
১
এপ্রিল ২০২৫ সাল থেকে ইস্তানবুল বিমানবন্দরে (IST) একই সাথে তিনটি রানওয়ে দিয়ে বিমান ওঠানামা শুরু করেছে। ইন্টারনেট ঘেঁটে দেখলাম পৃথিবীতে অল্পকিছু সংখ্যক বিমানবন্দরে এই সুবিধা রয়েছে। ৪ জুন ২০২৫ তারিখে তুর্কিয়ে ভ্রমণ গিয়ে ইস্তানবুল বিমানবন্দর ছাড়াও ইস্তানবুলের দ্বিতীয় বিমানবন্দর, সাবিহা গোকেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (SAW); নেভশেহির কাপাদোকিয়া বিমানবন্দর (NAV) এবং আন্তালিয়া বিমানবন্দর (AYT) দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছে। প্রতিটা বিমানবন্দর সুন্দর, পরিচ্ছন্ন, ঝকঝকে এবং তারা দারুণ সার্ভিস দিয়ে থাকে। পরিচ্ছন্নতা, সার্ভিস, স্থাপত্য এবং নান্দনিকতার দিক থেকে অসাধারণ লেগেছে তুর্কিয়ের ইস্তানবুল বিমানবন্দর। দ্য ইকোনমিক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী ইস্তানবুল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চলতি বছর বিশ্বসেরা বিমানবন্দর নির্বাচিত হয়েছে। মাত্র দুই বছর আগেও তারা তালিকার ৭ নম্বরে ছিল, সে বছর সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দর সেরা নির্বাচিত হয়েছিল। কিন্তু রাতারাতি উন্নয়নের ফলে এখন তাদের ধারেকাছেও কেউ নেই। সর্বশেষ জরীপে যাত্রীদের অভিজ্ঞতা, সেবা, অবকাঠামো, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা ও পরিচালনা দক্ষতার ওপরে ভিত্তি করে বিমানবন্দরটি ৯৮.৫৭ স্কোর পেয়ে শীর্ষ অবস্থান লাভ করেছে। ২০২৪ সালে তাদের স্কোর ছিল ৯৫.৭৯ এবং ২০২৩ সালের ৭ম স্থান থেকে এটি একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। ইস্তানবুল বিমানবন্দরের এই সাফল্য স্বপ্নের মতো। ১৯৬৬ সালের পর থেকে আমাদের কুর্মিটোলা বিমানবন্দরের শুধু নামবদল হয়েছে, সার্ভিস কিংবা সক্ষমতা বাড়েনি। দ্বিতীয় বিমানবন্দরের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে বিগত সরকার ১৩৬ কোটি টাকা ব্যয় করলেও কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। অথচ তুর্কিয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নেয়ার ৫ বছরের মধ্যে এবং নির্মাণ কাজ শুরু করার ৪২ মাসের মধ্যে ইস্তানবুল বিমানবন্দর অপারেশনাল করতে সক্ষম হন।
বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ভ্রমণ বিষয়ক ম্যাগাজিন ট্রাভেল অ্যান্ড লেজার এর জরিপ অনুযায়ী গত ২ বছরে ইস্তানবুল বিমানবন্দরের অগ্রগতি ছিল চোখে পড়ার মতো। এই ২ বছরের মধ্যে এটি তালিকার ৭ নম্বর অবস্থান থেকে সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি, কাতারের হামাদ, দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে পিছনে ফেলে তালিকার ১ নম্বরে উঠে এসেছে। এই সাফল্যের পিছনে অবদান রেখেছে এর আধুনিক কাঠামো। চলতি বছরের এপ্রিল মাস থেকে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ঘন্টায় বিমান ওঠানামার সংখ্যা ১২০ থেকে বাড়িয়ে ১৪৮ করেছে। ইউরোপীয় এয়ার ট্রাফিক সংস্থা ইউরোকন্ট্রল এই সক্ষমতাকে গেম চেঞ্জার হিসেবে অভিহিত করেছে। ২০২৪ সালে এই বিমানবন্দর প্রায় ৮০ মিলিয়ন যাত্রী ব্যবহার করেছেন এবং ২০২৫ সালের জুন মাসে দৈনিক গড়ে ১,৫৯১টি ফ্লাইট পরিচালিত হয়েছে, যা ইউরোপে সর্বোচ্চ। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের বার্ষিক যাত্রী ধারণ ক্ষমতা ১২০ মিলিয়নে উন্নীত করার লক্ষ্যে কাজ করছেন।
২
