
১
অবতরণিকা।
কয়েকমাস আগের কথা। ছোটখাট কোর্স রিইউনিয়ন চলছে। বাচ্চারা একদিকে বসে খেলছে, আনন্দ করছে, ভাবীরা যে যার মতো ছোটছোট গ্রুপে জটলা করে আড্ডায় ব্যস্ত। অফিসাররাও তাই, একটু পরপর হাসির ছররা শোনা যাচ্ছে, হেসে একে অপরের ওপরে গড়িয়ে পড়ছে। আমাদের যে কোন অনুষ্ঠানের স্বাভাবিক চিত্র। কারো কারো মুখের দিকে তাকিয়ে অভিব্যক্তির প্রকাশ দেখছিলাম। হঠাৎ মনেহলো, এই যে এতো মুখের ভিড়, এখানে একটা মুখ মিসিং। এরকম সামাজিক আসরে তার প্রাঞ্জল উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো! অথচ এখন কেন্দ্রীয় কারাগারের কোন এক নির্জন সেলে সে হয়তো গভীর চিন্তায় মগ্ন। সেকী তার ফেলে আসা জীবনের কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা করছে! হয়তো! হয়তোবা না! দিনের শেষে মানুষ ফিরে আসে নিজের কাছে, নিজের আত্মার কাছে। সে তখন নিজেকে প্রশ্ন করে, কেননা মানুষ প্রতিটা কর্ম বিবেকতাড়িত হয়ে করে জানি। খারাপ কিছু করলেও সে বিবেকের কাছে তার স্বপক্ষে যুক্তি দাঁড় করায়। এটাই মানুষের ধর্ম। তবে সমাজে এমনও কিছুকিছু মানুষ আছে, যারা এসব যুক্তিতর্কের ঊর্ধ্বে। বিবেক নয়, নিয়তি তাদেরকে গন্তব্যের দিকে তাড়িত করে। আমি মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান (অবঃ) এর কথা বলছি। জিয়া আমার একজন কোর্সমেট।
২
যদি ফিরে তাকাই।
২০০৬ সাল, আমি র্যাব-১০ এর উপ-অধিনায়ক। ৭ ডিসেম্বর ২০০৬ তারিখে মেজর এরশাদসহ একটা টিম নিয়ে দু’জন অস্ত্র ব্যবসায়ী এবং ১৩টা পিস্তল উদ্ধার করেছিলাম। ২০০৭ সালে এরকম আরও দু’টা অস্ত্র উদ্ধার অপারেশন করেছি। একটা অপারেশন এটিএন-বাংলার সাংবাদিক জিএম তসলিম কভার করেছিলেন, আরেকটা সেসময়ের সিএসবি (?) চ্যানেলে প্রচারিত হয়েছিল। চ্যানেলটা ২০০৭ সালের মাঝামাঝিতে সম্ভবত বন্ধ হয়ে যায়। সাফল্যের ভাণ্ডারে তখন ২০টা অস্ত্র উদ্ধার। ১১ জানুয়ারি ২০০৭ তারিখে সেনা অভ্যুত্থানের পরের একরাতে আমার সাবজেক্ট ছিলেন লোটাস কামাল, সেদিন রাতে অনেকেই সাবজেক্ট মিস করলেও আমি মিস করিনি। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার-অস্ত্রব্যবসায়ী গ্রেফতার ছাড়াও অবৈধ ভিওআইপি-পাইরেটেড সিডি ব্যবসায়ী, ইয়াবাসহ নানারকম অপারেশন পরিচালনা করেছিলাম। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর, সিডরের রাতে শ্যামলী-কল্যাণপুর এলাকায়, সারারাত অপারেশন শেষে পরদিন বাসায় ফিরেছি। পরদিন সারাদিন আগারগাঁও, এরকম কয়েকবার হয়েছে। এরকম আরও কিছু সফল অপারেশনের কারণে এডিজি (অপস) কর্নেল গুলজার এবং র্যাবে সেসময়ে ডিজি হিসেবে কর্মরত হাসান মাহমুদ খন্দকার স্যার আমাকে পছন্দ করতেন।
