জয়-পরাজয় নির্ধারণ করার সক্ষমতা রাখে।
২
সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স (SIGINT) ও অপারেশনাল পরিধি।
Unit 8200-এর মূল শক্তি হলো সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স (SIGINT), যা মূলত অদৃশ্য তরঙ্গ ও ডিজিটাল সংকেতকে রণকৌশলে রূপান্তর করার এক উন্নত প্রক্রিয়া। তারা প্রধানত তিনটি স্তরে কাজ করে: প্রথমত, রাডার, স্যাটেলাইট এবং ফাইবার অপটিক্স থেকে কাঁচা তথ্য বা ‘র ডাটা’ সংগ্রহ; দ্বিতীয়ত, এনক্রিপ্ট করা জটিল কোড ভেঙে গোপন বার্তার অর্থ উদ্ধার; এবং তৃতীয়ত, সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে শত্রুর পরবর্তী পদক্ষেপ আগেভাগেই নস্যাৎ করে দেয়া। এই ত্রিমাত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইউনিটটি কেবল তথ্যই সংগ্রহ করে না, বরং সাইবার স্পেসের প্রতিটি স্পন্দনকে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। আরেকটু বিস্তারিত ভাবে:
ক। তথ্য বা ‘র ডাটা’ সংগ্রহ।
Unit 8200-এর প্রথম এবং প্রধান স্তর হলো বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা তথ্যের মহাসাগর থেকে সুনির্দিষ্ট সংকেত খুঁজে বের করা। তারা উন্নত এন্টেনা ও গ্রাউন্ড স্টেশন ব্যবহার করে রেডিও সিগন্যাল, স্যাটেলাইট ডাটা এবং এনক্রিপ্টেড ইমেইল থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতিটি পাবলিক ও প্রাইভেট ইন্টারঅ্যাকশন পর্যবেক্ষণ করে। এই ‘বিগ ডাটা’ সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হয়, যা কোটি কোটি বার্তার মধ্য থেকে শত্রুপক্ষের সন্দেহজনক আলাপচারিতা কয়েক সেকেন্ডে শনাক্ত করতে পারে। ডিজিটাল মহাকাশে ঘুরে বেড়ানো প্রতিটি অদৃশ্য স্পন্দনই এই ইউনিটের জন্য একেকটি গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্যের উৎস হিসেবে কাজ করে।
খ। ডিক্রিপশন।
তথ্য সংগ্রহের পরবর্তী ও অত্যন্ত জটিল ধাপ হলো সংগৃহীত এনক্রিপ্টেড বা সংকেতায়িত তথ্যের পাঠোদ্ধার করা। Unit 8200-এর গণিতবিদ ও প্রোগ্রামাররা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সুপারকম্পিউটার এবং আধুনিক অ্যালগরিদম ব্যবহার করে শত্রুপক্ষের সুরক্ষিত সামরিক কোড ও পাসওয়ার্ড ভেঙে ফেলে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা গোপন ইমেইল, ডার্ক ওয়েবের চ্যাট বা স্যাটেলাইট ফোনের আড়ালে থাকা কৌশলগত পরিকল্পনাগুলো উন্মোচন করে। শত্রুর সবচেয়ে সুরক্ষিত ডিজিটাল দেয়াল ভেদ করে তাদের গোপন সিদ্ধান্তগুলো জেনে নেয়াই এই ডিক্রিপশন প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য।
গ। সাইবার অ্যাটাক।
Unit 8200-এর চূড়ান্ত এবং সবচেয়ে আক্রমণাত্মক ধাপ হলো শত্রুপক্ষের ডিজিটাল ও ভৌত অবকাঠামোকে সরাসরি আঘাত করা। তারা অত্যন্ত শক্তিশালী ম্যালওয়্যার বা ভাইরাস ব্যবহার করে শত্রু দেশের বিদ্যুৎ কেন্দ্র, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সামরিক সার্ভারগুলো অচল বা ‘ডাউন’ করে দিতে সক্ষম। কেবল তথ্য চুরি নয় বরং সাইবার স্পেস থেকে কমান্ড পাঠিয়ে প্রতিপক্ষের পারমাণবিক কেন্দ্র বা শিল্প কারখানার যন্ত্রপাতি নিয়ন্ত্রণ করে সেগুলো সশরীরে ধ্বংস করে দেয়াও এই ইউনিটের রণকৌশলের অংশ। একটি বুলেট খরচ না করেই কিবোর্ডের কমান্ডে শত্রুর পুরো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দেয়াই এই অ্যাটাক ইউনিটের মূল লক্ষ্য।
৩
সাড়া জাগানো কিছু অপারেশন ও বিতর্ক।