ইস্তানবুলের পূর্বের প্রধান বিমানবন্দর ছিল আতাতুর্ক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এটি একসময় ইউরোপের অন্যতম ব্যস্ত বিমানবন্দর ছিল এবং ২০১৩ সাল থেকে যাত্রী পরিবহনে ইউরোপের শীর্ষ ৫টি ব্যস্ত বিমানবন্দরের মধ্যে একটি ছিল। তবে আতাতুর্ক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের চারদিকে শহর এবং মারমারা সাগর থাকায় এর সম্প্রসারণের আর কোনো সুযোগ ছিল না, যা ক্রমবর্ধমান যাত্রীচাপ মোকাবেলায় হিমসিম খাচ্ছিল। ইস্তানবুলের অন্য আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সাবিহা গোকেনও ধারণক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছে গেছে। এই ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে তুর্কিয়ে সরকার ইস্তানবুল শহরের বাইরে একটি নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়, যেখানে সম্প্রসারণের সুযোগ থাকবে। নতুন বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য ৭ অক্টোবর ২০১৩ তারিখে Cengiz – MAPA – Limak – Kolin – Kalyon জয়েন্ট ভেঞ্চার গ্রুপ দ্বারা iGA (Istanbul Grand Airport) সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি এখন পর্যন্ত তুর্কিয়ের সবচেয়ে বড় অবকাঠামোগত বিনিয়োগ।
নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের স্থান হিসেবে ইস্তানবুলের কেন্দ্র থেকে প্রায় ৩৫ কিমি উত্তরে, কৃষ্ণ সাগর উপকূলের ইয়েলিকয়, তাইয়াকাদিন এবং আকপিনার গ্রামের মধ্যবর্তী একটি ৭,৬০০ হেক্টর (১৯,০০০ একর) এলাকা নির্বাচন করা হয়। এই এলাকায় এরআগে একটা খোলা-পিট কয়লা খনি ছিল, যা বিমানবন্দর নির্মাণের প্রয়োজনে মাটি দিয়ে ভরাট করা হয়। মে ২০১৫ সালে আনুষ্ঠানিক ভাবে এই বিমানবন্দরের নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং রেকর্ড ৪২ মাসে তা সম্পন্ন হয়। ২৯ অক্টোবর ২০১৮ তারিখে, ৯৫তম প্রজাতন্ত্র দিবসে তুর্কিয়ের রাষ্ট্রপতি রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এই বিমানবন্দর উদ্বোধন করেন।
৩
৬ এপ্রিল ২০১৯ তারিখ থেকে আতাতুর্ক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সমস্ত ফ্লাইট এবং এর IATA কোড (IST) নতুন ইস্তানবুল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্থানান্তরিত হয়। এর মাধ্যমে আতাতুর্ক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যাত্রীবাহী ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে ইস্তানবুল তুর্কিয়ের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের দ্বিতীয় ব্যস্ততম বিমানবন্দর। ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে ইস্তানবুল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপের মধ্যে একটি বৈশ্বিক বিমান চলাচল কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। এছাড়াও এই বিমানবন্দর বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ব্যক্তিগত মালিকানাধীন বিমানবন্দর। বর্তমানে ইস্তানবুল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি একক টার্মিনাল ভবন রয়েছে যা বছরে প্রায় ৯০ মিলিয়ন যাত্রী ধারণ করতে পারে। এতে তিনটি স্বাধীন রানওয়ে এবং দুটি সেকেন্ডারি রানওয়ে রয়েছে।
ACI EUROPE এর ২০২৫ সালের বিমানবন্দর শিল্প কানেক্টিভিটি রিপোর্টে শীর্ষে উঠে এসেছে ইস্তানবুল বিমানবন্দর, ফ্রাঙ্কফুর্টকে ছাড়িয়ে বিশ্বের সবচেয়ে সংযুক্ত বৈশ্বিক হাব হয়ে উঠেছে এটি। তুর্কি এয়ারলাইন্সের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক, ইস্তানবুলের কৌশলগত অবস্থান, শক্তিশালী অপারেশনাল ক্ষমতা এবং সহায়ক বিমান চলাচল নীতির জন্য ইস্তানবুল বিমানবন্দর বিবেচিত হয়েছে। ইস্তানবুল বিমানবন্দরটি ৪টি ধাপে নির্মিত হচ্ছে। যখন সমস্ত ধাপ সম্পন্ন হবে, তখন এটি বছরে ২০০ মিলিয়ন যাত্রী ধারণ করতে সক্ষম হবে এবং ৩০০টিরও বেশি গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করতে সক্ষম হবে। এটি কেবল তুর্কিয়ের জন্যই নয়, বরং আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
৭ আগস্ট ২০২৫