র্যাব-১০ এ আমার অধিনায়ক, লে কর্নেল মানিক স্যার একদিন অফিসে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এর আগে কোথাও গুলজার স্যারের সাথে চাকরি করেছো?’ আমি জানালাম, ‘না, র্যাবেই প্রথম।’ স্যার বললেন, ‘তোমাকে আর ইউনিটে ধরে রাখা যাচ্ছে না। কর্নেল গুলজার স্যার তোমাকে তার স্টাফ হিসেবে র্যাব ফোর্সেস সদরদপ্তরে পোস্টিং করে নিতে যাচ্ছেন।’ অগত্যা ২০০৭ সালের নভেম্বরের দিকে র্যাব-১০ থেকে ফোর্সেস সদরদপ্তরে নতুন দায়িত্ব বুঝে নিতে যেতে হলো।
মেজর জাফরের কাছ থেকে ডেপুটি ডাইরেক্টর (এডমিন) হিসেবে দায়িত্ব বুঝে নিচ্ছি, সপ্তাহ দুয়েক হয়েছে মাত্র। এরকম সময়ে আমার আর্মিতে রিভার্সন অর্ডার এলো। যেহেতু র্যাবে ডেপুটেশনের মেয়াদ মাত্র বছর দেড়েক হয়েছে এবং একটা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বুঝে নিতে যাচ্ছি, তাই কর্নেল গুলজার স্যার সেনাসদরে সংশ্লিষ্ট ব্রাঞ্চে কথা বলে পোস্টিং অর্ডার ক্যান্সেল করাতে চেষ্টা করলেন কিন্তু পারলেন না। আর্মিতে ফিরে যেতেই হবে, নতুন এক দায়িত্বে। যশোর সেনানিবাসে একটা পদাতিক ইউনিটের উপ-অধিনায়ক। ক্লিয়ারেন্সের জন্য সদরদপ্তরের বিভিন্ন ডাইরেক্টরেট ঘুরে শেষে ডিজি হাসান মাহমুদ খন্দকার স্যারের সামনে স্যালুট দিয়ে দাঁড়ালাম। বিদায় নেবার পালা।
৩
স্মৃতির ঝাপসাগুলো!
আর্মিতে ফিরে যাচ্ছি শুনে সেনাপ্রধানের সাথে কথা বলে ডিজি পোস্টিং অর্ডার ক্যান্সেল করতে চাইলেন কিন্তু আমি নিজেই বাধ সাধলাম। স্যারের হাতটা তখনো টেলিফোনের ক্র্যাডলে, বললাম, ‘স্যার আমাকে একটা পদাতিক ইউনিটের উপ-অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। আমাদের চাকরিতে এটাই নিয়ম।’ যে পোস্টিং অর্ডার কর্নেল গুলজার স্যার চেষ্টা করেও ক্যান্সেল করতে পারেননি সেটা সেনাপ্রধানের সাথে কথা বলে ডিজি ক্যান্সেল করুন, এরকমটা আমি চাইনি। আমি আসলে চাইনি কর্নেল গুলজার স্যার আমাকে ভুল বুঝুন। স্যারের ব্যক্তিত্বের বিশালতা আকাশ সমান আর মানুষকে ভালোবাসেন গভীর মমতায়, এরকম একজন মহান মানুষের কাছে কখনো ছোট হতে চাইনি। ডিজি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনাকে ঐ দায়িত্বে মিনিমাম কতদিন থাকতে হবে?’ আর্মিতে সিনিয়ররা জুনিয়রদের ‘তুমি’ করে সম্বোধন করলেও পুলিশে দেখেছি ‘আপনি’ করে সম্বোধন করার চল, স্যারও ‘আপনি’ করেই কথা বলেন। বিষয়টা আমাদের কাছে খানিকটা অস্বস্থিকর লাগলেও মেনে নিতে হয়। যস্মিন দেশে যদাচার। ‘স্যার কমপক্ষে ৬ মাস’, আমি ডিজিকে জানালাম। ‘ঠিক আছে, ৬ মাস হলে আমাকে জানাবেন, আপনাকে র্যাবে ফিরিয়ে আনতে চাই’, ডিজি বললেন। সম্মতি জানিয়ে ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে যশোর সেনানিবাসে ২৩ ইস্ট বেঙ্গলে যোগ দিলাম।