Unit 8200-এর কার্যক্রমের সিংহভাগই কঠোর গোপনীয়তার চাদরে ঢাকা থাকে, তবে আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা বিশ্লেষণে বেশ কিছু বিধ্বংসী সাইবার হামলার পেছনে এই ইউনিটের সম্পৃক্ততা আজ ওপেন সিক্রেট। গত কয়েক দশকে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে ডিজিটাল নাশকতার যেসব বড় ঘটনা ঘটেছে, তার প্রায় প্রতিটির সূত্রপাত এই ইউনিটের ল্যাবরেটরি থেকেই হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। বিশেষ করে শত্রু দেশের স্পর্শকাতর পরিকাঠামোয় সাইবার অনুপ্রবেশ এবং ডিজিটাল প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর ক্ষেত্রে তাদের মুন্সিয়ানা বিশ্বজুড়ে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। মূলত এই বিতর্কিত অপারেশনগুলোই Unit 8200-কে আধুনিক যুদ্ধের এক ভয়ংকর ও অপ্রতিরোধ্য ‘শ্যাডো ফোর্স’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ক। Stuxnet (২০১০)।
Stuxnet ছিল বিশ্বের প্রথম ডিজিটাল অস্ত্র যা কেবল সফটওয়্যার নষ্ট করেনি, বরং সাইবার কমান্ডের মাধ্যমে সরাসরি ভৌত অবকাঠামো ধ্বংস করেছিল। এই অত্যন্ত জটিল ম্যালওয়্যারটি ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক কেন্দ্রের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সেন্ট্রিফিউজগুলোর গতি নিয়ন্ত্রণহীন করে দিয়ে সেগুলোকে সশরীরে অকেজো করে দেয়। আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের দৃঢ় বিশ্বাস, Unit 8200 এবং যুক্তরাষ্ট্রের NSA অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে এই ‘অপারেশন অলিম্পিক গেমস’ পরিচালনা করেছিল। কোনো মিসাইল বা বোমা ব্যবহার না করেই একটি দেশের পরমাণু কর্মসূচিকে কয়েক বছর পিছিয়ে দেয়ার এই ঘটনাটি সামরিক ইতিহাসে এক অভাবনীয় বিপ্লব ঘটিয়েছিল। Stuxnet-এর মাধ্যমেই সাইবার যুদ্ধের এক নতুন এবং ভয়ংকর যুগের সূচনা হয়।
খ। Duqu ও Flame.
Duqu এবং Flame ম্যালওয়্যার মূলত অত্যন্ত সুক্ষ্ম ও দীর্ঘমেয়াদী গোয়েন্দাগিরির জন্য নকশা করা হয়েছিল। এই ম্যালওয়্যারগুলো মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সরকারি নেটওয়ার্ক ও কৌশলগত অবকাঠামোতে নিঃশব্দে প্রবেশ করে বছরের পর বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ অডিও রেকর্ড, স্ক্রিনশট এবং কি-লগ তথ্য চুরি করে পাচার করেছে। প্রথাগত ভাইরাসের মতো এগুলো সাথে সাথে সিস্টেম ধ্বংস না করে বরং ‘ডিজিটাল প্যারাসাইট’ বা পরজীবীর মতো লুকিয়ে থেকে শত্রুর প্রতিটি গোপন পদক্ষেপের ওপর নজরদারি চালিয়েছে। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক আলোচনা এবং সামরিক রণকৌশল সম্পর্কে আগাম তথ্য সংগ্রহে এই স্পাইওয়্যারগুলো বৈশ্বিক গোয়েন্দা মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
গ। সাম্প্রতিক গুজব ও প্রোপাগান্ডা যুদ্ধ।
বর্তমান যুগে যুদ্ধ কেবল রণক্ষেত্রে নয় বরং মানুষের মনস্তত্ত্ব ও সোশ্যাল মিডিয়ার নিউজফিডেও সমানভাবে চলমান, যাকে আধুনিক সামরিক পরিভাষায় ‘ইনফরমেশন ওয়ারফেয়ার’ বা তথ্যযুদ্ধ বলা হয়। Unit 8200-এর মতো শক্তিশালী সংস্থাগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের মনোবল ভাঙতে এবং জনমতকে প্রভাবিত করতে নানা ধরনের ডিজিটাল প্রোপাগান্ডা পরিচালনা করে। সম্প্রতি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে কেন্দ্র করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া কিছু রহস্যময় ভিডিও এই প্রোপাগান্ডা যুদ্ধের এক জ্বলন্ত উদাহরণ। ওই ভিডিওগুলোতে এআই-এর সূক্ষ্ম প্রযুক্তিগত ত্রুটি যেমন- প্রধানমন্ত্রীর হাতে ছয়টি আঙুল দৃশ্যমান হওয়া, বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে এটি গভীর ষড়যন্ত্রমূলক 'ডিপফেক' প্রযুক্তির একটি অপরিপক্ক প্রয়োগ হতে পারে, যা শত্রুপক্ষকে বিভ্রান্ত করতে বা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলে তৈরি করা হয়েছে।