সপ্তাহখানেক পর, ২০০৮ সালের জানুয়ারিতে এসআইএন্ডটি, সিলেট সেনানিবাসে একটা কোর্সে গেলাম। আমার কোর্সমেট মেজর জিয়াও একই কোর্সে যোগ দিল। সে পার্বত্য চট্টগ্রামে ডেপ্লয়েড ৩২ ইস্ট বেঙ্গল থেকে কোর্সে এসেছিল। সেখানেই কথা প্রসঙ্গে জানলাম ওর ইউনিট যশোরে যাচ্ছে এবং আমরা একই পদাতিক ব্রিগেডে চাকরি করতে যাচ্ছি। এভাবেই ব্রিগেডের অধীনস্থ একটা পদাতিক ব্যাটালিয়নের উপ-অধিনায়ক আমি, আর অন্যটিতে জিয়া। ২০০৮ সালে আমার ইউনিট ‘অপারেশন আলোর সন্ধানে’ এবং ‘অপারেশন নবদিগন্ত’- এর কারণে মাগুরা জেলাতে ডেপ্লয়েড, আর জিয়ার ইউনিট ঝিনাইদহে। কিছুদিন যশোরের একটা টাস্কফোর্সের সাথে কাজ করে আমি মাগুরাতে গেলাম এবং ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮ তারিখে নবম জাতীয় নির্বাচন কন্ডাক্ট করে যশোর সেনানিবাসে ফিরে আসি। ৬ জানুয়ারি ২০০৯ তারিখে আওয়ামীলীগ সরকারের মন্ত্রিরা শপথ গ্রহণ করেন। তারপর চারদিকে দায়িত্বের পালাবদল শুরু। র্যাবের ডিজি হাসান মাহমুদ খন্দকার নতুন সরকারের আস্থাভাজন বলে বাহিনীতে থেকে গেলেন কিন্তু অন্যান্য পদে নতুন অফিসাররা যোগ দিয়েছেন, দিচ্ছেন। পুরনো অফিসাররা র্যাব থেকে নিজনিজ বাহিনীতে ফিরে যাচ্ছেন। কর্নেল গুলজার স্যারকে এসময় র্যাব থেকে বিডিআর-এ প্রেষণে পাঠানো হয়, যেখানে তার নিয়তি নির্ধারিত ছিল। স্যারের জায়গায় এডিজি (অপস) হিসেবে কর্নেল রেজানুর রহমান খান এবং এডিজি (এডমিন) হিসেবে কর্নেল মো. শামসুল হক যোগ দেন।
২০০৯ সালের জানুয়ারির শেষের দিকে ডিজি হাসান মাহমুদ খন্দকার স্যারকে ফোন করে জানালাম, ‘স্যার, উপ-অধিনায়ক হিসেবে আমার একবছর পূর্ণ হয়েছে। আপনি চাইলে আমাকে নিয়ে প্ল্যান করতে পারেন।’ কিছুদিন পর ইন্টেলিজেন্স ক্লিয়ারেন্স শুরু হলো। কর্মস্থল, বাবার বাসা, শ্বশুরের বাসা, গ্রামের বাড়ি সবখানে পুলিশ, ডিজিএফআই, এএসইউ ক্লিয়ারেন্স শেষে যখন পোস্টিং অর্ডার বের হবে ঠিক তখনই ঘটলো সেই পৈশাচিক পিলখানা হত্যাকাণ্ড, রক্তাক্ত ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৯। মার্চের প্রথমদিকে ‘অপারেশন র্যাবেল হান্ট’-এ চলে গেলাম কুষ্টিয়াতে। মিরপুর, কুস্টিয়া সেক্টরে সম্ভাব্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি সামলানো এবং কুষ্টিয়া অঞ্চলে পলাতক/লুকিয়ে থাকা বিডিআর সদস্যদেরকে এরেস্ট করতে হবে। কুষ্টিয়া-মাগুরা-ঝিনাইদহ এলাকা থেকে বেশকিছু পলাতক বিডিআর সদস্যকে এরেস্ট করতে সক্ষম হয়েছিলাম। এভাবে মাসখানেক কুষ্টিয়াতে কাটিয়ে যশোরে ফিরতেই পোস্টিং অর্ডার হাতে পেলাম, নতুন কর্মস্থল র্যাব।
ইতিমধ্যে মেজর জেনারেল মুহাম্মদ মাহবুব হায়দার খান মিলিটারি সেক্রেটারি হিসেবে সেনাসদরে যোগ দিয়েছেন। ৫৯ ইস্ট বেঙ্গলে লে কর্নেল পদে তিনি জিয়ার অধিনায়ক ছিলেন এবং দূর সম্পর্কের আত্মীয়। সেনাসদরে যোগ দিয়েই তিনি মেজর জিয়াকে র্যাবে পোস্টিং করলে সে ৫ মার্চ ২০০৯ তারিখে ঢাকার আগারগাঁওয়ে র্যাব-২ এ যোগ দেয়। এভাবেই সে স্থানীয় এমপি জাহাঙ্গীর কবির নানকের সংস্পর্শে আসে। এই সংস্পর্শ তাকে একদিন গভীর অতলে নিমজ্জিত করেছিল।
৪
একটি অবাক পোস্টিং অর্ডার।
হাসান মাহমুদ খন্দকার স্যারকে ফোন করে পোস্টিং অর্ডার হাতে পাওয়ার কথা জানালাম। তিনি জয়েনিং লিভ না নিয়ে যতদ্রুত সম্ভব র্যাবে যোগ দিতে বললেন। কেননা ইতিমধ্যে বেশ কিছু অফিসার র্যাবে যোগ দিয়ে বিভিন্ন পদে থিতু হয়েছেন। ডিজি’র একজন ঘনিষ্ট স্টাফ অফিসার মেজর সিরাজ (উনি কিছুদিন আগে ব্রিগেডিয়ার পদবীতে স্বাভাবিক অবসরে গিয়েছেন) ফোনে জানালেন ডিজি আমাকে ডেপুটি ডাইরেক্টর (ইন্টেলিজেন্স উইং) হিসেবে নির্বাচিত করে রেখেছেন। তিনি ওখানে তার আস্থাভাজন কাউকে বসাতে চান।
পিলখানা হত্যাকাণ্ডের তদন্ত এবং অন্যান্য বিষয়ে ব্যস্ততার কারণে অনেকে হয়তো খেয়াল করেননি আমি বিএনপি’র আমলে র্যাবে ছিলাম, কর্নেল গুলজার স্যারের সাথেও কাজ করেছি। কিংবা স্বয়ং ডিজি’র ইচ্ছেয় এই পোস্টিং বলে অনেকেই হয়তো বিষয়টা সেভাবে খতিয়ে দেখেননি। কিন্তু জিয়ার ব্যাপারটা ছিল ভিন্ন। সে আমার র্যাবে পোস্টিং মেনে নিতে পারেনি। যাহোক, ৯ এপ্রিল ২০০৯ তারিখ সকালে মুভ অর্ডার হাতে নিয়ে সম্ভবত এগারোটার ফ্লাইটে যশোর থেকে র্যাব ফোর্সের সদরদপ্তরে যোগ দিলাম। সরাসরি ডিজি’র অফিসে পৌঁছে স্যালুট দিয়ে জানালাম, ‘স্যার, আমি এসেছি।’ তিনি আমাকে দাপ্তরিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বললেন। এরমাঝেই একদিন র্যাব সদরদপ্তরে জিয়ার সাথে দেখা, কোন কুশলাদি বিনিময় না করেই তার প্রশ্ন, ‘তুই র্যাবে কেন?’ এরকম প্রশ্নের উত্তর হয়না। আমি চুপ থাকলাম।