৪
প্রযুক্তির ‘ইনকিউবেটর’: ইউনিট থেকে স্টার্টআপ।
Unit 8200 কেবল একটি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা নয়, বরং এটি ইসরায়েলের সিলিকন ভ্যালি বা ‘সিলিকন ওয়াদি’-এর মূল চালিকাশক্তি ও প্রযুক্তির এক অনন্য ইনকিউবেটর। এই ইউনিটের কঠোর প্রশিক্ষণ ও বাস্তবমুখী অভিজ্ঞতা তরুণ সদস্যদের উদ্ভাবনী চিন্তাকে এমন স্তরে নিয়ে যায়, যা পরবর্তীতে বিশ্বখ্যাত স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইসরায়েলের প্রযুক্তি খাতের মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত এই ইউনিটের প্রাক্তন সদস্যরা মিলে গড়ে তুলেছেন চেক পয়েন্ট, পালো আল্টো নেটওয়ার্কস (Palo Alto Networks) এবং উইজ (Wiz)-এর মতো বিলিয়ন ডলারের সাইবার সিকিউরিটি জায়ান্ট। সামরিক প্রয়োজনে তারা এখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), বিগ ডাটা অ্যানালাইসিস এবং উচ্চতর এনক্রিপশনের যেসব জটিল কৌশল রপ্ত করে, তা পরবর্তী জীবনে বেসামরিক প্রযুক্তি খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে। গ্লোবাল আইটি মার্কেটে বর্তমানে যে সাইবার নিরাপত্তা ও ডাটা সায়েন্সের আধিপত্য দেখা যায় তার একটি বিশাল অংশ এই ইউনিটের ল্যাবরেটরি থেকে বেরিয়ে আসা মেধাবীদের মস্তিস্কপ্রসূত। Unit 8200 থেকে প্রাপ্ত কারিগরি জ্ঞান ও নেতৃত্বের গুণাবলি ইসরায়েলকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান ‘স্টার্টআপ নেশন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। যুদ্ধের ময়দান থেকে কর্পোরেট বোর্ডরুম, সবখানেই এই ইউনিটের সদস্যদের প্রভাব সমানভাবে দৃশ্যমান। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই একটি সামরিক ইউনিট শেষ পর্যন্ত একটি দেশের জাতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ও বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। সামরিক ও বেসামরিক এই মেলবন্ধনই Unit 8200-কে বিশ্বের অন্যান্য সব গোয়েন্দা সংস্থার চেয়ে আলাদা ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে তুলেছে।
৫
গাজা ও লেবানন সংকটে ভূমিকা।
গাজা ও লেবানন সীমান্তজুড়ে চলমান উত্তেজনায় হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো সশস্ত্র সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে Unit 8200-এর প্রযুক্তিগত নজরদারি অপরিহার্য। এই ইউনিটের গোয়েন্দারা আধুনিক সেন্সর ও ড্রোন থেকে প্রাপ্ত হাজার হাজার ঘণ্টার ভিডিও ফুটেজ এবং অডিও ডাটা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে মুহূর্তের মধ্যেই শত্রুর অবস্থান শনাক্ত করে। বিশেষ করে গাজার ভূগর্ভস্থ টানেল নেটওয়ার্কের ভেতরকার অত্যন্ত গোপনীয় যোগাযোগ ট্র্যাক করা এবং হিজবুল্লাহর কমান্ড সেন্টারের ডিজিটাল সিগন্যাল খুঁজে বের করতে এই ইউনিটের অ্যালগরিদমগুলো জাদুর মতো কাজ করে। প্রতিটি নিখুঁত বিমান হামলা বা স্পেশাল অপারেশন পরিচালনার