এদিকে আমাকে যে ডেপুটি ডাইরেক্টর (ইন্টেলিজেন্স উইং), পদের জন্য ডিজি সিলেক্ট করে রেখেছিলেন তার হদিস মিলছে না। শুনেছি তিনি এডিজিকে কয়েকবার আমার বিষয়ে আদেশ দিলেও সেটা কার্যকরি করা নিয়ে গড়িমসি চলছে। একদিন এডিজি (অপস) কর্নেল রেজানুর রহমান খান (পরবর্তীতে মেজর জেনারেল পদে স্বাভাবিক অবসরে যান) তার অফিসে ডেকে খানিকটা বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি নাকি এর আগে র্যাবে ছিলে? আবার কীভাবে পোস্টিং হলো?’ আমি ঠাণ্ডা মাথায় বললাম, ‘আমি এর আগে র্যাব-১০ এ ছিলাম, একবছর।’ তিনি আমার দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছিলেন, তারপর বললেন, ‘যাও।’
একদিন ডিজি আমাকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন তখনও পোস্টিং অর্ডার বের হয়নি। এর সম্ভবত দুয়েক দিন পর এডিজি (এডমিন) কর্নেল মো. শামসুল হক (পরবর্তীতে লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে স্বাভাবিক অবসরে যান) তার অফিসে ডেকে পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি ইন্টেলিজেন্স কোর্স করেছো?’ আমি বললাম, ‘না।’ সেদিন বুঝেছিলাম ডিজি আমাকে যে উদ্দেশ্যে র্যাবে এনেছেন তা কার্যকর হবে না। এরপর একটা মজার পোস্টিং অর্ডার বের হয়েছিল, মেজর সুমন সুবহান- পোস্টেড টু র্যাব সদরদপ্তর এয়ার উইং (উইথ ইমিডিয়েট ইফেক্ট, এটাচড টু র্যাব সদরদপ্তর ইন্টেলিজেন্স উইং) । পোস্টিং অর্ডার হাতে নিয়ে সেদিন আমি অনেকক্ষণ হেসেছিলাম।
ইন্টেলিজেন্স কোর্স না করার অজুহাতে দুই এডিজি মিলে আমাকে এয়ার উইং-এ পোস্টিং করলেন অথচ আমি অ্যাভিয়েশন কোর্স করিনি। তারা আসলে খোঁড়া যুক্তিতে ডিজিকে বোঝালেন, ইন্টেলিজেন্স কোর্স না করার কারণে ইন্টেলিজেন্স উইং-এ পোস্টিং দিতে পারলেন না, তবুও তার আদেশের সম্মানার্থে আমাকে ইন্টেলিজেন্স উইং-এ এটাচড করা হয়েছে। ডিজি র্যাব আপাদমস্তক একজন ভদ্রলোক, এডিজি দ্বয়ের কর্মে বিরক্ত হলেও মুখে কিছু বললেন না। আমাকে এয়ার উইং-এ পোস্টিং করার কারণে সবেচেয়ে বেশি অবাক হয়েছিলেন সম্ভবত ডাইরেক্টর (এয়ার উইং), লে কর্নেল আলমগীর হোসেন (স্যার পরবর্তীতে মেজর জেনারেল পদে স্বাভাবিক অবসরে যান) । উনি একজন চমৎকার মানুষ।
কর্নেল সামস স্বাক্ষরিত পোস্টিং অর্ডারটা দেখে সেসময়ে অনেক অফিসার হাসাহাসি করেছিলেন। একটা কথা বলে রাখি, বেসিক ইন্টেলিজেন্সের কাজকর্ম সেনাবাহিনীতে কর্মরত অনেক অফিসারই করতে সক্ষম, এজন্য ইন্টেলিজেন্স কোর্স করা থাকলে ভালো, তবে আবশ্যিক না। ডিজিএফআই, এফআইইউ ইত্যাদি ইউনিটে ইন্টেলিজেন্স কোর্স ছাড়াই প্রচুর অফিসার সুনামের সাথে কাজ করে যাচ্ছেন। এমনকি আমারই দু’বার ডিজিএফআই-এ পোস্টিং-এর জন্য ক্লিয়ারেন্স হয়েছিল, কিন্তু আমি অজুহাত দেখিয়ে যাইনি। আরেকটা মজার ঘটনা হলো, র্যাবে জিয়ার চাকরিটা র্যাব-দুই-এ শুরু হলেও ওর প্রকৃত উত্থান ডাইরেক্টর (ইন্টেলিজেন্স উইং) হিসেবে, জিয়া কিন্তু ইন্টেলিজেন্স কোর্স করেনি।
এয়ার উইং-এ যোগ দেয়ার কয়েকদিন পর লে কর্নেল আলমগীর স্যার আমাকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে আর্মি এভিয়েশনে ফিরে গেলেন। এক্টিং ডাইরেক্টর (এয়ার উইং) হিসেবে ডিজি হাসান মাহমুদ খন্দকার স্যারের সাথে সচিবালয়ে কয়েকবার মিটিং করার সুযোগ হয়েছিল। প্রতিবছর র্যাবে হেলিকপ্টার কেনার জন্য বাজেট বরাদ্দ থাকলেও বিভিন্ন দাপ্তরিক জটিলতায় কেনা সম্ভব হতোনা। একবার এরকম একটা মিটিং-এ যাবার সময় ডিজিকে দেয়া সামান্য পরামর্শে এই জট খুলে যায়। ইন্টেলিজেন্স উইং-এ আমার বস তখন মেজর আজিম, উনি বেশ সিনিয়র কিন্তু বিভিন্ন কারণে প্রমোশন পাননি। এরপর থেকে অবশ্য সাপলুডু খেলার প্রতিটা মই বেয়ে তরতর করে এগিয়ে যান, ব্রিগেডিয়ার র্যাংকে পৌঁছে আমেরিকা যান, তারপর ওনার হদিস জানি না। উনি কী বেঁচে আছেন! এডিজি (অপস) কর্নেল রেজানুর রহমান খান ইবিআরসি, চট্টগ্রাম সেনানিবাসে থাকাবস্থায় ওনার নেতৃত্বে যে টাস্কফোর্স ছিল তার দু’জন সদস্য, মেজর মাসুমকে ডেপুটি ডাইরেক্টর (ইন্টেলিজেন্স) এবং মেজর রাজ্জাককে ডেপুটি ডাইরেক্টর (এডমিন) হিসেবে নিয়োগ দিয়ে র্যাবে তার ক্ষমতা পোক্ত করেন। তবে মেজর আজিম, ডাইরেক্টর (ইন্টেলিজেন্স উইং) আমাকে নিয়ে পড়েন মহাবিপদে। আমাকে কোথায় কি কাজ দিবেন ভেবে পাননা। অবশেষে মেজর হামিদ স্যারের সাথে টিএফআই-এ কাজ করতে পাঠালেন। র্যাব-১ অফিসের পিছনে টিএফআই তখন পিলখানা হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। আমি নিজেও স্যারের সাথে পিলখানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। সেখানেই অস্থায়ী অফিস খোলা হয়। ইতিমধ্যে র্যাবে বেশকিছু পদে পরিবর্তন হয়েছিল, কর্নেল রেজানুর রহমান খান ব্রিগেডিয়ার পদে প্রমোশন পেয়ে ৪৬ ব্রিগেড কমান্ডার হলেন। লে কর্নেল মিজান ডাইরেক্টর (অপস) থেকে কর্নেল পদে প্রমোশন পেয়ে র্যাবের এডিজি (অপস) হলেন। মেজর জিয়া লে কর্নেল পদে প্রমোশন পেয়ে উপ-অধিনায়ক র্যাব-২ থেকে ডাইরেক্টর (ইন্টেলিজেন্স উইং) হলো। আমার প্রমোশন না হবার গল্পটা আগে একসময় বলেছি, আর কর্নেল সামস যে তখন কোন ভাগাড়ে গেলেন মনেপড়ছে না।
৫
মেটামরফোসিস।