আগে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে এই ইউনিটের দেয়া রিয়েল-টাইম তথ্যই সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে। ডিজিটাল গোয়েন্দাগিরির মাধ্যমে তারা কেবল শত্রুর বর্তমান অবস্থানই নয়, বরং সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনাও আগেভাগে ভণ্ডুল করে দিতে সক্ষম। আধুনিক যুদ্ধের এই জটিল সমীকরণে Unit 8200-এর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ইসরায়েলি বাহিনীর জন্য একটি অদৃশ্য সুরক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করছে।
৬
সাইবার যুদ্ধের নৈতিকতা ও চ্যালেঞ্জ।
Unit 8200-এর প্রযুক্তিগত ক্ষমতা যেমন আকাশচুম্বী তেমনি এর প্রয়োগ নিয়ে নৈতিক বিতর্ক ও সমালোচনাও বিশ্বজুড়ে সমানভাবে বিদ্যমান। এই ইউনিটের বিরুদ্ধে প্রায়ই ফিলিস্তিনি সাধারণ নাগরিকদের ওপর ব্যাপক নজরদারি এবং তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠে। সমালোচকদের মতে সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্সের আড়ালে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত আলাপচারিতা ও তথ্য হাতিয়ে নেয়া মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। তবে ইসরায়েলের নীতিনির্ধারক ও সামরিক বিশ্লেষকদের কাছে এই ইউনিটটি কেবল একটি গোয়েন্দা সংস্থা নয়, বরং এটি তাদের অস্তিত্ব রক্ষার এক অপরিহার্য ‘ডিজিটাল দেয়াল’। মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিকূল ভূ-রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে এ ধরনের কঠোর নজরদারি ছাড়া বিকল্প নেই বলেই তাদের দাবি। প্রযুক্তির এই বিশাল ক্ষমতার অপব্যবহার এবং জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই, এই দুইয়ের মধ্যবর্তী লড়াইটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৭
আধুনিক যুদ্ধ এখন আর কেবল রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বা বারুদের গন্ধে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি কোডিং, এনক্রিপশন এবং জটিল অ্যালগরিদমের এক অদৃশ্য লড়াই। Unit 8200 বিশ্বকে এটিই প্রমাণ করেছে একটি ভৌগোলিক ছোট দেশও যদি প্রযুক্তিতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পারে তবে সে বৈশ্বিক রাজনীতি ও সামরিক কৌশলে বিশাল প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম। আজকের রণক্ষেত্রে গোলাবারুদের চেয়েও শক্তিশালী অস্ত্র হলো তথ্যের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ, আর সেই প্রবাহের নিয়ন্ত্রণই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করে দিচ্ছে আগামী দিনের জয়-পরাজয়। এই ইউনিটটি কেবল ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা নয় বরং আধুনিক যুদ্ধের সংজ্ঞাকেই আমূল বদলে দিয়েছে, যেখানে একটি কিবোর্ডের কমান্ড ধ্বংস করে দিতে পারে শত শত মিসাইলের কার্যকারিতা। ডিজিটাল এই শ্রেষ্ঠত্ব যেমন নিরাপত্তার ঢাল হিসেবে কাজ করছে, তেমনি এটি তথ্যের সার্বভৌমত্ব নিয়ে তৈরি করছে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ। Unit 8200-এর উত্থান এই বার্তাই দেয় যে, আগামীর পৃথিবীতে যারা সাইবার স্পেস নিয়ন্ত্রণ করবে, তারাই বিশ্ব শাসনের মূল চাবিকাঠি হাতে রাখবে। তথ্যের এই মরণপণ লড়াইয়ে প্রযুক্তিগত সক্ষমতাই এখন যেকোনো দেশের টিকে থাকার প্রধান শর্ত।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১৬ মার্চ ২০২৬