ইন্টেরোগেশন নিঃসন্দেহে একটা জটিল এবং টায়ারিং কাজ। ৫/৬ মাস ওখানে কাজ করার পর বিরক্তি ধরে গেল। নতুন এডিজি (অপস)কে টানা কয়েক মাস ইন্টেরোগেশন করা নিয়ে আমার একঘেয়েমির কথা জানালে উনি র্যাব-৪ এ উপ-অধিনায়ক হিসেবে পোস্টিং করে দিলেন। অক্টোবর ২০০৯ সাল থেকে পরের কয়েকটা মাস মিরপুর এলাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। বেশকিছু সন্ত্রাসী ধরা পড়লো। এখানকার অভিজ্ঞতার ওপরে ভিত্তি করে ‘গ্রাউন্ড জিরো’ থ্রিলারটা লিখেছিলাম। ইতিমধ্যে লে কর্নেল জিয়া, ডাইরেক্টর (ইন্টেলিজেন্স উইং) কে নিয়ে বাহিনীর অফিসারদের ভিতরে সমালোচনা শুরু হয়ে গেছে। র্যাবে তখন ১২টা ব্যাটালিয়ন ছিল, সবাই টিটকারি মেরে ইন্টেলিজেন্স উইং-কে ‘র্যাব থার্টিন’ নামে ডাকা শুরু করলো। এছাড়া র্যাবে গুম কালচার শুরু হবার কারণে তার উপরে অনেকেই ক্ষ্যাপা, কিন্তু কী এক অজ্ঞাত কারণে তাকে কেউ ঘাঁটায় না। কিংবা ঘাঁটাতে সাহস পায়না। একদিন জিয়ার সাথে এরকম একটা ইস্যুতে বচসা হলো, অধিনায়ককেও বেশ কিছু উত্তপ্ত কথা বললাম। আসলে ওর কিছু কাজকর্ম মেনে নিতে পারছিলাম না। কিছু অফিসার ওর হাতে নষ্ট হতে যাচ্ছে দেখে ভীষণ রেগে গিয়েছিলাম। যাহোক এক সুন্দর দিনে ডাকফাইলে আমার পোস্টিং অর্ডার এলো। ২৭ মে ২০১০ তারিখে সামরিক পর্যবেক্ষক হিসেবে একবছরের জন্য কঙ্গো চলে গেলাম। তবে হঠাৎ পোস্টিং অর্ডারের রহস্যভেদ হয়েছিল কয়েকমাস পর।
২০১১ সালের জানুয়ারির দিকের কথা, ইউএন মিশন শেষ হবার ৩/৪ মাস আগে আমি তখন ঢাকায়, ছুটিতে। কি একটা কাজে কিংবা এমনিই হয়তো র্যাব সদরদপ্তরে গিয়েছিলাম। আমার কোর্সমেট লে কর্নেল জিয়া, ডাইরেক্টর (ইন্টেলিজেন্স উইং) তখন অনেক ক্ষমতাশালী একজন অফিসার। জিয়াকে বলেছিলাম কর্নেল গুলজার স্যারের কথা, ওকে বলেছিলাম নিজেকে সামলে রাখতে। প্রলোভন থেকে দূরে থাকতে বলেছিলাম, সে কিছু কথা চুপচাপ শুনলো, কিছু হেসে উড়িয়ে দিল। যে অতলের দিকে ওর প্রস্থান তা থেকে নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি। চোখের সামনে ও কীরকম বদলে গেল, আমি ওকে মানুষ থেকে ক্রমাগত সরীসৃপে পরিণত হতে দেখলাম, র্যাব ব্যাজে যেটার ছবি আছে। মনে পড়লো র্যাব-৪ অফিসের বারান্দায় ওর সাথে বচসা’র কথা।
ওর অফিসেই বসে আছি, সামনের টেবিলে কফির কাপে ধোঁয়া উড়ছে। টেবিলের ওপারে ও, শরীরটা চেয়ারে সামান্য এলিয়ে বসে আছে। লে কর্নেল মোঃ রাশিদুল আলম (পরবর্তীতে ব্রিগেডিয়ার পদে উন্নীত হন এবং এলপিআরে থাকাবস্থায় বিদেশে পালিয়ে যান শুনেছি) আমার বাঁ পাশের চেয়ারে। উনি তখন র্যাব-১ এর প্রতাপশালী অধিনায়ক। আড্ডার ফাঁকে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোর মিশন কবে শেষ হবে?’ জানালাম। উনি জিয়াকে হঠাৎ বললেন, ‘সুমন তো র্যাবের মেয়াদ শেষ হবার আগেই পোস্টিং গেছে, ওকে র্যাবে ফিরিয়ে আন।’ স্যারের কথার উত্তরে অনিচ্ছা প্রকাশ করার আগেই জিয়া নির্বিকারভাবে বলে বসলো, ‘না স্যার, ওকে র্যাবে আনা যাবে না।’ জিয়ার উত্তর শুনে আমি এবং স্যার দু’জনই হতভম্ব হয়ে গেলাম। আমি র্যাবে থাকতে চাইলে তো ওর সাথে সেদিন বিবাদে জড়াতাম না। তবে আমার ওভাবে হঠাৎ ইউএন মিশনে পোস্টিং অর্ডার বের হবার কারণটা সেদিন বুঝে গিয়েছিলাম। এরপর থেকে নীরব ঘৃণা। এরপর থেকে ওকে এভয়েড করতাম। কোর্সমেটদের মধ্যে আমি সম্ভবত একমাত্র অফিসার, যে জিয়ার পারিবারিক অনুষ্ঠানগুলোতে কখনো যোগ দেয়নি। সামনাসামনি দেখা হলে কথা হয়েছে, কুশল বিনিময় হয়েছে, তবে অতটুকুই। ওকে নিয়ে আর কখনও মাথা ঘামাইনি।
৭
স্মৃতির যবনিকা পাঠ।
আজ কেন জানিনা ওর স্মৃতিতে পেয়েছে। মাথা ঘামাচ্ছি ওকে নিয়ে। আমি আসলে ভাবছিলাম জিয়ার উত্থান আর পরিণতির কথা। ধরাযাক, মেজর জেনারেল মাহবুব ওকে যদি র্যাবে না পাঠাতেন! ওর যদি র্যাব-দুই পোস্টিং না হতো! ও যদি ইন্টেলিজেন্স উইং-এ না যেত! তাহলে হয়তো আর দশজন অফিসারের মতো সেও চাকরি শেষে অবসরে যেতে পারতো, একটা সুস্থ-সুন্দর জীবন পেতো! হাসি-তামাশার এই মিলনমেলায় সেও সময় কাটাতে পারতো। এখন তার পরিবার কোথায় আর সে কোথায়! ভাবী! বাচ্চা! এই জীবনে তাদের আর দেখা হবে কী! কিংবা পুরো বিষয়টাকে যদি এভাবে দেখি! যদি ডিজি র্যাব তার আদেশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারতেন! যদি এডিজি (অপস) তার কথা শুনতেন! যদি এডিজি (এডমিন) ফালতু যুক্তি না দেখাতেন! তাহলে আমার আজ অবস্থান কোথায় হতো? সরকারি কিছুকিছু পদ এমনই, সেখানে গিয়ে না চাইলেও অনেককিছু করতে হয়। অনৈতিক অর্ডার ফেরানো অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয়না। গান পয়েন্টেও দাঁড়াতে হয়। তাহলে! অদূরে হাস্যরসরত ছেলের দিকে তাকিয়ে শরীরটা কেঁপে উঠলো। আলহামদুলিল্লাহ্। হয়তো কারো দোয়া’র কারণে আমি ভালো আছি! আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়েছেন। কখনো কখনো ভাগ্য আমাদের এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করে যে, নিজেকে সঁপে দেয়া ছাড়া কিছুই করার থাকে না। জিয়া তারটা ভালো বলতে পারবে। তবে এটা তো ঠিক, মানুষ নিয়তির সন্তান।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